শাহ দেহলভীর চার পুত্র : অবদানের এক ঝলক

ওলিউর রহমান ।।

খ্রিস্টিয় আঠার শতকের বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক এবং আধুনিক ইসলামি চিন্তার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.-এর উপর আল্লাহ তাআলার সবিশেষ যে অনুগ্রহ ছিল তা হল তাঁর সুযোগ্য চার সন্তান।

বিজ্ঞাপন

‘নি’মাল খালাফ লিনি’মাস সালাফ’ তথা ‘বাপ কা বেটা’ বলে যে আরবি ও উর্দু প্রবচন; শাহ ওলিউল্লাহ এবং তার চার সন্তানের ব্যাপারে এটি পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রযোজ্য।

উপমহাদেশে চিন্তা ও আদর্শের যে প্রদীপ শাহ ওলিউল্লাহ প্রজ্জ্বলিত করেছিলেন তার বিচ্ছুরণ এবং আলোকচ্ছটা ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলেই ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তার সুযোগ্য সন্তানেরা।

মারাঠা, জাঠ, শিখ, রাজপুত, শিয়া সম্প্রসারণবাদ এবং বিদেশি বেণিয়াদের বিরুদ্ধে যে অনন্ত সংগ্রামের সূচনা শাহ ওলিউল্লাহ করেছিলেন তার সুযোগ্য সন্তানেরা সে সংগ্রাম ও আন্দোলনের হাল ধরেছিলেন শক্ত হাতে। তারই ভিত্তিতে ভারতবর্ষকে দারুল হরব ঘোষণা করে জিহাদের ডাক দেওয়া হয়েছিল। ভারতের একটি বৃহৎ অংশে শরয়ী শাসন কায়েম হয়েছিল। সংগঠিত হয়েছিল বালাকোট ও শামেলির লড়াই। রেশমি রুমাল আন্দোলন।

দিল্লির মাদরাসায়ে রহিমিয়্যাতে শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার যে নতুন ধারার সৃষ্টি শাহ ওলিউল্লাহ করেছিলেন সে জ্ঞানচর্চার সম্প্রসারণ তার সন্তানেরা এ পরিমাণ করেছিলেন যে, ভারতবর্ষে হাজার হাজার মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলা অঞ্চলের দেওয়ানী গ্রহণের পর বৃটিশ সরকার কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া আশি হাজার মাদরাসা তদানীং জ্ঞানচর্চার সম্প্রসারণের উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

জন্মের ক্রমধারায় শাহ ওলিউল্লাহর সুযোগ্য চার সন্তান হলেন, শাহ আবদুল আযীয, শাহ আবদুল কাদির, শাহ রফি উদ্দীন, শাহ আবদুল গণি। তবে আশ্চর্যজনকভাবে ওফাতের ক্রমধারা সম্পূর্ণ বিপরিত।

 

শাহ আবদুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ.

শাহ ওলিউল্লার জ্যেষ্ঠপুত্র শাহ আবদুল আযীযের জন্ম হয় ১১৫৭ হিযরির রমযান মাসে। শারীরিক গঠনে তিনি ছিলেন ক্ষীণকায় এবং জীবনের বেশিরভাগ সময়ে বিভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। তবে তার কামালিয়্যাত এবং গুণ বিবেচনায় তাকে উপাধী দেওয়া হয় সিরাজুল হিন্দ বলে। তার চিন্তার সুক্ষ্মতা এবং বিশ্লেষণ ও উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য লোকেরা তাকে ‘হুজ্জাতুল্লাহ’ বলে ডাকতেন।

