সেদিনের কথা—যদি আমাদের একটা পত্রিকা থাকত!

493

মাওলানা তাহমীদুল মাওলা ।।   

ছোটবেলা থেকেই জ্ঞানী-গুণী মানুষদেরকে আফসোস করতে শুনতাম এই বলে—আমাদের যদি একটা দৈনিক পত্রিকা থাকত! বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই শোনা কথার বাস্তবতা উপলব্ধি হত সুতীব্রভাবে। তখন আমিও বলতাম—আমাদের যদি এমন একটি পত্রিকা থাকত—যারা বাস্তবেই জনমানুষের কথা বলবে। বিদেশী চক্রের কাছে বিক্রী হয়ে দেশের কথা আর মানুষ ও মানবতার কথা ভুলে যাবে না। পরের এজেন্ডা বাস্তবায়নকে নিজেদের উপজীব্য বানাবে না। তামান্না ছিল যদি এমন কিছু সংবাদ মাধ্যম থাকত যারা কায়েমী স্বার্থবাদী, মিথ্যা ও হলুদ সাংবাদিকতার গিট খুলে দিতে পারত। যারা একবিংশ শতকের এ কালে পশ্চিমা ঘেঁষা জীবনব্যবস্থা ও জীবনচিন্তার দুর্বলতাগুলো ধরিয়ে দিতে পারত। যারা গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্র-আধুনিকতাবাদের ক্রম ব্যর্থতার ইতিহাস ও বাস্তবতা এবং এর অশুভ প্রভাপ-পরিণতি চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখা পারত। যদি এমন কিছু সংবাদ মাধ্যম হত—যা ইসলামের ইতিবাচক দিকগুলো মানষের দ্বারে দ্বারে পৌঁছে দেয় এবং ইসলামদুশমন মিডিয়ার মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডার উপযুক্ত বাস্তবভিত্তিক প্রতি-উত্তর দিত।

একইসঙ্গে ভাবতাম, ওই পত্রিকাগুলি করতে পারবে উদ্দেশ্যমূলক সংবাদের সঠিক বিশ্লেষণ। সর্বোপরি যারা গণ-মানুষের কল্যানকামী হওয়ার পাশাপাশি মানবতার মুক্তির জন্য কালের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ইসলামের দাঈর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।   কিন্তু তখনকার সময়ে এইসব ভাবনার পাশাপাশি এটিও ভাল রকম বুঝতাম যে, আপতদৃষ্টিতে এটি একটি অসম্ভবের পরের কিছু। কারণ লোকবল ও আর্থিক আয়োজন সম্ভব হলেও এর প্রচার-প্রচারণা ও সর্বস্তরে পৌঁছানোর ব্যবস্থা কীভাবে সম্ভব। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা, অনলাইন জগত আসার পর মনে হচ্ছে এখন সবই সম্ভব। দৈনিকের চেয়ে একধাপ এগিয়ে এখন ২৪ ঘন্টা সংবাদ প্রচারের সুযোগ এসেছে। প্রয়োজন লোকবলের, প্রয়োজন উদ্যোগের। প্রয়োজন সহযোগিতা ও সমন্বিত প্রচেষ্টার।

