মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া: প্রাণোচ্ছ্বল, স্বপ্নবান, মেধাবী আলেমের প্রতিকৃতি

611

শরীফ মুহাম্মদ ।।

তাঁর সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হওয়ার দিনটির কথা মনে পড়ে। সেদিনটিই যে তাঁকে দেখার শেষ দিন হবে, ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।  মাকতাবাতুল আযহার- এর উদ্যোগে একটি আলোচনা সভা ছিল বাড্ডায়। কয়েকজন প্রবীণ লেখক আলেমকে সম্মাননা ক্রেস্ট দেওয়া হয়েছিল সেদিন। তিনি ছিলেন সম্মাননা ক্রেস্টপ্রাপকদের অন্যতম। ভরা মজমায় যেটা হয়, টুকটাক কথাবার্তা হয়, সৌজন্য বিনিময় হয়,  বাকি সব আনুষ্ঠানিক কথাবার্তার মধ্যেই সময় কেটে যায়। সেদিনও সেটাই হয়েছিল। অল্প দু’-একটি কথাবার্তা ছাড়া তাঁর সঙ্গে লম্বা কোনো কথা হয়নি আমার। হওয়ার কথা ছিল, হওয়া উচিতও ছিল।

তবে সেই দিনটির একটি ব্যাপার আমার মনের মধ্যে দাগ কেটেছিল। দু’-একবার তাঁর কাছাকাছি হয়েছি, দু-একটি কথা তাকে বলেছি, কিন্তু স্বতস্ফূর্ত সাড়াটা সেভাবে পাইনি। শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব, বহু মানুষের কাছে সম্মানীয়, অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তারচেয়েও বড় হচ্ছে,  বহু তরুণ আলেম ছিল তাঁর স্নেহ ও উচ্ছ্বাসমাখা মহব্বতেরও পাত্র। ফর্সা, সুন্দর হাসিমাখা উচ্ছ্বল মুখ, এটাই যেন তাঁর স্বাভাবিক ও সব সময়ের চিত্র ছিল। তাঁর বহু গভীর কথোপকথনের মনোযোগী শ্রোতা হওয়ার সুযোগ বহুবার হয়েছে আমার। কিন্তু সেদিন সেই প্রস্রবণমুখিতা তারমধ্যে মোটেই দেখতে পাওয়া যায়নি। একাধিক বারের স্ট্রোকে দুর্বল ও অসুস্থ ছিলেন, এটা তো জানাই ছিল।  কিন্তু তিনি যে তখন এতটাই উদ্যম ও শক্তিহীন ছিলেন, মোটেই জানা ছিল না আমার।

আরেকটি ব্যাপার হলো, যে দু-চারবার তাঁর কাছাকাছি গিয়েছি,  ঠান্ডা এবং আগ্রহী চোখে তিনি বারবার তাকিয়েছেন। তাঁর এই শান্ত দৃষ্টির সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল না। উচ্ছ্বল মুখভঙ্গির সঙ্গে প্রাণবান দৃষ্টিপাত ছিল তার এক বড় বৈশিষ্ট্য। বারবার মনে হচ্ছিল, তিনি কিছু বলতে চান,  কিন্তু পারছেন না। মনে হচ্ছিল,  তিনি তাঁর স্বাভাবিক হাস্যোচ্ছ্বলতায় ফিরতে চান, কিন্তু সেই হাস্যোচ্ছ্বলতা তাঁর আসছে না। সেদিন ভিড়ের মধ্যে আমি শুধু তাঁকে বলেছিলাম, ‘ইনশাআল্লাহ কিছুদিনের মধ্যেই দেখা করতে আপনার বাসায় আসবো।’ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছিলেন তিনি।

বলছিলাম আমাদের মুরুব্বী, মেধাদীপ্ত আলেমেদ্বীন , বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী লেখক  মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ.- এর কথা।

দুই.

