মাওলানা আনোয়ার শাহ : জীবনের দিনলিপি

964

আবদুল্লাহ আশরাফ ।।

নরসুন্দা নদীর কূলঘেঁষে সুবিশাল এক শহর গড়ে ওঠে। তার বুকে দাঁড়িয়ে আছে, শহিদি মসজিদ। একটি ইতিহাস! একটি ঐতিহ্য! সে মসজিদ ঘিরে আল্লামা আতহার আলী রহ.-এর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জামিয়া, দ্বীনী বিদ্যাপীঠ আল জামিয়াতুল ইমদাদিয়া, কিশোরগঞ্জ। ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানটি যুগ যুগ ধরে তাঁর সুনাম-সুখ্যাতি ছড়িয়ে আসছে। দিন যতোই যায় তার গুণ-মান যেন বেড়ে চলছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হচ্ছে, একজন দক্ষ ও ব্যক্তিত্ববান পরিচালকের হাতে। সে মহান ব্যক্তিটি হচ্ছেন এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় দল নেজামী ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা হজরত মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর সুযোগ্য সন্তান আযহার আলী আনোয়ার শাহ (হাফিযাহুল্লাহ)। শাইখুল হাদিস ও প্রখ্যাত তাফসিরবিশারদ তিনি।

দেশের অন্যতম অভিভাবক এই আলেমেদ্বীনের বয়স সত্তর পেরিয়েছে দু’বছর আগেই। স্পর্শ করেছে বার্ধক্য ও অসুস্থতা। কিন্তু দ্বীন, ইলম ও দ্বীনী সমাজের খেদমতে তাঁর যেন কোনো বিশ্রাম নেই। দরস, মাদরাসা পরিচালনা, মজলিস, মাহফিল, মিটিং- প্রোগ্রাম তাঁকে ঘিরে রাখে প্রায় সবটা সময়জুড়ে। কীভাবে কাটে তাঁর সময়? কীভাবে যায় মাস-বছর, এ লেখায় তারই একটি চিত্র দেখার চেষ্টা করব আমরা।

উল্লেখ্য যে, গত শুক্রবার শহিদী মসজিদে জুমআর নামাযের পর খাদ্যনালীতে সামান্য পীড়া অনুভূত হওয়ায় পারিবারিক উদ্যোগে চিকিৎসার জন্য কিছুদিনের মধ্যে ব্যাংকক যাওয়ার কথা জানিয়ে মুসল্লিদের দোয়া চান হযরত আনোয়ার শাহ সাহেব। সে প্রেক্ষিতে হযরতের অনেক শুভাখাঙ্খী তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি শেয়ার করেন। এ ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে অনেকেই ফোনে হযরতের স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে শুরু করেন।

আজ (৭ অক্টোবর) সোমবার ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে হযরতের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অসুস্থতা তেমন গুরতর কিছূ নয়। বার্ধক্যজনিত রোগ এবং খাদ্যনালী সামান্য ফুলে গেছে। আলহামদুলিল্লাহ, অত উদ্বেগের কিছু নেই।

দুই.

শারীরিক দুর্বলতার পরেও জীবন চলে রুটিন মাফিক। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে এক সময় বাসার পাশে নূর মসজিদে ছুটে যেতেন। নরসুন্দা নদীর কূল ঘেঁষে মসজিদটি অবস্থিত। সকালে সুমিষ্টি বাতাস উপভোগ করে ফজর পড়তেন। এখন আর সে সুযোগটা হয় না। তাঁর বাড়ির ভেতরেই একটা পাঞ্জেগানা তৈরি করে নিয়েছেন। বাসায় অবস্থান করার সময় এখানে জামাতের সাথে সালাত আদায় করেন। ভোরে এক কাপ চা পান করে কিছুক্ষণ আরাম করেন। সকালের নাস্তা সেরে ছুটে যান প্রাণের প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়ায়।

