আলী নদভীর স্মৃতিচারণ : আল্লামা সুলাইমান নদভীর ইলমি নিমগ্নতা ছিল প্রবাদতুল্য

579

[আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী রহ.। ২২ নভেম্বর ১৮৮৪ সালে তার জন্ম। তিনি ছিলেন একাধারে গবেষক, পণ্ডিত, ইতিহাসবেত্তা ও সাহিত্যিক আলেম। তার প্রসিদ্ধ রচনা হল- সীরাতুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, খুতুবাতে মাদরাস, সীরাতে আয়েশা, তারীখে আরদুল কুরআন, আরব ও হিন্দ কে তাআল্লুকাত, আরবূ কি জাহাযরানী, হায়াতে শিবলী। এই মহান মনীষীর ইনতিকাল হয় ১৯৫৩ সালের ২২ নভেম্বর। ইনতিকালের পর তার জীবন নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন অপর মনীষী সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.। লেখকের পুরানে চেরাগ গ্রন্থ থেকে  অংশ বিশেষ অনূদিত।] 

আবুল হাসান আলী নদভী ।।

আল্লাহ তাআলা একেকজনকে একেক রকম প্রতিভা দিয়ে সৃষ্টি করেন। কেউ বক্তৃতার ময়দানে উন্নতি করেন, কেউ সমাজ সংস্কার বা সংগঠনের কাজে দক্ষতার পরিচয় দেন। কেউ লিখতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।

আল্লাহ তাআলা সাইয়েদ সুলাইমান নদভীকে সৃষ্টি করেছেন ‘তালিম’, ‘তাসনিফে’র জন্য। জীবনে দুয়েকবার ভাষণ-বক্তৃতা দিয়েই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন- এ কাজ তার জন্য না। প্রত্যক্ষ সমাজ সংস্কারধর্মী কিছু কাজে হাত দিয়েও সরে এসেছিলেন- এ কাজে সফলতার তেমন আশা নেই। তারপর ‘তালিম’-‘তাসনীফ’কেই নিজের ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে নিলেন।

লেখালেখি এবং অধ্যয়নের প্রতি তার নিমগ্নতা নদওয়ায় প্রবাদতুল্য ছিল। নদওয়ায় সারাজীবন প্রকৃত অর্থেই তিনি তালিবে ইলম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কি সফরে, কি নিজ ঘরে- আমি যেমন তাকে দেখেছি- ইলমি আলোচনাই ছিল তার একমাত্র আগ্রহ ও আখাঙ্ক্ষার বিষয়। গভীর অধ্যয়নের কারণে সাধারণ বয়সের আগেই তার চুল দাড়িতে পাকন ধরেছিল।

সাইয়্যেদ সাহেব আমাকে একবার ঠাট্টাচ্ছলে বলেছিলেন, ‘আপনার মরহুম পিতা আমাকে শরীরের যত্ন নিতে বলেছিলেন, কিন্তু তা আর হল কই! লেখালেখি এবং পড়াশোনা তো আমাকে বুড়াই বানিয়ে দিল’!

এমন অনেক রাত ভোর হয়েছে-দেখা গেছে-সাইয়েদ সাহেব একমনে কিছু পড়ছেন বা লিখছেন। লেখালেখির প্রতি সাইয়েদ সাহেবের এমন আত্মনিবেদনের অবশ্য আবশ্যিকতা ছিল। নতুবা জাতির অপূরণীয় ক্ষতিই হতো। কতজনেরই বা থাকে এমন রাতভর একটানা লিখে যাওয়ার যোগ্যতা!

সাধারণত লোকদের এমনকি বিশিষ্টজনদেরও লেখা বা পড়ার সময়, স্থান নির্দিষ্ট থাকে। বাকি সময় তারা নানাবিধ ব্যস্ততায় কাটান। কিন্তু আমি আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী এবং সাইয়েদ সাহেবকেই দেখেছি-যাদের সারাক্ষণের ব্যস্ততা ইলমি আলোচনা কেন্দ্রিক। নদওয়ার কিছু কম বুঝের তালিবে ইলম সাইয়েদ সাহেবের প্রতি এ নিয়ে কিছুটা বিরক্তও ছিল। কিন্তু যারা তাকে ধারণ করতে পেরেছিল তাদের জীবন আলোকিত। তবে আফসোস, কতজনই বা তা পেরেছিল!