দেখা হওয়ার সেই দিনটিই ছিল শেষ দিন। এরপর তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয় নি। মালয়েশিয়ায় হঠাৎ এক দ্বীনী সফরে গিয়ে ওই মুহূর্তে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ছিলাম রাজধানীর নতুন অংশ পুত্রজায়ায়। সকাল দশটা- এগারোটার দিকে হবে। একইসঙ্গে ফোন পেলাম, সামাজিক মাধ্যমেও খবর পেলাম। তিনি ইন্তেকাল করেছেন।  প্রচন্ড কষ্ট লাগলো। হায়, আমার দেখা করা আর হলো না!

অসুস্থ ছিলেন তিনি। চিকিৎসা চলছিল। চিকিৎসক বদল হচ্ছিল। উন্নতি –অবনতির খবরও কানে আসছিল। কিন্তু কিছুতেই মনের মধ্যে এ কথাটা আসেনি যে তিনি সহসাই চলে যাবেন। তিনি চলেই গেলেন। সেদিনটি ছিল ২০ মে ২০১৭, আঠাশটি মাস পার হয়ে গেছে।

তিনি ছিলেন দেশের মধ্যবয়সি মেধাদীপ্ত, গবেষক- লেখক, সংগঠক ও তারুণ্যপ্রিয় একজন উজ্জ্বল আলেমেদ্বীন। মুহাদ্দিস, নায়েবে মুহতামিম। শীর্ষস্থানীয় জাতীয় আলেম ব্যক্তিত্বদের মজলিসের তরুণপ্রাণ। প্রৌড়ত্বের মধ্য পর্বেই তিনি বিদায় নিয়ে গেলেন।

তার জন্ম  ১৯৫৪ সালে। তার মানে তিনি বয়সে ১৭ বছরের বড় ছিলেন আমি এবং আমাদের বয়সী তরুণদের চেয়ে। অন্যদিকে পড়ালেখার ক্লাসের হিসেবে তার অবস্থান ছিল ৯/ ১০ বছর উপরে। নিঃসন্দেহে আমরা তাঁকে আমাদের আগের প্রজন্মের একজন সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করেছি। কিন্তু তার  জীবনের শেষ ২০-২২ বছরের সময়টাতে আমরা যখন তাঁর সঙ্গে নানা কারণে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি, বসেছি, মনেই হয়নি বয়স ও শিক্ষাস্তরের এতটা ব্যবধান আমাদের মধ্যে রয়েছে। এত আন্তরিক,  এত আলাপী,  এত উন্মোচিত  এবং  এতটাই অকৃত্রিম ছিলেন যে  বড়ভাই-বড়ভাই, বন্ধু -বন্ধু  একটি আবহ তৈরি হয়ে যেত। এই আবহটা আসলে তিনি নিজ থেকেই তৈরি করতেন। অসাধারণ হাস্যোচ্ছ্বল ও মিশুক মানুষ ছিলেন। আলেমেদ্বীন ও উস্তায হিসেবে অনেক উচ্চস্তরের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তাঁর এই স্বভাব-বৈশিষ্ট্য আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাইকেই মুগ্ধ করতো।

তিন.

দরসে তাঁর মুগ্ধকর আলোচনার কথা দূর থেকে শুনতাম।  কখনও দেখিনি বা শুনিনি। মজলিস-সেমিনারে তার বক্তব্য মুগ্ধ হয়েই শুনেছি। সবচেয়ে বেশি গিলেছি তার বৈঠকি আলাপ। তিনি যখন মালিবাগ আনসার কোয়ার্টার মসজিদের খতিব, তখন ওখানে গিয়েছি বহুবার। তাঁর বাসায় দস্তরখানে বসেছি। সেখানে ‘ইসলামী গবেষণা পরিষদ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান ছিল তাঁর পরিচালনায়।  ওই প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে তাঁর ব্যস্ততাও দেখেছি। আর যেটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে তাঁর সঙ্গে, সেটা হলো,  বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক লেখা তৈরি নিয়ে আলোচনা। তখন চলমান পান্ডুলিপি,  অর্ধসমাপ্ত রচনা তাঁর যা যা আছে, এগুলো সমৃদ্ধ করতে কী কী কিতাব ও বইপত্র পড়ছেন এবং পড়েছেন সেসব বলতেন। অনেক সময় আলোচ্য গ্রন্থ বা বিষয়ের মোটামুটিভাবে চর্চিত ও প্রতিষ্ঠিত দৃষ্টিকোণের বাইরে গিয়ে তিনি যে বিশ্লেষণের নতুন আরেকটি আঙ্গিক পেয়েছেন সেটাও তুলে ধরতেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, দেওবন্দ আন্দোলন, মুজাদ্দিদে আলফেসানী- এসব বিষয়ে তাঁর পাণ্ডুলিপিগুলো যখন মাঝ পথে, তখনই তাঁর মুখে অনেক আলোচনা শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

