রায় কেন মেনে নিচ্ছেন ভারতের মুসলিম নেতারা? কী আছে এর অন্তরালে?

919

ওয়ারিস রব্বানী ।।

বিজ্ঞাপন

ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত দিয়েছে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। দীর্ঘ শুনানি ও অপেক্ষার পর হঠাৎ করে রায় ঘোষণার তারিখ জানিয়ে দেওয়ার পর গত ৯ নভেম্বর এই রায় দেওয়া হয়।এ রায় নিয়ে প্রশ্ন, বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন ভারতের মুসলিম নাগরিকদের পাশাপাশি বহু অমুসলিম ব্যক্তিত্বও। এমনকি এতে ভারতের প্রতিবেশী মুসলিম দেশ বাংলাদেশ-পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের মাঝে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও বেদনার ধ্বনি উচ্চারিত হতে থাকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলি পর্যন্ত খোলাখুলি ভাষায় বলেছে, এ রাযটি দেওয়া হয়েছে হিন্দুদের পক্ষে। কিন্তু এতসব কিছুর পরও বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের এ রায় ঘোষণার পর ভারতের কোনো  মুসলিম রাজনীতিক, ধর্মীয় নেতা ও সংগঠনের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো প্রতিবাদ অথবা বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটেনি। ঘোষণা করা হয়নি অযৌক্তিক এ রায় মেনে না নেওয়া কিংবা এ রায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ডাক দেওয়ার মতো কোনো কর্মসূচি। বাবরি মসজিদ নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের ইতিপূর্বেকার আবেগ-অভিব্যক্তির সঙ্গে এ অবস্থানের তেমন একটা মিল পাওয়া যায় না।

বরং প্রকারান্তরে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় ভারতীয় মুসলমানদের উল্লেখযোগ্য সব সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও নেতা রায়টি মেনে নেওয়ার কথাই জানান দিয়েছেন। এতে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, ভারতের মুসলিম সংগঠন ও নেতারা কেন নীরবে একতরফা ও অযৌক্তিক এ রাযটি মেনে নিয়েছেন? রায়টি কি আসলেই মেনে নেওয়ার মত ছিল? তারা তবে নীরব হয়ে গেলেন কেন? কেনই বা পিছু হটলেন? তবে কি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের এই রায় মেনে নেওয়া এবং এই নীরবতার পেছনে রয়েছে অন্য কোনো বাস্তবতা? ভারতীয় মুসলমানদের নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের চিত্রটি কি বর্তমানে নাগরিক ক্ষোভ ও ভালোবাসা প্রকাশের স্বাভাবিক পর্যায়ে আছে?

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে রাম মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্তের পক্ষে যেসব কারণ দেখানো হয়েছে, তার কোনোটাই রাম মন্দিরের পক্ষে যায়নি। মোটা দাগে রায়ে বলা হয়েছে, কোনো ফাঁকা বা খালি জায়গায় বাবরি মসজিদটি নির্মাণ করা হযনি।প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী এ মসজিদের নিচে অন্য কোনো কাঠামো আগে থেকেই ছিল। তবে বাবরি মসজিদের জায়গায় আগে কোনো মন্দির ছিল, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ ছিল রায়েরই ভাষ্য। এরপরও মসজিদ ভেঙ্গে সেখানে মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্ত দিয়ে বলা হয়, কাছাকাছি জায়গায় মসজিদ নির্মাণের জন্য সরকারের তরফ থেকে ৫ একর জমি বরাদ্দ দিতে হবে।

এ রায়ে মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির নির্মাণের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিগুলো খুবই ঠুনকো, একতরফা এবং এক অর্থে অযৌক্তিক। দারুল উলুম দেওবন্দ, আল্লামা সাইয়েদ আরশাদ মাদানী, আল্লামা আবুল কাসেম নোমানী, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রহমানীসহ অপরাপর বহু মুসলিম নেতা ও আলেম নেতৃবৃন্দ রায়ের অযৌক্তিকতার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তারাসহ দিল্লি শাহী জামে মসজিদের ইমাম, জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, মাওলানা সালমান নদভী-এরকম অনেকেই ভারতে মুসলমানদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে সামনে এনে এ রায়ের বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোনো রকম বিক্ষোভ-প্রতিবাদে রাস্তায় না নামতে আহ্বান জানিয়েছেন। কেউ কেউ কোনোরকম সমালোচনা ছাড়াই রায়টি মেনে নেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন।