শিক্ষার হাতেখড়ি হয় বাবা শাহ ওলিউল্লাহর হাতেই। খুবই অল্প বয়সে তিনি কুরআন হিফজ করেন। ষোল বছর বয়সে পিতার ইনতিকালের আগেই তিনি জ্ঞানার্জনের আবশ্যিক পাঠ চুকিয়ে নেন। ফিকহ, তাফসির, হাদিস, যুক্তিতর্ক, দর্শন এবং জ্যামেতির ভিত্তিমূলক জ্ঞান কিংবদন্তী পিতা থেকেই অর্জন করেন। পিতার ইনতিকালের পর শায়খ নুরুল্লাহ বারহানভী এবং মুহাম্মাদ আমীন কাশ্মীরি সহ একাধিক বিশিষ্ট আলেম থেকে তিনি বিভিন্ন হাদিসের কিতাবের সনদ লাভ করেন।

পিতার ইনতিকালের পর তাঁর যাবতীয় দায়িত্ব সূচারুরূপে আঞ্জাম দিয়েছেন শাহ আবদুল আযীয দেহলভী। তার ব্যাপারে সমকালীন অনেকেই বিখ্যাত ফারসী কবিতা ‘আগার পেদর না তাওয়ানাদ পেসর তামাম কুনাদ’ উদৃত করতেন।

সতের বছর বয়সে মাদরাসায়ে রহিমিয়্যার দায়িত্ব হাতে নেন। পাঠদানের প্রক্রিয়াসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও মানসম্মত করেন। দিন নির্দিষ্ট করে সাধারণ মানুষদের নসিহত ও কুরআনের তাফসির শুনানোর যে ধারা শাহ ওলিউল্লাহ চালু করেছিলেন, পুত্র শাহ আবদুল আযীয সে ধারা অব্যাহত রাখেন। সাইয়েদ আহমদ শহীদ রহ.কে ইসলামি হুকুমত প্রতিষ্ঠার সশস্ত্র আন্দোলনে প্রেরণ করে পিতা শাহ ওলিউল্লাহ সংগ্রামের যে ধারা সূচনা করেছিলেন পুত্র শাহ আবদুল আযীয তার পূর্ণতা দেন।

 

শাহ আবদুল আযীয রহ.-এর কর্মময় বর্ণিল জীবনকে পাঁচটি অধ্যায়ে ভাগ করা যায়।

 

১. কুরআন শিক্ষার প্রচার

সারা ভারতবর্ষজুড়ে তার তত্ত্ববধানে অনেক মক্তব মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার জন্য তিনি স্বভাষায় কুরআনের তাফসির করার প্রতি তিনি গভীর মনোযেগ দেন। প্রচণ্ডরকম শারিরীক অসুস্থতা নিয়েও তিনি প্রতি সপ্তাহের সোম ও শুক্রবারে কুরআনের তাফসির করতেন। পরম আগ্রহ নিয়ে দূর দূরান্তের মানুষ তার তাফসিরের দরসে অংশে নিতেন।

জনসম্মুখে যে তাফসির শাহ সাহেব করতেন তা সংকলনও করা হত। তবে ১৮৫৭-এর চরম দুর্যোগের কালে সে সংকলনের বড় অংশকে জ্বালিয়ে (!) দেয়া হয়। অবশ্য শাহ সাহেবের একান্ত নিজস্ব তত্ত্ববধানে সংকলিত কুরআনের অংশ বিশেষের তাফসিরগ্রন্থ তিনখণ্ডের ‘তাফসিরে ফাতহুল আযীয’ তাফসির বিষয়ে তার অসামান্য দক্ষতার পরিচায়ক হিসেবে এখনও বিদ্যমান।

 

২. হাদিস চর্চার ব্যাপক প্রসার

উপমহাদেশে হাদিসের চর্চার ক্ষেত্রে শাহ সাহেব অতুলনীয় দৃষ্টান্ত। দীর্ঘ চৌষট্টি বছর তিনি হাদিসের দরসের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। উপমহাদেশব্যাপী হাদিস চর্চার বিভিন্ন ধারার ক্রমসূত্র তার পর্যন্ত গিয়েই সংযোজিত হয়। উসূলে হাদিস ও রিজাল শাস্ত্রের উপর তার লিখিত আল উজালাতুন নাফিয়াহ এবং বুসতানুল মুহাদ্দিসিন সংক্ষিপ্ত হলেও অতি গুরুত্বপূর্ণ দু’টি কিতাব।