গবেষণাধর্মী লেখালেখি নিয়ে তিনি যখন বৈঠকি কথা বলতেন, তখন তারুণ্যের উৎফুল্লতা যেন তাঁকে পেয়ে বসতো। এটাকে আপনি সৃজনসুখের আবেগমুখরতাও বলতে পারেন। এত আগ্রহী ভাষায় আর এতটা জাগ্রত ভঙ্গিতে কথা বলতে থাকতেন, মনে হতো, গভীর কোনো থিসিসের জরুরি ব্যাখ্যা তিনি পরীক্ষকদের সামনে পেশ করে চলেছেন। এখানে আরেকটি ব্যাপার ঘটতো। দেখা যেত, তাঁর এসব গভীর ও আগ্রহ-উদ্দীপক জমজমাট আলোচনার শ্রোতা আমি একা কিংবা আমার মতো শুধু আর দু -একজন বসে আছি। শ্রোতা হিসেবে তাঁর এসব মনোযোগী কাজের জন্য এতটা  ‘গুরুত্ব’ পেয় নিজেদেরকেও কিছুটা ‘কাজের’  এবং কিছুটা ‘বোদ্ধা’  মনে হওয়ার মতো একটা বিভ্রমের মধ্যে পড়ে যেতাম। বেশিরভাগ সময়ই তাঁর সঙ্গে দেখা হলে তার চলমান কোনো না কোনো লেখা-প্রকল্প নিয়ে এরকম কথাবার্তা হতো। হঠাৎ কোনো ব্যস্ততা থাকলে কিংবা মজলিসের ধরনই অন্যরকম হলে হয়তো সেটা হতে পারতো না।

 চার.

তিনি সরাসরি আমার উস্তায বা শিক্ষক ছিলেন না ।  উস্তাযতুল্য তো অবশ্যই ছিলেন। ছিলেন আমাদের অনেক বন্ধু ও সহপাঠীর উস্তায।  কিন্তু আমাদের কাছে অবশ্যই আগের প্রজন্মের একজন গবেষক লেখক-আলেম ও উস্তায হিসেবে অনেক সম্মানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। এবং এসবের সঙ্গেও তিনি ছিলেন একটু অন্যরকমভাবে উজ্জ্বল। তাঁর উপস্থিতি তাঁকে চিনিয়ে দিত। ছোট -বড় কোনো কাজে তাঁর দীপ্ত উপস্থিতি আমাদের ভালো লাগতো। আর তাঁর স্থায়ী অনুপস্থিতির কথা আমরা কখনো ভাবতে পারিনি, ভাবার সুযোগই পাইনি। মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া লেখক- আলেমদের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে ছিলেন আমাদের আগের প্রজন্মের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই নক্ষত্রের আলোকবিভার কিছু বিশিষ্ট মাধুর্য তো অবশ্যই ছিল। তাঁর লেখাগুলোতে চোখ রাখলে সচেতন পাঠকমাত্রই সেটা অনুভব করবেন। তাঁর গদ্যে গবেষণাধর্মীতা, বিশ্লেষণগত আঙ্গিক এবং বিভিন্ন কিতাব ও গ্রন্থ মন্থনজাত নির্যাস এবং ফলাফল উদ্ভাবনের একটা উন্নত নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়।