লেখালেখির প্রতি তার আত্মনিবেদনের উত্তম প্রতিদানই আল্লাহ দিয়েছেন। এমনসব অনবদ্য ও কালজয়ী গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন উর্দু সাহিত্যে যার তুলনা হয় না। লেখার প্রতি তার সংবেদশীলতা এত অধিক ছিল যে, প্রতিটি রচনাকেই তিনি জীবনের প্রথম এবং শেষ রচনা মনে করতেন।

আসলে কোনো বিশেষ বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া এক বিষয় আর তা মনোমুগ্ধকর বর্ণনাশৈলিতে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করতে পারা ভিন্ন পাণ্ডিত্যের বিষয়। তবে আল্লাহ তাআলা সাইয়েদ সাহেবের মধ্যে উভয় যোগ্যতার উত্তম সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন।

একে তো কিছু লেখার পূর্বে তার দীর্ঘ অধ্যাবসায় ছিল। দ্বিতীয়ত প্রতিটি রচনায় ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনাভঙ্গি ছিল। এ কথা অতুক্তি হবে না-এ ময়দানে তিনি তার উস্তায আল্লামা শিবলি নোমানীকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন।

সাইয়েদ সাহেবের বৈচিত্রপূর্ণ রচনাসম্ভারে সাধারণ দৃষ্টিপাতের দ্বারাও তার অধ্যয়নের গভীরতা এবং বর্ণনার বিচিত্রতা পাঠকের উপলব্ধি হওয়ার কথা। উর্দু সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ উস্তায শিবলি নোমানীর অসম্পূর্ণ ‘সীরাতুন্নবী’ গ্রন্থটির এমনভাবে তিনি পূর্ণতা দিয়েছেন-না জানলে কারো বুঝার সাধ্যি নাই- এ গ্রন্থের লেখক দুই আলাদা ব্যক্তি।

এছাড়া সাইয়েদ সাহেবের রচিত ‘খুতুবাতে মাদরাসে’র অনরূপ কিতাব শুধুু উর্দু কেন- এ যাবত কোনো ভাষাতেই লেখা হয়নি।

কুরআনে বর্ণিত স্থানগুলোর ভৌগোলিক এবং ঐতিহাসিক পর্যালোচনার নিরিখে তার প্রাথমিক জীবনে রচিত ‘তারীখে আরদুল কুরআন’ গ্রন্থটি এ বিষয়ে কাজ করা পরবর্তীদের জন্য সর্বোত্তম নমুনা।

এছাড়াও দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সেমিনারে পঠিত আরবি ও উর্দুতে তার অগ্রন্থিত বিভিন্ন রচনা সংকলন করা হলে পাঠকের জন্য এটা বুঝা আরও সহজ হত যে সাইয়েদ সুলাইমান নদভী ভারতবাসীর জন্য কত বড় নেয়ামত ছিলেন।

সাইয়েদ সাহেবের অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল তিনি দু’টি যুগের ছাত্র ছিলেন। ভারতে দীর্ঘদিন যাবত চর্চিত ‘কাদিম ইলম’ নামে পরিচিত বিদ্যা তিনি আহরণ করেছেন। অপরদিকে আল্লামা শিবলি নোমানী এবং হাবিবুর রহমান শেরওয়ানিদের মতো হালের বিদ্বানরাও তার উস্তায ছিলেন। ফলে তিনি কাদিম ইলমকেও অস্বীকার করে বসেননি আবার নতুন নতুন জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে সীমারেখার লাগাম টানতেও সক্ষম ছিলেন।

ইলম অন্বেষণের চর্চিত দু’টি ধারার সমন্বয়ের কারণে তার চিন্তা ও ভাবনায় প্রশস্ততা ছিল। ফলে একদিকে রাজনীতির ময়দানের ত্যাগী পুরুষ হিসেবে পরিচিত মাওলানা মুহাম্মদ আলী জওহর এবং মাওলানা আবুল কালাম আযাদের সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব ছিল অপরদিকে ‘মু’তামারে ইসলামির’ মতো অরাজনৈতিক সংগঠনের সাথে তার ঘনিষ্টতা ছিল। তিনি আলিগড়ের উস্তায ছিলেন যেমন, তেমনি জামিয়া মিল্লিয়ার সাথেও তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।

আধুনিক ধারায় শিক্ষাপ্রাপ্তদের অনেককে পশ্চিমের সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হতে দেখা গেলেও আল্লামা সাইয়েদ সুলাইমান নদভী শেষ জীবনে বেছে নেন হাকিমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানবী রহ.-এর সোহবত। এটাই তার চিন্তার স্বচ্ছতা ও প্রশস্ততার অনন্য দৃষ্টান্ত।

অনুবাদ : ওলিউর রহমান