দারুয যিয়াফাহ : আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্যের অংশ

142

শাহাদাত সাকিব ।।

বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থায় উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। মাটির মানুষ উটের বাহন ছেড়ে আকাশে উড়ছে বিমানের কল্যাণে। মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে দেশ থেকে দেশান্তরে। স্বপ্ন দেখছে মহাকাশ জয়ের। রকেটে চড়ে এগিয়ে যাচ্ছে স্বপ্ন জয়ের প্রত্যাশায়। কিন্তু আজ থেকে হাজার বছর আগে ছিল না যোগাযোগ ব্যবস্থার এই উৎকর্ষ। এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে ভাবতে হত অনেক। মরুভূমির ধুলো মাড়িয়ে, কষ্টের দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তবেই পৌঁছতে হত কাক্সিক্ষত দেশে। এর মাঝে কেটে যেত মাসের পর মাস। পথে পথে ডাকাতের ভয়। খাবার ফুরিয়ে যাবার আশংকা। ঘুমানোর জন্য সুন্দর আরামদায়ক একটু জায়গা মেলাও ভার ছিল সে যুগে। পথিকের এই কষ্টের কথা বিবেচনা করেই বিশাল মুসলিম ভূখ-ে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ‘দারুয যিয়াফাহ’। রাস্তার মাঝে মাঝে অসংখ্য ঘর। গরীব-অসহায় ও মুসাফিরদের সেখানে বিনামূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করা হত।

এসকল ‘দারুয যিয়াফাহ’গুলোতে মানুষ খুঁজে পেত বাসগৃহের প্রশান্তি। কষ্টের মুহূর্তে ভরপেট খাবার এবং মাথা গোঁজার ঠাঁই। মুসলিম রাষ্ট্রের খলীফা ও সমাজসেবী মানুষেরা মুসাফিরদের জন্য এ পথগৃহগুলো তৈরি করত। শীতকালের হাড় কাঁপানো ঠা-া ও গ্রীষ্মের প্রচ- গরম থেকে বাঁচার জন্য পথচারীরা এই ঘরগুলোতেই আশ্রয় নিত। হিজরী তৃতীয় শতাব্দীর বিশিষ্ট আলেম সা‘দ বিন ইয়াযিদ বলেন, তিনি একবার প্রচ- বৃষ্টির সময় এমন এক গৃহে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তিনি দেখেন, প্রতিটি কামরা-ই লোকজনে ভর্তি হয়ে আছে। -আল মুনতাযাম ৫/৩৯

খলীফা মুসতানসির বিল্লাহ এ ব্যাপারে ছিলেন সুপ্রসিদ্ধ। তিনি বাগদাদের প্রতিটি মহল্লায় অসহায় গরীবদের জন্য ‘দারুয যিয়াফাহ’-এর ব্যবস্থা করেছিলেন। বিশেষ করে রমযান মাসে এখান থেকে তাদের খাবার বিতরণ করা হত। সেইসাথে বয়স চল্লিশ হয়েছে এমন বাদীদের ক্রয় করে তিনি আযাদ করে দিতেন এবং তাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতেন। -আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ১৭/২৬০

আমীর নূরুদ্দীন মাহমুদ রাহ.-ও এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ছিলেন। আল্লামা আবু শামাহ ইবনুল আসীর রাহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, নূরুদ্দীন মাহমুদ বিভিন্ন পথের মাঝে মাঝে বিনামূল্যে থাকা-খাওয়ার জন্য অসংখ্য ‘খান’ (বর্তমান যুগের আবাসিক হোটেল) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এর ফলে মানুষের যাতায়াত নিরাপদ হয় এবং মালামাল সংরক্ষিত থাকে। প্রচ- শীত বা বৃষ্টিতে পথিকের জন্য সেখানেই থাকার ব্যবস্থা ছিল। -আররাওযাতাইন, ১২

ব্যক্তি উদ্যোগে সেবা প্রদানের পাশাপাশি মুসলমানরা গড়ে তুলেছিল বিভিন্ন সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। মুসলিম সমাজে গড়ে উঠেছিল বহুমুখী দাতব্য সংস্থা।

বিশিষ্ট দায়ী আল্লামা মুস্তফা আসসিবায়ী এ ধরনের দাতব্য সংস্থার বহুমুখী সেবার বিবরণ উল্লেখ করেছেন। যেমন :

১. মুসাফির ও পথচারীদের জন্য বাসগৃহের ব্যবস্থা।

২. খানকা প্রতিষ্ঠা।

৩. যে সকল গরীব ও অসহায় মানুষের থাকার কোনো ঘর নেই এবং গৃহ নির্মাণ কিংবা ভাড়া নেয়ার আর্থিক সামর্থ্যও নেই তাদের বসবাসের জন্য গৃহ নির্মাণ।

৪. পথচারীদের পানি পানের ব্যবস্থা।

৫. উন্মুক্ত হোটেল প্রতিষ্ঠা। যেখান থেকে বিনামূল্যে গরীব ও অসহায়দের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।

৬. মক্কায় আগত হাজ্বীদের থাকার জন্য বিনামূল্যে বাসগৃহের ব্যবস্থা।

৭. পথচারী, গবাদী পশু ও ক্ষেত-খামারে পানি সরবরাহ করার জন্য কূপ খনন।

৮. কবরস্থানের ব্যবস্থা করা।

৯. গরীব ও অসহায় মৃতব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা।

১০. ইয়াতীম, পঙ্গু, অন্ধ, বৃদ্ধের থাকা-খাওয়া ও যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা।

১১. কারাগারস্থ ব্যক্তিদের আত্মিক  উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা।

১২. অসচ্ছল পরিবারের উপযুক্ত ছেলে-মেয়েদের বিয়ের যাবতীয় খরচের ব্যবস্থা।

১৩. মায়েদের জন্য দুধ-চিনির ব্যবস্থা। সুলতান সালাহুদ্দীন রাহ. তার কেল্লার একটি ফটকের পাশ দিয়ে দুটি নালা তৈরি করেছিলেন। সপ্তাহে দুই দিন একটি নালা দিয়ে দুধ অপর নালা দিয়ে চিনিমিশ্রিত পানি প্রবাহিত করা হত। মহিলারা সে দুই দিন এসে শিশু ও সন্তানদের জন্য প্রয়োজনীয় দুধ ও চিনিমিশ্রিত পানি নিয়ে যেত।

১৪. হাসপাতাল ও ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।

১৫. পাত্র ইত্যাদি ভেঙ্গে গেলে নতুন পাত্র কেনার জন্য অর্থ প্রদানের ব্যবস্থা।

১৬. অসুস্থ পশুর চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যবস্থা এবং যেসকল পশু বয়সের কারণে নিজে চরে বেড়িয়ে কাজ করে খেতে অক্ষম মৃত্যু পর্যন্ত সেগুলোর লালন-পালনের ব্যবস্থা। -মিন রাওয়াইয়ি হাযারাতিনা, পৃ. ১৭৮-১৮২

ইসলামের স্বর্ণযুগে এ ধরনের বহুমুখী সেবা প্রদানের জন্য গড়ে উঠেছিল অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠান। একেক প্রতিষ্ঠান একেক ধরনের সেবা প্রদান করত। জনগণ বিনামূল্যে এ সেবাগুলো পেয়ে থাকত। ফলে অসহায় ও বিপন্ন মানুষেরাও লাভ করত সামাজিক মর্যাদা। কারো কাছে হাত পাতা কিংবা অন্যের উপর বোঝা হয়ে থাকতে হত না তাদের।