এসবের বাইরে আমার জীবনে তাঁর টুকরো টুকরো স্মৃতির ব্যাপারগুলো অনেক বেশি ক্রিয়াশীল ও গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে তাঁকে প্রথম দেখেছি কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায়ে নুরিয়ায় কোনো এক বেফাক পরীক্ষার সময়। ওই বছরটি ছিল আমাদের তাইসিরুল মুবতাদির বছর। অর্থাৎ কিতাব বিভাগের প্রথম বছর। পরীক্ষার কেন্দ্র হওয়ার কারণে তিনি এবং তাঁর সহপাঠীরা মালিবাগ থেকে এসেছিলেন কামরাঙ্গীরচরে। ওই বছর সম্ভবত তাঁরা মেশকাত কিংবা দাওরায়ে হাদিসের পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। মসজিদের নির্মীয়মান দোতলায় মেহমান পরীক্ষার্থী ছাত্ররা অবস্থান করতো। চলাফেরা, আসা-যাওয়ার সময় ভিন্ন মাদরাসার বড় বড় ছাত্রদের মধ্যে আমরা তাদেরকে দেখতাম। সেখানেই তাঁকে দেখেছি প্রথম। আমরা তো খুবই ছোট ছাত্র তখন। বয়সেও,  ক্লাসেও।  দূর থেকে দেখতাম, টুকটাক গল্পও শুনতাম মালিবাগ মাদরাসার ছাত্রদের। ওই সময় এতোটুকুই।

শরহেবেকায়ার বছর আমি ভর্তি হই ফরিদাবাদ মাদরাসায়। সে ১৯৮৮ সালের কথা। কয়েক মাস পরের এক বৃহস্পতিবার। আমাদের ক্লাস এবং উপরে-নিচে আরও কয়েক ক্লাসের ছাত্ররা বিকেলের দিকে বের হয়ে যায় মাদরাসা থেকে। তাদের প্রথম গন্তব্য বায়তুল মোকাররম। সেখানে পক্ষকালব্যাপী সীরাত মাহফিলের একদিনের বয়ান শোনা তাদের উদ্দেশ্য। দেখাদেখি  আমিও দু- একজনের সঙ্গে বের হয়ে যাই। মাগরিবের পর যথারীতি বায়তুল মোকাররমের পূর্ব সাহানে কোনো একজন জনপ্রিয় ওয়ায়েজের আলোচনা শুনি। এরপর শুনে শুনে এক ছাত্র ভাইয়ের সঙ্গে চলে যাই মালিবাগ-শহীদবাগে। শুনতে পাই, সেখানে কী একটা প্রোগ্রাম চলছে ছাত্রদের। সেখানেই নাকি ফরিদাবাদ মাদরাসার ছাত্ররা অবস্থান করছে।

মালিবাগ জামিআ

মূলত ছাত্রদের ওই প্রোগ্রামটি ছিল ‘লাজনাতুত তালাবা’ নামের একটি সংগঠনের আয়োজনে। স্থানটি ছিল শহীদবাগ মসজিদের লাগোয়া ভবনের দোতলা বা তিনতলা। ওই মসজিদের খতিব তখন মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ.। সেখানে গিয়ে দেখি সীরাত বিষয়ে ছাত্রদের বক্তৃতা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। প্রতিযোগিতার আরেকটি পর্ব ছিল, প্রবন্ধ রচনা। প্রবন্ধ জমা নেওয়া হয়ে গেছে। বিষয় ছিল সম্ভবত: রাসুলুল্লাহ ( সা.)-এর রাজনৈতিক জীবন। একেক জন বক্তৃতা দিচ্ছে, পেছনে বসে শ্রোতাদের মধ্য থেকে বক্তব্য শুনছি। আগে কিংবা পরে ওই সংগঠনের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা না থাকলেও সেদিন ঠিকই দেখাদেখির মুডে আমি ওইখানে হাজির হয়ে গিয়েছিলাম।

 

