যে জন্য বিশ্বব্যাপী গুণীজনদের প্রশংসা পেল ইমরান খানের ভাষণ

4734

এনাম হাসান জুনাইদ ।।

জাতিসংঘে প্রদত্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাষণ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ওলামায়ে কেরাম ও বিভিন্ন গুণীজনদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। পাকিস্তানের প্রখ্যাত আলেম, মুসলিম বিশ্বের সর্বজন শ্রদ্ধেয় মুরুব্বী শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি ইমরান খানের ভাষণের প্রশংসা করেছেন।  পাকিস্তান জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রধান মাওলানা জাহিদুল হক হক্কানী, প্রখ্যাত সাংবাদিক হামিদ মীরসহ পাকিস্তানের আরো কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ইমরান খানের ভাষণের প্রশংসা করেছেন ।  ইমরান খান  তার ভাষণে কাশ্মীর ইস্যুর পাশাপাশি ইসলামফোবিয়া, ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ভুল ধারণা, মুসলমানদের  নবীর প্রতি ভালোবাসা, ইসলাম ও ইসলামের বিভিন্ন নিদর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা, ইসলামের পর্দার বিধান  ইত্যাদি বিষয় অত্যন্ত জোরালো ও যুক্তিপূর্ণ ভাষায় আবেগ ও দৃঢ়তার সাথে উপস্থাপন করেছেন, যার দৃষ্টান্ত জাতিসংঘের মত আন্তর্জাতিক নেতৃবর্গের সভায় বিরল।

তার ভাষণে ইউরোপের নেতৃবর্গের সামনে ইসলাম, মুসলমান, রাসূল, রাসূলের আদর্শের প্রতি একজন প্রবল আত্মমর্যাদাসম্পন্ন ঈমানদারের অভিব্যক্তিই প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করছেন  পৃথিবীর অনেক আলেম এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

ইমরান খান তার ভাষণে বলেছেন, “আপনারা মনে করেন, ইসলাম সংখ্যালঘু অধিকারের বিরোধী। আমাকে বিষয়টি পরিষ্কার করতে দিন।  ইসলাম ধর্মে কুরআন যেভাবে বিধি বিধানের উৎস। তেমনি হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনীকে মনে করা হয় সেই কুরআনের বাস্তব রূপ। তিনি সর্বপ্রথম মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইসলামী সভ্যতার মূল ভিত্তি। ভাবতে অবাক লাগে, ইসলাম সম্পর্কে বলা হয়, এটি নারী অধিকার বিরোধী। এটি সংখ্যালঘু অধিকার বিরোধী। অথচ মদীনাই সর্বপ্রথম এমন কল্যাণরাষ্ট্র, যা  দরিদ্র, এতীম, বিধবা, প্রতিবন্ধীদের দায়িত্ব গ্রহণ  করেছে।

এই রাষ্ট্র ঘোষণা করেছে- প্রত্যেকেই তার ধর্ম পালনে স্বাধীন। এটি একটি পবিত্র দায়িত্ব যে ধর্মীয় জায়গাগুলোকে সংরক্ষণ করা হবে। প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের সামনে সমান। তার ধর্ম তার বর্ণ যাই হোক না কেন।  ইসলামের চতুর্থ খলীফা তো এক ইহুদির কাছে মামলায় হেরে গিয়েছিলেন। সুতরাং যখন কোনো মুসলিম সমাজ কোন সংখ্যালঘুর প্রতি অবিচার করে তখন সেটা ইসলামের এবং ইসলামের নবীর আইনের বিরুদ্ধে যায়।”

