বিবাড়িয়ার সেই বড় হুজুর সিরাজুল ইসলাম রহ.

452

মুহাম্মদ মামুনুর রশীদ ।।

তিনি ছিলেন গোটা দেশের সবচেয়ে বয়ষ্ক ও বরেণ্য দ্বীনী অভিভাবক। জীবনের শেষ বেলায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কিংবা বি-বাড়িয়ার এই বড় হুজুরের দিকে তাকিয়ে থাকতো সারা দেশের মানুষ। আলেম-উলামা ও ধর্মপ্রাণ মহলই শুধু নয়, নানা মত-পথের রাজনীতিক নেতা, আমলারাও তাঁর কাছে ছুটে যেত দোয়া নিতে। তিনিই হলেন আল্লামা সিরাজুল ইসলাম ‘বড় হুজুর’ রহ.।‘মুফাসসির সাহেব হুজুর’ নামে খ্যাত ছিলেন জীবনজুড়ে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জনসাধারণ নিজের পিতার চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন তাঁকে। দেখা গেছে, বহু হিন্দু ধর্মালম্বী মানুষও তাঁকে বিপুল শ্রদ্ধা করতেন।

তিনি দীর্ঘ কর্মময় হায়াত পেয়েছিলেন। ১৩৩ বছরের জীবনের শেষ ১২-১৫ বছর জাতীয় অভিভাবকত্বের মসনদে দেশের মানুষ তাঁকেই বসিয়েছেন।

ক্ষণজন্মা এই মহা পুরুষ ১৮৭৩ ইসায়ী সনে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার দশদোনা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম লাভ করেন। তার পিতা মুন্সি মুহাম্মদ আবদুল মাজেদ ছিলেন একজন খোদাভীরু ব্যাক্তি। তাঁর মাতা আমেনা ছিলেন ধর্মনুরাগী মহিয়সী নারী। দুগ্ধ পানরত অবস্থায় তিনি মাতৃহারা হন। আনুমানিক ৭/৮ বছর বয়সে তিনি পিতাকেও হরান।

পিতা-মাতা উভয়কে হারিয়ে আগামী দিনের এই মহীরুহ আপন দাদা-দাদীর তত্ত্ববধানে লালিত পালিত হন।

তিনি পিতার কাছেই প্রাথমিক ধর্মীয় শিক্ষা- কায়দা ও আমপারা পড়েন। পিতার মৃত্যুর পর বাসগাতি গ্রামের মৌলভি ইয়াকুব সাহেব রহ.-এর কাছে জীবনের ৪/৫ বছর অতিবাহিত করেন। তারপর কানাইগর গ্রামে একটি মাদরাসায় দুই বছর পড়া-লেখা করে ঢাকার নবাববাড়িতে একটি মাদরাসায় ভর্তি হয়ে গভীর মনোযোগে পড়তে আরম্ভ করেন।

১৩৪৫ হিজরিতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য ভারত যান। বিশ্বখ্যাত দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ মাদরাসায় হাদীস, ফিকহ ও তাফসির ইত্যাদি বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করেন। সেখানকার সর্বোচ্চ শিক্ষাস্তর- দাওরায়ে হাদীস ও তাফসিরে সনদ লাভ করে পাঁচ বছর পর দেশে ফিরে আসেন।

বাড়ি ফিরে আসার সময় উস্তাদগণ তাঁকে বলেছিলেন, “ইনশা আল্লাহ তুমছে দ্বীন কি খেদমত হোগা।”

জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

১৩৫০-১৪২৫ হিজরি (১৯৩০-২০০৫ ঈসায়ী) পর্যন্ত একাধারে ৭৫ বছর দেশের প্রাচীনতম ইসলামী বিদ্যাপিঠ, শতবর্ষি ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইউনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে তিনি হাদীস, তাফসির, ফিকহ, আদব, নাহু, ছরফ, মানতেক ও বালাগাত ইত্যাদি বিষয়ে তা’লীম দেন।

১৯৬৭ সালে ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.-এর ইন্তেকালের পর থেকে প্রায় ৪০ বছর যাবত সম্পূর্ণ বুখারি শরীফ তিনি একাই পড়াতেন। ১৯৭৪ সাল থেকে জামিয়া ইউনুছিয়ার মুহতামিমের দায়িত্বও সূচারূ রূপে পালন করেছেন তিনি। ঝড়, বৃষ্টি- বাদল উপেক্ষা করে মাদরাসায় প্রত্যেক দিন হাযির হওয়া এবং সময়মত উপস্থিত থাকা ছিল তাঁর জীবনের বৈশিষ্ট্য।

