‘ইখতিলাফ ও মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও বৈরী শক্তির চক্রান্তের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে’

213

অধ্যাপক মাওলানা ড. আফম খালিদ হোসেন। ইসলামের ইতিহাসের সাবেক অধ্যাপক, চট্টগ্রাম ওমরগণি কলেজ। গবেষক লেখক ও অনুবাদক। সম্পাদক, মাসিক আততাওহীদ। দেশবিখ্যাত ইসলাম বিষয়ক আলোচক। ইসলামি সংস্কৃতি, রাষ্ট্রদর্শন ও মুসলিম দেশে দেশে বিরাজমান সংকট-সম্ভাবনার বিশ্লেষক। উম্মাহ-পরিস্থিতির নানা রূপ নিয়ে সুধীসমাবেশ ও গণমাধ্যমে নিয়মিত তার পর্যবেক্ষণ পেশ করেন। জোরালো ভাষায় বলেন উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির কথা। ইসলাম টাইমস বছরপূর্তি আয়োজনে তার সঙ্গে কথা বলেছেন আবু দারদা

ইসলাম টাইমস: ইসলাম বিরোধী আক্রমণকারী ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে মুসলমানরা কীভাবে ঐক্যবদ্ধ থাকতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

 .খালিদ হোসেন: ইসলামের যে বৈরী শক্তি তা ইসলামের প্রাথমিক জমানা থেকে শুরু করে আমাদের জমানা পর্যন্ত সক্রিয়। বিশেষ করে ইহুদি চক্র, কুফফার ও মুশরিকীনদের একটা গ্রুপ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয়। আমি মনে করি আমাদের ছোট ছোট মতভেদ, শাখাগত ইখতিলাফ, আমাদের মধ্যে মতের ভিন্নতা আছে এবং থাকবে, এগুলোকে আপন আপন জায়গায় রেখে ইসলাম ও মুসলমানদের পিছনে বৈরী শক্তির যে চক্রান্ত হচ্ছে এর বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে হবে৷ বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য খুঁজে নিতে হবে৷ ইখতিলাফ আমাদের থাকবে। ঝালকাঠির নেছারাবাদী সাহেব একটা কথা বলতেন, التحاد مع الاختلاف  তথা ‘মতভিন্নতা সত্ত্বেও আমাদের ঐক্যবদ্ধ’ হয়ে থাকতে হবে।

এক্ষেত্রে আমরা একটু পিছনের দিকে তাকালে দেখি ৪৭ সনে পাকিস্তান রাষ্ট্র হওয়ার পর পাকিস্তানের যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলো তারা ইসলামী আইন কার্যকর করণের ক্ষেত্রে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গড়িমসি করতে লাগলো৷ তখন কায়েদে আযম, লিয়াকত আলী খানসহ সরকারের লিডারদের সাথে আলেমরা যোগাযোগ করতে লাগলেন।

আলেমরা ক্ষমতাসীন লিডারদের বললেন, ইসলামী সিস্টেম চালু করেন৷ তখন তারা আলেমদের উদ্দেশে বললো, আপনাদের ইসলামের ভেতরেও তো ইখতিলাফ। আপনারা হানাফীরা, দেওবন্দীরা আহলে হাদীসদের পিছনে নামাজ পড়েন না৷ বেরলভীরা দেওবন্দীদের পিছনে নামাজ পড়ে না। আপনাদের ভেতরে তো ইসলাম নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপিং। তখন শীর্ষ আলেমরা চিন্তা করলেন, বৃহত্তর স্বার্থে আমাদের ইখতিলাফ সত্ত্বেও ইসলামপন্থী দলগুলোকে এক করা দরকার৷ আলহামদুলিল্লাহ তারা খুব কামিয়াব হলেন। ওলামাদের ২২ দফা প্রণিত হলো। এটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মূল ইসলামি প্রেক্ষিত হিসেবে সাব্যস্ত হলো। কেবলমাত্র ফেকাহের ক্ষেত্রে মতভেদ থাকবে। হানাফী ফেকাহ মানবেন দেওবন্দী ও বেরলভীরা৷ আহলে হাদীসরা তাদের ধারা অনুযায়ী আমল করবেন। শিয়ারা ফেকহে জাফরী মেনে চলবেন। সেখানে দেওবন্দী, আহলে হাদীস, জামায়াতে ইসলামী, বেরলভীসহ সবাই স্বাক্ষর করেছেনে। এরকম ঘটনা আরও বহু রয়েছে। কিছুদিন আগে দেওবন্দেও সমস্ত ফেরকার লোকদের নিয়ে একটা ইজতেমা হয়েছে৷ আমাদেরও এরকম বৃহত্তর স্বার্থে ইসলামের দুশমনদের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে যেতে হবে৷ ঐক্যের এই প্রয়াসটা অতীতের ইতিহাস থেকে সবক হিসেবে গ্রহণ করতে পারি৷