প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তার ভাষণে আরও বলেন,  “বিষয়টি পরিষ্কারভাবে বুঝে নেওয়া উচিত যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অন্তরের অন্তঃস্তলে বাস করেন। তিনি যখন আক্রান্ত হন, তাকে যখন ব্যঙ্গ করা হয় তখন সেটি আমাদের অন্তরকে আঘাত করে। আমরা মানুষ হিসেবে একটা জিনিস বুঝি, যখন মনে আঘাত লাগে তখন সেটা শরীরের আঘাতের চেয়ে অনেক অনেক অনেক বেশি ব্যথা দেয়। এবং সে জন্যেই মুসলমানরা তাদের নবীকে ব্যঙ্গ করলে কঠিন প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে থাকেন। আমি সবসময়ই ভেবেছি, যদি কখনো সুযোগ পাই, তাহলে আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বিশেষত পশ্চিমা জাতি ও তাদের নেতৃবর্গকে এই বিষয়টি বোঝাবো।

“পশ্চিমা বিশ্বে আমি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছি। ধর্ম সম্পর্কে আমি তাদের মনোভাব ভালোভাবেই বুঝি। কিশোর বয়সে সর্বপ্রথম লন্ডনে যখন আসলাম, দেখলাম ঈসা আ. এর উপরে একটি কমেডি ফিল্ম চলছে, ইসলামী সমাজে যা কল্পনাও করা যায় না।”

“ আমাদেরকে খুবই সতর্ক থাকতে হবে যাতে করে আমরা অন্যের কষ্টের কারণ না হই। পশ্চিমা জগতে ‘হলোকাস্ট’ বিষয়টিকে খুবই স্পর্শকাতর মনে করা হয়। কারণ এটি ইহুদি সম্প্রদায়কে ব্যথা দেয়। সে জন্যই আমি বলতে চাই যে, আপনারা আপনাদের বাকস্বাধীনতাকে আমাদের নবীকে আঘাত করার কাজে লাগাবেন না। আমাদের ব্যথা দিবেন না। এটাই আমরা চাই।”

পাকপ্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আমরা জানি, চরম পর্যায়ের আচরণ মানুষকে চরমপন্থার দিকে নিয়ে যায়। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা মনে করেন, সন্ত্রাসবাদ আর ইসলাম সমর্থক। কিন্তু আমাদের জেনে রাখা উচিত, প্রত্যেক সমাজেই চরমপন্থি রয়েছে, মধ্যপন্থি রয়েছে এবং উদারপন্থি রয়েছে। কোন ধর্ম চরমপন্থা শিখায় না। সকল ধর্মের মূল কথায় ভালোবাসা এবং সমবেদনার শিক্ষা আছে। এটাই আমাদেরকে প্রাণীদের থেকে ব্যতিক্রম করে দেয়।

“সন্ত্রাসবাদের সাথে ধর্মের সম্পর্ক নেই। এখনো পর্যন্ত কেউ এই বিষয়টি গবেষণা করেনি, ১/১১ আগে আত্মঘাতী বোমা হামলা পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি করেছে তামিল টাইগাররা। তারা ছিল হিন্দু। কেউ তখন হিন্দু ধর্মকে তো এই চরমপন্থার জন্যে ভর্ৎসনা করেন নি। আমরা জাপানের কেমিক্যাজ পাইলটের মুভি দেখেছি। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে আত্মঘাতী বিমান হামলা করেছেন। কেউ তার ধর্মকে নিন্দা করেননি “

ইমরান খান ইসলাম সম্পর্কে পাশ্চাত্যের ভুল ধারণাকেই ইসলাম সম্পর্কে ভীতি সৃষ্টি করার আসল কারণ মনে করেন। তিনি বলেন,  “লাখ লাখ মুসলমান আমেরিকা এবং ইউরোপের দেশগুলোতে সংখ্যালঘু হিসেবে বাস করে। ইসলামভীতি ৯/১১ পর থেকে খুবই উদ্বেগজনক ভাবে বেড়ে চলেছে। প্রত্যেক মানুষকে উচিত পরস্পর বোঝাপড়ার সাথে বসবাস করা। কিন্তু ইসলামফোবিয়া, ইসলাম সম্পর্কে অমূলক ভীতি একটা বিভাজন তৈরী করছে। মুসলমান নারীরা, যারা  বোরকা পরিধান করেন তারা এখন কিছু কিছু দেশে হেনস্থার শিকার হন। পর্দাকে এমনভাবে দেখা হয়, যেন এটা একটা অস্ত্র। এটা কেন হচ্ছে? এটি হচ্ছে ইসলাম সম্পর্কে অমূলক ভীতির কারণে।”

