পৃথিবীর সবকিছু বদলে যায়

76

আবদুল্লাহ জোবায়ের ।।

সেদিন গিয়েছিলাম বাংলাবাজার। প্যারিদাস রোড।
বাংলাবাজারে লম্বা একটা সময় কাটিয়েছি। এ অঞ্চলের পথঘাট খুব চেনা, শৈশবের গন্ধমাখা।
পুরো নগর জুড়ে নানা ধরনের বিল্ডিং ধাঁই ধাঁই করে উঠে যাচ্ছে। চেনা নগরে নিজেকেই কেমন যেন অচেনা মনে হয় মাঝেমাঝে। হঠাৎ হঠাৎ কোন গলির মুখে দাঁড়িয়ে অসহায় বোধ করি। এখানে এত্ত বড় বিল্ডিংটা আসলো কোত্থেকে? এই শহর কী আমার?

গুলশান-বনানী পারতপক্ষে যাই না। সেদিন হঠাৎ একজনের বিয়ের জন্য গিয়ে পড়লাম বিপদে। কোনো রিকশা চলে না। বিশাল বিশাল আধুনিক স্থাপত্য চারদিকে। মনে হলো ভিন্ন কোনো দেশ।
বাংলাবাজারকে এদিক থেকে খুব ভালো লাগে। প্যারিদাস রোড আগের মতোই ঘিঞ্জি আছে। এখনও দুটা রিকশা ক্রস করতে করতে বেগ পেতে হয়। রিকশাওয়ালা গালাগালি দেয়্ আর মাঝখান দিয়ে লোহার ঠেলাগাড়ি এসে ঢোকে।

আমরা প্যারিদাস রোডের একটা কানাগলির শেষ মাথায় প্রাচীন দোতলা একটা বাড়িতে থাকতাম। নিচতলায় প্রেসের কাজ চলতো সারাদিন। কালি আর নতুন কাগজের গন্ধ দারুন ভালো লাগতো। আরও কিছু গন্ধের প্রতি দূর্বলতা ছিল তখন। যেমন কাঠে বার্নিশের গন্ধ, প্রাইভেট কার স্টার্ট নেয়ার পর ধোঁয়ার গন্ধ।

যাই হোক, সেই বাসাতে থাকতে থাকতেই আমি আমার জীবনের প্রথম লক্ষ্য ঠিক করি। স্থির সিদ্ধান্ত নেই- বড় হয়ে আমি একজন বুক বাইন্ডার হবো। জানালা দিয়ে নিচের বাইন্ডিংখানার দেখতাম কি অবিশ্বাস্য দক্ষতায় একটার পর একটা ফর্মা তারা ভাঁজ করছেন। এরপর পাশ দিয়ে সেলাই। সেটা আরেক রকম অলৌকিক কাজ। এরপর কাটিং মেশিনে কাটা ও বাঁধাই করা। দেখতে দেখতে প্রায় সবগুলো ধাপ আমার মুখস্থ হয়ে গেছিলো।
রোডের এ মাথা ওমাথা দুবার হাঁটলাম। আব্বার সাথে কত এসেছি এখানে। মোড়ে লিটন ভাইদের ফোনের দোকান। এখানে বসে আব্বা নানান জায়গায় ফোন করতেন। আত্মীয়-স্বজন। দেশে আর বিদেশের বন্ধুরা। তখনও মোবাইল খুব একটা প্রচলিত হয়নি। টেলিফোন করার জন্য আসতেই হতো। সেই দোকানটা দেখলাম বন্ধ।

রাস্তার ওপারে খুব চেনা একটা ফার্মেসি। ফার্মেসির মালিক আমার ওসতাদ। আমাকে প্রেশার মাপতে শিখিয়েছিলেন। তাঁর দোকানে আসলেই তিনি লেখার প্যাড গিফট করতেন। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম সেখানে। দোকানদার বুড়ো হয়েছেন। কাচা দাড়ি পেকে ধুসর হয়ে এসেছে। একবার ভাবলাম গিয়ে কথা বলি। আর আগানো হলো না।

আরেকটু সামনে ছিল বইয়ের লাইব্রেরী। সেসব এখন উঠে গেছে। লন্ড্রি না কি যেন দেখলাম। একজন বুড়ো দর্জির দোকান ছিল। সেটাও নাই। তিনি বোধহয় আর বেঁচে নেই।

পুরোনো সেই বাসাটায় এসে উঠলাম। আগে ছাদটা কত উঁচু মনে হতো। এখন একেবারে নিচে নেমে এসেছে মাথার কাছে। একটা জানালা খোলা- ভেতরে অন্ধকার। বাইরের টানা বারান্দায় কারা জানি আধময়লা কাপড় শুকোতে দিয়ে গেছে। ভেতরে একসময় কত জমজমাট অবস্থাই না ছিলো। লোকজন আসতো আর যেতো। গমগমে পরিবেশ। আব্বা কখনও কখনও ভেতরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসতেন। বক্তব্য রাখতেন। আবার কখনও আমাকে পড়াতেন। একা একা হাঁটতেন।

সামনে নতুন বিল্ডিং হচ্ছে। মনটা অজানা কারণে খারাপ হলো।

পৃথিবীর সবকিছু বদলে যায়। এই কানা গলিটাও বদলাবে। আশেপাশের সব ঘরবাড়ি বদলে যাবে। আমি ও আমরা সবাই বদলে যাবো, কেউ থাকবে না, কেউ না।

তবুও ক্ষীণ আশা- প্রাচীন শহরগুলো হাজারো মানুষের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকুক। ছাপাখানার কালিঝুলি মাখা এঁদো গলি, প্রাচীন শ্যাওলা পড়া বিল্ডিং আর এই নিস্তব্ধতার ভেতর আমাদের শৈশবগুলো বেঁচে থাকুক।

লেখকের ফেইসবুক পাতা থেকে নেয়া