বেশি বেশি দরূদ পড়ায় খুলে সৌভাগ্যের দুয়ার

575

মাওলানা মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ ।।

বিজ্ঞাপন

আমাদের নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তাআলার আখেরী রাসূল। তিনি গোটা মানবজাতির জন্য আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ দূত। তাই তাঁর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য ছাড়া আল্লাহতে বিশ্বাস ও আল্লাহর আনুগত্যের দাবি অর্থহীন। কুরআন মজীদের বিভিন্ন জায়গায় এ বিষয়টি ঘোষিত হয়েছে।

আল্লাহকে পাওয়ার একমাত্র পথ খাতামুন্নাবিয়ীন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ। তাই তাঁর জন্য হৃদয়ের গভীরে মহববত ও ভালবাসা পোষণ করা এবং তাঁর জন্য আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দুআ করা প্রত্যেক উম্মতির ঈমানী কর্তব্য।

কুরআন মজীদে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য দরূদ পাঠের তথা আল্লাহর দরবারে তাঁর জন্য দুআ করার আদেশ করেছেন। এটা একদিকে যেমন আল্লাহর কাছে তাঁর রাসূলের মর্যাদার প্রমাণ অন্যদিকে মুমিন বান্দার রহমত ও বরকত লাভের অন্যতম উপায়।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (তরজমা) নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর উপর রহমত নাযিল করেন এবং ফেরেশতারা তাঁর জন্য রহমতের দুআ করেন। সুতরাং হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি দরূদ পড় এবং অধিক পরিমাণে সালাম পাঠাও। (সূরা আহযাব : ৫৬)

এখানে কিছু ফযীলত উল্লেখ করা হল। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই সহজ ও মূল্যবান আমলটি বেশি বেশি করার তাওফীক দিন।

১. রহমত, মাগফিরাত ও দরজা বুলন্দির আমল

আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আছ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন-

من صلى علي صلاة صلى الله عليه بها عشراً

 

যে আমার উপর একবার দরূদ পড়বে, বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন।-সহীহ মুসলিম ১/১৬৬; জামে তিরমিযী ১/১০১

অন্য হাদীসে আছে, হযরত আনাস রা. বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من صلى علي صلاة واحدة صلى الله عليه عشر صلوات، وحطت عنه عشر خطيئات، ورفعت له عشر درجات.

যে আমার উপর একবার দরূদ পড়বে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন, তার দশটি গুনাহ ক্ষমা করা হবে এবং দশটি দরজা বুলন্দ হবে।-সুনানে নাসায়ী ১/১৪৫; মুসনাদে আহমদ ৩/১০২; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ২/৪৩

অন্য বর্ণনায়, আবু বুরদা রা. থেকে বর্ণিত আছে, তার আমলনামায় দশটি নেকী লেখা হবে।-আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ২২/৫১৩

আবু হুরায়রা রা. থেকেও দরূদের এই ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।-মুসনাদে আহমদ ২/২৬২, হাদীস : ৭৫৬১

২. ফেরেশতারা মাগফিরাতের দুআ করেন

হযরত আমের ইবনে রবীআহ রা. বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে খুতবার মধ্যে বলতে শুনেছি-

من صلى علي صلاة، لم تزل الملائكة تصلي عليه ما صلى علي، فليقل عبد من ذلك أو ليكثر. (قال السخاوي في القول البديع، ص : 25 : حسّن شيخنا هذا الحديث. وقال الشيخ شعيب الأرناؤوط : حديث حسن. اه)

 

আমার উপর দরূদ পাঠকারী যতক্ষণ দরূদ পড়ে ফেরেশতারা তার জন্য দুআ করতে থাকে। সুতরাং বান্দার ইচ্ছা, সে দরূদ বেশি পড়বে না কম।-মুসনাদে আহমদ ৩/৪৪৫; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৪০; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ৯০৭

৩. দরূদ পাঠকারীর জন্য শাফাআত অবধারিত

রুওয়াইফি ইবনে ছাবিত আলআনসারী রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি এ দরূদ পাঠ করবে তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত হয়ে যাবে।

اللهم صل على محمد وأنزله المقعد المقرب عندك يوم القيامة. (قال الهيثمي في مجمع الزوائد : رواه البزار والطبراني في الأوسط والكبير، وأسانيدهم حسنة. اه)

