‘আদর্শ বিচ্যুত না হলে আমাদের ছেলেরা সব জায়গা থেকেই ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসতে পারবে’

326

মাওলানা মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন। বিদগ্ধ আলেম মুহাদ্দিস। শক্তিমান লেখক। নব্বয়ের দশক থেকে লিখে আসছেন। তার গদ্যের গাঁথুনি চমৎকার। আধুনিক গদ্য নিয়ে তার জানাশোনা ও দক্ষতা ঈর্ষণীয়। তার প্রকাশিত গ্রন্থ সংখ্যা সত্তরের অধিক। লেখালেখির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে তার সাথে কথা বলেন:  ওলিউর রহমান।

 

ইসলাম টাইমস:  বাংলাদেশের সাধারণ লেখক আর ইসলামি ঘরানার লেখকদের সাহিত্যকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? অনেকেই তো ইসলামি ঘরানার লেখকদের লেখালেখিকে সাহিত্য মানে উত্তীর্ণ নয় বলে মনে করেন।

যাইনুল আবিদীন: প্রথম কথা হলো, সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে দু’টি ধারা চালু আছে। সাধারণ ধারা বা আধুনিক শিক্ষিতদের ধারা এবং মাদরাসা শিক্ষিতদের ধারা। এক্ষেত্রে কথা হল, এই দুই ধারাতেই এমন অনেক লেখক আছেন যাদের লেখা মানসম্পন্ন। আবার একটা বড় সংখ্যা এমন আছে যাদের লেখা সাহিত্যের বিবেচনায় উত্তীর্ণ না। এই দুই ধারাতেই তৃতীয় একটা শ্রেণি আছে যারা আসলে সাহিত্যের জন্য নয় বরং বিষয় ভিত্তিক প্রয়োজনীয় লেখা লেখেন। সাধারণ শিক্ষিতদের যে ধারা তাদের অনেকের মধ্যে এমন একটা প্রবণতা আছে যে-শ্রেণি বিভাজন না করে ইসলামি ঘরানার যে কারো বই পড়ে সামগ্রিকভাবে একটা ফলাফল বের করতে চেষ্টা করেন। যেটা ত্রুটিপূর্ণ। এভাবে তালাশ করা হলে সাধারণ শিক্ষিতদের ধারার মধ্যেও মানসম্মত লেখক কমই পাওয়া যাবে।

দ্বিতীয়ত, সাহিত্যে মানোত্তীর্ণ লেখা যারা লেখেন একাডেমিক চর্চার বাইরে গিয়ে তাদের বিস্তৃত অধ্যয়ন করতে হয়। সুতরাং একাডেমিক পরিচয়ে দু’টি ধারা বিভাজন যে গড়ে উঠেছে বা গড়ে তোলা হয়েছে এটাই আদতে প্রশ্নবিদ্ধ। সাহিত্যের সব ছাত্রই তো লেখক হতে পারে না। আবার অনেক লেখকই তো সাহিত্যের ছাত্র না। ‘তাহলে মাদরাসা পরিচয়ের লোকদের লেখা মাত্রই তা মানসম্পন্ন হবে না’ ধারণা যারা পোষণ করেন তাদেরকে শিল্প বা সাহিত্যানুরাগী বলা যায় না।

ইসলাম টাইমস:   আপনার গদ্যের গাঁথুনি ও শক্তিমত্তা নিয়ে অনেক প্রশংসা শোনা যায়। এই গদ্য আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো মেহনত কি আপনার ছিল?

