মাইকে ফুঁক দিয়ে কবিরাজি : যা বললেন দুই বিশিষ্ট আলেম

472

তারিক মুজিব ।।

প্রাকৃতিক স্বাভাবিক ধারা অনুযায়ী মানুষ কখনো কখনো অসুস্থ হয়। হাদিসে অসুস্থতাকে আল্লাহর নেয়ামত বলা হয়েছে। তবে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া নবীর সুন্নত। আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে বাহ্যিক উপকরণ দ্বারা চিকিৎসা গ্রহণের বিষয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। বাহ্যিক উপকরণের পাশাপাশি কুরআন ও হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া পড়ে শরীরে দম করার (ফুঁক দেওয়া) বিষয়েও অনেক প্রমাণাদি পাওয়া যায়। অবশ্য শরীরে দম করা, পানিতে ফুঁক দেওয়া বা তাবিজ লাগানো ইত্যাদি জায়েয হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত রয়েছে।

তবে সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় মঞ্চ থেকে মাইকের মাধ্যমে আগত লোকদের বোতলে ফুক দেওয়ার ঘটনা বা এ জাতীয় অন্যান্য কর্মকাণ্ড শরিয়ত সমর্থিত নয়। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া ছাড়াও দেশরে বিভিন্ন জায়গায় মাঝেমাঝেই দেখা যায় পানিতে ফুক দেওয়া, বালিতে ফুঁক দেওয়া, গাছের ছালে ফুঁক দেওয়াসহ নানা অদ্ভুত কর্মকাণ্ড ঘটে থাকে। কেউ কেউ এগুলো ধর্ম বিশেষত ইসলামের নাম দিয়ে করে। অথচ ইসলামে এসবের কোনো অস্তিত্বই নেই। এগুলো ইসলামকে নিয়ে উপহাস মাত্র। শরিয়ত এগুলোকে গর্হিত এবং মারাত্বক গোনাহের কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

এ প্রসঙ্গে মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার শিক্ষক মুফতি যাকারিয়া আবদুল্লাহর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জের যে ঘটনা এটা সম্পূর্ণ ধোকাবাজী এবং ইসলাম বহির্ভূত কাজ। এসবের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। কেউ অসুস্থ হলে তার প্রথম করণীয় হচ্ছে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে অভিজ্ঞতার আলোকে যেগুলো রোগ নিরাময়ের উপকরণ হিসেবে প্রমাণিত সেগুলো গ্রহণ করে। এটাই ইসলামের শিক্ষা। তাছাড়া কুরআন-হাদিসে বর্ণিত বিভিন্ন দোয়া পড়ে দম দেওয়ার বিষয়টিও প্রমাণিত। এর বাইরে চিকিৎসা বা রোগ নিরাময়ের কল্পিত যে পদ্ধতি তা সম্পূর্ণ শরিয়ত বিরোধী কাজ।

এ বিষয়ে বাইতুল উলূম ঢালকানগর মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতি রফিউদ্দীন ইসলাম টাইমসকে বলেন, ইসলামে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে ঝাড়-ফুঁকের বিষয়ে প্রমাণ পাওয়া গেলেও কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা বা কবিরাজির নামে যে উদ্ভট সব পদ্ধতি দেখা যায় সেগুলোকে শরিয়ত কখনোই সমর্থন করে না। ইসলামের নামে এগুলো করা মূলত ইসলামকে নিয়ে খেলল-তামাশা করা। অনেক মুহাক্কিক আলেম এসব কর্মকাণ্ডকে শিরক পর্যায়ের গোনাহ মনে করেন।

মুফতি রফিউদ্দীন সাহেব আরও বলেন, সকল রোগের চিকিৎসা থাকার কথা হাদিসে উল্লেখ আছে। সূরা ফাতিহা পড়ে দম করার বিষয়েও হাদিস আছে। তবে জাহিলিয়্যাতের যুগে যেসব মন্ত্র পড়ে কবিরাজি করা হতো সেগুলোর ব্যাপারে হাদিসে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা এসেছে। কল্পিত উদ্ভট এসব পদ্ধতি হাদিসের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই পড়ে।

ঝাড়-ফুঁক জায়েয হওয়ার শর্তগুলো কী জানতে চাইলে মুফতি যাকারিয়া আবদুল্লাহ বলেন, শরিয়ত সমর্থিত বাক্যাবলী দ্বারা দম করতে হবে এটা প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, যে ঝাড়-ফুক করছেন-তার আমল, আখলাক, শিক্ষা, বেশভুশা ঠিক আছে কি না সেটা দেখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এখন দেখা যায় দাড়িবিহীন সাধারণ শিক্ষিত বা মুর্খ লোকেরা কবিরাজি বা ঝাড়-ফুঁক করতে করতে শুরু করে দিয়েছে।

জনগণের অসচেতনতা এসব কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী মন্তব্য মারকাযুদ্দাওয়ার এ শিক্ষক বলেন, জনগণ যদি সচেতন হতো তাহলে এসব অলীক বস্তুর পেছনে ছুটত না। আর জনগণের সমর্থণ না পেলে মঞ্চে উঠে মাইকের মাধ্যমে এসব ফুঁক দেওয়ার ঘটনাও ঘটার সুযোগ ছিল না। তাই স্থানীয়ভাবে আলেমদের এসব শরিয়ত বহির্ভূত কার্যাদি সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে হবে।