বাবরি মসজিদ মামলা : রায়ের প্রধান ভিত্তিটাই সন্দেহমূলক

345

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

ভারতীয় সু্প্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ও তার সহকর্মী অন্য বিচাপতিরা ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ মামলার রায় দিয়েছেন গত ৯ নভেম্বর। সেই রায়ে তারা মসজিদের স্থানটিকে হিন্দুদের দিয়ে দিলেন এবং সেখানে মন্দির নির্মাণের জন্য একটি কমিঠি গঠন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন। আর অন্য কোনো জায়গায় মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলমানদেরকে ৫ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানালেন। এটাই হচ্ছে এই রায়ের মূল কথা। এই রায় দেওয়ার পেছনে মূল ও ভিত্তিগত যে প্রধান যুক্তিটি রায়ে বলা হয়েছে, সেটি হলো, বাবরি মসজিদ কোনো খালি জায়গায় নির্মাণ হয়নি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের বক্তব্য ছিল, মসজিদ যে জায়গাটিতে নির্মাণ হয়েছে সেখানে আগে থেকেই কোনো একটা কিছুর স্থাপনা ছিল। রায়ে একথাও বলা হয়েছে যে, সেই স্থাপনা যে কোনো মন্দিরের ছিল এমন কোনো তথ্য প্রমানিত হয়নি। তার মানে হলো, মন্দির ছিল-এমন কথা প্রমানিত না হওয়া সত্ত্বেও নিছক সন্দেহের ভিত্তিতে মসজিদের জায়গাটিকে মন্দির বানানোর জন্য দেওয়া হলো। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে মুসলমানদের ‘অপরাধ’ সাব্যস্ত হলো, তারা কেন কোনো খালি জায়গায় মসজিদ বানালেন না? প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে, ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এরকম অপ্রমাণিত একটা সন্দেহের ভিত্তেতে যারা বর্তমানে ওই ভূমির দখলে আছে (অর্থাৎ বাবরি মসজিদ ও মুসলমান) তাদের উচ্ছেদ করতে পারে কি না।

ভারতের উচ্চ আদালতের বিচারকরা হয়তো জানেন না যে, ইসলামের বিধান অনুযায়ী মসজিদ বানানোর জন্য কোনো খালি জায়গা আবশ্যক নয়। আগে কোনো বাড়িঘর বা স্থাপনা ছিল এমন জায়গাতেও মসজিদ নির্মাণ হতে পারে। যেহেতু রায়ের ভাষ্য ও ‍যুক্তি অনুযায়ীই মসজিদের ওই জায়গায় হিন্দুদের মূল দাবি-রামমন্দির থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়নি, তাই ধরে নিতে কোনো সমস্য নেই যে, অতীতের মুসলিম শাসকরা বৈধ জায়গাতেই মসজিদটি বানিয়েছেন। তারা যে বৈধ জায়গায় মসজিদটি বানান নি- এরকম যুক্তি-প্রমাণ এ রায়েও তুলে ধরা হয়নি।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বাবরি মসজিদের জায়গাটি রায়ের আগ পর্যন্ত দখলে ছিল মুসলমানদের (অর্থাৎ মসজিদের)। মালিকানা ও দখলিসত্ত্ব ধারাবাহিকভাবে থাকার পরও শুধুমাত্র ওই জায়গায় পূর্বে থেকে কিছু একটি স্থাপনা ছিল-প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের এমন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জায়গাটি থেকে বৈধ মালিকদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। বিনিময়ে অন্য জায়গায় তাদেরকে ৫ একর জায়গা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। মালিকানা ও দখলিসত্ত্ব আছে এমন কোনো পক্ষকে উচ্ছেদ করার জন্য এ জাতীয় যুক্তি ও সিদ্ধান্ত কীভাবে যৌক্তিক বলে গণ্য হতে পারে? দুনিয়ার যে কোনো আদালতেই এমন নজির পাওয়া মুশকিল হবে।

বৈপরিত্বে ভরা রায়

রায়টি শুধু মসজিদ উচ্ছেদ ও হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের এ সিদ্ধান্তের কারণেই প্রশ্নবিদ্ধ নয়, বরং আরো প্রশ্ন ও অযৌক্তিকতা এই রায়ের মধ্যে বিদ্যমান। রায়ে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা এবং সেখানে জোর করে মূর্তিস্থাপন অন্যায় হয়েছে, বে-আইনি হয়েছে। রায়ের এই অংশটি থেকেও দুটি প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। এক ৯২ সালে মসজিদ ভেঙ্গে ওই স্থানে মূর্তিস্থাপন যদি বে-আইনিই হয়, তাহলে সেই মসজিদের জায়গাটি এখন মন্দির নির্মাণের জন্য হিন্দুদের দেওয়া হলো কিভাবে? দুই. ৯২ সালে মসজিদ ভেঙ্গে মূর্তিস্থাপন বে-আইনি হলে ওই সময় মসজিদ ভাঙ্গার ঘটনায় নেতৃত্বদানকারী বিজেপি নেতা আদভানীসহ অন্য যেসব উগ্র হিন্দু নেতারা যুক্ত ছিল তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তির ঘোষণা হল না কেন? একটি রায়ে কোনো অন্যায় ঘটনাকে শুধু বে-আইনি বলে ক্ষান্ত হয়ে গেলে সেটা কি আদলতের রায় হিসেবে যথেষ্ট হয়? সেই অন্যায় ও বে-আইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গের স্পষ্ট শাস্তি কিংবা শাস্তির সুপারিশ আদালতের রায়ে তো থাকার কথা ছিল। অথচ এমন কোনো কথা ওই রায়ে নেই।

