ঢাকা : মসজিদের শহর ক্যাসিনোর শহর

185

মাওলানা বাহাউদ্দীন যাকারিয়া ।।

মোবাইলে ডাউনলোড করা বাংলা অভিধান সার্চ করে দেখলাম, ক্যাসিনো শব্দের অর্থ জুয়া খেলার নির্দিষ্ট গৃহ বা পানশালা।

উইকিপিডিয়াতে ক্যাসিনোর পরিচয়ে লেখা আছে, ক্যাসিনো হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের জুয়া খেলার একটি নির্দিষ্ট স্থান। বাংলায় যাকে জুয়ার আড্ডা বা আসর বলা যায়। কিন্তু সেটা হয় সুবিশাল পরিসরে‌। সাধারণত ক্যাসিনো এমনভাবে বানানো হয় যে এর সাথে কিংবা পাশাপাশি হোটেল রেস্টুরেন্ট শপিংমল আনন্দভ্রমণ জাহাজ অন্যান্য পর্যটন আকর্ষণ থাকে। কিছু কিছু ক্যাসিনোতে সরাসরি বিনোদন প্রদান যেমন স্টান্ড আপ কমেডি, কনসার্ট, খেলাধুলা ইত্যাদির ব্যবস্থা থাকে।

ক্যাসিনো ইতালিয় ভাষার শব্দ। তার মূল ক্যাসা অর্থ ঘর। ক্যাসিনো বলতে ছোট ভিলা, গ্রীষ্মকালীন ঘর কিংবা সামাজিক ক্লাবকে বোঝানো হতো। ১৯ শতকের দিকে ক্যাসিনো বলতে এমনসব ভবনকে বোঝানো হতো যেখানে আনন্দদায়ক কাজকর্ম হতো। যেমন নগরের সামাজিক অনুষ্ঠান যেখানে নাচ, গান, জুয়া ও ক্রীড়ার ব্যবস্থা থাকতো। আধুনিক দিনে ইতালিতে বিভিন্ন অর্থে ক্যাসিনো ব্যবহার করে। যেমন পতিতালয় (ক্যাসা চুইসাও বলে যার অর্থ বন্ধ বাড়ি) ও শব্দপুর্ণ পরিবেশ।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ মদ, জুয়া, হাউজির সাথে পরিচিত হলেও ক্যাসিনো শব্দের সাথে পরিচিত নন। তথাকথিত উঁচু পাড়ার লোকদের হয়ত ক্যাসিনো সম্পর্কে পূর্ব থেকে জানাশুনা থাকতে পারে। সপ্তাহখানেক হয় মিডিয়ার কল্যাণে এ শব্দ শুনতে পাই আমরা। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অপারেশনের ফলে ক্যাসিনোতে কি কি হয় তা প্রকাশ পেতে শুরু হয়েছে। তা দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। এখানে বিদেশি মদসহ বিদেশি নারীও পাওয়া যাওয়ার খবর প্রকাশ পেয়েছে পত্র পত্রিকায়। ক্যাসিনোগুলো দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্য বিদেশিদের সাহায্য নেয়া হত। খবরে প্রকাশ প্রায় একশত জন নেপালি কাজ করত ক্যাসিনোতে। এর মধ্যে ১৯ জন পালিয়ে যায় পুলিশের প্রহরায়।

মোহামেডান, ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব, ভিক্টোরিয়া, ওয়ান্ডার্স ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবে জমজমাট ক্যাসিনোর আয়োজন হত। এসব ক্লাবে পুর্ব থেকেই জুয়া, হাউজি খেলা হয়ে আসছে। জুয়া, হাউজিই ক্লাবগুলোর ব্যয় নির্বাহের আয়ের প্রধান উৎস। ক্যাসিনোগুলোতে অপারেশন চালানোয় জাতীয় সংসদের হুইপ জনাব শামছুল হক চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি তো বলেই ফেলেছেন, এগুলো বন্ধ হলে ক্লাবগুলো চলবে কিভাবে? খেলোয়াড়দের বেতন দিবে কোত্থেকে? বেতন বন্ধ হয়ে গেলে এরা চাঁদাবাজি করবে।

জাতীয় সংসদের মাননীয় হুইপের বক্তব্য যদি এমন হয় তাহলে সমাজে অন্যায় রোধ হবে কিভাবে? জুয়া, হাউজি খেলা ও মদ বিক্রির পয়সায় যাদের বেতন দিতে হয় তারা দেশের জন্য কতটুকু কল্যাণ বয়ে আনবে?

ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে নানা শ্রেণীর মানুষ আসত। এদের জন্য রয়েছে পৃথক পৃথক রুমের ব্যবস্থা। ভিওআইপি শ্রেণীর লোকেরাও ক্যাসিনোতে আসত। জুয়া খেলার ফাঁকে ফাঁকে মদপানের ব্যবস্থাও থাকত। ক্যাসিনোতে যাতায়াতকারীদের তালিকায় রয়েছেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ, রাজউকের প্রকৌশলী, ঠিকাদার, আইনজীবী ও এক শ্রেণীর নব্যধনী। শুধু এরাই নন। আরও আসতেন দেশের বিভিন্ন উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় জুয়ার ভয়ঙ্কর নেশায় মেতে উঠতেন সরকারি উচ্চপদস্থ বেশ কয়েকজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। সন্ধ্যার পর এরা লাখ লাখ টাকা নিয়ে জুয়া খেলতে আসতেন। কেউ কেউ কোন দিন জিততেন। আবার কেউ খালি হাতে ফেরত যেতেন।

এদের কারো কারো আবার দেশের ক্যাসিনোতে তৃপ্তি মিটত না। তাই এরা পারি জমাতেন শ্রীলঙ্কা, নেপালে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে এরা এসব দেশে জুয়া খেলতে যেতেন। সপ্তাহের শেষ কর্ম দিবস বৃহস্পতিবার দুপুরে অথবা বিকালে উড়াল দিতেন সেসব দেশে। দুদিন জুয়া খেলে শনিবার রাতে ফিরে রোববার অফিস করতেন। কোন কোন কর্মকর্তা আবার জুয়ার নেশায় দুদিনের স্থলে তিন চার দিনও নেপালে অবস্থান করতেন। এসময় তারা সরকারি সংশ্লিষ্ট অফিসে অসুস্থতার কারণ জানিয়ে মেইল করে দিতেন। উল্লেখ্য, শ্রীলঙ্কা বা নেপাল যাতায়াত করা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ নিজের নামে বিকল্প পাসপোর্ট ব্যবহার করতেন।

ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার জন্য ব্যবহৃত বোর্ড বাংলাদেশে তৈরি নয়। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত। জানা যায়, সর্বাধিক বোর্ড চীন থেকে আমদানি করা। জনমনে প্রশ্ন, এ বোর্ডগুলো কিভাবে আমদানি করা হয়? সমুদ্র বা আকাশ পথেই তো বাংলাদেশে ঢুকেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তখন কী করেছিলেন? এর আমদানিকারক কারা? যেভাবে ক্যাসিনোগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে, তদ্রুপ তদন্ত করে এদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হোক।

এ ক্যাসিনো গুলো নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতেন সরকার দলীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। জাতীয় সংসদের হুইপ, সিটি কর্পোরেশনের কয়েকজন প্রভাবশালী কাউন্সিলর এবং নগর যুবলীগের কিছু দায়িত্বশীল। কয়েকজন কাউন্সিলর এবং যুবলীগ নেতা পুরো ঢাকা শহরের চাঁদাবাজি সহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশের পর একজনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্ষের ভিতরই ভুত। এ ভুত সমূলে তাড়ানো না গেলে সরকারের এ অপারেশন ব্যর্থ হবে।

বাংলাদেশ একটি মুসলিম প্রধান দেশ। রাজধানী ঢাকাকে মসজিদের শহর বলা হয়। সে শহর আজ জুয়ার শহরে পরিণত। এটা হতে দেওয়া যাবে না। সকল ক্যাসিনো সমূলে উৎপাটন করতে হবে সরকার তথা প্রশাসনকে।

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া