ইসলাম টাইমস ইতিবাচক ধারার গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করবে

237

নিউজপোর্টাল ইসলাম টাইমস পূর্ণ করেছে একবছর। সামনের দিনগুলোতে ইনশাআল্লাহ চলবে, চলার চেষ্টা করবে আরও পরিকল্পিত ও ইতিবাচক আয়োজন নিয়ে। বছরপূর্তির এই সময়ে ইসলাম টাইমস-এর সম্মানিত প্রকাশক ও ফেইথ মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান বিশিষ্ট ফকীহ ও প্রাজ্ঞ ইসলামি ব্যক্তিত্ব মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইসলাম টাইমসের পাঠকদের সামনাসামনি হয়েছেন। কথা বলেছেন ইসলাম টাইমস প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট, উদ্যোগ ও ভবিষ্যত ভাবনা নিয়ে। তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আবদুর রহমান রাজি

ইসলাম টাইমস: ইসলাম ভিত্তিক একটি অনলাইন নিউজপোর্টাল প্রকাশনার উদ্যোগ নিলেন কেন? এর পেছনে বিশেষ কোনো প্রেক্ষাপট কি রয়েছে?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: সাধারণভাবে গণমাধ্যমে আলেম-উলামা ও ইসলামপন্থীদের অন্তর্ভুক্তি একটি আবশ্যকীয় বিষয় যা বলার অপেক্ষা রাখে না। তিন দশক আগ পর্যন্তও গণমাধ্যমের চিত্র বর্তমান থেকে ভিন্ন ছিল। সেসময় ইসলাম বিষয়ক সংবাদ বা বিষয়ের উপস্থিতি কম থাকলেও ইসলাম বিদ্বেষী সংবাদমাধ্যম বিশেষ একটা ছিল না। তখন গণমাধ্যম বলতে বোঝা যেত কয়েকটি ছাপা পত্রিকা, সরকারি একটি টেলিভিশন এবং কয়েকটি রেডিও প্রোগ্রাম। গণমাধ্যমের পরিধিটা সীমিত ছিল। দৈনিক পত্রিকাগুলো ছাপা হতো ৮ পাতায়। ঘটনা,ঘটনার খবর ও আলোচিত ঘটনার বিশ্লেষণ আসতো।

তবে আমি বলব, তিন দশক পূর্বের সংবাদমাধ্যমগুলো এখনকার চেয়ে বেশি গণমুখী ছিল। ইসলামবিমুখতা বা ইসলামপন্থীদের প্রতি বিরূপ মানসিকতা উস্কে দেওয়ার প্রবণতা তখনকার সংবাদমাধ্যমে উল্লেখযোগ্যভাবে ছিল না বললেই চলে। সেকারণেই সে সময়গুলোতে আলেম-উলামারা নিজেদের দিক থেকে আলাদা গণমাধ্যম করার প্রয়োজনীয়তা ততটা বোধ করেননি। যদিও বাংলা সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের অগ্রদূত ছিলেন মাওলানা আকরাম খাঁ। মাসিক মুহাম্মদী, দৈনিক আজাদ বাংলা গণমাধ্যমে শীর্ষ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এসে আমরা বিস্ময় ও আক্ষেপের সাথে লক্ষ্য করলাম, পরিস্থিতি দ্রুতই পাল্টে গেছে। সংবাদমাধ্যমের নামে বিত্তবানদের অঢেল টাকায় গড়ে ওঠা গণমাধ্যমে দেশ সয়লাব হয়ে গেছে। এসব গণমাধ্যম গণমাধ্যমের যা মূলকাজ তাতে কম পারদর্শী হলেও তথাকথিত বিনোদন, মুক্তচিন্তা ইত্যাদির নামে আয়োজন- উপস্থাপনটা রাখছে বেশি। ঘোষণা দিয়ে ইসলাম বিরোধিতার কথা না বললেও তাদের এসব কাজের অধিকাংশই হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক, মানুষের ইসলামি মনস্তত্ত্ব ও চিন্তা-চেতনা বিকাশের প্রতিবন্ধক হয়ে। এজন্য আমি দাবির সাথে বলতে পারি, এখনকার প্রতিষ্ঠিত বহু গণমাধ্যম জনগণের গণমাধ্যম না হয়ে হয়ে উঠেছে সংখ্যালঘু গণমাধ্যম। এসব গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত কেউ বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, তারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে।