পাঁচ

শহীদবাগে ছাত্রদের বক্তৃতা চলছিল। এর মধ্যেই ফরিদাবাদ মাদরাসার কয়েকজন ছাত্র প্রতিযোগিতায় আমার নাম দিয়ে দিল। একদমই তাৎক্ষণিকভাবে। আমি ভালো করে বুঝতেও পারিনি। হঠাৎ আমার নাম ডাকা হলো, পরিচিতদের ঠেলা ধাক্কায় সামনে গিয়ে বক্তৃতা দিলাম। এরপরই ঘটলো আমার জন্য অনুপ্রেরণামূলক একটি ঘটনা। বিচারকদের মধ্যে উপস্থিত একজন আমাকে ১০০ টাকা পুরস্কার দিলেন। আরো কয়েকজন পুরস্কারের ঘোষণা দিলেন। যিনি ১০০ টাকা পুরস্কার দিলেন, তিনি মূলত পারিবারিকভাবে আমাদেরকে চেনেন। ছোটকালে আমাকে দেখেছেন। সেকারণেই হয়তো  আমার ‘বক্তৃতা’র সময় তার মুগ্ধতা ও বিস্ময় একটু বেশি ছিল। এ জন্যই এ ঘটনা ঘটেছে। ওই রাত শেষে ফজরের পর আলাদা নসিহত মূলক বক্তব্যের মজলিস হলো‌। এরপর ফলাফল ঘোষণা করে বিজয়ীদের মাঝে আনুষ্ঠানিক পুরস্কার দেওয়া হলো। ভাগ্যক্রমে বক্তৃতা প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারটি জুটলো আমার ভাগে।

ওইদিন সকালের ওই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমী, মাওলানা ইসহাক ফরিদী রহ., মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ., মাওলানা আবু সুফিয়ান, মাওলানা যাকারিয়া প্রমুখ।  মজলিস শেষে মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আলাদা করে আমাকে বললেন, ‘সুযোগ সময় মতো এক জুমা’র দিন  মসজিদে চলে আসবে। কী লেখালেখি কর, বক্তৃতা -বক্তব্যের জন্য কী চর্চা কর -আলাপ করবো।”  এই ছিল তাঁর সঙ্গে আমার স্বাভাবিক যোগাযোগের সূচনা। একদিন যথারীতি তার মসজিদে গিয়েও ছিলাম। এরপর এ যাওয়ার আর ধারাবাহিকতা থাকেনি।

পরবর্তী সময়ে দাওরা ফারেগ হওয়ার পর লেখালেখির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মালিবাগ আনসার কোয়ার্টার মসজিদে গিয়েছি বেশ কয়েকবার। তখন কথাবার্তা হয়েছে আরেকটু  ‘পরিণত’ আঙ্গিকে। এক সময় তাঁর অনুজ লালবাগের মুফতি তৈয়ব ভাইয়ের সঙ্গেও আনসার কোয়ার্টার মসজিদে গিয়েছি। উদ্দেশ্য লেখালেখির কোনো একটি কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়া। এরই এক পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে দেওয়া একটি বড় গ্রন্থের আংশিক অনুবাদে তার সহযোগী হিসেবেও অল্প কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। সম্ভবত সেটি ছিল মাওলানা মাহবুব রেজভীর তারীখে দারুল উলুমের কোনো একটি খণ্ডের কিছু কাজ। এসব কাজেরও বিশেষ কোনো ধারাবাহিকতা পরে আর ছিল না।

মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ. মালিবাগ মাদরাসা, মাঝে একটা সময় পীরজঙ্গী মাজার মাদরাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে  শিক্ষকতার পাশাপাশি ‘ইসলামী গবেষণা পরিষদ’-এর কাজে ভালো একটা সময় ব্যয় করতেন। ‘গবেষণা পরিষদ’ কিছুটা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার পর তিনি নিজ থেকেই গবেষণামূলক প্রয়াসের মধ্য দিয়ে একেকটি গ্রন্থ তৈরি করতেন। এবং আমার কাছে মনে হতো , ওইসব গ্রন্থের কাজ নিয়ে তিনি কিছুটা বিভোর থাকতেন। কোনো প্রকাশনীর ফরমায়েশ অথবা সময়ের কোনো ফ্রেম ধরে তিনি কাজগুলো করতেন না। একদমই নিজের তড়প ও ব্যক্তিগত প্রেরণাজাত প্রকল্প থেকেই কাজগুলো করতেন। ওই সময়গুলোতে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলে কিংবা  কোনো মজলিসে সাক্ষাৎ হয়ে গেলে তাঁর চলমান কাজ নিয়ে নানা রকম মতবিনিময় করতেন। আলোচনাগুলো তিনি এতটাই গুরুত্ব দিয়ে করতেন যে তাঁর কাজ ও সে কাজের তুলনায় আমার নিজের অবস্থা ও অবস্থান ভেবে অবাক হয়ে যেতাম। ভাবতাম, এত গুরুত্ব দিয়ে তিনি কেন আমার সঙ্গে কথা বলছেন। এখন অনুমান করি, এটা ছিল  কোনো স্নেহভাজনের প্রতি তাঁর সাধারণ সুধারণা ও উচ্চ মূল্যায়নের একটি উদার নমুনা। আরেকটি ব্যাপার হলো, এতে কাজটি সম্পর্কে তাঁর নিজের অনেক বেশি সিরিয়াসনেস, নিমগ্নতা ও অনুসন্ধিৎসার একটি আলামতও এভাবে ফুটে উঠতো।

