কবি ফররুখের ক’জন বন্ধু-সুজন

160

সাদ আবদুল্লাহ মামুন ।।

সততা ও চেতনার কবিকণ্ঠ ফররুখ আহমদ। শাশ্বত বিশ্বাসের অনুগত এক তেজস্বী কবি। ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ ও প্রতিষ্ঠায় আমরণ স্বপ্নচারী। ন্যায়ের পথে নিঃসঙ্গ এক ডাহুক। সোনালি স্বপ্নরাজ্যের পথে ডেকে চলা সিন্দাবাদ। আমরণ সোচ্চারী। আপোষহীন প্রতিবাদী। কী কথায়, কী লেখায়! কী আচরণে, কী উচ্চারণে!

বাংলা ভাষার শক্তিমান কবি ফররুখের চারপাশে একসময় ভিড় করে থাকা সমকালীন ধান্ধাবাজ লেখক-বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই পরে সটকে পড়েছে। কবির সঙ্গে শেষ পর্যন্ত তারা সততা ও আদর্শের প্রতিযোগিতায় টিকেনি। পরে সেইসব কতিপয় স্বার্থান্ধ চেয়েছে কবির আকাশসম মর্যাদায় ছাঁই ছিটাতে। চাটুকারের দল চেয়েছে বিভিন্ন ধুয়া তুলে তোষামদ-ঘৃণাকারী মহান এই কবিকে একলা করে দিতে। যেমন করছে তাদের কোনো কোনো চেলা এখনও। কিন্তু ওদের পরিণতি শুধুই ব্যর্থতা।আদর্শ ও চেতনার ঈগলকে দুর্গন্ধ-ছড়ানো মাছির দল কী করে প্রতিহত করবে!

আমরা এখানে কবি ফররুখ আহমদের কয়েকজন বন্ধু-সুজনের কথা বলতে চাই। যাঁদের কেউ কেউ আলেম-লেখকও। যারা আদর্শবান এই কবির সংগ্রাম-সমরে পাশে ছিলেন। সঙ্গী ও সমর্থক হয়ে। সর্বাঙ্গীন সুন্দরতম কল্যাণময় ইসলামের সৌকর্য প্রকাশের মিছিলে। তাদের মধ্যে সর্বোজ্জ্বল নাম মাওলানা আবদুল খালেক রহ.। ইসলামি চিন্তাবিদ ও মাসিক মদীনা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ. লিখেছেন : কবি ফররুখ আহমদের চিন্তার জগতে বিপ্লব আসে প্রাজ্ঞ সাধকপুরুষ অধ্যাপক মাওলানা আবদুল খালেক রহ.-এর সোহবত-সান্নিধ্যে এসে। ‘সিরাজুস সালেকীন’ ও সাইয়েদুল মুরসালীন’ নামক দুটি কালজয়ী গ্রন্থপ্রণেতা মাওলানা আবদুল খালেক ছিলেন ফুরফুরার পীর মাওলানা আবু বকর সিদ্দিক রহ.-এর একজন বিশিষ্ট খলিফা।

[স্বপ্নরাজ্যের দুঃসাহসী সিন্দাবাদ]

মাগুরার শ্রীপুরের মাঝআইল গ্রামে (১৯১৮) জন্মগ্রহণ করা ফররুখ দেশ ভাগের আগে কলকাতায় থাকতেন নিজেদের কেনা বাড়িতে। ১৯৪১ সালে তার পড়াশোনা শেষ হয়নি; কিন্তু কবি হিসেবে প্রসিদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত। তখনই তিনি কলকাতায় সাক্ষাৎ লাভ করেন মাওলানা আবদুল খালেক রহ.-এর।

প্রথম সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনার পর থেকেই তাঁর মনোরাজ্যে শুরু হয় এক নতুন বিপ্লব। বাংলা ভাষার অন্যতম কবিতাগ্রন্থ সাত সাগরের মাঝি-ই এর প্রমাণ। ফররুখ আহমদ তার তৃতীয় কবিতাগ্রন্থ সিরাজাম মুনীরা মাওলানা আবদুল খালেক রহ.কে উৎসর্গ করেন। এ বিষয়ে কবিকন্যা ইয়াসমিন বানু লিখেছেন : আব্বার জীবনে এক অচিন্তনীয় পরিবর্তনের মূলে যে মহান ওলির দোয়া ছিল, তিনি হচ্ছেন আব্বার পীর মরহুম মাওলানা আবদুল খালেক সাহেব রহ.।