 ৩. শিয়া সম্প্রসারণবাদের প্রতিরোধ

মুঘল সম্রাট হুমায়ুন ইরানিদের সহায়তায় দ্বিতীয় মেয়াদে দিল্লির ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে উপমহাদেশে শিয়াবাদের যে উত্থান শুরু হয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেবের পরে এসে তা চরম মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ভারতবর্ষে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা শিয়া সম্প্রসারণবাদকে শাহ সাহেব কঠোর হাতে দমন করেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিয়াবাদের বিরুদ্ধে খুব জোরালো আলোচনা করেন। শিয়াবাদের খণ্ডনে তার লিখিত ‘তুহফায়ে ইসনা আশারিয়া’কে এ বিষয়ে এ যাবতকালের রচিত সবচেয়ে সমৃদ্ধ গ্রন্থ মনে করা হয়।

বিপক্ষের মত খণ্ডনের স্বাভাবিক যে ধারা তার বাইরে গিয়ে শাহ আবদুল আযীয দেহলভী এই কিতাবে প্রথমে উলুহিয়্যাত, নবুওয়্যাত, মাআদ, ইমামত ও খেলাফত প্রসঙ্গে বিভিন্ন দলিলের আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পরে তিন খলিফা, আম্মাজান আয়েশা এবং অপরাপর সাহাবাদের বিরুদ্ধে শিয়াদের যাবতীয় অভিযোগের সমুচিত জবাব প্রদান করেছেন। শিয়াদের বিভিন্ন ফেরকা, ইতিহাস এবং তাদের নানা উপদলে বিভক্তির কার্যকরণ নিয়েও শাহ সাহেব তুহফায়ে ইসনা আশারিয়্যাতে এমন প্রামাণিক আলোচনা করেছেন যে শিয়াদের নিজেদের রচিত পুস্তকাদিতেও এত তথ্যবহুল আলোচনা নেই।

উপমহাদেশব্যাপী এই কিতাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে শিয়া সম্প্রসারণবাদ চরম হুমকির মধ্যে পড়ে। শিয়াদের অনেকেই এই কিতাব রচনার পর নিজেদের ভ্রান্ত মত পরিহার করে সত্য সঠিক দ্বীনের দিকে প্রত্যাবর্তনও করে।

 

৪. ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গঠিত সংগ্রামী জামাতের বিন্যস্তকরণ

উপমহাদেশে সম্পূর্ণ শরিয়া ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভি দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে একটি সংগ্রামী জামাত গঠন করেছিলেন। তার মৃত্যুর পরে পুত্র শাহ আবদুল আযীয সে জামাতটিকে আরও বিন্যস্ত করেন। সাইয়্যেদ আহমদ শহিদ, শাহ ইসমাইল শহিদ, মাওলানা আবদুল হাই বারহানভী সহ অসংখ্য অকতূভয় বীর শাহ সাহেবের কাছে জিহাদের বাইয়াত গ্রহণ করেন।

সাইয়েদ আহমদ শহীদকে আমীর বানিয়ে শাহ সাহেব সে দলটিকে পূর্নাঙ্গ ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার জিহাদে প্রেরণ করেন সীমান্তবর্তী এলাকায়। সাইয়েদ আহমদ শহীদ এবং তাঁর সাথীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি বৃহত অঞ্চলে ইসলামি শাসন ব্যবস্থা জারি করা হয়। সেখানে চল্লিশ হাজারের মতো সাইয়েদ সাহেবের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ত্রিশ লাখ লোক সাইয়েদ সাহেবের খেলাফতের উপর বাইয়াত গ্রহণ করেন।

 