একারণে আলেম-উলামা এবং দ্বীনদার শ্রেণির মানুষ উদ্বিগ্ন ছিলেন বেশ কিছুদিন থেকে। জাতীয় গণমাধ্যমেও দ্বীনদার শ্রেণির এগিয়ে আসা নিয়ে তারা ভাবতে শুরু করেছিলেনও। নানাসময়েই দৈনিক পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কখনো সাপ্তাহিক কোনো ম্যাগাজিন প্রকাশের ব্যাপারেও কথাবার্তা হয়েছে। তবে এসব বিষয়ে ভাবতে ভাবতে এবং আলোচনা চলতে চলতেই গণমাধ্যমের এ সেক্টরটা চলে গেছে বিলিয়নারদের হাতে। সংসদ ও রাজনীতির অন্যান্য অঙ্গনের মতো গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণও পুরোটা চলে গেছে হাজার কোটিপতি ব্যবসায়ীদের হাতে। যে কারণে পুঁজিবাদী মানসিকতার ওপর ভর করে গণমাধ্যম এখন শতকোটি টাকার প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। আর জানা কথা হলো, যারা কিছু বাছ-বিচার করে আয় করেন- এমন লোকদের দ্বারা এজাতীয় শত কোটি টাকার প্রকল্প চালু করা বা টিকিয়ে রাখা কঠিন ব্যাপার। কিন্তু এতসব কিছু সত্ত্বেও প্রয়োজনীতা তো থেকে গেছে তার নিজের জায়গায়। বরং দিনদিন এ প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকট হচ্ছে। এজন্য কিছু সুহৃদ ও বন্ধুর সাথে পরামর্শ করে আমরা সীমিত পরিসরে হলেও একটি গণমাধ্যমের প্রয়াস শুরু করতে চেয়েছি। ইসলাম টাইমস সেই রকমই একটি পদক্ষেপ।

যেহেতু ভবিষ্যত গণমাধ্যম চলে যাচ্ছে অনলাইনের দিকে। খবর আসছে, বিভিন্ন দেশে ছাপানো অনেক পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেছে। ইন্টারনেটের ভাল-মন্দ যা-ই আছে,  বাংলাদেশের মানুষও ব্যপকভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। এজন্য শুরুতে একটি অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে পথচলা শুরু করতে চেয়েছি।

ইসলাম টাইমস: বর্তমান সময়ের প্রভাবশালী বহু গণমাধ্যমকে আপনি সংখ্যালঘু গণমাধ্যম বললেন, অথচ এগুলো তো জনপ্রিয়তা পাচ্ছে, চলতে পারছে। তাহলে এসব গণমাধ্যম ‘সংখ্যালঘু’ হয় কীভাবে?

 মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: দেখুন, সস্তা জনপ্রিয়তা আর কাজের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া দু’টি ভিন্ন জিনিস। আগে আমরা দেখতাম, গণমাধ্যমে মানুষের কথা, তাদের ভাবনা, ঐতিহ্য ও অধিকারের কথা বলা হতো। কিন্তু আপনি দেখবেন, গত দুই দশক ধরে মানুষ কী বলবে সেটা গণমাধ্যমই শিখিয়ে দিচ্ছে। এদেশের মানুষের ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নানামুখী আয়োজনের মাধ্যমে গণমাধ্যম দেশ ও জাতির বাইরের সংস্কৃতি আমদানি করছে। মানুষের ওপর সেগুলো চাপিয়ে দিচ্ছে। শুধু বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই নয়, খবর, প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমেও অনেক অপ্রয়োজনীয় ও উল্টো জিনিস প্রচার করছে, জনগণকে নিজস্বতা বিরোধী বিষয় গেলাচ্ছে। এভাবে নতুন প্রজন্মকে ভুল জিনিসে অভ্যস্ত করছে। আর এটাতো স্পষ্টই যে,  সুরসুরিমূলক বিষয়, ভাসাভাসা যুক্তিতে নতুন নতুন কথা উঠালে অপরিণত তরুণেরা ধাবিত হয়, আগ্রহী হয়। এভাবেই তারা সস্তা জনপ্রিয়তা কামায়।

অথচ গণমাধ্যম হিসেবে তাদের কাজ হওয়া উচিত, ইতিবাচকভাবে মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেষ্টা করা, দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। জাতির মূল মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ঐতিহ্যের বার্তা তুলে ধরা। আলেম-উলামা এবং ধর্মপ্রাণ মানুষ এ ব্যাপারটাতেই জোর দেন বেশি। আর ইসলাম টাইমসও এ দৃষ্টিভঙ্গিটাই লালন করে। ইসলাম টাইমস ইতিবাচক ধারার গণমাধ্যম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছে এবং করবে ইনশাআল্লাহ।

ইসলাম টাইমস: সাংবাদিকতায় ইসলামি প্রয়াসের প্রয়োজনীতা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: সাংবাদিকতা বলতে কী বুঝাতে চেয়েছেন আমার কাছে স্পষ্ট নয়। কিন্তু আমরা চলমান সংবাদমাধ্যমে এমন অনেক আয়োজন দেখি ইসলাম যেগুলোকে জরুরি মনে করে না, বৈধও মনে করে না। যেমন, মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খোঁচাখুঁচি করা, জাতীয় কোনো স্বার্থ ছাড়া কারো দোষ খোঁজার জন্য পেছনে লেগে যাওয়া, বিনোদনের নামে মুসলমান সমাজের তাহযীব তামাদ্দুনের পরিবর্তে ভিন্ন সংস্কৃতিকে গণমানুষের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলা। এসব বিষয় ইসলাম সমর্থিত নয়। তবে সাংবাদিকতা যদি হয় গণমানুষের পক্ষে কথা বলা, মজলুমের পক্ষে অবস্থান নেওয়া, সমাজের কোনো ইতিবাচক বিষয়কে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা- তবে সেগুলোর জন্য কাজ করতে সবার আগে ইসলামই বলে। কুরআন, হাদিস পড়লে বিভিন্ন জায়গায় এর উদাহরণ পাওয়া যাবে। আরেকটি কথা আগেও বলা হয়েছে, অপসাংবাদিকতা বা ভুল তথ্যের আগ্রাসনের ফলে সৃষ্ট খারাপ ক্রিয়া থেকে মানুষকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে কাজ করার জন্যও সাংবাদিকতায় আলেমদের যথোপযুক্ত ভূমিকা রাখা দরকার বলে মনে হয়।

