চার্চের সেবিকা না হয়ে ইসলাম গ্রহণ : অতঃপর ফিলিস্তিনি শিশুদের কুরআনের পাঠদান

207

তারিক মুজিব ।।

‘আমার মা চেয়েছিলেন আমি চার্চের সেকিকা হই। আমার বেড়ে ওঠার পরিবেশও অনেকটা সেরকমই ছিল। তবে কুদরত আমার জন্য ভিন্ন কিছু লিখে রেখেছিলেন। আমি ইসলাম গ্রহণ করলাম। আলহামদুলিল্লাহ এখন আমি যথারীতি একজন মুসলিম।’

মারিয়া কিলারা মাহমুদ বলছিলেন এসব কথা। তার বাবা মাহমুদ ওয়াযবিজ ফিলিস্তিনি মুসলিম। মা ইলিদা প্যারাগুয়ান খ্রিস্টান। মারিয়ার জন্ম শিকাগোতে। শৈশব কেটেছে ফিলিস্তিন, প্যারাগুয়ে এবং যুক্তরাষ্ট্রে। জন্মের পর খ্রিস্টান শিশুদের মতো যথারীতি তার ব্যাপ্টাইজ করা হয়। পড়াশোনার হাতেখড়িও হয় ক্যাথলিক চার্চেই।

বর্তমানে তিনি ফিলিস্তিনি শিশুদের কুরআন শেখানোর কাজ করেন। মাঝেমাঝেই তাদের নিয়ে গল্পের আসর জমান। আলাপে আলাপে তাদেরকে নবীদের, সাহাবাদের গল্প বলেন। সাথে রাখেন নানা প্রকারের চকোলেট। তাঁর ইসলাম গ্রহণের গল্পটা বেশ কৌতুহল-উদ্দীপক।

মারিয়া কিলারা প্রথম যখন তার পিতৃভূমি ফিলিস্তিনে আসেন তখন তার বয়স নয় বছর। স্কুলে যাতায়াত শুরু করেছেন কিছুদিন হল। বাবা মাহমুদ ওয়াযবিজকে গুরুত্বপূর্ণ কাজে ফিলিস্তিন যেতে হচ্ছিল। সাথে নিয়ে যান ছেলে ইউসুফকে। মারিয়া কিলারা মার সাথে আমেরিকাতেই থেকে যান। হঠাৎ তার মা কঠিন অসুখে পড়েন। ভালো চিকিৎসার জন্য তিনি চলে যান আর্জেনটিনায়। অগত্যা মেয়েকে পাঠাতে হল ফিলিস্তিনে, বাবার কাছে।

ফিলিস্তিনে মারিয়া এবং তার ভাই ইউসুফকে মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। তারা দ্রুতই আরবি শিখে ফেলছিলেন। বাবা মাহমুদের ঐকান্তিক কামনা ছিল- সন্তান দু’টি একবার অন্তত কালিমাটা পাঠ করুক। তা আর হয়ে ওঠেনি।

ততদিনে স্ত্রী সুস্থ হয়ে ফিলিস্তিনে চলে এসেছেন। মেয়েকে পাঠালেন গির্জায়। নানা প্ররোচনায় মেয়েকে ইসলামের প্রতি তিনি এমন বিদ্বেষী করে তোলেন যে, মারিয়া বলেন, আযানের আওয়াজ শুনলে আমি কানে আঙ্গুল চেপে ধরতাম। ইসলামি অনেক পুস্তক মাটিতে রেখে আমি পথ মাড়াতাম। কখনো ইচ্ছেও হয়েছিল- ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের পক্ষে আমি অবদান রাখবো।

তবে তা আর হতে পারেনি। মারিয়া এখন ফিলিস্তিনি মুসলিমদের মাঝে ইসলাম বিষয়ক নানা বই বিতরণ করেন। উপযুক্ত জায়গা দেখে কখনো বয়স্ক কখনো শিশুদের নিয়ে তিনি বসে যান তালিমের কাজে। তার বাসায় অনেক বই। পাঠাগার সবার জন্য উন্মুক্ত।

আরবিতে তিনি বুৎপত্তি অর্জন করেছেন। ইংরেজিতে রয়েছে তার অসামান্য দখল। বাহিরের কোনো দেশ থেকে আসা পর্যটক নারীদেরও তিনি কুরআন শিক্ষা দেন। ইংরেজিতে, আরবিতে।

মারিয়া কিলারা

আরবিটা শিখেছিলেন ছোটবেলাতেই। বাবা যখন মাদরাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়ছিলেন। তখনও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে আরবি ভাষাটা তার মনে ধরেছিল। প্রচুর আরবি বই তিনি পড়তেন। কুরআন শরীফও মাঝেমাঝে উল্টে উল্টে দেখতেন।

একদিনের ঘটনা। মারিয়া কিলারার মা ইলিদা মেয়েকে কুরআনের একটি কপি থেকে ‘মা মেরি’ এবং ‘যীশুর’ আলোচনা পড়তে দিলেন। মারয়াম এবং ঈসার (আলাইহিমাস সালাম) ঘটনা তার মনে গভীর রেখাপাত করল। ত্রিত্ববাদ এবং একত্ববাদ নিয়ে তিনি পড়ে গেলেন দ্বন্দে। ভয়ে মাকেও কিছু বলতে পারছেন না। আবার কুরআন পড়াও ছেড়ে দিতে পারছিলেন না।

ইতোমধ্যে তার বাবা ওয়াযবিজকে আবার আমেরিকায় ফিরে যেতে হলো। তবে মারিয়ার মোটেই যেতে ইচ্ছে করছিল না। এদিকে মায়ের কড়া শাসন ছিল। মা তাকে আর্জেনটিনার একটি চার্চে পাঠিয়ে দিলেন। কিছুদিন ছিলেনও সেখানে। পরবর্তীতে একটি স্কলারশিপ নিয়ে তিনি আমেরিকায় চলে যান। এসময় তার ইসলাম সম্পর্কে বিস্তারিত জানার সুযোগ হয়। বাবা মাহমুদ তাকে সহযোগিতা করেন। একসময় তিনি এক ফিলিস্তিনি যুবককে বিয়ে করে পিতৃভূমিতে চলে আসেন।

প্রথমদিকে ফিলিস্তিনে তার জানাশোনা তেমন ছিল না। একাকীই জীবন কাটাতেন। নিঃসঙ্গতা কাটাতে তিনি বাচ্চাদের কুরআন পড়াতে শুরু করলেন। মাঝেমাঝে বয়স্ক নারীরাও আসতো তার সাথে আলাপ করতে। মারিয়া কিলারার পরিচিতি দিনদিন বাড়তে লাগল।

এখন প্রতিদিনই দেখা যায় কুদসের কোনো নির্জন জায়গায় তিনি বসে আছেন। তার চারপাশে শিশুদের জটলা। কখনো কুরআন পড়াচ্ছেন। কখনো গল্প বলছেন। কখনো চকোলেট বিতরণ করছেন, একজন একজন করে।