যেভাবে পথ চলছে তালীমুদ্দীন একাডেমী কুমিল্লা

530

খসরু খান ।।

তালীমুদ্দীন একাডেমী কুমিল্লা। ছোট থেকে বয়স্ক সর্বস্তরের মানুষের মাঝে দ্বীনী শিক্ষা ছড়িয়ে দেওয়ার একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠান। যারা ‍দ্বীনী শিক্ষা গ্রহণের জন্য নিযমিতভাবে মাদরাসায় পড়েন না বা পড়ার সুযোগ পান নি, তারাও যেন ফরযে আইন পর্যায়ের দ্বীনী শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হন- সেজন্যই এই উদ্যোগ।

কুমিল্লা রানীর বাজার মাদরাসার কাছে বাগিচাগাঁও এলাকায় অবস্থিত এ প্রতিষ্ঠানের সূচনা মজলিসটি অনুষ্ঠিত হয় ২০১৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। আর প্রথম সবক শুরু হয় ওই বছরের ১ মার্চ। আপাতত ৩ বছর মেয়াদী কোর্সের এই দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতিদিন সবক চলে চার শিফটে। প্রথম শিফট সকাল ৭ টা থেকে সাড়ে ৮ টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় শিফট জোহরের নামাজের পর থেকে আসরের নামাজের আগ পর্যন্ত দেড় ঘন্টা। তৃতীয় শিফট মাগরিব থেকে এশা এবং চতুর্থ শিফট এশার আধাঘন্টা পর থেকে দেড় ঘন্টা। দেড় ঘন্টার প্রতিটি শিফটে বিভিন্ন বয়স ও পেশার মানুষ এই একাডেমীতে এসে শিক্ষা গ্রহণ করেন। সাধারণ শিক্ষা ও পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষের মধ্য থেকে যার জন্য যেই শিফটটি উপযোগী তিনি সেই শিফটে অংশগ্রহণ করে থাকেন।

তালীমুদ্দীন একাডেমী কুমিল্লার প্রধান শিক্ষক মুফতি আনোয়ার হোসাইন

তালীমুদ্দীন একাডেমী কুমিল্লার প্রধান শিক্ষক মুফতি আনোয়ার হোসাইন জানান, মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা-র রঈস মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ সাহেব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া ঢাকা-র আমীনুত তালীম মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক সাহেবের প্রত্যক্ষ নির্দেশনা ও রাহনুমায়িতে এ প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হয়। কোরআন শরীফের সহীহ তেলাওয়াত শেখানোসহ জরুরি দ্বীনী মাসায়েল ও দ্বীনী মেজাজ নির্মাণের শিক্ষা দেওয়া হয় এখানে। উদ্বুদ্ধ করা হয় উলামায়ে কেরামের সাথে সাধারণ শিক্ষিত মানুষের দুরত্ব কমানো এবং আলেমদের থেকে উপকৃত হওয়ার বিষয়ে। তাহযীবুল আফকার বিষয়ে গুরুত্ব ‍দিয়ে পড়ানো হয়।

এক প্রশ্নের উত্তরে মুফতি আনোয়ার হোসাইন আরও জানান, এ প্রতিষ্ঠানটিকে মাদরাসা বলি না, বরং তালীমুদ্দীন একাডেমীর মূল কাজ মাদরাসা শিক্ষার সাথে যুক্ত নয়- এমন সাধারণ শ্রেণির মুসলমানদের মাঝে জরুরি দ্বীনী শিক্ষার বিস্তার ঘটানো। কুমিল্লা শহরে আলহাজ্ব মাশুক আহমদ সাহেবের একটি বাড়িতে দ্বীনের খেদমত হিসেবে কিছু করার জন্য তার একান্ত আগ্রহে এ প্রতিষ্ঠানটির কাঠামো বিন্যাসে সিদ্ধান্ত নেন মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার দুই প্রধান অভিভাবক। তিনি জানান, কোরআন শরীফের সহীহ তেলাওয়াত শেখানোর পাশাপাশি ওযু-নামাজ শুদ্ধ করা এবং ইসলাহী নেসাব থেকে পাঠ দিয়ে দ্বীনের মেজাজ তৈরি করা হয় শিক্ষার্থীদের মাঝে। এছাড়া হাকীমুল উম্মত হযরত আশরাফ আলী থানভী রহ.-এর গ্রন্থ ‘তালীমুদ্দীন’ থেকে ইসলামের বুনিয়াদি আকীদা ও ফিকিরের শিক্ষা দেওয়া হয়। আকিদা সিরিজ-সিরাত সিরিজসহ বিভিন্ন কিতাব থেকে মৌখিক আলোচনার ভিত্তিতে বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীদের মাঝে দ্বীনের পাঠ ও সমঝ দান করা হয়। মুআমালাতের মাসায়েলের পাশাপাশি মুআশারাতের শিক্ষা দেওয়ার জন্য ‘মিন আদাবিল ইসলাম’ কিতাব থেকেও পড়ানো হয় ছাত্রদের।

জানা যায়, শুরুর ‍দিন এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০ জন। আগ্রহী দ্বীন শিক্ষার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকে।এখন প্রতিটি শিফটের শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫০ জনের মতো। সে হিসেবে ২০০/২৫০ পুরুষ শিক্ষার্থী এ প্রতিষ্ঠানে পাঠ গ্রহণ করে। এ শিক্ষার্থীদের মাঝে শিশু, তরুণ, মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধ-সব বয়সের মানুষই রয়েছেন।আর দুই জন মহিলা শিক্ষিকার কাছে একই পদ্ধতিতে তিন শিফটে শিক্ষা গ্রহণ করেন নারী শিক্ষার্থীরা। প্রতি সোমবার বাদ মাগরিব অনুষ্ঠিত হয় দ্বীনী মাহফিল। এ মাহফিলে শতাধিক পুরুষ এবং স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় ৬০/৭০ নারী অংশ গ্রহণ করেন প্রায় নিয়মিত।

সাধারণ শিক্ষিতদের মাঝে ফরযে আইন পর্যায়ের দ্বীনী ইলম শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান- তালীমুদ্দীন একাডেমীর এই মডেল এরই মধ্যে আরও বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তরবঙ্গ ও সিলেটসহ বিভিন্ন জেলাশহরে তালীমুদ্দীনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

তালীমুদ্দীন একাডেমীর শিক্ষাদান কার্যক্রমের সফলতা তুলে ধরতে গিয়ে এক অভিজ্ঞতার কথা জানান মুফতি আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, ৩০/৪০ বছর ধরে দ্বীনের সঙ্গে যুক্ত, দাওয়াত ও তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষের তেলাওয়াত সহীহ ছিল না, ওযু-নামাজের মাসায়েল জানতেন না। তালীমুদ্দীন একাডেমীতে বছর খানেকের মেহনতে তারা এখন সহীহ তেলাওয়াত করতে পারেন। জরুরি মাসায়েল জানেন ও দ্বীনী মেজাজ লালন করতে শিখেছেন, আলহামদুলিল্লাহ।