প্রাচীন যুগের সীরাত রচনা-৬ : সীরাতে যাহাবী

173

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

ইমাম যাহাবী রহ.-এর পুরো নাম, শামসুদ্দীন আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে কাইমায আয-যাহাবী রহ.। বংশগতভাবে তাঁরা তুর্কিস্তানের অধিবাসী। তবে দাদা ‘কাইমায’ এর আমল থেকেই দামেশকে বসবাস করেন।

‘যাহাবী’ অর্থ স্বর্ণকার। ইমাম যাহাবী রহ.-এর বাবা স্বর্ণের কাজ করতেন। এক্ষেত্রে তার দক্ষতা ও প্রসিদ্ধির কারণে ‘যাহাবী’ নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এই পরিচিতি তার পরবর্তী বংশধরের নামের সঙ্গেও যুক্ত হয়। অবশ্য তার ছেলে শামসুদ্দীনের জীবনের সাথে ‘যাহাবী’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ (স্বর্ণালী, স্বর্ণময়, স্বর্ণমাখা) যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। নিঃসন্দেহে ‘স্বর্ণালী’  জীবন ছিল তাঁর।

তিনি ছোটবেলায়ই কোরআন মাজীদ হিফয করেন। এবং তৎকালীন অভিজ্ঞ কারী সাহেবদের কাছে কিরাআত শাস্ত্রের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর হাদীস শাস্ত্রের আগ্রহ নিয়ে ১৮ বছর বয়সে প্রথমে নিজ দেশে, পরবর্তীতে হালাব, তারাবলুস, উরদুন, নাবলুস, কুদস ও হিজাযসহ আরো অনেক দেশে ইলমের জন্য সফর করেন। এইসব সফরে নাহব, সরফ, আদব, এবং মাগাযী, সিয়ার ও তারীখ বিষয়েও বিপুল জ্ঞান অর্জন করেন।

তাঁর বিখ্যাত উস্তাযগণের মধ্যে রয়েছেন- ইমাম ইবনে তাইমিয়া (৬৬১ হি.) রহ., ইবনে দাকীকিল ঈদ (৭০২) রহ., বদরুদ্দীন ইবনে জামাআহ (৭৩৩) রহ., জামালুদ্দীন মিযযী (৭৩৯) রহ., আলামুদ্দীন বিরযালী (৭৩৯) রহ. প্রমুখ শাস্ত্রীয় পণ্ডিত মনীষীগণ।

পরবর্তী জীবনে তিনি শিক্ষকতা, রচনা ও গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। একপর্যায়ে দামেস্কের বিখ্যাত ‘গোতা’ অঞ্চলের এক মসজিদে খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এবং বিখ্যাত দারুল হাদীস ‘উম্মে সালেহ’ এ হাদীসের দরস প্রদান করেন। মৃত্যু পর্যন্ত ওখানেই থাকেন। তবে অন্যত্রও হাদীসের দরস প্রদান করেন।

সেসময় দূর-দূরান্তের অসংখ্য হাদীস অন্বেষী ছাত্র তাঁর কাছে ছুটে আসে এবং দীর্ঘদিনের সাহচযের্য বিপুল হাদীস ও হাদীস শাস্ত্রের জ্ঞান লাভ করে। তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের মাঝে রয়েছেন- ইমাম তাজুদ্দীন সুবকী রহ., হাফেয ইবনে কাসীর রহ., ইবনে রজব হাম্বলী রহ., ও সালাহুদ্দীন সাফাদী রহ. প্রমুখ ইমামগণ।

তিনি হাদীস, উলূমুল হাদীস, ইতিহাস, জীবনী ও এতৎসংশ্লিষ্ট অনেক কিতাব রচনা করেন। তন্মধ্যে রয়েছে- তারীখুল ইসলাম, সিয়ারু আলামিন নুবালা, তাযকিরাতুল হুফফায, মীযানুল ইতিদাল ইত্যাদি।

শাস্ত্রীয় পান্ডিত্যের অধিকারী এই ইমাম ৭৪৮ হিজরীর ৩ জিলকদ দামেশকে ইন্তেকাল করেন। সেখানের বিখ্যাত ‘বাবুস সাগীর’ গোরস্তানেই তিনি সমাহিত।