প্রকৃতপক্ষে অনলাইন জগতটিও সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের জন্য তা নিয়ন্ত্রিত। তারপরও হুদাইবিয়ার সন্ধি যেমন মক্কাবাসীদের কাছে ইসলামকে পরিচিত করানোর সুযোগ এনে দিয়েছিল। তদ্রুপ ইন্টারনেটের ব্যাপকতাও আমাদের সামনে সে পথ খুলে দিয়েছে। কারণ অনলাইন মাধ্যমটি যদিও সকল অনিষ্টের বাজার, তথাপি যথাযথ ইসলামের আবেদনময়ী দাওয়াত এখানেও সবকিছুকে ছাপিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে পারে। কারণ ইসলাম ও ইসলামী দাওয়াতে এমন সব সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ উপাদান রয়েছে যা সকল অসত্যকে ম্লান করে দিতে পারে।   আল্লাহর শুকর, ইতিমধ্যে কয়েকটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যম যাত্রা শুরু করেছে। যারা মানবতা এবং ইসলাম ও মুসলামানের কথা বলেন। যারা সংবাদকে বিশ্লেষণ করেন। ভাষার আঁচরে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য তুলে ধরার চেষ্টা করেন। হলুদ সাংবাদিকতা প্রতিকারের চেষ্টা করেন। যারা জীবন ও জগতে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ইসলাম ও মুসলমানের করণীয় নির্দেশ করার চেষ্টা করেন। প্রচার ও প্রতিবাদের ভাষা ও ভাষ্য ঠিক করে দেন। ইসলামী প্রতিনিধিদের ভাষ্য ও ব্যাখ্যা তুলে ধরার চেষ্টা করেন। আরো অনেক কিছুই করেন, করার চেষ্টা করেন এবং পরিকল্পনা করেন। আমি তাদের শুকরিয়া জনাই। শুকরিয়া জানাই এ অঙ্গনের উদ্যোক্তা ও সহযোগীদের।

আমার আজকের কথাগুলো তাদের প্রতি—যারা আফসোস করতেন, যারা দৈনিক পত্রিকা করার স্বপ্ন দেখতেন, যারা আমার মতো কল্পনা করতেন—সত্য কথা বলার মতো নিজস্ব পত্রিকা ও সংবাদ মাধ্যমের, এখনো কি আমাদের কিছু করার নেই? ইসলাম টাইমসের মতো একটি অনলাইন গণমাধ্যম যখন আমার দুয়ারের কড়া নাড়ে তখন কি একটু সহযোগিতা, একটু প্রচার-প্রচারণা, একটু সাহস-যোগানো ও একে শক্তিশালী করার প্রেরণা অনুভব করতে পারি না আমি? আমরা কি তাদের কাছ থেকে সংবাদ বিশ্লেষণ ও দাওয়াতি ভাষার অনুশীলন করতে পারি না? সবাই নিজে নিজেকে সাংবাদিক ও ভাষ্যকার না মনে করে আমরা কি তাদের থেকে প্রতিবাদ ও প্রতি-উত্তরের ভাষা ও ভাষ্য গ্রহণ করতে পারি না? তাদের অনুকরণে অনলাইনভিত্তিক দাওয়াতি কাজে আমরা কি এক প্লাটফর্মে এসে দাঁড়াতে পারি না?

ইসলাম টাইমসের বর্ষপুর্তির এ সময়ে প্রশ্নগুলো আমার কাছে অনেক বড় মনে হচ্ছে। ভাবছি, আমরা কি সেই জাতি যারা আফসোস করে, কল্পনা করে আর স্বপ্ন দেখে সময় পার করাকেই বাস্তবতায় অবতীর্ণ হওয়ার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি?   আমরা দেখেছি, একজন সাংবাদিক, একটি পত্রিকা, কতকিছু করতে পারে! আমি নিজের ক্ষুদ্রতা সত্ত্বেও ইসলাম টাইমসের সম্পাদক মাওলানা শরীফ মুহাম্মদকে যতটুকু বুঝি—তিনি তেমনি একজন সুনিপুন কারিগর। তার দ্বারা অনেক কিছু সম্ভব। আমাদের প্রয়োজন শুধু ইসলাম টাইমসকে নিজের মনে করার। গ্রহণ করে নেওয়ার এবং পাশে দাঁড়ানোর। এমন কয়েক হাজার ফেইসবুক ব্যবহারকারী কি নেই, যারা প্রতিদিন এবং প্রতিটি সংবাদ শেয়ার দেবেন এবং অন্তত একটি করে কমেন্ট করবেন? ইসলাম টাইমস আছে, থাকবে এবং একের সাথে শত যোগ হবে ইনশাআল্লাহ।

লেখক: মুহাদ্দিস, ইসলামি আলোচক

পরিচালক, রিসালাতুল ইসলাম বিডি