যাইনুল আবিদীন: কারো কাছে ভাল লাগাটা তো তার ব্যাপার। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি আমার লেখা ততটা মানোত্তীর্ণ না।

আমার প্রথম কোনো লেখা প্রকাশ করেন মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। তাঁর সাথে আমার সাক্ষাতের শুরুর দিকে এবং পরবর্তীতে অনেকবার বলেছেন,  সাধারণ পাঠকদের বোধগম্য করে সহজ সাবলীল গদ্যে লেখতে। আমি আমার গদ্যকে সাবলীল করতে বাংলাদেশ ও কলকাতার নামী বে-নামী বহু লেখকের লেখা পড়েছি। আধুনিক গদ্যের যে গঠন ও বিন্যাস, প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখায় তার প্রয়োগ, ও উপযোগিতা বিশ্লেষণ করে করে লেখা পড়েছি। এভাবেই পড়তে পড়তে,  লেখতে লেখতে গদ্যের একটা নিজস্বতা এসেছে।

 ইসলাম টাইমস:   সাহিত্যের ময়দানে আমাদের ইসলামি ঘরানার অনেক তরুণ ইদানিং কাজ করছেন। কেউ কবিতা লেখছেন,  কেউ গল্প-প্রবন্ধ,  কেউ উপন্যাস। বাংলাদেশের প্রেক্ষিত বিবেচনায় ইসলামি ঘরানার তরুণদের কোন শাখায় অগ্রসর হওয়া অধিক কল্যাণকর মনে করেন?

যাইনুল আবিদীন: এটা আসলে খোদাপ্রদত্ত প্রতিভা। যে গল্প-উপন্যাসে উন্নতি করতে পারবে তাকে তো কবিতা লেখার জন্য টেনে আনা যাবে না। আবার যার কবিতা লেখার হাত ভাল, গল্প-উপন্যাসে সে হয়ত ততটা সৃজনশীল হতে পারবে না। তাই এটা প্রত্যেকের অভিরুচির ব্যাপার।

অবশ্য বাংলাদেশে মানসম্মত প্রবন্ধ, গবেষণাকর্মের অভাব রয়েছে। সে প্রেক্ষিতে সৃষ্টিশীল কোনো কাজ বা ভাল কোনো অনুবাদকর্ম বা গবেষণাপ্রসূত প্রবন্ধ বাংলাদেশের জনমানুষের জন্য কল্যাণকর বিবেচিত হবে বলে মনে করি।

ইসলাম টাইমস:   আপনার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা তো কম নয়। পাঠকনন্দিত অনেক বই-ও আছে। আপনার নিজের কোনটিকে সেরা মনে হয়?

যাইনুল আবিদীন: এক্ষেত্রে তো আসলে লেখকের বলার কিছু থাকে না। পাঠকের যে বই পড়ে উপকার হয় বেশি সেটাকে সেরা বই বলতে হবে। তবে যে বইগুলোর ক্ষেত্রে আমি শ্রম দিয়েছি বেশি, তার মধ্যে ‘বড় যদি হতে চাও’,  ‘ইমাম আবু হানিফা: আকাশে অঙ্কিত নাম ও সাহিত্যের ক্লাস অন্যতম।

ইসলাম টাইমস:    আপনার প্রকাশিত বড় যদি হতে চাও,  প্রিয় লেখক প্রিয় বই- এ বইগুলো কি কোনো সিরিজের অংশ?

যাইনুল আবিদীন: প্রিয় লেখক প্রিয় বই,  বড় যদি হতে চাও,  এদুটি আসলে সিরিজ ভিত্তিক কোনো কাজ না। আবার একদম লক্ষ্য-শূন্যও না। আমাদের মহান আকাবির এবং তাদের রেখে যাওয়া ইলমি সম্পদগুলোর সাথে তরুণদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা বড় উদ্যেশ্য। বাকি প্রতিটা কাজ করার সময়ই ছোট-বড় বেশ কিছু উদ্দেশ্য তো থাকেই।

ইসলাম টাইমস:   বর্তমানে কওমি ফারেগ অনেক তরুণ মিডিয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে, বিশেষত অনলাইন মিডিয়া। এটাকে কীভাবে দেখছেন?

যাইনুল আবিদীন: মিডিয়ার সাথে আমার পরিচিতি কম। আর অনলাইনের ব্যাপারেও আমার জানাশোনা নাই তেমন। তাই এ ব্যাপারে নিজ থেকে কিছু মন্তব্য করতে পারছি না। তবে আশা করি, আমাদের ছেলেরা যদি নিজেদের আদর্শের উপর থেকে কাজ করতে পারে তবে তারা সব জায়গা থেকেই ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসতে পারবে।