জামিআ ইমদাদিয়া

তিনি মাদরাসা প্রাঙ্গনে পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে পুরো মাদরাসায় একটা অঘোষিত নীরবতা ছেয়ে যায়। এরপর বসে পড়েন তার কার্যালয়ে নিয়মিত দায়িত্ব আঞ্জামে। কখনো অফিসের সামনে চেয়ারটিতে বসে থাকেন। কখনো ঘুরে ঘুরে মাদরাসার প্রতিটি অফিস ও শ্রেণিকক্ষ পরিদর্শন করেন। সমবয়সী শিক্ষকরা তাঁর কাছে গেলে বসে গল্প করেন। লেখাপড়ার হালহাকিত জেনে নেন। দরকারি বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দেন। নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হন দরসে হাদিসে। তিনি উস্তাজুল আসাতিজা। হাদিসের দরসে বসলে মনে হয় ইলমের ঝর্নাধারা চলছে। প্রজ্ঞা ও বাগ্মিতায় চমৎকার, হৃদয়ঙ্গম করার মতো আলোচনার পসরা তুলে ধরেন।

কোনো প্রোগ্রাম না থাকলে বিকেলটা তিনি কাটান মাদরাসা ক্যাম্পাসে। ছুটি পেয়ে হিফজের ছোট ছোট বাচ্চারা তাঁর পাশে ভীড় করে। তিনি বাচ্চাদের সাথে গল্প করেন, তাদের তেলাওয়াত শুনেন, ভুল হলে শুধরে দেন। কখনো নিজের জীবনের গল্প শোনান। হাফেজ ছাত্ররা তাঁর সাথে সময় কাটাতে বেশ আনন্দ পায়। আর শিশুরাও যেন তাঁর প্রাণ। সবাই একদিকে, আর শিশুরা অন্যদিকে। অথচ এ সাধাসিধে মানুষটা কতো গুরুগম্ভীর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। দূর থেকে তাঁকে দেখে অনেকে ভড়কে যায়। কিন্তু কাছে এসে কথা শুনলে মুগ্ধ হয়ে ফিরতে হয়। তিনি কখনো প্রাণবন্ত মানুষ, কখনো বা দায়িত্বপ্রাণ, কখনো গুরুগম্ভীর। অনন্য যোগ্যতাসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব। বহু গুণের বাহক।

তিন.

ওয়াজ-নসিহতের ময়দানেও ব্যস্তপ্রাণ এক মণীষী। এক সময় ছুটে বেড়িয়েছেন এক শহর থেকে অন্য শহরে। অসুস্থ না হলে এখনও কাউকে ফিরিয়ে দেন না। মানুষের মাঝে হেদায়াতের আলো ছড়াতে সর্বদা তৎপর তিনি। তাঁর সুমিষ্ট তেলাওয়াত ও শুদ্ধ প্রমিত ভাষার আলোচনা উপস্থিত মানুষেরা বিমোহিত হয়ে শুনেন। কিশোরগঞ্জ ও আশপাশের বহু দ্বীনী মাহফিলের সভাপতিত্বের আসনটিতে তাঁকেই বসতে হয়। কাছের-দূরের বহু মাহফিলে প্রধান মেহমান হিসেবে দরদী সুরে নসিহত করেন তিনি। কিশোরগঞ্জ, বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও আশপাশের কয়েকটি জেলায় আলেম সমাজের নিজস্ব ফোরামগুলোতে তিনিই সমাধানের বাক্যটি উচ্চারণ করেন।

দুপুর সাড়ে বারোটায় মাদরাসার কাজ শেষ করে বাসায় ফিরে জোহরের প্রস্তুতি নেন। গাড়ি থাকলেও তিনি শহরের ভেতর রিকশায় চলাচল করতে বেশি পছন্দ করেন। কখনো রিকশা দাঁড় করিয়ে মানুষের কথা শুনেন। সমস্ত ব্যস্ততার ফাঁকে কখনো ছুটে যান তাবলিগি মারকাজে। মশওয়ারা শুনেন, বয়ান করেন। দ্বীনি দাওয়াতের ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। সময়ের উপযোগী পদক্ষেপ নিতে কখনো পিছপা হন না।

চার.

