দলিল-প্রমাণবিহীন অলীক কথাবার্তা বললে মাহফিল থেকে মানুষের আস্থা উঠে যাবে

271

অধ্যাপক মাওলানা ড. আফম খালিদ হোসেন। ইসলামের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক, চট্টগ্রাম ওমরগণি কলেজ। গবেষক লেখক ও অনুবাদক। সম্পাদক, মাসিক আততাওহীদ। দেশবিখ্যাত ইসলাম বিষয়ক আলোচক। ইসলামি সংস্কৃতি, রাষ্ট্রদর্শন ও মুসলিম দেশে দেশে বিরাজমান সংকট-সম্ভাবনার বিশ্লেষক। উম্মাহ-পরিস্থিতির নানা রূপ নিয়ে সুধীসমাবেশ ও গণমাধ্যমে নিয়মিত তার পর্যবেক্ষণ পেশ করেন। জোরালো ভাষায় বলেন উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির কথা।

সম্প্রতি তার সঙ্গে কথা হয়েছিল ওয়াজ-মাহফিলের নানা দিক নিয়ে। সেখানে তিনি ওয়াজের গুরুত্ব, বিষয়বস্তু, বক্তার যোগ্যতা ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলেছেন। ইসলাম টাইমসের পক্ষে তার সঙ্গে কথা বলেন ওলিউর রহমান


ইসলাম টাইমস: দ্বীনের প্রচারে ওয়াজ মাহফিল কতোটা গুরুতপূর্ণ?

 ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: দ্বীনের প্রচার প্রসারে ওয়াজ নসিহত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সময়ে সময়েই সাহাবিদের বিভিন্ন বিষয়ে নসিহত করতেন। পরবর্তীকালে বিশিষ্ট সাহাবায়ে কেরাম এ ধারা চালু রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. সহ অনেক সাহাবি তারিখ নির্দিষ্ট করে মানুষকে নসিহত করতেন। তাছাড়া কুরআনেও আছে- وذكر فإن الذكري تنفع المؤمنين অর্থাৎ, ‘হে নবী, আপনি নসিহত করুন। নসিহত মু’মিনদের ব্যাপক উপকার করে’।

আমাদের দেশে শীত মওসুমে যে ওয়াজ নসিহতের আয়োজন করা হয় তা নবি সাহাবিদের যুগের সে ধারার অনুসরণ। এসব মাহফিলের আলোচনা শুনে সাধারণ মানুষের মাঝে দ্বীনের উপর চলার জযবা তৈরি হয়। মানুষ ধর্মীয় অনেক বিধিবিধান জানতে পারে। মানুষের ঈমানের মজবুতি এবং আমলের বৃদ্ধির জন্য এসব ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব অপরিসীম।

আল্লাহ তাআলা সুরা আনফালে বলেন, وإذا تليت عليهم اٰياته زادتهم إيمانا অর্থাৎ, যখন তাদের কাছে আল্লাহর বিধানাবলী বর্ণনা করা হয় তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায়।

ইসলাম টাইমস: মাহফিলে দেখা যায় বক্তারা নানা বিষয়েই কথা বলেন। বর্তমানে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোন বিষয়ের আলোচনার প্রতি বক্তাদের মনোযোগী হওয়া উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?

 ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: বিশুদ্ধ আকিদাহ, শিরকমুক্ত আমল, কু-সংস্কারমুক্ত জীবন এবং সিরাত বিষয়ক আলোচনা সাধারণ মানুষের জন্য অধিক উপকারী বলে আমার মনে হয়।
এছাড়া জনসচেতনতা তৈরির উদ্দেশে সামাজিক অবক্ষয় রোধে ইভটিজিং, কিশোর গ্যাং কালচার, সুদ, ঘুষ, দূর্নীতি, ক্যাসিনোর মতো সামাজিক ব্যাধিগুলোর বিরদ্ধেও কথা বলা উচিত।

তবে যে বিষয়টি অবশ্য বিবেচ্য তা হলো, যে আলোচনায় হোক তা হতে হবে বিশুদ্ধ এবং প্রামাণ্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে ওয়াজ মাহফিল দ্বীন প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম। এটার সঠিক ব্যবহার উচিত। দলিল-প্রমাণবিহীন অলীক কথাবার্তা বললে এ প্লাটফর্ম থেকেই সাধারণ মানুষের আস্থা উঠে যেতে পারে।

ইসলাম টাইমস: মানুষকে নসিহত করতে একজন বক্তার কেমন গুণাগুণ থাকা প্রয়োজন?

 ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা হাদিসের কিতাবে দেখতে পাই আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. যখন মানুষকে নসিহত করতেন তখন তার চেহারা লাল হয়ে যেত। শিরা ফুলে যেত। তিনি সবসময় আতঙ্কিত থাকতেন- এমন কথা বলে ফেলেন কি না রাসূল যা বলেননি। বর্তমানেও যারা আলোচক হবেন, মানুষকে যারা নসিহত করবেন তাদের এ গুণটি অর্জন করা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন- আমি নিশ্চিত যা জানি না তা বলব না।

এছাড়া ইলমের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া, মুত্তাকি হওয়া, উত্তম আখলাকের অধিকারী হওয়া, ইখলাসের সাথে আলোচনা করা এগুলোর কথা তো বলারই অপেক্ষা রাখে না।

ইসলাম টাইমস: মাহফিলের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় কোনটিকে মনে করেন? এখন তো দেখা যায়, কোথাও সারাদিনব্যাপী কোথাও সারারাতব্যাপী আবার কোথাও বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সভা করা হয়।

 ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: বিকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত সময়টাকে আমার কাছে মানুষের আলোচনা শোনার সবচেয়ে উপযোগী সময় মনে হয়। বিভিন্ন পেশার কর্মব্যস্ত মানুষ তখন অবসর থাকে। এসময়ের আলোচনা মানুষ মন দিয়ে শুনে। সারারাতব্যাপী যেখানে আলোচনা করা হয় মধ্যরাতের পর সেখানের উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে তেমন চাঞ্চল্য থাকে না। তাছাড়া মেখল মাদরাসার মুফতি ফয়জুল্লাহ রহ.সহ অনেক আলেম রাতব্যাপী আলোচনা পছন্দ করতেন না। কেননা সমাজে অসুস্থ, শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ থাকে। রাতব্যাপী আলোচনা হলে তাদের বিশ্রামের ব্যঘাত ঘটে। আর সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দিনব্যাপী ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করলেও মানুষের অনেক ফায়েদা হয়।

ইসলাম টাইমস: একটি সভায় সাধারণত সর্বোচ্চ কতজন বক্তাকে আলোচনার জন্য দাওয়াত করা উচিত?

 ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: ভালো আলোচনা করতে পারেন এবং মাহফিলে উপস্থিতির ব্যাপারে সচেতন এমন তিনজন আলেমকে দাওয়াত করাই যথেষ্ট। অনেক মাহফিলে দেখা যায়, বহুজন বিশিষ্ট আলোচককে দাওয়াত করা হয়। পরে সভায় একজন বক্তা কিছুক্ষণ আলোচনা করার পরই তাকে পরবর্তী বক্তার আগমনের সংকেত দেয়া হয়। এটা ভাল কাজ নয়। এধরনের অসম্পূর্ণ আলোচনা দ্বারা শ্রোতাদের তেমন উপকার হয় না।

ইসলাম টাইমস: আমরা জানতে পেরেছি আপনি খুতুবাতে রাসূলের উপর থিসিস লেখেছেন। কোন ভার্সিটির অধীনে এ থিসিস সম্পন্ন হয়, এ ব্যাপারে জানতে চাই।

ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাইন: হ্যা। সামাজিক সংস্কৃতির প্রেক্ষিত বিবেচনায় খুতুবাতে রাসূলের উপর আমি চারশত পৃষ্ঠার থিসিস লেখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভারতের লক্ষ্মৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আমি আমার থিসিস সম্পন্ন করি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমাকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়।

ইসলাম টাইমস: আপনার থিসিস লেটার কি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে?

ড. মাওলানা আ ফ ম খালিদ হোসাই: থিসিসটি লেখা হয়েছিল ইংরেজিতে। ইংরেজিতে কোনো পুস্তক আকারে থিসিসটিকে প্রকাশ করা হয়নি। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে যখন সিরাত বিশ্বকোশ ছাপা হয় তখন আমার কাছে রাসূলের খুতুবাতের বাংলা অনুবাদ চাওয়া হয়। পরে আমি গুরুত্বপূর্ণ খুতবাগুলোর অনুবাদ করে দিই। যেগুলো সীরাত বিশ্বকোশের ১৪ নাম্বার খণ্ডে ছাপা হয়েছে।