বড় হুজুর রহ. জামিয়াতে আসার পর স্টেশন রোডস্থ চাঁন মিয়া পেশকারের বাড়িতে বেশ কিছু কাল সপরিবারে বসবাস করেন। হযরত কয়েকজন মুরব্বিকে নিয়ে বাসায়ই প্রায় সময় জামাতে নামাজ আদায় করতেন। মাঝে মধ্যে আক্ষেপ করে বলতেন, এখানে যদি একটি মসজিদ হয়ে যেত খুবই ভালো হতো। বড় হুজুর রহ.-এর প্রত্যাশা ও দীর্ঘদিনের বাসনা ‍পূরণ হয়। এখানে একটি মসজিদ নির্মিত হয়, যা বর্তমানে ব্রাহ্মণাবাড়িয়া রেলস্টেশন জামে মসজিদ নামে পরিচিত।

বড় হুজুর রহ. ছিলেন চারিত্রিক সুন্দর গুণাবলির অধিকারী এক মহান মানুষ। সমাজে তাঁর অবদান অপরিসীম। তার চেষ্টায় পূর্বাঞ্চলে বহু মাদরাসা ও দ্বীনী মকতব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভাদুঘর জামিয়া সিরাজীয়াসহ আরো বহু মাদরাসা তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

মধ্য বয়সে তিনি সর্বপ্রথম জামিয়া ইউনুছিয়াতে কুরআনের তাফসির আরম্ভ করেন। তাঁর এই তাফসিরের শ্রোতা থাকতেন অসংখ্য মুরিদ, জনসাধারণ। এমনকি হজরত ফখরে বাঙ্গাল রহ.-ও প্রায় সময় বসতেন সেই তাফসিরে। তার তাফসিরের প্রভাব এলাকার মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে, কয়েক বছরের মধ্যেই তাফসির মাহফিল বিরাট সমাবেশে রূপ ধারণ করে। হুজুরের আওয়াজ সমাবেশের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তাই তাফসির কমিটি ঢাকা থেকে মাইক ক্রয় করে ত্বরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে মাইকের ব্যবস্থা করেন। এরপর থেকেই তিনি ‘মুফাসসির হুজুর’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। তার প্রত্যকটি তাফসিরে শেষ মুনাজাতে শরিক হওয়ার জন্য হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে সমবেত হতেন।

কয়েকটি উল্লেখযোগ্য স্থানে বড় হুজুর রহ. জীবনভর তাফসির করেছেন। যেমন বি’বাড়িয়া থেকে আট মাইল দূরে বড়াইল নামক গ্রামে। বি’বাড়িয়া সদর থেকে চার মাইল দূরে সুহিলপুর মাঠে (এখনও এখানে ১৫ দিন ব্যাপী তাফসির মাহফিল হয়)। সরাইল থানা সংলগ্ন উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। শহরস্থ নিয়াজ মুহাম্মদ হাইস্কুল মাঠে। মালিহাতা, বুধল ও মুহাম্মদপুর ইত্যাদি স্থানে।

জামিয়া ইনুছিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভিত্তিই ছিল কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনের উপর। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরও বাহাস বা বিতর্কসভা অনুষ্ঠিত হয়। কাদিয়ানীদের পক্ষ থেকে বাহাস করার জন্য সূদূর লাহোর থেকে কাদিয়ানী পণ্ডিত আনা হতো। সেসব বাহাস-মুনাযারায় কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি কাদিয়ানীদের জব্দ করতেন।

এছাড়াও বড় হুজুর রহ. বিভিন্ন সময়ে কাদিয়ানী, বেদআতীসহ অন্যান্য বাতিলপন্থি লোকদের সাথে বাহাস-মুনাযারা ও সংগ্রাম করেছেন।

আল্লামা সিরাজুল ইসলাম ‘বড় হুজুর’ রহ.-এর কবর।

১৯৮৭ সালে ভাদুঘর বেদআতীদের মোকাবেলা করেছেন। কান্দিপাড়ায় মসজিদ বিজয় করেছেন। যা আজও ‘ফাতাহ মসজিদ’ নামে পরিচিত। ১৯৯৪ সালে নাস্তিক মুরতাদ তাসলিমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ২০০১ সালে ফতোয়া বিরোধী রায় বাতিলের দাবিতে সংগ্রামে বার্ধক্য নিয়েই রাজপথে এসে দাঁড়িয়েছেন। এ আন্দোলনের সময় ৬ জন শহীদও হয়েছেন বি-বাড়িয়ায়। মোটকথা তাঁর গোটা জীবনটাই ছিলো ইসলাম ও মুসলমানদের খেদমতে নিয়োজিত।

বর্নাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মহামনীষী ১৩৩ বছর বয়সে অসংখ্য ছাত্র-ভক্তদের কাঁদিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ঈসায়ী রোজ শনিবার সকাল ৯.৩০ মিনিটে ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান। ভাদুঘর জামিয়া সিরাজীয়া মাদরাসার পাশেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর জানাজার নামাজে জেলা ঈদগাহ ময়দানসহ আশপাশের রাস্তা-ঘাট, বাড়িঘর, বিল্ডিয়ের ছাদে নামাজের জন্য লক্ষ মানুষের ঢল নেমেছিল। এই বিশাল সমাবেশ তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার স্বাক্ষর বহন করে।