[আব্বাকে যেমন দেখেছি]

ফররুখ আহমদের শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজন বরেণ্য লেখক ছিলেন। তাদের মধ্যে সাহিত্যিক আবুল হাশেম, কবি গোলাম মোস্তফা, শিক্ষাবিদ আবুল ফজল অন্যতম। ফররুখ খুলনা জেলা স্কুলে পড়ার সময় স্কুল-ম্যাগাজিনেই সম্ভবত তাঁর কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। তাঁর স্কুল-শিক্ষক সাহিত্যিক আবুল হাশেম লিখেছেন : একটা ছেলে এসে একটা লেখা হাতে দিল। ছেলেটাকে দেখতাম স্কুলের অন্য ছেলেরা যখন মাস্টার সাহেবদের জব্দ করার জন্য ফন্দি আঁটতে থাকতো, তখন সে বসে থাকতো নির্বাক মুখে, বই মেলে, তার ডাগর চোখ দুটি ঢেকে। লেখাটা পড়ে দেখলাম। চমৎকার লাগলো। একটু ঘষামাজা করে সেটা প্রেসে পাঠিয়ে দিলাম। এই ছেলেটিই হল ফররুখ আহমদ।

[আমার ছাত্র ফররুখ]

মাসিক মদীনা পত্রিকা সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। লেখক ও অনুবাদক। বাংলা ভাষায় অনেক বই লিখেছেন এবং বহু কিতাব তরজমা করেছেন। তাঁর সঙ্গে ফররুখ আহমদের এক যুগেরও অধিক গভীর ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর পত্রিকায় তিনি প্রচুর লিখেছেন।

 

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.-এর ভাষায় : মাসিক মদীনায় ফররুখ আহমদ নামে-বেনামে যে কত কবিতা লিখেছেন, তা শুমার করা মুশকিল। কখনো তিনি লিখেছেন আবদুল্লাহ মাহবুব ছদ্ম নামে, কখনো আবদুল জলীল, কখনো বা শুধু আবদুল্লাহ নামে। কলমের ডগায় যে নাম আসতো, সে নামেই তিনি কবিতা লিখে আমার হাতে দিতেন।’ [স্বপ্নরাজ্যে দুঃসাহসী সিন্দাবাদ]

 

ফররুখ আহমদের ‘নয়া জামাত’ স্কুল-পাঠ্য গ্রন্থ। ৪ খণ্ডে প্রকাশিত ফররুখের এই স্কুলপাঠ্য গ্রন্থমালা জনপ্রিয় হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বইগুলোর একাধিক মুদ্রণ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রকাশক পাওনা ঠিকমতো পরিশোধ না করায় ফররুখ প্রকাশকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। মাসিক মদীনা পত্রিকার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান ও কবি ফারুক মাহমুদ সেই মামলায় কবির পক্ষে সাক্ষী দেন। মামলায় ফররুখ আহমদ জয়ী হন।

ফররুখ আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু লেখক-অনুবাদক মাওলানা মুজীবর রহমান। তিনি বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন। উপমহাদেশ থেকে জুলুমবাজ ইংরেজদের বিতাড়নে যেসব আলেম ইতিহাসের পাতার স্মরণীয় মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি রহ. তাদের অন্যতম। মাওলানা মুজীবুর রহমান এই বরেণ্য সংগ্রামী-মনীষীর রোজনামচা বাংলায় অনুবাদ করেছেন। বয়সে মাওলানা মুজীবুর রহমান কবি ফররুখ আহমদ থেকে কিছুটা বড় ছিলেন কি না! কারণ, ফররুখ আহমদ সাহিত্যিক-সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীনকে লেখা এক চিঠিতে লিখেছেন ‘মাওলানা মুজীবুর রহমান সাহেব’। [ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য : ২৪৬] কবি ফররুখ আহমদের আরেকজন আলেম-বন্ধু , মাওলানা নূরুল আলম রইসী।