শুক্রবার দিনের রুটিনটা আবার আরেক রকম। ঐতিহাসিক শহীদি মসজিদের খতিব তিনি। অনেক দূর থেকে ছুটে আসে মানুষ শহীদি মসজিদে। তাঁর পেছনে দুরাকাত জুমার সালাত আদায় করতে। মুখনিঃসৃত যাদুকরী বয়ান ও সুমিষ্ট কুরআন তেলাওয়াতের মাধুর্য উপভোগ করতে। অপরিচিত কেউ এসে তাঁর তেলাওয়াত শুনে মুগ্ধ হয়নি, এমন মানুষ পাওয়া খুব দুস্কর।

শহিদী মসজিদ

কথার উচ্চারণশক্তি যেমন সুন্দর, তেমনি বক্তব্য হয়ে থাকে বিষয় ও পরিস্থিতির জন্য দিক নির্দেশনামূলক। স্পষ্টতা, সাহস আর কল্যাণকামিতার স্বরে ভরে উঠে মসজিদ-আঙিনা, মানুষের হৃদয়। মানুষকে তন্ময় হয়ে শুনে তাঁর কথা। এ যেন কিংবদন্তি আলেম আতহার আলী রহ.-এর অবশিষ্ট কথার বলিষ্ঠ ঘোষক। তাঁরই যোগ্য  এক আদর্শিক উত্তরসূরি।

শহিদের রক্তছোঁয়ায় গড়ে ওঠা শহিদি মসজিদের সঙ্গে লাগোয়া দ্বিতীয় তলায় ঊনিশশো সাতচল্লিশের দুশরা জানুয়ারির বৃস্পতিবার সকাল দশটায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা পাঁচ ভাই, তিন বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি প্রথম। আতহার আলী রহ.- প্রথম পুত্র সন্তান পেয়ে পুলকিত হন। পুলকিত নূরের এক ঝলক বাগে আতহারের দরদি এই মালীর গায়েও পড়ে। তারই প্রকাশ সন্তানের সাজানো-গুছানো সব কাজকর্মে। জামিয়ার সুষ্ঠু পরিচালনা, এর বিশাল ইমারত আর সুন্দর অবকাঠামো এ যেন হজরত মাওলানা আতহার আলীরই প্রতিচ্ছায়া।

পাঁচ.

কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডের (বেফাক) তিনি সিনিয়র সহ-সভাপতি, নীতি নির্ধারণী ব্যক্ত্বি। জাতীয় পরিসরে দ্বীন কেন্দ্রিক আলেম সমাজের কাজ ও মজমার তিনি মধ্যমণি।কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক দলীয় রাজনীতির সঙ্গে তাঁর বিশেষ সংযোগ নেই।বাবা আতহার আলী রহ. রাজনীতির পুরোধা থাকালেও তিনি কখনো রাজনৈতিক তৎপরতায় জড়াতে পছন্দ করেননি। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করি না কেন এর পেছনে একটা বড় কারণ রয়েছে, আপনারা জানেন, বাবা ছিলেন উপমহাদেশের ইসলামী রাজনীতির পুরোধা এবং এদেশের আলেমদেরকে রাজনীতির ময়দানে তিনিই নামিয়েছেন। তিনি তার তিক্ত অভিজ্ঞতার  আলোকে এবং দুটি বিশেষ কারণে আমাকে রাজনীতি করতে নিষেধ করেছেন।’

তিনি যোগ করেন, ‘রাজনীতিতে না জড়ানোর দুটি কারণের একটি হলো, আমাদের এসময়ের রাজনীতিবিদদের মাঝে সেই ইখলাস বা একনিষ্ঠতা নেই। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, এ ধরনের রাজনীতিতে নিজের লোকেরাই অনেক সময় গাদ্দারি করে থাকে। তাই তিনি (আব্বা) আমাকে রাজনীতি করতে নিষেধ করেছেন।’

তবে ইসলামের জন্য সংগ্রামী অবস্থানের প্রয়োজন সামনে এলে তিনি দায়িত্ব নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ান। মোটেও পিছপা হন না। উত্তাপমুখর বহু সময়েই এটা তিনি প্রমাণ করেছেন।তিনি বলেন, ‘দলীয় রাজনীতির সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও শরয়ী আন্দাজে যখন যা বলা ও করা দরকার, তা আমি শহীদি মসজিদের খুতবা এবং প্রয়োজনে রাস্তায় নেমে মিছিল-মিটিংসহ দরকারি ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়ে থাকি। আমি এ কাজগুলো দলীয় ব্যানার থেকে বলতে চাই না।’

