সিরাত থেকে ।। কা’বার চাবি

473

মুহাম্মাদ ইরফান জিয়া ।।

বিজ্ঞাপন

 পবিত্র কা’বা ঘর। মুসলিম উম্মাহর প্রাণকেন্দ্র। মর্যাদা ও আভিজাত্যের প্রতীক।

ইসলামপূর্ব যুগেও একে সম্মানের যোগ্য মনে করা হতো। কা’বা ঘরকে কেন্দ্র করে কোনো খেদমতের সুযোগ এলে সেটাকে সৌভাগ্যের কারণ মনে করা হতো। এ কাজে যারা নির্বাচিত হতেন সমাজে তারা পরিচিত হতেন সম্মানিত ও মর্যাদাবান হিসেবে।

এ কারণেই কা’বা ঘরের খেদমতকে ভাগ করে দেয়া হতো বিভিন্ন গোত্রের বিভিন্ন মানুষের মাঝে। যেমন, হাজীদেরকে যমযমের পানি পান করাতেন হযরত আব্বাস রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু। আরো কিছু দায়িত্ব ছিলো নবীজীর চাচা আবু তালেবের ওপর। এই ধারাবাহিকতায় কা’বা ঘরের চাবির দায়িত্বে ছিলেন হযরত উসমান ইবনে তলহা রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু।

হিজরতের আগের কথা। তখন প্রত্যেক সোম ও বৃহস্পতিবার কা’বা ঘরের দরজা খুলে দেয়া হতো। এ দু’দিন লোকেরা আল্লাহর ঘরে প্রবেশের সৌভাগ্য লাভ করতো। একদিন নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন সাহাবাকে নিয়ে বাইতুল্লায় প্রবেশ করতে চাইলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ালেন হযরত উসমান ইবনে তলহা। তিনি তখনও মুসলমান হননি।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বার চাবি না পাওয়াকে অপমান মনে করে ক্ষেপে গেলেন না। নিজ বংশ আভিজাত্য দেখিয়ে জোর করে প্রবেশও করতে চাইলেন না। বরং অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে উসমানের বাধা মেনে নিলেন। বললেন, ‘উসমান, একদিন তুমি এই চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে। আমি তখন যাকে ইচ্ছে চাবিটা দেব।’

নবীজীর এই কথার পিঠে উসমান বললেন, ‘এমন দিন যদি আসে তাহলে সেটা হবে কুরাইশ বংশের অপমান ও অপদস্থ হওয়ার দিন।’ নবীজী বললেন, ‘না, না, বরং সেদিন কুরাইশ বংশ হবে যথার্থ সম্মানের অধিকারী। পাবে মুক্তির স্বাদ।’

নবীজীর এই কথা উসমানের হৃদয়ে আশ্চর্যরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলো। তার বিশ্বাস জন্মে গেলো, মুহাম্মদ যা বলছেন তা অবশ্যই ঘটবে। সেই মুহুর্তেই তিনি ইসলাম গ্রহণের সংকল্প করে ফেললেন।

উসমান ইবনে তলহার এই ইচ্ছের কথা জানতে পারলো তার সম্প্রদায়। সবাই মিলে তাকে ছি ছি করতে লাগলো। তাদের কঠিন ভর্ৎসনায় ইসলাম কবুল করা হলো না উসমানের।

***

মক্কা বিজয়ের দিন। মক্কার সবকিছুই সেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধীন। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমানের কাছে কা’বার চাবি চাইলেন। বরকতময় সে চাবি সাথে সাথে তাঁর হাতে তুলে দিলেন উসমান। চাবি নিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে বাইতুল্লাহর দরজা খুললেন। ভেতরে প্রবেশ করে দুই রাক‘আত নামায আদায় করলেন।

বাইরে তখন অপেক্ষমান জনতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হওয়ার পর সবাই সীমাহীন কৌতুহল নিয়ে তাকিয়ে রইলো তাঁর দিকে। কাকে দেয়া হবে আজ কা’বার চাবি। কে পাবে এই মুবারক দায়িত্ব?

হযরত আব্বাস এবং আলী রাযিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুও উপস্থিত ছিলেন সেখানে। দু’জনই এ চাবি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছিলেন। এমনকি তারা এ ব্যাপারে আবেদনও করেছিলেন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে।

কিন্তু না, সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নবীজী দরাজ গলায় ডাকলেন উসমান ইবনে তলহাকে। তার হাতেই দিলেন কা’বার চাবি। বললেন, ‘এখন থেকে এ চাবি তোমার বংশধরের হাতেই থাকবে। একেবারে কেয়ামত পর্যন্ত। তোমাদের হাত থেকে এ চাবি কেউ নিতে চাইলে সে হবে জালিম, অত্যাচারী।’

উসমান ইবনে তলহা নবীজীর কাছ থেকে চাবি নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন। নবীজী তাকে ডেকে বললেন, ‘কী, আমি যা বলেছিলাম তাই হলো না?’

উসমানের মনে পড়ে গেলো হিজরতের আগের ঘটনা। মনে পড়ে গেলো নবীজীর সে কথা- ‘একদিন এ চাবি আমার হাতে দেখতে পাবে’।

এসব ভাবতে ভাবতে বিশ্বাসের আলোয় ভরে উঠলো উসমানের মন। হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি বলে উঠলেন, ‘আপনার কথা নিঃসন্দেহে বাস্তবায়িত হয়েছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আপনি আল্লাহর রাসূল। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।’

*ইসলামী যিন্দেগী: ৫৭৬, তাফসীরে মাযহারী: ২/১৩৮।