 

চট্টগ্রামের রেডিও অফিসের পরিচালক ইব্রাহীম আকন্দকে লেখা এক চিঠিতে কবি ফররুখ লিখেছেন,  জনাব আকন্দ সাহেব আসসালামু আলাইকুম। আমাদের পুরাতন বন্ধু জনাব নূরুল আলম রইসী চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনার কাজ লইয়া যাইতেছেন। ইনি একজন আলেম এবং বাংলা ভাষায় পণ্ডিত ব্যক্তি। লেখক এবং বক্তা। … নতুন জায়গায় অপরিচিত পরিবেশে রইসী সাহেব যাহাতে নিজেকে বন্ধুহীন বলিয়া অস্বস্তি অনুভব না করেন, সেই জন্য আপনাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্য এই চিঠি দিলাম। আশা করি আল্লাহর ফজলে ভালো আছেন। আমাদের তামদ্দুনিক আন্দোলনের কাজ নানারকম বাধাবিঘ্নের ভিতর দিয়া অগ্রসর হইতেছে। দোওয়া করিবেন।

আরজগোজার

ফররুখ আহমদ

 

ফররুখ আহমদের এ চিঠি থেকে বোঝা যায় বন্ধুদের প্রতি তাঁর কী অসাধারণ হৃদ্যতা। চিঠির শব্দাবলি থেকে ধারণা হয়, মাওলানা নূরুল আলম রইসী বয়সে কিছুটা বড় ছিলেন কিংবা সমবয়সী। সেইসঙ্গে এটাও জানা যাচ্ছে, মাওলানা নূরুল আলম রইসী ছিলেন বাংলা ভাষার একজন পণ্ডিত ও লেখক। চট্টগ্রাম কলেজে তিনি কয়েক বছর অধ্যাপনা করেছেন। শিক্ষকতার সূত্রে দুবাই গিয়েছেন। পরে আমেরিকায়। তিনি ছিলেন কবি ও প্রাবন্ধিক। এ ছাড়া সমকালীন আলেম-লেখকদের প্রতি ফররুখ আহমদের অশেষ শ্রদ্ধা ছিল। নতুনদের প্রতি ছিল ভালোবাসা। আলেম- লেখকগণ বাংলা ভাষায় আরও বেশি ইসলামচর্চা করেন, আরও বেশি সৃষ্টিশীল ও সৃজনশীল হয়ে ওঠেন, ফররুখ আহমদ এটি চাইতেন মনেপ্রাণে। মাওলানা মুহিউদ্দীন খানের ভাষায় :‘সমকালীন লেখক আলেমদের মধ্যে মাওলানা নুর মোহাম্মদ আজমী, মাওলানা মুস্তাফিজুর রহমান, মাওলানা আবদুল্লাহিল কাফী এবং হাকীম আবদুল মান্নানের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ অনেক বারই তাঁর বৈঠকী আলাপ-আলোচনার মধ্যে লক্ষ্য করেছি। নতুন লেখকদের মধ্যে হাকীম হাফেজ আজীজুল ইসলাম, মাওলানা মাহমুদুর রহমান হারুন, মাওলানা মুজীবুর রহমান, অধ্যাপক আখতার ফারূক এবং মাওলানা সৈয়দ জহীরুল হক প্রমুখ তরুণ আলেমের প্রতি তাঁর স্নেহ-প্রীতি ছিল অবারিত। প্রায়ই তিনি এঁদের ডেকে নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। নিজে উপযাচক হয়ে এঁদের কর্মস্থলে পর্যন্ত চলে যেতে কুণ্ঠিত হতেন না।’

 

