‘প্রভু, তাদের  ওপর রহম করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবে লালনপালন করেছেন’

128

মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ।।

(২৭. ১০. ২০১৯ তারিখে দারুল উলুম করাচির জামে মসজিদে প্রদত্ত বয়ান। অনুলিখন ও অনুবাদ: শিহাব সাকিব)

আল্লাহ তাআলা সূরা বনি ইসরাইলে প্রথমে মহান মেরাজের দিকে ইশারা করেছেন। বনি ইসরাইলের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। ঈমানের প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন। এরপর এই উম্মতে মুহাম্মদিয়ার জন্য জীবনঘনিষ্ঠ বিধিবিধান, দ্বীনী সামাজিক ও নৈতিক কর্মপন্থা সম্পর্কে অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন।

কীভাবে জীবন অতিবাহিত করবে, তোমার প্রতিপালক সে বিবরণ পেশ করছেন। প্রথমত আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদত না করা, কাউকে ইবাদতের উপযুক্ত মনে না করা। প্রয়োজনপূরণের মালিক মনে না করা। সমস্যা ও সংকট দূরীভূতকারী মনে না করা।

আল্লাহর একত্ববাদ ও ইবাদতের আলোচনার পর বলেছেন, “মা বাবার সাথে উত্তম ব্যবহার করো।” ভাবুন, মা বাবার সাথে সদাচরণের গুরুত্ব কত! এটাকে তাওহীদ ও ইবাদতের সাথে মিলিয়ে উল্লেখ করলেন। অন্য আরেক স্থানে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়ার সাথে সাথে মা বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নির্দেশ দিয়ে বলেন,“আমার ও তোমার মাতা পিতার কৃতজ্ঞতা আদায় কর।”-সুরা লুকমান, ১৪।

এখানেও একই সাথে আল্লাহ ও মা বাবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের নির্দেশ দিয়েছেন।তাদের সাথে উত্তম আচরণ ও কৃতজ্ঞতাবোধ আমাদের অনেক বড় দায়িত্ব ও মর্যাদার বিষয়।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন, তাদের একজন অথবা উভয়েই তোমাদের জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন তাদের সামনে কখনো “উফ” শব্দ বলবে না। ধমক দিবে না। ইজ্জত ও সম্মানের সাথে কোমলভাবে কথা বলবে। তাদের প্রতি মমতাপূর্ণ আচরণের সাথে তাদের সামনে নিজেকে বিনয়াবনত করএবং দুআ কর, হে আমার প্রতিপালক তারা যেভাবে আমার শৈশবে আমাকে লালন পালন করেছেন, তেমনি আপনিও তাদের  প্রতি রহমতের আচরণ করুন। -সুরা বনি ইসরাইল, ২৩-২৪।

আল্লাহ তাআলা মা বাবার অধিকার বয়ান করার জন্য এই পূর্ণ দুইটি আয়াত নাযিল করেছেন। এখানে বার্ধক্যের কথা বিশেষভাবে এজন্য বলেছেন, এ সময় মানুষের স্মরণশক্তিও যেহেন দুর্বল হয়ে পড়ে। কখনো কখনো তাদের সেবা করতে গিয়ে অনেক পরিশ্রম ও কষ্ট করতে হয়। তাই আসল পরীক্ষা এই সময়।

যাবৎ তুমি তোমার মা বাবার আদর স্নেহ লালন পালন ও সেবা যত্নের মুখাপেক্ষী ও নির্ভরশীল তাবৎ তোমার ভাল ব্যবহার তেমন কী বার্তা বহন করে?দেখার বিষয় হল তারা যখন বৃদ্ধ হয়ে পড়েন। বার্ধক্যজনিত নানা উপসর্গ সামনে আসতে থাকে। বোধ বিবেক অচল হতে থাকে। তোমাদের বিরক্তিকর অনেক কিছু তাদের থেকে প্রকাশ পেতে শুরু করে। একই কথা বারবার জিজ্ঞেস করেন। একই বিষয় বারংবার বলতে থাকেন।

বড় হলে মানুষ শৈশবের সবকিছু ভুলে বসে। মা বাবার সব ত্যাগ কুরবানি, কষ্ট মেহনত কিছুই মনে রাখতে চেষ্ট করে না। তারা কীভাবে নির্ঘুম দীর্ঘ দিবস রজনী তাকে স্নেহ আদর দিয়ে গেছেন? অসুখ বিসুখে তাকে নিয়ে চিকিৎসক ও হাসপাতালে অবিরাম ছুটে চলেছেন! তার কত আবদার পূরণ করেছেন। অমলিন বদনে কত অবান্তর প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সব কিছু ভুলে যায়। দায়িত্বশীল বড় মানুষ এখন! ঘরে বয়োবৃদ্ধ মা বাবা পড়ে আছেন। তাদের খবর রাখে না। সে নিজেরটাই নিজে বুঝে। নিজের যেটাতে ফায়দা সেটা নিয়েই পড়ে থাকে।

কুরআন হাদীসে অনেক দুআ বর্ণিত হয়েছে। তন্মধ্যে কিছু দুআর রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট ও গুণ। যেমন এখানের দুআটি। আমাদের মহান মালিক আল্লাহ এই দুআ আমাদের শিখিয়েছেন এবং এই দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। বলেছেন, “বলো রাব্বিরহামহুমা কামা রাব্বায়ানি সাগিরা”- তারা যেভাবে আমাকে লালন পালন করেছেন তেমনি আপনিও তাদের প্রতি রহমতের আচরণ করুন।