প্রখর ব্যক্তিত্বসচেতন এই রাহবার আলেমেদ্বীন দেশ, জাতি ও উম্মাহর ক্রান্তিকালে বয়ান ও খুতবার মাধ্যমে অমূল্য দিক-নির্দেশনা প্রদান করে থাকেন। ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ওপর যে কোনো আঘাতের প্রতিবাদে সবার আগে গর্জে ওঠেন তিনি। ভারতের বাবরি মসজিদ ভাঙা, আফগানিস্তানে মার্কিন হামলা, কাশ্মির, ইরাক, বসনিয়া, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও উইঘুর ও রোহিঙ্গা মজলুম মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়ে মিছিল-মিটিং ও প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন তিনি।  জেলা শহর থেকে আওয়াজ উঁচু করেছেন বারবার। এছাড়াও দেশয়ি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক নানান সংকট-সমস্যার রাহনুমায়ি বয়ান, বিবৃতি ও সাক্ষাৎকার দিয়ে যাচ্ছেন। কিশোরগঞ্জের ইমাম-ওলামা পরিষদ নামে একটি সংগঠনের সম্মানিত সভাপতি তিনি। ইমামদের মাধ্যমে সমাজের মানুষদের নানা সমস্যা সম্পর্কে সতর্ক করার চেষ্টা করেন।

সম্প্রতি উদ্ভূত তাবলিগি সংকট ও তৈরিকৃত সমস্যার বিরুদ্ধে প্রবল নেতৃত্ব এবং সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন শুরু থেকেই।

ছয়.

কওমি মাদরাসার সনদের স্বীকৃতির ব্যাপারে নানা সময়ে জোরালো আওয়াজ তুলেছেন তিনি। কদিন আগে হাইয়াতুল উলইয়ার প্রশ্নফাঁসের সংকটময় সময়ে তিনি কেন্দ্রীয় এ পরীক্ষাটাকে সবরকম প্রশ্নের উর্ধ্বে রাখতে কয়েকটা প্রস্তাব রেখেছিলেন,  ক.  প্রতিটি জেলার শুধু একটি কেন্দ্রে পরীক্ষার আয়োজন করা। খ.  মহিলা পরীক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও পরীক্ষা কেন্দ্র সীমিত করে ফেলা। গ.  নেগরানদের (পরীক্ষা পরিদর্শক) তালিকা ঢেলে সাজানো। মুত্তাকি ও খোদাভীরু লোক দেখে হলের দায়িত্ব অর্পণ করা।  ঘ.  প্রশ্ন তৈরি করবেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাওলানা ইসমাঈল বরিশালী এবং তা সংশোধন করবেন আল্লামা আশরাফ আলী। এর বাইরে আর কেউ প্রশ্ন দেখবেন না- এ বিষয়টি নিশ্চিত করা।  ঙ. পুরো বাংলাদেশকে কয়েকটি জোনে বিভক্ত করা এবং পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা পূর্বে সে জোনগুলোতে ই-মেইলের মাধ্যমে  প্রশ্নপত্র পাঠানো এবং সেখান থেকে প্রিন্ট দিয়ে প্রশ্নপত্র বিলি করা।

এ প্রস্তাবগুলো বোর্ড কর্তৃপক্ষ প্রথমে গ্রহণ না করলেও পরবর্তীতে তা পালন করে সুফল পায়। এমন কি শোনা যায়, তিনি প্রথম বেফাকের(কওমি মাদরাসা বোর্ড) পক্ষ থেকে একটি দৈনিক পত্রিকার প্রস্তাবও করেছিলেন। যা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

বেফাক ছাড়াও বৃহত্তর ময়মনসিংহের ‘তানযিমুল মাদারিসিল কওমিয়া’ নামে একটি আঞ্চলিক বোর্ডও তিনি পরিচালনা করছেন।

কওমি মাদরাসার সিলেবাসের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি বিভিন্ন সময় সংস্কারের কথা বলেছি। আমাদের নেসাবের মধ্যে আধুনিক কিছু বইপত্র পাঠ্যভুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু বোর্ডের কিছু দায়িত্বশীলদের ভিন্নমতের জন্য এতে সফল হতে পারছি না। আমার চিন্তা হলো, কিছু সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়োজন আছে। আমাদের মৌলিক কিতাবাদি ঠিক রেখে বাকিগুলোতে কিছুটা তারমিম (সংস্কার) করা যেতে পারে। আর এটা করতে পারলে আমাদের মঙ্গল বৈ অমঙ্গল হবে না।

সাত.

