প্রাচীন যুগের সীরাত রচনা-৫ : সীরাতে ইবনে কাসীর

235

মুহাম্মাদ তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব ।।

কিতাবটির পুরো নাম, আল-ফুসূল ফিখতিসারি সীরাতির রাসূল।

লেখক, হাফেয ইমাদুদ্দীন আবুল ফিদা ইসমাঈল ইবনে উমর ইবনে কাসীর রহ.।

তিনি ৭০১ হিজরীতে শামের ‘বুসরা’ অঞ্চলের একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন সে অঞ্চলের বরেণ্য ফকীহ। সে হিসাবে একটি দ্বীনী ও ইলমী পরিবারে তিনি বেড়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বৈবাহিক সূত্রে যুক্ত হন আরেকটি ইলমী পরিবারের সাথে। বিখ্যাত রিজাল শাস্ত্রবিদ ‘তাহযীবুল কামাল’ গ্রন্থকার হাফেয জামালুদ্দীন আবুল হাজ্জাজ মিযযী রহ.-এর মেয়েকে বিয়ে করেন। হাফেয মিযযী রহ. তাঁর বিশেষ উস্তায। এছাড়াও তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাযগণের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা ইবনে তাইমিয়া, ইমাম যাহাবী, বুরহানউদ্দীন আল-ফাযারী ও কামালুদ্দীন ইবনে কাযী শুহবাহ রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ ইতিহাসখ্যাত মনীষীগণ।

তাঁর বিখ্যাত ছাত্রদের মাঝে রয়েছেন ইমাম বদরুদ্দীন যারকাশী, আল্লামা ইবনুল জাযারী ও ঐতিহাসিক ইবনু হিজ্জী রাহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ মনীষীগণ।

৭৭৪ হিজরীতে তিনি দামেশকে ইনতিকাল করেন। তাঁর উস্তায আল্লামা তাইমিয়া রহ.-এর কবরের পাশেই তিনি সমাধিস্থ।

আল্লামা ইবনে কাসীর রহ. ছিলেন তাফসীর, হাদীস, উলুমুল হাদীস ও ইতিহাসের বিদগ্ধ পণ্ডিত আলেম। তাঁর লিখিত ‘তাফসীরে ইবনে কাসীর’ অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য তাফসীর গ্রন্থগুলোর একটি। তাঁর সংকলিত হাদীসের কিতাব ‘জামিউল মাসানীদ’ সুবিশাল দশ খন্ডে প্রকাশিত। ইতিহাস বিষয়ে তাঁর গ্রন্থ ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গুরুত্বপূর্ণ উৎসগ্রন্থগুলোর অন্যতম।

সীরাত বিষয়ে তার একটি গ্রন্থ ‘আস-সীরাতুন নাবাবিয়্যাহ নামে প্রসিদ্ধ। সেটি ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ কিতাবেরই সীরাত অংশ। এ বিষয়ে তাঁর আরেকটি কিতাব হলো ‘আল-ফুসূল ফিখতিসারি সীরাতির রাসূল’। এটি হাদীস, সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থগুলোর আলোকে নবীজীবনের সংক্ষিপ্ত ও সুসমৃদ্ধ একটি সংকলন।

এতে সীরাতের সারনিরযাসধর্মী আলোচনার মধ্য দিয়ে নবীজীবনের প্রায় সকল শিরোনামকেই একত্রিত করেছেন। এবং অনেকটা নোট আকারে লিখেছেন। সীরাতে ইবনে ইসহাকের নির্ভরযোগ্য বর্ণনাগুলোও সূত্রসহ উল্লেখ করেছেন। এমনিভাবে তাঁর কিতাব ‘আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ থেকেও মৌলিক আলোচনাগুলো চয়ন করেছেন। সেক্ষেত্রে বিস্তারিত বক্তব্য উল্লেখ করার পরিবর্তে বিশুদ্ধ ও প্রণিধানযোগ্য বক্তব্যগুলো এনেছেন। কোথাও কোথাও একাধিক বক্তব্য উল্লেখ করলে দলীলের আলোকে সঠিক বক্তব্যকে চিহ্নিত করে দিয়েছেন। ফলে কিতাবটি অনেক ক্ষেত্রেই সুদীর্ঘ গ্রন্থ পাঠের কাজ দেয়।

কিতাবটির মূল বৈশিষ্ট্যই হলো দীর্ঘতা পরিহার ও সংক্ষেপণ। এর প্রথম খণ্ডে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বংশ, জন্ম, নবুওতপূর্ব জীবন, নবুওত, দাওয়াত, মেরাজ, হিজরত, জিহাদ ও ‍যুদ্ধাভিযানগুলোর ধারাবাহিক বিবরণ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে সংক্ষেপে ইতিহাস বর্ণনার মতো করে একের পর এক ঘটনাগুলো লিখেছেন। দ্বিতীয় খণ্ডে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ব্যক্তিজীবন, আচার-আখলাক, গুণাবলী, ব্যবহার সামগ্রী, সেই সাথে তাঁর সঙ্গে সম্পৃক্ত একান্ত বিষয়গুলো -যেমন বহু বিবাহ ও অন্যান্য বিষয়- ফিকহী মাসায়েলের কিতাবের বিন্যাসে উল্লেখ করেছেন। এতে প্রায় সব কথায়ই হাদীসের উদ্ধৃতি বর্ণনা করেছেন।

এক কথায় বলা যায়, এটি নবীজীবনের যথেষ্ট নির্ভরযোগ্য, সংক্ষিপ্ত ও সমৃদ্ধ সংকলন।

কিতাবটি আরবের বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তন্মধ্যে কুয়েতের ‘দারুন নাওয়াদির’ থেকে প্রকাশিত ‘শায়খ আবদুল হামীদ মুহাম্মাদ আদ-দারভীশকৃত তাহকীকে ছাপা সংস্করণটি উল্লেখযোগ্য।