সোনালী যুগে স্বাস্থ্যসেবা, ‘মসজিদের সাথে একটা ফার্মেসীও থাকত’

422

শাহাদাত সাকিব ।।

সুস্থতা আল্লাহ তাআলার অনেক বড় নিআমত। একজন সুন্দর বলেছেন- ‘সুস্থতা সুস্থ ব্যক্তির মাথার তাজ, যা কেবল অসুস্থরাই দেখতে পায়।’ অসুস্থ ব্যক্তিই শুধু অনুভব করতে পারে- রোগের যন্ত্রণা কত কষ্টদায়ক। রোগ-যন্ত্রণার মুহূর্তে সেবার জন্য একজন মানুষ পাশে থাকা রো গীর অনেক প্রয়োজন।

মুসলমানদের সোনালীযুগে তাই রোগীর সেবা করার জন্য ছিল অনেক সুন্দর ব্যবস্থা। কোনো অসুস্থ রোগী যেন চিকিৎসাহীন না থাকে, এদিকে বিশেষ লক্ষ রাখা হত। কারাগারে থাকা অপরাধী ব্যক্তীরাও এ আওতার বাইরে ছিল না; বরং তাদেরও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হত নিয়মিত। ওযীর আলী ইবনে ঈসা বাগদাদের প্রধান চিকিৎসক সিনান ইবনে সাবেতকে লিখেছিলেন- আমি বন্দীদের ব্যাপারে ভেবে দেখেছি। সংখ্যাধিক্য এবং প্রতিকূল আবহাওয়া ও অবস্থানের কারণে অনেক সময় তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। তাই তাদের জন্য আলাদা চিকিৎসক নির্ধারণ করা আমাদের দায়িত্ব। চিকিৎসক প্রতিদিন কারাগারে যাবে। পুরো কারাগার ঘুরে অসুস্থদের চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ঔষধ সরবারহ করবে। -তারীখুল হুকামা, পৃষ্ঠা ১৪৮

বিভিন্ন বড় বড় মসজিদ ও জনবহুল স্থানে বসানো হত ভ্রাম্যমান চিকিৎসাকেন্দ্র। মাকরিযী রাহ. বলেন, ইবনে তুলূন যখন মিসরের বিখ্যাত জামে মসজিদ নির্মাণ করেন তখন মসজিদের পিছনে একটি ফার্মেসীও প্রতিষ্ঠা করেন। প্রয়োজনীয় সব ধরনের ঔষধ সেখানে ছিল। প্রতি জুমার দিন একজন ডাক্তার অসুস্থদের সেখানে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতেন। -আলমাওয়াইযু ওয়াল ই‘তিবার ৪/২৬৭

এ ধরনের ভ্রাম্যমান হাসপাতালের পাশাপাশি নির্মিত ছিল বড় বড় হাসপাতাল। সেখান থেকে রোগীদেরকে বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান করা হত। সমাজের নেতৃস্থানীয় লোক ও ধনীব্যক্তিরা অসহায় মানুষদের সেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য এগুলো প্রতিষ্ঠা করতেন।

সুলতান নূরুদ্দীন রাহ. ৫৪৯ হিজরীতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলমুসতাশফান নূরী আলকাবীর’। দামেশকে নির্মিত এ হাসপাতালটি ছিল তৎকালীন দেশের সবচেয়ে সুন্দর হাসপাতাল। হাসপাতালটিকে কেবলমাত্র গরীব ও অসহায় ব্যক্তিদের জন্য তিনি ওয়াকফ করেছিলেন। তবে হাঁ, প্রয়োজনে ধনীরাও সেখানে চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারত। রোগীদের সব ধরনের ঔষধ-পত্র হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে প্রদান করা হত।

ঐতিহাসিকগণ লেখেন, ৮৩১ হিজরীতে একজন রুচিশীল পর্যটক আলমুসতাশফান নূরীতে যান এবং হাসপাতালের সেবার মান, শৃংখলা, খাবার-দাবার ও রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের যত্ন দেখে অভিভূত হন। তবে চিকিৎসা শাস্ত্রে তাদের কতটুকু অভিজ্ঞতা আছে তা পরীক্ষা করার জন্য অসুস্থতার ভান করে হাসপাতালে ভর্তি হন। প্রধান চিকিৎসক এসে তার নাড়ি ধরে বুঝতে পারেন। আসলে তার কোনো রোগ নেই। চিকিৎসকদের পরীক্ষা করাই উদ্দেশ্য। তিন দিন পর্যন্ত তাকে হাসপাতালে আপ্যায়ন করা হল। মুরগী, বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি ও ফল দিয়ে যত্ন করা হল অনেক। তিন দিন পর প্রধান চিকিৎসক তাকে একটি কাগজ দিলেন, সেখানে লেখা ছিল- আমাদের এখানে তিন দিন মেহমানদারী করা হয়। তখন সে বুঝে গেল, চিকিৎসক আগেই তার রোগ ধরে ফেলেছেন। -তারীখুনা আলমুফতারা আলাইহি, ১৬৩

৬৮৩ হিজরীতে আলমালিকুল মানসূর সাইফুদ্দীন নির্মাণ করেন ‘আলমুসতাশফাল মানসূরী আলকাবীর’ শৃংখলা ও পরিপাটির দিক থেকে এটি ছিল তৎকালীন যুগের পৃথিবীর সুন্দরতম একটি হাসপাতাল। এর চিকিৎসা সেবাও ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত ও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। প্রত্যেক রোগীর সেবায় দুজন ব্যক্তি নিযুক্ত থাকত। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল, কেবলমাত্র হাসপাতালে অবস্থানরত ব্যক্তিদেরই চিকিৎসা সেবা প্রদান করত না; বরং যেসকল রোগী হাসপাতালে আসতে অক্ষম তাদের বাড়ী গিয়ে সেবা প্রদান করা হত এবং প্রয়োজনীয় ঔষধ ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হত। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার মানুষকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হত এ হাসপাতাল থেকে। যারা সেবা পেয়ে সুস্থ হয়ে উঠত, যাওয়ার সময় পরিধান করার জন্য তাদের একটি করে নতুন কাপড় দেয়া হত এবং ঘরে ফিরে অতিরিক্ত পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে স্বাস্থ্যের যেন অবনতি না ঘটে এজন্য প্রয়োজন পরিমাণ অর্থও দিয়ে দেয়া হত। -মিন রাওয়াইয়ি হাযারাতিনা, পৃ. ২১২