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর একদল ধান্ধাবাজ লেখক- বুদ্ধিজীবী জোটবদ্ধভাবে ফররুখ আহমদের বিরুদ্ধে লেগে পড়ে। তাকে কোণঠাসা করার জন্য বিভিন্ন নিন্দা ছড়াতে থাকে। ফররুখের আদর্শ চেতনা ও সততার কাছে বছরের পর বছর ধরে পরাজিত হয়ে আসা সেই লেখক- বুদ্ধিজীবীগোষ্ঠী স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে তাঁর চলার পথ সংকুচিত করতে থাকে। তখন দৈনিক গণকণ্ঠে এ বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান বুদ্ধিজীবী-প্রাবন্ধিক আহমদ ছফা। তিনি লেখেন : অন্যান্য কবি-সাহিত্যিক, যাঁদের কোনো রকমের আদর্শবোধ নেই, চরিত্র নেই, সুবিধাবাদিতাই নীতি, আমরা জানি তারা আজ ফররুখ আহমদের নামে দুটো সমবেদনার কথা কইতেও কুণ্ঠাবোধ করবেন। তারপরেও আমরা মনে করি, ফররুখ আহমদ একজন বীর চরিত্রের মানুষ। একজন শক্তিমন্ত কবি। আমাদের সাহিত্য থেকে তার নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। [দৈনিক গণকণ্ঠ, ১লা আষাঢ় ১৩৮০/ ১৯৭৩]

 

১৯৭৪ সালের ১৯ শে অক্টোবর সন্ধ্যায় বাংলা ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি ফররুখ আহমদ ৫৬ বছর বয়সে ইনতেকাল করেন। ইসলামি ঐতিহ্য ও চেতনার মশালবাহী এমন একজন কবির মৃত্যুতে সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে একটি বেদনাবহ পরিবেশ রচিত হয়। তারই সাক্ষ্য কবিপত্নীকে লেখা কথাশিল্পী-শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের একটি ব্যক্তিগত পত্র।

তিনি লিখেছেন :

বেগম কবি ফররুখ আহমদ

জনাবা, আপনার স্বামী মরহুম কবি ফররুখ আহমদের অকাল-মৃত্যুর জন্য দেশের আরো বহুজনের মতো আমরা অত্যন্ত মর্মাহত। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর প্রতি সুবিচার করা হয়নি।  এ অপরাধে আমরা অপরাধী।…

কবি-পরিবারের সকলের প্রতি আমাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা। আল্লাহ আপনাদের মনোবল দিন।

বিনীত

আবুল ফজল

জীবিত থাকতে ফররুখ আহমদ সংঘবদ্ধ বহু চক্রান্তের শিকার হয়েছেন। তাঁর সঙ্গে করা হয়েছে নানা মাত্রিক অপরাধ। তবু তারা পারেনি তাকে মচকাতে। পারেনি তাঁর পথকে স্থিমিত করতে। তাই আজ বলতে বড়ো সাধ জাগছে। জেনে খুশি হোন সততা ও আদর্শের কবি হে ফররুখ! কোটি কোটি বাংলাভাষীর মনে নারঙ্গী বনে কাঁপা সবুজ পাতার মতো কিংবা এলাচমাখা সুবাসের মতো আজও প্রিয় হয়ে আছেন আপনি ও আপনার কবিতা। হে নাবিক সিন্দাবাদ!

আজও ছুটে চলছে হেরার রাজতোরণ পানে বিশ্বাসীদের সফেদ কাফেলা!

ইতিহাস সাক্ষী, বাংলায় ভাষায় এর আগে ফররুখ আহমদের মতো এমন আদর্শ ও আপোষহীন কবির আগমন ঘটেনি। তাই এমন চরিত্র ও ব্যক্তিত্ববান কবির জন্য বাংলা ভাষার বেদনা ও হাহাকার কবে ফুরাবে কে জানে! আদর্শ ও সততায় বলিয়ান এমন আরেকজন কবি পেয়ে বাংলাভাষীদের হৃদয় কবে জুড়াবে কে জানে!

তথ্যঋণ :

ফররুখ আহমদ ব্যক্তি ও কবি : শাহাবুদ্দীন আহমদ (সম্পাদিত)

ফররুখ আহমদ জীবন ও সাহিত্য : আবদুল মান্নান সৈয়দ

 

লেখক: তরুণ আলেম-লেখক, মাদরাসা-শিক্ষক