ইসলাম টাইমস: আমরা দেখছি, সারা দুনিয়ার মুসলমানদের বিভিন্ন ফেরকা বা গ্রুপের মধ্যে একটা মারমুখি মনোভাব, এই মারমুখি মনোভাব দূর করে মানসিকভাবে ঐক্য কিংবা সহনশীলতা কীভাবে স্থাপন করা যায়?  আপনার পরামর্শ কী?

.খালিদ হোসেন: এসব বিরোধের ক্ষেত্রে অনেক সময় আমাদের দলীয় স্বার্থ কাজ করে। ফেরকাওয়ারিয়্যাতের স্বার্থ কাজ করে৷ আপনি দেখবেন, পাকিস্তান অথবা হিন্দুস্তানে কোনো মৌলবী সাহেব যদি বয়ান বা ওয়াজে বিপরীত মতের কাউকে গালি দিতে পারে কিংবা বিরোধী মনোভাবের কাওকে যদি ঝাঁঝালো ভাষায় কিছু বলতে পারে তাহলে ওই এলাকায় তার মাহফিল বা কর্মযোগ  নিশ্চিত, তো এই মারমুখি মনোভাব পরিহার করা দরকার৷ আমি এখানে মাওলানা তারিক জামিল সাহেবের কথা বলতে পারি। তিনি সারাজীবন দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করেছেন৷ কদিন আগে আমি তার একটা ইন্টারভিউ শুনেছি। তিনি ইউকে-তে ইন্টারভিউটা দিয়েছেন৷ ইন্টারভিউয়ে তিনি বলেছেন, ‘মুসলমান মুসলমানে গ্রুপিং করে যে রক্ত আজ ঝরছে, তাতে আমার দিল চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। আমাদের ভেতর যে ইখতিলাফ আছে, তা আমরা ভেতরে চেপে রাখি। উম্মাহর ঐক্যের জন্য আমরা কি কদম বাড়াডে পারি না!’ এরকম দাওয়াত যদি দশটা জায়গা থেকে আসে তাহলে আর মারমুখি মনোভাব থাকবে না৷ মানুষ মনে করবে উনার সাথে আমার ইখতিলাফ আছে ঠিক, তারপরও তো আমরা মুসলমান।

ইসলাম টাইমস: এজাতীয় দূরত্ব ও বিরোধেরে কি সুদূরপ্রসারী কোনো ক্ষতি আছে?