ইসলাম টাইমস: ইন্টারনেট বা অনলাইনে অনেকরকম বিচ্যুত তথ্য ও অশ্লীলতার বিষয় থাকে, সে অঙ্গনে আপনারা কাজ করতে নেমেছেন! এর ভালোমন্দ দিক নিয়ে বলবেন?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: ইন্টারনেট তো বেশিদিন আগের কথা না। মাত্র দুই-তিন দশকের কথা। তবে অল্প সময়ের মধ্যে ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে ইন্টারনেট নিজের আওতাভূক্ত করে নিয়েছে। যদিও আমাদের চাওয়া ও আহ্বান হলো, যার প্রয়োজন নেই তার ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে না। তথাপি এটা সত্য যে, খুব দ্রুতই ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা, ইন্টারনেট থেকে খবর সংগ্রহের প্রবণতা বেড়েছে। এজন্যই আমরা ভেবেছি, এ অঙ্গনেও যতটুকু সম্ভব ইতিবাচক ভূমিকা রাখার চেষ্টাটা করা। আমি ইসলাম টাইমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেছিলাম, আমরা এমন লোকদেরকে এই সাইট ভিজিট করতে আহ্বান করি না যারা এখনও ইন্টারনেট ব্যবহার করেননি। বরং যারা ইতোমধ্যে ইন্টারনেটে জড়িয়ে আছেন, তাদেরকেই ইসলাম টাইমস পড়ার আহ্বান জানাই। যেন এখান থেকে অন্তত তারা ইতিবাচক তথ্য-উপাত্ত কিছু পান। একই সাথে আমি আরও আহবান করবো, যারা ইসলাম টাইমস বা ভালো কোনো সাইটে ঢুকার জন্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তারা শরীয়া বিরোধী কোনো সাইটে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকবেন।

ইসলাম টাইমস: আপনি দেশের পরিচিত দু’টি ইদারার সঙ্গে যুক্ত আছেন। উচ্চতর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার মহাপরিচালক এবং মাসিক আল কাউসারের সম্পাদক আপনি। পাশাপাশি আপনি ইসলাম টাইমসেরও প্রকাশক। এ দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে কি ইসলাম টাইমসের কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে?

 মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: ইসলাম টাইমস স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান। মারকাযুদ্দাওয়া বা আল কাউসারের কোনো অঙ্গ প্রতিষ্ঠান নয়। সময়ের প্রয়োজন ও পরিস্থিতি সামনে রেখে এ পোর্টালটি প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি ওই দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, বরং ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র একটি প্রতিষ্ঠান।

ইসলাম টাইমস: কাদেরকে পাঠক বিবেচনা করে ইসলাম টাইমসের সংবাদ- আলোচনা বা বিভিন্ন আয়োজন উপস্থাপন করা হয়?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: সকল বাংলাভাষী মানুষের জন্যই ইসলাম টাইমসের আয়োজন। শুধুমাত্র মাদরাসা সংশ্লিষ্ট বা দ্বীনদার মহলই এর টার্গেট পাঠক নয়, বরং সকল বাংলাভাষী মানুষই যেন এখান থেকে ইতিবাচক কিছু গ্রহণ করতে পারে সে বিবেচনা থেকেই ইসলাম টাইমস প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইসলাম টাইমস: ইসলাম টাইমস-এর ভবিষ্যৎ পথচলা নিয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ: সীমিত আয়োজনের মধ্যে ইসলাম টাইমস এর পথচলা শুরু। নানারকম সীমাবদ্ধতা নিয়েই ইসলাম টাইমসকে এগিয়ে আসতে হয়েছে। সীমাবদ্ধতা নিয়েই পথ চলতে হচ্ছে। তবুও শুরুর দিন থেকেই চিন্তা করা হয়েছে এটা যেন একটি পূর্ণাঙ্গ পোর্টাল হয। যেটি গণমানুষের পক্ষে সব সময় কাজ করবে। যেমন সব পর্যায়ের শিক্ষা, অর্থ-বাণিজ্য, শহর ও গ্রামীণ জনপদের হালহাকিকত তুলে ধরবে, তেমনি মজলুমের পক্ষে অবস্থান নেয়া, জুলুমের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঁচু করা এর কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া ইসলাম ও মুসলমান স্বার্থের প্রশ্নে অগ্রাধিকারেরর বিষয়টি তো বলার অপেক্ষা রাখে না। আল্লাহ তাআলার তাওফিক শামিলে হাল হলে ইনশাআল্লাহ সামনে এই চিন্তা ও বিবেচনা থেকেই আরো নানারকম ইতিবাচক আয়োজন রাখা হবে।