তাছাড়া এখানে আরকটি জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার আশংকা তৈরি হয়েছে। বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার একটি মামলা আদালতে এখনও চলমান। সেই মামলার কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি বা ইচ্ছা করেই শেষ করা হয়নি। অনেকেই এখন আশংকা করছেন ৯ নভেম্বরের বাবরি মসজিদ বিষয়ক এই চূড়ান্ত রায়টি বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার চলমান মামলায় দোষীদের পক্ষে ব্যবহার হতে পারে। অর্থাৎ এই রায়ে যেহেতু মসজিদের জায়গা মন্দিরের জন্য দেওয়া হয়ে গেছে, তাই এই রায়ের সূত্র ‍ধরে চলমান মামলায় এই যুক্তি উত্থাপিত হতে পারে যে, অভিযুক্তরা মসজিদ ভেঙ্গে অন্যায় কিছু করেনি। সেখানে মূর্তিস্থাপন করেও তারা বে-আইনি কিছু করেনি। কারণ চূড়ান্ত রায়ে তো সেই জায়গা মন্দিরকেই দেওয়া হয়েছে।

মূলত অযৌক্তিক একটি রায়ের ভেতরে অনেক রকম বৈপরিত্বই চোখে পড়ার কথা।লক্ষ করলেই সে বৈপরিত্বগুলো দেখতে পাওয়া যায়। একটি দিয়ে অপরটিকে ঢাকার চেষ্টা করা হলেও বিভিন্ন পর্যায়ের পক্ষপাত ও অসদুদ্দেদ্দেশ্য রায়টির বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

গ্রাম্য সালিশের মতো ভারসাম্যের বিচার!

বাবরি মসজিদের মূল জায়গাটিকে মন্দিরের জন্য দিয়ে অন্য জায়গায় মসজিদের জন্য ৫ একর জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। বেশিরভাগ মুসলিম নেতৃত্ববৃন্দ এ ৫ একর জায়গার ঘোষণা প্রত্যখ্যান করেছেন। আদালত সচেতনভাবে অথবা অসচেতনভাবেই এ কাজটি করেছে। অযৌক্তিক ‍যুক্তির ভিত্তিতে মসজিদের জায়গা মন্দিরের জন্য দিয়ে মসজিদের জন্য আলাদাভাবে ৫ একর জায়গা দেওয়ার কথা বলেছে। বাস্তবে রায় সঠিক হলে মসজিদের জন্য এই বিকল্প জায়গা দেওয়ার দরকার ছিল না। মসজিদের জন্য ভারতের আদালতের রায়ে সরকারের দেওয়া ৫ একর জায়গা মুসলমানদের দরকার নেই। কারণ মসজিদের জন্য বিকল্প জায়গা দিয়ে বাবরি মসজিদ কেন্দ্রিক মুসলিমদের ন্যায্য আবেগ ও ক্ষতের কোনো রকম উপশম হবে না। এ রায়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম বৈপরিত্ব সৃষ্টি করে বাস্তবতা ও ন্যায্যতা এড়িযে গিয়ে এক ধরণের ভারসাম্যের ‘গ্রাম্য বিচার’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

বাবরি মসজিদ হেফাজত ও এ বিষয়ক মামলার সুষ্ঠু রায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল ভারত রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি ও মর্যাদার ইস্যু। ‘৪৭ পূর্ব সময়ে বলা হয়েছিল, সে দেশের মুসলমানরা ন্যায় বিচার ও ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে না, সমতার চোখে তাদের দেখা হবে। সেই সব প্রতিশ্রুতি ও নীতির একটি অগ্নিপরীক্ষা ছিল বাবরি মসজিদ মামলার রায়ের বিষয়টি। বাস্তবতা হলো, সেই ন্যায্যতা ও আস্থা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এই রায়ে। বরং মুসলমানদের স্পষ্ট অধিকারকে আঘাত করে হিন্দু-পক্ষপাতিত্ব প্রকটভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

বাবা-ছেলের ঝগড়ায় গ্রাম্য বিচারের একটি গল্প লোকমুখে মশহুর হযে আছে। বাবার বিরুদ্ধে জুলুমের বিচার দায়ের করে ছেলে। গ্রাম্য সালিশে বসে বাবাকে ধমক দিয়ে বলা হয় ছেলের প্রতি জুলুম না করতে আর ছেলেকে বলা হয় বাবার কাছে ক্ষমা চাইতে।এভাবে প্রকৃত বিচারের দিকে না গিয়ে ভারসাম্য তৈরির যে সিদ্ধান্ত গ্রাম্য সালিশে দেওয়া হয়-তারই একটি নমুনা-মহড়া দেখা গেল বাবরি মসজিদ মামলার রায়ে। মূল জমি মন্দির বানানোর জন্য হিন্দুদের দিয়ে মুসলমানদের ‘সান্ত্বনা’ দিতে মসজিদের জন্য ৫ একর জায়গা দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই গ্রাম্য সালিশেরই একটি নমুনা।#