. খালিদ হেসেন: আপনি দেখুন, পাকিস্তানের শিয়ারা যেসমস্ত আলেমদের মেরে ফেলেছে এই মানের আলেম এখন কমে গেছেন, মাওলানা হক নওয়াজ জংগভী, মাওলানা হাবীবুল্লাহ মুখতার, মুফতি শামজী, মুফতী সামিউল হক। কিছুদিন আগেও মুফতি তকী উসমানী সাহেবকে মেরে ফেলতে চেয়েছে। এটা যারা করতে চেয়েছে বা যারা মেরেছে তারা কেউ কিন্তু অমুসলিম নয়। তাদেরকে মেরেছে নামধারী মুসলমানরাই। আবার অপরদিক দিয়ে দেখা যায়, শিয়াদেরকেও মেরে ফেলা হচ্ছে। গায়রে মুকাল্লিদ আগ্রাসী মনোভাব নিয়ে আছে মুকাল্লিদদের বিরুদ্ধে। একটা অবাক হওয়ার বিষয় হচ্ছে, দেওবন্দী জামাতের তরীকা এটা একটা হক তরীকা। সাহাবায়ে কেরামের নমুনার উপরে তারা দাওয়াত তাবলীগ, তালীম তাযকিয়া করে আসছে। ব্যক্তি বিশেষে দোষত্রুটি থাকতে পারে মানুষ হিসেবে। এই দেওবন্দের মোবারক জামাতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের আহলে হাদীসরা বিশাল একটা বই লিখেছে ‘আদ্দেওবন্দিয়া আগরাজুহা ওয়া আদাবুহা’। এই কিতাবে আহলে হাদীস আলেমরা দেওবন্দীদের ‘খোরাফাতের সাথে যুক্ত, মুনকারাতের সাথে যুক্ত’ এটা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে৷ এই দেওবন্দীদের বিরুদ্ধে আহমাদ রেজা খান বেরলভি যে ‘ফতোয়ায়ে রেজভিয়্যাহ’ প্রণয়ন করেছে সেখানে পুরা কুফুরীর সাথে যুক্ত করেছে-তাকফিরী কথাবার্তা বলেছে। সে বলেছে, তাদের সাথে বিয়ে করা, মৃত্যুর পর জানাযা পড়া, জিয়ারত করা হারাম৷

এই যে কঠোর মনোভাবের পথ তা থেকে দূরে সরে আসতে হবে। মানুষকে ভালোবাসতে হবে এবং ইখতেলাফ থাকা সত্ত্বেও আমরা একে অপরের সাথে যদি ভালো ব্যবহার করি তাহলে মিল মুহাব্বত থাকবে, বিরোধিতা চরম আকার ধারণ করবে না৷ মিল হতে না পারলে যে যার লাইনে চলুক, কিন্তু মূল ইসলামের বিরুদ্ধে, রাসূলের বিরুদ্ধে, নসসে শরয়ীর বিরুদ্ধে যদি কোনোরকমের বাঁধা আসে তাহলে আমাদের সবাইকে সবাই একমত হয়ে যেতে হবে।

যদি উম্মাহর ভেতরকার ইখতিলাফের পরিধি বিস্তৃত হতে থাকে তাহলে ইসলামের উপর আঘাত আসলে কেউ এগিয়ে আসবে না। এখন এক গ্রুপ আরেক গ্রুপকে সহ্য করতে পারছে না। বই লিখছে, মুনাযারা করছে৷ আমরা খুব সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছি৷ আমাদের এই মূহূর্তে প্রয়োজন উম্মাহর ঐক্য। যে বিষয় নিয়ে মুফতী শফী রহ. ‘ওয়াহদাতে উম্মাত’ নামে একটা কিতাব লিখেছেন। আমার পরিচয় আমি মুসলমান। আমার পরিচয় আমি উম্মাতে মুহাম্মাদীর সদস্য৷ এটাই আমার প্রথম পরিচয়৷ তারপর আমার ফিকহী নজরিয়্যাহ, সিয়াসী নজরিয়্যাহ। আমি হানাফী মাজহাব মানবো। কেউ শাফেয়ী মানবে। কেউ হাম্বলী মানবে। কেউ মালেকী মাজহাব মানবে৷ যে যার লাইনে মানুক অন্য কাউকে৷ কিন্তু আমাদের মাঝে চিন্তার ঐক্য, অবস্থানের সহনশীলতা অনেক বেশি জরুরি৷