যে দুআ স্বয়ং আল্লাহ শিখাচ্ছেন এবং করতে বলছেন তা কবুল হওয়ার ব্যাপারে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই! কোন সাধারণ মানুষ যখন কাউকে বলে আমার কাছে এক হাজার টাকা চাও। সে তাকে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে চাইল। কিন্তু পেল না। এটা ঐ লোকের নিচু মানসিকতা ও অভদ্রোচিত আচরণ বলে গণ্য করা হয়। আল্লাহ তাআলা অনেক অনেক মহান। তার মাকাম সীমাহীন উঁচু। তিনি কোন দুআ করতে শিখাবেন কিন্তু সেই দুআ কবুল হবে না, এটা হতেই পারে না। অসম্ভব। অবশ্যি এই দুআ কবুল হবে।

এই দুআ মা বাবার জন্য সব সময় করা যাবে। জীবদ্দশায় যেমন করা যাবে তাদের ইন্তিকালের পরেও করা যাবে। “রাহমা” বিস্তৃত অর্থবহ একটি শব্দ। তারা যতদিন বেঁচে আছেন ততদিন দুআ করলে এর ভেতর তাদের সুস্থতা, সুখ স্বাচ্ছন্দ্য, আরাম আয়েশ ও সুখময় জীবন, সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হবে।

অনেকে মা বাবা জীবিত থাকাবস্থায় তাদের যথাযথ কদর করতে পারে না। তারা কী নিয়ামত ছিলেন, বুঝতে পারে না। ইন্তিকালের পর মনের ভেতর উদ্রেক হয়, তাদের যতটা সেবা যত্ন ও ইজ্জত সম্মান করার দরকার ছিল করতে পারি নি। অজ্ঞতা ও উদাসীনতায় এত দিন হক আদায় করতে পারি নি। এখন কী করব আমি? আল্লাহ তাআলা সুন্দর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এখনও রাস্তা খোলা। দুআ কর।

ইসালে সওয়াবের সাথে সাথে এই দুআর প্রতি বিশেষভাবে ইহতিমাম করবে। এই দুআ বেশি উপকারি। এক হাজার টাকা সাদাকা করলে সেই পরিমাণ সওয়াব পৌঁছবে। কুরআন খতম করলে তার সওয়াব। কুরবানি করলে কুরবানির সওয়াব। কিন্তু “রাব্বিরহামহুমা”- তে রয়েছে এসব থেকে আরও বেশি কিছু। আল্লাহর রহমত। এটা হবে তার শান মোতাবেক। কুরআন তেলাওয়াত নামাজ সাদাকা এক দিকে আর আল্লাহর রহমত অপর দিকে।

এজন্যেই হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানভি র. বলতেন, যত পার ইসালে সওয়াব কর। যত করবে তত তাদের কাছে পৌঁছবে। তবে বেশি গুরুত্ব দেবে দুআর প্রতি। আল্লাহ তালা ছোট্ট একটি দুআ শিখিয়েছেন। এতে চাওয়া হয় আল্লাহর রহমত। পরম দয়ালু রহীম রহমানের রহমত। তার উপর আর কার রহমত হতে পারে?

তিনি তার রহমতের মাত্র এক ভাগ পুরা পৃথিবীর সবার মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। নিরানব্বই ভাগ তার কাছেই রেখে দিয়েছেন। এই যে, মা বাবা সন্তান ভাই বোন স্বামী স্ত্রীর মাঝে ভালবাসা ও মহব্বতের বন্ধন দেখি এসবই সেই এক ভাগ থেকে সিঞ্চিত। এমনকি পাখি যে তার ঠোঁট দিয়ে ছানাকে আাহার করায় তাও এই রহমতের কারণেই।

মা বাবার জন্য, আত্মীয় পরিজনের জন্য রহমতের দুআ করা মানে অফুরন্ত সীমাহীন নেআমতের দুআ করা। এর ভেতর যাবতীয় সব কিছু চলে এসেছে। মৃত্যুর পর তাদের যা যা প্রয়োজন সবই আছে এতে। মাগফিরাত জান্নাত লাভ ও দারাজা বুলন্দি। কত সময় আর ব্যয় হয় এতে! মাত্র কয়েক মুহূর্ত। বারবার পড়তে থাক। মা বাবার হক আদায়ে যত ত্রুটি হয়েছে, কিছুটা হলেও লাঘব হবে। ইনশাল্লাহ।

আমার বাবা মুফতি শফি র. আমার দাদার একমাত্র সন্তান ছিলেন। তার অনেক খেদমত করেছেন। তিনি বলতেন, “আমার বাবা একদিন আমাকে বললেন, আমার ইন্তিকালের পর আমাকে ভুলে তো যাবেই, তবে খুব দ্রুত ভুলে যেও না। অন্তত কিছু দিন ইসালে সওয়াব ও দুআ করো। আজও তার কথাগুলো আমার কানে প্রতিধ্বনিত হয়। তার ইন্তিকালের পর কোন একটি দিন এমন যায়নি যে দিন তার জন্য দুআ করি নি। ইসালে সওয়াব করিনি।”