ছয়.

ময়মনসিংহ শহরে নদীর ওই পারে মালিডাঙ্গায় তাঁর পৈতৃক বাড়ি। ওই বাড়িতে আমার সফর হয়েছে এবং জমজমাট সময় কেটেছে। এর প্রধান সূত্র যদিও ছিলেন মুফতি তৈয়ব ভাই, কিন্তু ওই সময়টাতে মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেবও বাড়িতে ছিলেন। সময়টা ছিল মাদরাসাগুলোর ছুটি থাকার কোনো একটি সময়। সারাটা দিন কেটেছে, খেলাধুলা হয়েছে, হইচই করেছি। আর মাওলানা আবুল ফাতাহ সাহেবের সঙ্গেও অকৃত্রিম গল্পের মজলিসে বসেছি। এরপর যখন ময়মনসিংহ  জেলা ভিত্তিক ঢাকায় অবস্থানরত আলেমদের উদ্যোগে  ‘নাসিরাবাদ ফাউন্ডেশন’  গঠিত হলো, তখন প্রথম দিককার খসড়া বৈঠকগুলো থেকে নিয়ে পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন বৈঠক,  সভা-সমাবেশ ও সফরে তাঁর সান্নিধ্যে সময় কাটানোর সুযোগ হয়েছে। তাঁর ওই আন্তরিক,  কাছে টেনে নেওয়া, আলাপি, মধুর বৈশিষ্ট্যের পরশটি পেয়েছি সবসময়।

যখন তিনি হায়াতে ছিলেন তখন এ সৌন্দর্যগুলোর অনেক কিছুই অনুভবের সঙ্গে চোখে পড়েনি। তিনি চলে যাওয়ার পরই এজাতীয় প্রতিটি বিষয়,  তাঁর আচরণ ও সংস্রবের প্রতিটি মাধুর্যের কথা অন্তরে গভীরভাবে রেখাপাত করছে।  আমাদের সময়ের সক্রিয়, মিশুক ও প্রাণবান এক উজ্জ্বল অভিভাবক ছিলেন তিনি।

যতটুকু মনে পড়ে, আনসার কোয়ার্টার মসজিদে তাঁর পেছনে মাগরিব ও এশার নামাজ পড়েছি অনেকবার। যতটুকু মনে পড়ে,  তাঁর নিজের আশপাশের গ্রামীণ বহু নিকটাত্মীয় পরিবারের ঢাকাকেন্দ্রিক আশ্রয়ের প্রধান জায়গা ছিল তাঁর বাসা। কাজ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনে কাছের- দূরের গ্রামের মানুষেরা এলে তাঁর ওখানেই উঠতেন। যতটুকু মনে পড়ে, মেহমানদারির ক্ষেত্রে সহজ ও অবারিত একটি দস্তরখান তাঁর ওখানে প্রস্তুতই থাকতো। বোঝা যেত, তাঁর পরিবারের ভেতর থেকেও  এজাতীয় আয়োজনে সহযোগিতা থাকতো। আমি তাঁর বাসায় বেশ কয়েকবার দস্তরখানে বসেছি। ৫-৭ জনের কোনো মজলিস চলছে মসজিদে। এভাবে এশার নামাজের সময় হয়ে গেছে। দেখা যেত, পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই বাসায় দস্তরখান প্রস্তুত।  হাসিমুখ আচরণ,  আন্তরিক আপ্যায়ণ আর নানারকম সুন্দর গুণাবলীর একজন সমন্বিত মানুষ ছিলেন তিনি।