আমি বারবার একথা বলতে চাচ্ছি, আমরা এতটা সঙ্কীর্ণ হয়ে গেছি যে, নিজেদের দল, মত, গণ্ডি, মাসলাক ও মাশরাফের বাইরের দলগুলোকে আমরা খুব খারাপ নজরে দেখি৷ এটা তো ভালো কথা নয়৷ আমাদের নজরকে প্রশস্ত করতে হবে। উম্মত নিয়ে ফিকির করতে হবে। আমি এ-কথাও মনে করি, আফ্রিকার কোণায় যদি কোনো কালো মানুষ, হতে পারে তার আখলাকী কিছু দোষ আছে, হতে পারে তার দাঁড়ি কিছুটা ছোট, হতে পারে তিনি জুব্বা গায়ে দেন না, তিনি ওই এলাকার পোশাক গায়ে দেন, তারপরও উনার দ্বারা যদি উম্মাহ, ইসলাম ও মুসলমানের ফায়দা হয় তার কলমে-যবানে আমি তাকে মোবারকবাদ দিতে প্রস্তুত। হতে পারে তিনি আরেক পীরের মুরীদ। হতে পারে আরেক মাদরাসার ফারেগ৷ হতে পারে তিনি মাদরাসায় পড়েন নাই, কিন্তু ইসলামের বুলন্দির জন্য তিনি ওই এলাকায় কাজ করছেন, আমরা তাকে মোবারকবাদ দিতে পারি৷

ইসলাম টাইমস: কোনো কোনো অমুসলিমকেও অনেকসময় দেখা যায়, মুসলমানদের প্রতি ন্যায়ানুগ কথা বলতে, সহানুভূতি প্রকাশ করতে, সেক্ষেত্রে আমাদের আচরণ কেমন হবে?

. খালিদ হোসেন: কোনো মু’তাদিল মেজাজের অমুসলিম- হিন্দু, খ্রিস্টান ও শিখ যিনি তার ধর্ম পালন করেন, কিন্তু তিনি মানবিক নীতিমালা, ইসলামের বিধিমালা ও সৌন্দর্য্যকে পছন্দ করেন, আমি তাকে তার জায়গায় রেখেই তার প্রতি অভিনন্দন জানাতে চাই। অনলাইনে আমি এক খ্রিস্টানকে বলতে শুনলাম, দুনিয়ার বুকে যতো সন্ত্রাসী কাজ হয়েছে, মুসলামনের তুলনায় ইহুদিরা করেছে বেশি। যে লোকটা এই কথা বলেছে আমি তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই৷ কদিন আগে ব্রিটেনের পার্লামেন্টে ব্রিটেন প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বোরকাপরিহিতা মহিলাদেরকে পোস্টবক্স বলে মন্তব্য করেছে। মুসলমান মেয়েরা শুধু চোখ দুটো খোলা রাখে সেজন্যই ছিল তার পোস্টবক্স বলে মন্তব্য। তার মন্তব্যের বিপরীতে একজন শিখ এমপি জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন, আপনি আমার এপিয়ারেন্সের উপরে মন্তব্য করতে পারেন না। আমি কি গায়ে দিবো, আমার কি পোশাক, তার উপর আপনি কথা বলতে পারেন না।’ আমি তার বক্তব্য শুনে অবাক হয়েছি। তো, এরকম বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভেতরেও উদার প্রকৃতির মানুষ রয়েছে যারা ইসলামের পর্দা, মানবাধিকার এবং রাসূল সা.-এর জীবনের নানান অনুষঙ্গ পছন্দ করেন। এসব লোকদের বক্তব্যকেও আমরা সাধুবাদের সাথে গ্রহণ করতে চাই। তাদের সাথে আমাদের সৌজন্য- সম্পর্ক গড়ে তোলায় ক্ষতি নেই।