অবশ্য মাওলানা সালমান নদভী এক ভিডিও বক্তব্যে একধাপ আগে বেড়ে এ রায়টিকে তার ‘প্রত্যাশিত’ রায় হিসেবেই ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এমন রায়ের কথা মাথায় রেখেই ইতিপূর্বে তিনি পণ্ডিত রবিশংকরের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন। হজরত ওমর রা.-এর যুগে মসজিদ স্থানান্তরের একটি ঘটনা উল্লেখ করে বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণের রায়টি নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, রায়ে ঘোষিত ওই ৫ একর জায়গায় মুসলমানদের দায়িত্ব হলো, একটি শানদার মসজিদ নির্মাণ করা। তার এই অতি ‘স্বস্তিকর’ বক্তব্যে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, অভিব্যক্তি ও ভাষা ভিন্ন হলেও মুসলিম নেতাদের একটি কমন অবস্থান হলো, বাবরি মসজিদ রায়ের প্রতিবাদে কোনো উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সুযোগে হিন্দু উগ্রবাদীদের হাতে যেন ভারতজুড়ে মুসলমানদের জীবনে নতুন কোনো প্রাণঘাতী সংকট তৈরি না হয়। বাবরি মসজিদ ধ্বংস ও মন্দির নির্মাণের এই রায় নিয়ে সাধারণ মুসলমান এবং মুসলিম নেতাদের মাঝে ক্ষোভ ও বেদনার রক্তক্ষরণ চলছে। কিন্তু সবাই নীরবে অসহ্যকর এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিজেপি-আরএসএসের গত কয়েক বছরে বহু মুসলমানকে রাস্তাঘাটে হত্যা করা হয়েছে। পায়ে পা বাধিয়ে ঝগড়া লাগিয়ে রাস্তায় পিটিয়ে মেরে ফেলছে বহু মুসলিমকে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের রাজ্যে রাজ্যে এনআরসির নামে চলছে মুসলমানদের অ-নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করার অভিযান।চাকরি, ব্যবসা, বসতি, ধর্মপালন সবকিছুতেই রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে উগ্র হিন্দুবাদী নিপীড়ন। এ পরিস্থিতিতে উপরে-নিচে সব পর্যায়ে ভারতের মুসলমানরা দাঁতে ঠোঁটে কামড় দিয়ে অস্তিত্ব রক্ষার চেষ্টা করছেন। বাবরি মসজিদ ইস্যুতে দেশজুড়ে উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীদের আরেকটি মুসলিম সংহারক তাণ্ডবের ক্ষেত্র তৈরি থেকে সতর্ক থাকছেন। সেজন্যই রায় ঘোষণার পর থেকে দেড় দিন পার হলেও ভারতের কোথাও, কোনো রাজ্যেই জনগণ পর্যায়ে অসংগঠিত উপায়েও কোনো বিক্ষোভ প্রকাশ পায়নি। একইসঙ্গে মুসলিম বিরোধী হিন্দুবাদী কোনো আক্রমণের খবরও কোনো দিক থেকে পাওয়া যায়নি।

বাবরি মসজিদ ইস্যুতে ঘোষিত একতরফা, সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুবাদী এই রায়ের পর ভারতের মুসলমানদের পক্ষে সে রায় নীরবে সহ্য করা বা মেনে নেওয়ার পেছনের কারণ মূলত এটাই। মুখে জাবর কাটার মতো ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে ফেনা তুলে ফেললেও ভারতে মুসলমানদের দিন পার হচ্ছে শ্বাসরুদ্ধকর অনিশ্চয়তার মধ্যে।সেই পরিস্থিতির মধ্যেই বাবরি মসজিদ ধ্বংসের এই রায়, সেই পরিস্থিতির মধ্যেই মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের এই রায়; কী নেতা, কী সাধারণ, ভারতের সব মুসলমানরা ‘মেনে’ নিচ্ছেন। কারণ তারা জীবন বাঁচানোর জন্য মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। রায় ‘মেনে’ নেওয়ার এই শীতল আগুন ভারতের সাম্প্রদায়িক হিন্দু এস্টাবলিশমেন্ট কি সবসময় তুষের নিচেই চাপা দিয়ে রাখতে পারবে নাকি সর্বনাশা হিন্দুত্ববাদের আগুনে নিজেরাই পুড়ে মরবে? সময়ই বলে দেবে এ প্রশ্নের উত্তর।