তাঁর ‘আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ’ কিতাবটি মূলত সুবিশাল কিতাব ‘তারীখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহীরি ওয়াল আলাম’এর অংশ। ৫০ খণ্ডে লেখা এই কিতাবের প্রথম দুই খণ্ড হলো ‘সীরাতে নববী’।

কিতাবটির অন্যতম প্রধান বিষয় যেহেতু ইসলামী ইতিহাস, তাই প্রথম খণ্ড শুরু হয়েছে প্রথম হিজরীর বর্ণনা দিয়ে। এভাবে পুরো প্রথম খণ্ড লেখা হয়েছে ‘মাগাযী’ (ইসলামী যুদ্ধ বিগ্রহের ইতিহাস) বিষয়ে।

দ্বিতীয় খণ্ডে ‘নবীজির মুজেযা’ অধ্যায়ের পাশে পাণ্ডুলিপিতে ইমাম যাহাবী রহ. লিখেছেন, ‘কেউ যদি এটিকে স্বতন্ত্র সীরাত গ্রন্থ বানাতে চায়, তাহলে যেন পুরো প্রথম খণ্ডটিকে অবশ্যই এখানে যুক্ত করে। তারপর ‘মুজেযা’ অধ্যায় থেকে সীরাতের শেষ পর্যন্ত লিখে নেয়।-মূল পাণ্ডুলিপির বরাতে শায়খ বাশশারকৃত ভূমিকা, পৃষ্ঠা : ৬

এখান থেকে বোঝা যায় তিনি কিতাবের বিষয়বস্তুর কারণে প্রথম হিজরীর বিবরণ দিয়ে কিতাব শুরু করলেও তাকে ‘আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ’র অংশ হিসেবে ধরেছেন। অর্থাৎ প্রথম খন্ডের ১-১১তম হিজরীর মাগাযী অংশ যুক্ত হবে দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচিত নবীজির জন্ম থেকে মৃত্যু ও দাফনের বিবরণের পর। আর দাফন ছিল ১১তম হিজরীর ঘটনা। এখানে এসে ১-১১তম হিজরীর বিবরণ যুক্ত হয়ে সীরাতের কিতাব পূর্ণ হবে।

আরো বুঝা যায় যে, এই অংশটিকে তিনি স্বতন্ত্র সীরাতের কিতাবের রূপও দিতে চেয়েছিলেন।

ইমাম যাহাবী রহ. এই সীরাত অংশটি তাঁর কালজয়ী কিতাব ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’তেও যুক্ত করেছেন। ‘সিয়ার’ কিতাবটির পান্ডুলিপি তিনি প্রস্তুত করেছিলেন মোট ১৪ খণ্ডে । তবে লেখা শুরু করেছেন তৃতীয় খন্ড থেকে। বলেছেন প্রথম দুই খন্ড হবে ‘তারীখুল ইসলাম’ কিতাবেরই সীরাতের দুই খণ্ড। অর্থাৎ সীরাতের অংশটুকু যেমনিভাবে স্বতন্ত্র কিতাব, তেমনিভাবে তাঁর এই বিখ্যাত দুই কিতাবেরও প্রথম অংশ।

শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্য, প্রাজ্ঞতা বিশেষজ্ঞতার সাথে দক্ষ হাতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে ‘সীরাত’ লিখেছেন তার আর কী পরিচিতি প্রয়োজন?

এই কিতাবে তিনি প্রত্যেকটি ঘটনা লিখেছেন সনদ বা বর্ণনাসূত্র সহ। ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন শিরোনাম দিয়ে দিয়ে, স্পষ্টভাবে, নির্ভরযোগ্যতার সাথে। কিতাবটির শুরুতে তিনি তার উৎসগ্রন্থ সমূহের একটি তালিকাও পেশ করেছেন।

কিতাবটি ভিন্নভাবে যেমন ছেপেছে, তেমনি উক্ত দুই কিতাবের সঙ্গেও ছেপেছে। তাছাড়া আরবের বেশ কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নুসখা পাওয়া যায়। তন্মধ্যে শায়খ বাশাশার আওয়াদ মারূফ দামাত বারাকাতুহুমকৃত নুসখাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।