ইসলাম এমন একটা ধর্ম যা দেড় হাজার বছর ধরে এই সমাজে, এই পৃথিবীতে টিকে আছে, যেখানে সবাই এক ধর্মের নয়৷ নানান ধর্মের বসবাস এমন নাজুক পরিস্থিতিতে ইসলাম টিকে আছে৷ ইউরোপ, ইটালী আফ্রিকায় সব অন্য জাতি, তাদের মাঝেও সামান্য কজন মুসলমান টিকে আছে। এটা হচ্ছে ইসলামের উদার মানসিকতার কারণে, সহনশীলতার কারণে। সব মানুষের সাথে মিলেমিশে থাকাই ইসলামের উদারতা। ইসলামের মুল নীতিমালার উপর অটুট থেকেই আমরা এটা করতে পারি। অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুকরণ ও সাদৃশ্য বর্জন করেই আমরা এটা করতে পারি। রাসূলের হাদীস আছে, প্রতিবেশির সাথে ভালো ব্যবহার করা৷ প্রতিবেশি মুসলমান হলে ভালো, অমুসলমান হলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করা৷ এই উদারতা এখন আমাদের মাঝে নেহায়েত কম৷ আমরা নিজেদের ভেতরে সঙ্কুচিত হয়ে গেছি। দুনিয়া যে অনেক বড় তা আমরা ভুলে গেছি। আপনি যে প্রশ্নগুলো করছেন তা অত্যন্ত যৌক্তিক, সময়োপযোগী এবং এই মুহূর্তে তা সময়ের দাবি।

ইসলাম টাইমস: উম্মাহর এই সংকটকালে মাঝে মাঝেই নানারকম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয় কোনো কোনো মহল থেকে। এসব ক্ষেত্রে করনীয় কী হতে পারে?

. খালিদ হোসেন: একটা ঘটনা বলি আপনাকে, হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেছেন, আমি বহুদিন ধরে আরব দেশের নতুন কিতাব বের হলে সংগ্রহ করে পড়ি। কোনো ম্যাগাজিন বের হলে সংগ্রহ করে পড়ি। সাইয়্যেদ কুতুব রহ.-এর সাথে যখন আমার দেখা হলো। আমি তাকে বললাম, আমি তো আপনার সমস্ত লেখার পাঠক৷ এবং “ফি যিলালিল কুরআনে” আপনি যে তফসির করেছেন অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে। তবে দুই চারটা জায়গায় জমহুর ওলামার খেলাফ হয়েছে। তিনি এটা শুনে বললেন, আপনি আমার ঠিকানা নিন, এবং আমার ভুলগুলো চিহ্নিত করে দিন আমি সংশোধন করে নিবো, ইনশাআল্লাহ। তো, আমরা যদি দিলের দরদ দিয়ে ইসলাহ করতে চাই তা অবশ্যই ঠিক হবে। অপরদিক থেকেও এ সংশোধনী গ্রহণ করতে হবে। হটকারিতা কোনো সমাধান নিয়ে আসে না। উম্মাহর মাঝে কারো ভুলত্রুটি থাকলে আমরা তাদের সংশোধন করার চেষ্টা করবো। বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলেমরা কাজ করবেন এ বিষয়গুলি নিয়ে, সবাই কথা বলবো না। উম্মাহর মাঝে যেন ইখতেলাফ না বাড়ে৷ সব বিষয়ে আমাদের সবার মন্তব্য করতে হবে এমন নয়৷ আমি মনে করি, এটাই আমাদের উম্মাহের মাঝে ইত্তেহাদ ও উলফত বৃদ্ধি করার একটা মাধ্যম।

ইসলাম টাইমস: আধুনিক শিক্ষিতদের মাঝে ইসলামের প্রচার কীভাবে হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

