ইসলাম টাইমস-এর একবছর এবং আমার অর্ধবছর : সুখ-দুখের আলাপাচার

146

ওলিউর রহমান ।।

ইসলাম টাইমসে কাজ করার অর্ধবছর পূর্ণ হলো। ইসলাম টাইমসের বছরপূর্তিতে আমি অর্ধবছরপূর্তির লেখা লেখছি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করার আগে স্বভাবত অনেক ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আমার যে অভ্যেস; ইসলাম টাইমসে যোগ দেওয়ার সময় তা হয়ে উঠেনি। পরিকল্পনা এবং সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ইসলাম টাইমসে যোগ দেওয়া অনেকটা কাকতালীয়ই।

মার্চ মাসের শেষ দিকের কোনো তারিখ হবে। বছরের আগের তিনটি মাস ব্যক্তিগত ব্যস্ততা ও নানান জায়গায় ঘুরে কাটিয়েছি। ঢাকার মাদরাসাগুলোতে তখন খতমে বুখারীর অনুষ্ঠান চলছে। বিভিন্ন মাদরাসার খতমে বুখারীর অনুষ্ঠানে শরিক হতে বন্ধু-বান্ধবের দাওয়াতে ঢাকায় এলাম।

সেদিন যাত্রাবাড়ীতে বোনের বাসায় ছিলাম। দুপুরের দিকে ইসলাম টাইমসের সম্পাদকের ফেসবুক পোস্টে দেখলাম-অফিসের জন্য শিক্ষানবিশ একজন লোক প্রয়োজন। আমার হাতে তখন অফুরন্ত সময়। সম্পাদক সাহেবের সাথে পূর্বের কিছুটা পরিচিতি ছিল। দূর সম্পর্কের সামান্য আত্মীয়তাও নাকি! আমি তাকে মেসেজ করলাম-দু’মাসের জন্য আপনার কাছে থেকে কাজ শিখতে চাই। রিপ্লাই দিলেন, রাতে কথা হবে। আমার নাম্বার ছিল তাঁর কাছে।

ফরিদাবাদে ইমাদুদ্দীন সাহেবের মেহমান হয়ে খতমে বুখারীর বিরিয়ানি খেয়ে বুড়িগঙ্গার পাড়ে গিয়ে বাদাম নিয়ে বসলাম সন্ধ্যায়। সাথে মামনুন, যাকি ছিল। ঢালকানগর থাকাকালে প্রায় প্রতিদিনই বিকালে এ জায়গায় এসে বসতাম। সেসব স্মৃতির আলাপ করছিলাম সে সন্ধ্যায়।

ইসলাম টাইমসের সম্পাদকের ফোন। পাঁচ-সাত মিনিটের আলাপে আগ-পর না ভেবেই আবেগের বশে সিদ্ধান্তের মতো বলে দিলাম- দু’মাসের জন্য আসতে পারব। তিনি আরও ভাবতে বললেন। আব্বার সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত পোক্ত করতে বললেন। এটা আসলে আমার প্রতি তার ইহসান ছিল।

আমার বাবা। আল্লাহ তার কল্যাণ করুন। যিনি চূড়ান্ত অনুমোদনের বিষয়টি নিজের কাছে রেখে যেকোনো ব্যাপারে ইচ্ছে বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের কর্মটি সন্তানদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ইসলাম টাইমসে যোগ দেওয়ার বিষয়টি জানালে তিনি বললেন, তুমি যদি কল্যাণে দেখো, তাহলে যোগ দাও।

তারপর থাকার সামান্য সরঞ্জামাদি নিয়ে একদিন পল্লবীর ঝিলপাড়ে ইসলাম টাইমস অফিসে চলে এলাম। দু’রুমের একটি ছিমছাম বাসায় অফিস। আগেও একবার এসেছিলাম। তখন অফিসে খসরু ভাই ছিলেন। আমার স্বভাবজাত চঞ্চলতা, যখন তখন ঘুরতে বের হওয়া, আড্ডা জুড়ে দেওয়ার হঠাৎ ইতি ঘটল। শুরুতে এটা খুব ভূগিয়েছে। সারাদিন মন খারাপ থাকতো। কাউকে কিছু বলতাম না। এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। এখন তো অনেকদিন যায়, দুপুর থেকে ঘুমুতে যাওয়ার আগে কয়টা শব্দ উচ্চারণ করি তাও গুণে রাখা সম্ভব।

২.

আমি যখন ইসলাম টাইমসে আসি তখন অপরাপর সহকর্মীরা ছুটিতে অফিস থেকে দূরে ছিল। এসময় ঘটল কওমি মাদরাসা ইতিহাসের কলঙ্কজনক প্রশ্নফাঁসের ঘটনা। কওমি মাদরাসার একজন সন্তান হিসেবে এ দুঃখজনক ঘটনায় এবং আরও নানাবিধ কারণে আমাদের সম্পাদক সাহেবও তখন কিছুটা বিমর্ষ ছিলেন। তাই কাজ শিখতে আসা আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হয়েছে সে সময়টাতে। ডেস্কে বসার কয়েকদিনের মধ্যেই স্পর্শকাতর একটি বিষয়ে হাইআতুল উলয়া ও বেফাক বোর্ডের দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলে প্রতিবেদন তৈরির কাজটা আমার জন্য কঠিন হলেও আমি সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম।

গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে অফিসের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্যের দূরে থাকার বিষয়টি অফিসের উপর কোনো প্রভাব ফেলেছে কি না সেটা বাদ দিয়ে আমি বলি, আমার জন্য সেটা ভালই হয়েছিল। শুরু থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার একটা প্রশিক্ষণ পাওয়া গিয়েছিল। অবশ্য কেউ যদি তখন ‘এটা এভাবে নয়, ওভাবে, এখানে এটা হবে না ওটা লেখ’ বলে বলে আমার ‘কাঁচা-হাতের’ করা প্রতিবেদনগুলোকে ঠিক করে দিত- যেটার জন্য আসলে আমি তখন প্রস্তুতই ছিলাম- তাহলে হয়ত এতদিনে আমার কাজ আরও মানসম্মত হত।

তবে আমাদের সম্পাদক সাহেব করেছিলেন। একটা পত্রিকার সম্পাদকের এতটুকু সময় বা সুযোগ থাকে না যে তিনি অফিস সহকারীদের প্রতিটি কাজ প্রতি মুহূর্তে ঠিক করে দিবেন। তবুও আমাদের সম্পাদক সাহেব আমার কাজকে একটু একটু করে ঠিক করে দিয়েছেন। অথচ মানসিকভাবে তিনি কিছুটা নিমগ্নও ছিলেন তখন। এটা আমার উপুর্যপুরি পাওনাই বলা যায়। এজন্যই উপরে বলে এসেছিলাম, ঘটনাটি আমার জন্য ভালই ছিল।

৩.

শুরুতে রমযান পর্যন্ত দু’মাসের কথা থাকলেও রোযার পরে আমি ইসলাম টাইমসেই থেকে গেলাম। এই থেকে যাওয়া এবং এখনও স্বেচ্ছায় থাকার ব্যাপারে ‘জু বি হো খাইর’ বলে পরের আলোচনা করি। শিক্ষানবিশ হলেও রমযান পরবর্তী সময় থেকে পেশাদারিত্বের সাথেই কাজ করছি। সম্পাদক সাহেবের নির্দেশনা এবং তার থেকে তথ্যগত সহযোগিতা নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে মাঝেমাঝেই কিছু প্রতিবেদন করি। ইসলামি সংবাদমাধ্যম হিসেবে যেকোনো ঘটনাকে জাগতিক, মানবিক ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্লেষণ করা হয় ইসলাম টাইমসে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় এবং বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় ইসলামি ধারার সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারটি আমাদের বছরপূর্তি উপলক্ষে বিভিন্নজন থেকে নেওয়া প্রকাশিত অভিব্যক্তি থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়। আমি বরং প্রয়োজনের পরের বিষয়টি নিয়ে কথা বলি।

একটি প্রতিষ্ঠান একা একা খুঁড়িয়ে চলতে পারলেও অপরাপর সহযোগী ক্ষেত্রগুলো থেকে পূর্ণ সহযোগিতা না পেলে তা কখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। সহযোগিতার কথা বললেই অনেকে অর্থনৈতিক বিষয় ভাবতে শুরু করে। অফিসের অর্থনীতি বিষয়ে আমি কথা বলবার কে?  সহযোগিতা বলতে আমি বলতে চাচ্ছি তথ্যগত সহযোগিতা। একটি প্রতিবেদনকে মানসম্মত করতে প্রচুর তথ্য সংযোজন করতে হয়। সরেজমিন তদন্ত করে প্রতিবেদন করার সামর্থ্য ইসলামি মিডিয়া পরিচালনাকারীদের কতটুকু আছে তা তো সবারই জানা। তাই তথ্যের প্রয়োজনে মাঝেমাঝে আমাদেরকে আমাদের অঙ্গনেরই বিভিন্নজনের কাছে ফোনে কথা বলতে হয়। এই তথ্যের সহযোগিতাটা ইসলামি মিডিয়াগুলো পুরোপুরি পায় কি না তা চারমাসে আমার কাছে স্পষ্ট হয়নি। অথবা বলতে পারি হতাশাজনকভাবে স্পষ্ট হয়েছে। ছোট্ট করে শুধু বলি, আপনি যে অঙ্গনটিকে তুলে ধরতে বা আগলে রাখতে মিডিয়ায় ঘাম ঝরাচ্ছেন সে অঙ্গনেরই চেনা-অচেনা রথি মহারথিদের একটি বড় অংশ তথ্য সহযোগিতা না দিয়ে আপনাকে তাচ্ছিল্য করেই দায়িত্ব শেষ করবেন। আপনি আর কী করবেন! কিচ্ছু তো করবারও নেই।

৪.

প্রতিবেদনের জন্য ইসলাম টাইমসকে উদৃত করে অনেকের থেকে সম্প্রীতিমূলক আচরণ ‘উপহার’ পেয়েছি। এক্ষেত্রে আমাদের সম্পাদক সাহেবের ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং ইসলাম টাইমসের পূর্বের কিছু ভাল কাজের ভূমিকা আছে।

দেশের পুরোনো বড় বড় মাদরাসাগুলো নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন করতে গিয়ে আমাকে সেসব মাদরাসার দায়িত্বশীলদের সাথে কথা বলতে হয়েছে। অনেকের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সাড়া পেয়েছি। কেউ কেউ মাদরাসায় যাওয়ার দাওয়াত পর্যন্ত করেছেন। তবে দুয়েকজনের ব্যবহারের অসৌজন্য ছিল মন ভেঙ্গে দেওয়ার মতো।

তবে এসব সৌজন্য, অসৌজন্য নিয়ে আমি প্রতিক্রিয়া দেখাই না কখনো। আব্বার একটা উপদেশ মেনে চলি সবসময়। ইসলাম টাইমসে আসার আগের রাত্রে বলেছিলেন, ‘সংবাদমাধ্যমে কাজ করলে অনেকে ভাল-মন্দ অনেক কিছু বলবে। সততার জায়গা থেকে কাজ করবে। সাবধান,  প্রতিক্রিয়া দেখাতে যাবে না।’ #