ইমরান খান জলবায়ু, মুসলিম বিশ্বের ধনী শ্রেণীর পাশ্চাত্যের ব্যাংকসমূহে অর্থপাচার নিয়েও বিশদ আলোচনা করেন। সবশেষে তিনি কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা করেন।

অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে ভারত সরকারের নির্মম অত্যাচারের বিষয়টি বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে ইমরান খান বলেন, গত ৫২ দিন ধরে ৮০ লাখ কাশ্মীরিকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। ৯ লাখের বেশি সেনা মোতায়েন করে সেখানকার নাগরিকদের সঙ্গে পশুসুলভ আচরণ করছে আরএসএস মতাদর্শী মোদি সরকার।

আরএসএস মতাদর্শী ভারতের বর্তমান সরকার হিটলারের নাৎসি বাহিনীর মানসিকতা নিয়ে মুসলিমনিধন করছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, এ সরকারের হাতেই গুজরাটে মুসলিমদের ওপর গণহত্যা পরিচালিত হয়েছে। কাশ্মীরে কারফিউ প্রত্যাহারের পর আমরা আবারও এমন একটি গণহত্যার আশঙ্কা করছি।

মুসলিম নির্যাতনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নীরবতার সমালোচনা করে ইমরান খান বলেন, মুসলমানদের সন্ত্রাসী আখ্যায়িত করে তাদের ব্যাপারে সবাই নীরব বসে থাকে। আজকে যদি ইহুদিরা এভাবে অবরুদ্ধ থাকতো, তাহলে কি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া এমন হতো? রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানো হলো, আন্তর্জাতিক শক্তি কি ভূমিকা পালন করেছে?

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অনেকে বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতেই পারছে না। আবার অনেকে আছে, যারা বুঝেও কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তারা ভারতের বিশাল বাজারের দিকে তাকান। প্রায় ১২০ কোটি মানুষের বাজার আছে সেখানে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মানুষের চেয়ে বাণিজ্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, এটি দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, মুসলিমদের মধ্যে যারা উগ্রবাদে জড়ায়, তারা ইসলামের কারণে নয় ইনসাফের অভাবেই এ পথে পা বাড়ায়। এ জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দায় এড়াতে পারে না।

তিনি বলেন, যদি দুটি দেশের মধ্যে প্রচলিত যুদ্ধ শুরু হয় তাহলে সাত গুণ ছোট একটি দেশের সামনে দুইটি বিকল্প থাকে। হয় আত্মসমর্পণ নয়তো শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়া। আমরা যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়েছি তখন তো আমরা কখনোই আত্ম সমর্পণ করব না। যখন কোনও পারমাণবিক শক্তিধর দেশ শেষ অবধি লড়াই চালিয়ে যায় তখন এর পরিণাম মানচিত্রের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। দুই পরমাণু শক্তিধর দেশের লড়াইয়ের প্রভাব তখন পুরো দুনিয়ার ওপর পড়ে। সমগ্র বিশ্বকে এর ফল ভোগ করতে হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি জাতিসংঘের জন্য একটি পরীক্ষা। এই সংস্থা কাশ্মিরি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের গ্যারান্টি দিয়েছিল। এখন আত্মতুষ্টিতে না ভুগে বরং যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। এজন্য সবার আগে ভারতকে দখলকৃত কাশ্মিরে আরোপ করা কারফিউ তুলে নিতে হবে। সব বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই কাশ্মিরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দিতে হবে।