-আলমুজামুল কাবীর, তবারানী ৫/৪৪৮১; মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/২৫৪

৪. কিয়ামতের দিন নবীজীর সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে

আবদুললাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

أولى الناس بي يوم القيامة أكثرهم علي صلاة

কিয়ামতের দিন ঐ ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী হবে, যে আমার উপর সবচেয়ে বেশি দরূদ পড়েছে।

(رواه الترمذي وقال : هذا حديث حسن غريب)

-জামে তিরমিযী ১/১১০

৫. দোজাহানের সকল মকসূদ হাসিল হবে

হযরত উবাই ইবনে কা’ব রা. বলেন, একবার আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিকরুল্লাহর খুব তাকিদ করলেন। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আপনার প্রতি বেশি বেশি দরূদ পাঠ করে থাকি। আমি আমার দুআর কতভাগ আপনার জন্য নির্ধারণ করব? তিনি বললেন, তোমার যে পরিমাণ ইচ্ছা।

আমি বললাম, চারভাগের এক ভাগ? তিনি বললেন, তোমার যতটুকু ইচ্ছা। তবে বেশি করলে আরো ভালো।

আমি বললাম, তাহলে অর্ধেক? তিনি বললেন, তোমার যতটুকু ইচ্ছা। তবে বেশি করলে আরো ভালো।

আমি বললাম, তাহলে তিন ভাগের দুই ভাগ? তিনি বললেন, তোমার যতটুকু ইচ্ছা হয়। তবে বেশি করলে আরো ভালো।

আমি বললাম, তাহলে কি আমার দুআর পুরোটাই হবে আপনার প্রতি দরূদ? তিনি বললেন, তবে তো তোমার মকসূদ হাসিল হবে, তোমার গুনাহ মাফ করা হবে।

رواه الترمذي وقال : هذا حديث حسن. اه وقال الهيثمي : رواه الطبراني، وإسناده حسن.)

-জামে তিরমিযী ২/৭২; মাজমাউয যাওয়াইদ ১০/২৪৮; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৬/৪৫

৬. যে চায় তাকে কোঁচর ভরে দেওয়া হোক

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে চায় আমাদের উপর অর্থাৎ আহলে বাইতের উপর দরূদ পাঠের সময় তাকে পাত্র ভরে দেওয়া হোক, সে যেন এভাবে দরূদ পড়ে-

اللهم صل على محمد النبي وأزواجه أمهات المؤمنين وذريته وأهل بيته كما صليت على آل إبراهيم إنك حميد مجيد. (ومن سره أن يكتال بالمكيال الأوفى إذا صلى علينا أهل البيت فليقل … )

-সুনানে আবু দাউদ ১/১৪১

৭. গরীব পাবে সদকার সওয়াব

হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলমানের দান করার সামর্থ্য নেই সে যেন দুআয় বলে-

اللهم صل على محمد عبدك ورسولك، وصل على المؤمنين والمؤمنات، والمسلمين والمسلمات.

এটা তার জন্য যাকাত (সদকা) হিসেবে গণ্য হবে।

(أيما رجل مسلم لم يكن عنده صدقة فليقل في دعائه … فإنها زكاة. رواه ابن حبان في صحيحه، وقال السخاوي في القول البديع : ص 269، إسناده حسن. اه)

-সহীহ ইবনে হিববান ৩/১৮৫

৮. উম্মতের সালাম নবীজীর নিকট পৌঁছানো হয়

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলার যমীনে বিচরণকারী কিছু ফেরেশতা আছেন, তাঁরা আমার নিকট উম্মতের পক্ষ থেকে প্রেরিত সালাম পৌঁছিয়ে থাকেন।

أن لله في الأرض ملائكة سياحين يبلغوني من أمتي السلام.

-মুসনাদে আহমদ ১/৪৪১; ইবনে আবী শাইবা ৬/৪৪; সুনানে নাসায়ী ১/১৪৩

৯. দরূদ বিহীন দুআ আসমান-যমীনের মাঝে ঝুলন্ত থাকে

হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, যে পর্যন্ত তুমি তোমার নবীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উপর দরূদ না পড়বে ততক্ষণ দুআ আসমানে যাবে না, আসমান-যমীনের মাঝে থেমে থাকবে।

إن الدعاء موقوف بين السماء والأرض، لا يصعد منه شيء حتى تصلي على نبيك صلى الله عليه وسلم.

জামে তিরমিযী ১/১১০