.খালিদ হোসেন:  আমাদের দেশে এবং দেশের বাইরে মাদরাসায় পড়ে এমন ছাত্রের সংখ্যা তুলনামূলক কম৷ তবে, যারা মাদরাসায় পড়ে আলেম হচ্ছেন, ফাজেল হচ্ছেন, হাফেজ হচ্ছেন এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রের সংখ্যাই বেশি। এদের মধ্যে যারা মুসলমান তাদের পরিকল্পিতভাবে দাওয়াত দিতে হবে। কোনো কোনো বুজুর্গানে দ্বীনের সান্নিধ্যে নিয়ে যেতে পারি৷ দাওয়াত ও তাবলীগের যে মেহনত আছে, সেখানে নিয়ে যেতে পারি। অথবা বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে পরিকল্পিতভাবে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমরা পার্সোনাল একটা সম্পর্ক করেও দ্বীনের দিকে দাওয়াত দিতে পারি। আমি মনে করি হকপন্থী যারাই ইসলামের জন্য কাজ করে যাচ্ছে, সংগঠন করছে তাদের সবাইকে সহযোগিতা করা দরকার৷ তাহলে কুফর-শিরক, বিদআত-খোরাফাত কমে সত্যিকারের ইসলামের কথাগুলো স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবো।

আজকে আমরা যেসব ছাত্রদের দাওয়াত দিবো দ্বীনের দিকে ডাকবো কয়েকবছর পর দেখা যাবে, সে পূর্ণ ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়ে অন্যকে দ্বীনের পথে ডাকবে৷  নানান কৌশলের মাধ্যমে তাদের সাথে মিশে যদি ইসলামের বীজ রোপন করে দিতে পারি তাহলে দেখা যাবে নব প্রজন্মের ভেতরে ইসলামি চেতনার বীজ প্রবিষ্ট করে দিতে পারবো।

ইসলাম টাইমস: তরুণদের মধ্যে অনলাইন-অফলাইনে যারা দাওয়াতী মেজাজ নিয়ে লেখালেখি করেন তাদের উদ্দেশে বিশেষ কোনো পরামর্শ দেবেন?

. খালিদ হোসেন: আমি মনে করি ফেইসবুক, টুইটার ও ইনস্টাগ্রামসহ ইন্টারনেটের প্রতিটি সেক্টর দাওয়াত, তাবলীগ ও তালীমের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আপনি যদি ইসলামের কোনো একটা কথা, ইসলামের বৈরী শক্তির দুশমনদের কোনো কথার জবাব অথবা ইতিবাচক কোনো কথা অডিও-ভিডিও বা লিখে স্ট্যাটাস দেন তাহলে মুহূর্তেই তা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে৷ তরুণ দায়ীদের সোশ্যাল মিডিয়াকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো দরকার বলে মনে করি৷ তবে অনেক সময় আমরা বিপরীত চিত্র দেখি৷ সেটা হচ্ছে পারস্পরিক ঝগড়ার কথা আমরা ফেইসবুকে লিখি৷ তখন ফেইসবুক হয়ে যায় ঝগড়া-বিবাদের জীবন্ত প্লাটফর্ম। এটা দুঃখজনক৷ আমাদের মাঝে বিভেদ থাকলে ইনবক্সে করতে পারি৷ কিন্তু প্রকাশ্যে ফেইসবুকে দিয়ে দাওয়াত, তাবলীগ ও তাযকিয়ার পথকে বিপন্ন করে দেওয়া ঠিক না। এজন্য আমার পরামর্শ হচ্ছে, ডিজিটাল পদ্ধতিগুলো দাওয়াতের কাজে ব্যবহার করতে পারি। ইতিবাচক পরামর্শের জন্য ব্যবহার করতে পারি৷ পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা এজাতীয় কোন কথা আমরা ফেইসবুকের উন্মুক্ত প্লাটফর্মে উল্লেখ না করি৷ আমরা নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে কথা বলবো। কথা বলার সময় হুঁশিয়ারির সাথে বলবো। দাওয়াত, তাবলীগ ও তালীমের বাইরে আজেবাজে মন্তব্য করবো না৷ এক্ষেত্রে আমাদের সংযত আচরণ কাম্য। #