৫. হিন্দুস্তানে মুসলমানদের পুনঃর্জাগরণ এবং দখলদার বেণিয়া ইংরেজদের প্রতিরোধ

দরসে-তাদরীসে নিমগ্ন শাহ আবদুল আযীয ভারতবর্ষে মুসলমানদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিষয়েও ছিলেন পূর্ণ মনোযোগী। উপমহাদেশের সামগ্রীক অবস্থা বিবেচনা করে মুসলমানদের রাজনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে পিতা শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে একটি জামাত গঠন করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়। কিছুদিনের মধ্যেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বড় ধরনের কোনো হাঙ্গামা ছাড়াই বিহার-বাংলা-উড়িষ্যার দেওয়ানি দখল করে নেয় এবং নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে করতে দিল্লির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। মহীষূরের শহিদ সুলতান টিপুসহ অপরাপর মুসলিম বীরদেরও ইংরেজরা পরাস্ত করতে থাকে। ভারতবর্ষের সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের জাতীয় বিপদ আঁচ করে শাহ আবদুল আযীয দেহলভি তখন ইংরেজদের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম জিহাদের ডাক দিয়ে উপমহাদেশকে দারুল হরব ফতোয়া দেন।

শাহ সাহেবের ফতোয়া বিদ্যুৎবেগে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। জিহাদি চেতনায় উজ্জীবিত হন মুসলমানরা। অন্য ধর্মের মানুষদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের আগুন। সৈনিকরা হয় তেজ্যোদীপ্ত। সংগঠিত হয় শামেলির লড়াই। সিপাহী বিদ্রোহ।

ইংরেজদের কূট ষড়যন্ত্রে আপাত দৃষ্টিতে শামেলির লড়াইয়ে ভারতবর্ষের মানুষের পরাজয় হলেও এই প্রতিরোধই মানুষদের উজ্জিবিত করে পরবর্তী অন্যান্য স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিতে।

 

শাহ রফিউদ্দীন ইবনে শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.

শাহ ওলিউল্লাহ রহ.-এর দ্বিতীয় সন্তান শাহ রফিউদ্দীন রহ.-এর জন্ম হয় দিল্লিতে। অল্প বয়সেই পিতার ইনতিকাল হয়ে গেলে তার সার্বিক দেখাশুনার দায়িত্ব পড়ে বড় ভাই শাহ আবদুল আযীযের উপর। শাহ আবদুল আযীয রহ. ছোট ভাই রফিউদ্দীনকে পিতার আদর্শেই বড় করে তুলেন।

শাহ রফিউদ্দীন অল্প বয়সেই শিক্ষা কার্যক্রম সমাপ্ত করেন। বিশ বছর বয়স থেকেই তাকে হিন্দুস্তানের অন্যতম মুফতি হিসেবে গণ্য করা হতো। বড় ভাই শাহ আবদুল আযীযের চোখে সমস্যা দেখা দিলে মাদরাসায়ে রহিমিয়্যার যাবতীয় দায়িত্ব শাহ রফিউদ্দীন দেহলভীর উপর ন্যস্ত করা হয়। অত্যন্ত সূচারুরূপে তিনি মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব আঞ্জাম দেন।

বড় ভাই শাহ আবদুল আযীযের শারীরিক অসুস্থতার কারণে তার বিভিন্ন কাজও করে দিতেন শাহ রফিউদ্দীন। শাহ রফিউদ্দীন প্রসঙ্গে শাহ আবদুল আযীয দেহলভি বলেন, আল্লাহর অনেক শুকরিয়া যে, তিনি রফিউদ্দীনের লালন পালনের যিম্মাদারি দিয়ে আমার উপর ব্যাপক অনুগ্রহ করেছেন।

শাহ রফিউদ্দীন ছিলেন অত্যন্ত সুক্ষ্ম চিন্তার অধিকারী। তার লেখার হাতও ছিল অত্যন্ত পাকা। দর্শনের উপর তার লিখিত আসরারুল মুহাব্বাত গ্রন্থটিকে অনেকে এ শাস্ত্রের অন্যতম রচনা বলে মনে করেন। দর্শনের ক্ষেত্রে তাকে ইবনে সিনা, ফারাবি এবং নাসিরুদ্দীন তুসির সমকক্ষ ভাবা হয়।

দামগুল বাতিল, তাকমিলাতুস সানে’ সহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। এছাড়াও ইতিহাসে ছিল তার অসামান্য দখল।

বড়ভাই শাহ আবদুল আযীয দেহলভির জীবদ্দশাতেই ১২৩৩ হিজরির শাওয়াল মাসে শাহ রফিউদ্দীন দেহলভির ইনতিকাল হয়। পিতার কবরের পাশেই তাকে দাফন করা হয়।

 

শাহ আবদুল কাদের ইবনে শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.