বহুমুখি ব্যস্ততা এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক অভিভাবকত্বের জোয়াল কাঁধে থাকা সত্ত্বেও তাসাওউফ বা আত্মশুদ্ধির জগত থেকে তিনি পেছনে সরে থাকেননি। জামিয়া ইমদাদিয়ার ভেতরেই অবস্থিত খানকাহে আতহারিয়ায় প্রতি বুধবার তিনি  ইসলাহি বয়ান পেশ করে থাকেন। তাসাওউফ ও সুলুকের ধারায় পাঁচজন বুজুর্গের খেলাফত লাভ করেছেন তিনি।

 পাঁচ বুযুর্গ হলেন- ক.  হাকিমুল উম্মত আল্লামা আশরাফ আলী থানভী রহ.- এর সর্বশেষ খলিফা মুহিউসসুন্নাহ মাওলানা আবরারুল হক হারদুয়ি রহ.।  খ.  আল্লামা আতহার আলী রহ.-এর খলিফা মাওলানা আবদুল মান্নান সিলেটি রহ.।  গ.  আল্লামা জাফর আমহদ উসমানি রহ.-এর খলিফা মাওলানা খাজা শামসুল হক কটিয়াদী রহ.।  ঘ. হযরত মাওলানা আবদুল ওয়াহহাব রহ.-এর খলিফা মাওলানা ফয়জুর রহমান মোমেনশাহী রহ.। ঙ. হযরত মাদানি রহ.-এর খলিফা মাওলানা  এহসানুল হক সন্দ্বীপী রহ.।

মজলিসে দাওয়াতুল হকের কেন্দ্রীয় দায়িত্বের সঙ্গে তিনি যুক্ত। বর্তমানে কোন সিলসিলার সাথে বেশি সময় দেন, এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘হাকীমুল উম্মত থানভী রহ.-এর সিলসিলার সাথেই বেশি সময় ব্যয় করি।’

তাঁর পিতা কিংবদন্তি-ব্যক্তিত্ব হজরত মাওলানা আতহার আলী রহ.-এর পৈত্রিক বাড়ি ছিল সিলেটে। দ্বীনের কাজে তিনি থেকে যান কিশোরগঞ্জে। ঠিক তেমনি, বিশাল জামিয়া ইমদাদিয়া ও শহীদি মসজিদের সম্পর্ক এবং কিশোরগঞ্জের সব পর্যায়ের মানুষের ভালোবাসা তাঁকে তাদের একজন দ্বীনী অভিভাবক রূপে বরণ করে নিয়েছে। জাতির একজন বরেণ্য অভিভাবক হয়েও কিশোরগঞ্জের মাটি মানুষের সাথেই জড়িয়ে আছেন তিনি ওতপ্রোতভাবে।  আগত সব দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন হাসিমুখে।  স্থানীয় দ্বীনপ্রাণি মানুষের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত ও ভালোবাসার মানুষগুলো ছুটে আসে কর্মব্যস্ত এ মহান মানুষটির দরবারে।

আজ (৭ অক্টোবর) সোমবার সুদীর্ঘ কর্মময় জীবনের বর্ণিল অধ্যায়গুলো নিয়ে ইসলাম টাইমস-এর পক্ষ থেকে তাঁর অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি দীপ্তিময় কণ্ঠে বলেন,- “আমার জন্ম এবং আমার জীবনকে মনে করি كنتم خير أمة أخرجت للناس تأمرون بالمعروف وتنهون عن المنكر وتؤمنون بالله -এর উপর আমল করার জন্যই। জামিয়া ইমদাদিয়ার পরিচালনা, শহিদী মসজিদের ‘খেতাবত,’ বেফাকুল মাদারিসের দায়িত্ব পালন, মাহফিলে আলোচনাসহ দ্বীনের টুকটাক যা খেদমত করি তা ওই আয়াতের উপর আমলের জন্যই। জীবনের এই পড়ন্ত বেলায় এসে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা সত্ত্বেও এই কাজগুলো করে যেতে পারা মূলত আমার বাবার মোনাজাত এবং দেশের মানুষের দোয়ার বরকতেই। যতদিন বেঁচে থাকি, সুস্থতার সাথে যেন আল্লাহর দ্বীনের খেদমত করে যেতে পারি, দেশবাসীর কাছে একান্তভাবে আমি এই দোয়া কামনা করি”।

প্রতিবেদক: তরুণ আলেম-লেখক