চমৎকার বর্ণনায় রচিত কিতাব ‘তাফসিরে মুযিহুল কুরআনের’ রচয়িতা শাহ শাহ আবদুল কাদের মুহাদ্দিসে দেহলভির জন্মও দিল্লিতেই হয়। তার তালিম তারবিয়তও বড় ভাই শাহ আবদুল আযীযের হাতেই হয়।

বড় ভাইয়ের কাছে শিক্ষা সমাপ্তির পর শাহ আবদুল কাদের দিল্লির আকবরাবাদী মসজিদে অবস্থান করতে থাকেন। বড় ভাইয়ের অনুমতিক্রমে এখানে তিনি নিয়মিত কুরআনের তাফসীর করতেন। তাফসীরের উপর শাহ আবদুল কাদের দেহলভীর ছিল বিশেষ যোগ্যতা। বড় ভাই শাহ আবদুল আযীয দেহলভির নানা অসুস্থতার কারণে মাদরাসায়ে রহিমিয়্যাতেও তিনি বিভিন্ন সময় তাফসির করার দায়িত্ব পালন করেন।

হিন্দুস্তানের তদানিং ভাষা ফার্সিতে অনুদিত প্রথম পূর্ণাঙ্গ তাফসির গ্রন্থ ছিল শাহ আবদুল কাদের দেহলভি রচিত তাফসিরে মুযিহুল কুরআন। অত্যন্ত সহজ ও সাধারণের বোধগম্য করে রচিত এ তাফসির গ্রন্থটিই পরবর্তীতে উর্দু ও ফার্সিতে অনুদিত অন্যান্য তাফসীরগ্রন্থের সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।

জীবনের অন্য সকল মহান কীর্তির কথা বাদ দিয়ে কেবলমাত্র তাফসিরে মুযিহুল কুরআনের রচয়িতা হিসেবেও শাহ আবদুলল কাদের দেহলভিকে ভারতবর্ষের মুসলমানগণ মনে রাখবেন দীর্ঘদিন।

১২৩০ হিজরীর ১৯ রজব এই মহান মনীষীর ইনতিকাল হয়। তাকেও পিতা শাহ ওলিউল্লাহর পাশেই দাফন করা হয়।

 

শাহ আবদুল গনি বিন শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ.

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভির সর্বকনিষ্ঠ সন্তান শাহ আবদুল গনি দেহলভির জন্মও দিল্লিতেই হয়। বড় ভাইদের কাছে হয় তার শিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত রুচিশীল প্রকৃতির এবং প্রচণ্ড মেধাবী।

তবে নিজ অঙ্গনে পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ১২২৭ সালে তার ইনতিকাল হয়ে যায়। তার বংশেই জন্মগ্রহণ করেন বালাকোট বীর শাহ ইসমাঈল শহিদ রহ.।

এটি সবিশেষ আশ্চর্যের একটি ঘটনা যে মহান মুজাদ্দিদ শাহ ওলিউল্লাহ রহ.-এর সন্তানদের ওফাতের ক্রমধারা ছিল জন্মের সম্পূর্ণ বিপরিত। ছোট সন্তান শাহ আবদুল গনীর ওফাত হয় সবার প্রথম। আর বড় সন্তান শাহ আবদুল আযীয রহ. পিতার উত্তরাধীকার নিয়ে বেঁচে ছিলেন সবার চেয়ে বেশি সময়।

 

বিজ্ঞাপন