জীবনের শেষ  ১২-১৫ বছর কেন্দ্রীয়ভাবে আলেম সমাজের উদ্যোগী, চিন্তাশীল নেতৃত্বের জায়গায় তাঁর বিশেষ অবস্থান ছিল। বেফাকুল মাদারিস (কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড)-এর সহকারি মহাসচিব ছিলেন অনেকদিন। এছাড়াও বিভিন্ন সংস্থা, সংগঠনের শীর্ষ দায়িত্ব পালন করেছেন। মেলামেশা ও সমন্বয়ের ভালো একটি গুণ ছিল তাঁর। অঙ্গনের অনেক সংকট কিংবা জটিলতা তিনি সহজভাবে বুঝতেন। এর মধ্য দিয়েই দরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা করণীয় কর্মকৌশল বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করতেন। একজন গবেষক লেখক, মনোযোগী মুহাদ্দিস, আবার একই সঙ্গে একজন সংগঠক ও মেলামেশার মধ্য দিয়ে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। রুচিগতভাবেই এসব দায়িত্বের মধ্যে যথেষ্ট পরস্পর ভিন্নতা বা বিরোধ বিরাজ করে। এসব ভিন্নতা বা বিরোধকে অতিক্রম করে সবগুলো কাজ করে যাওয়া অনেক বড় সফলতার পরিচায়ক। মাওলানা আবুল ফাতাহ মুহাম্মদ ইয়াহইয়া রহ. ঠিক সেই সফল মানুষটিই ছিলেন।

সাত.

ইন্তেকালের আড়াই -তিন বছর আগে সম্ভবত তাঁর প্রথম স্ট্রোক হয় মোহাম্মদপুর জামিয়া রাহমানিয়া মাদরাসার একটি অনুষ্ঠানে। বক্তব্যরত অবস্থায় তাঁর কথাবার্তা ও শারীরিক ভারসাম্যে সমস্যা ধরা পড়ে। ওই দিনই চিকিৎসা শুরু হয়। এরপর থেকে তাঁর অসুস্থতাজনিত দুর্বলতা ও নাজুকতার অবস্থাটা চলছিল। সেই প্রাণচঞ্চল, হাস্যোজ্জ্বল বিচরণের মাত্রাটা কমে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি স্বাভাবিক চলাচলের ধারাটা ধরে রেখেছিলেন। দুর্বলতা ও অসুস্থতাকে সঙ্গে নিয়েই কিছুটা ম্রিয়মাণ সুস্থতার একটা জীবন তিনি যাপন করে যাচ্ছিলেন।

কিছুদিন পর চিটাগাংরোড সানারপাড়ের কাছে মোটর বাইক দুর্ঘটনার শিকার হন। মারকাযুল কুরআন মাদরাসায় যাতায়াতের সময় রাস্তা পাড়ি দিতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটে।  এরপর বেশ কিছুদিন তিনি বিছানায় ছিলেন। স্ট্রোকের রোগীদের বেশির ভাগের ক্ষেত্রে যে ঘটনাটি ঘটে, তাঁর ক্ষেত্রেও সেটি ঘটলো।  আরো একাধিকবার স্ট্রোক হলো। চলৎশক্তি কমে গেল, আরও দুর্বল হয়ে গেলেন। কিন্তু তখনও মনে হয়নি, আসলে তাঁর চলে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে। বরং মনে হচ্ছিল, মধ্যবয়সে প্রাণচঞ্চল অত্যন্ত মেধাবী এই আলেমেদ্বীন নিশ্চিতভাবে কিছুটা দুর্বল হয়ে গেলেন। এভাবেই হয়তো বার্ধক্য পর্যন্ত দুর্বলতা ও অসুস্থতাজনিত নাজুকতা নিয়ে তিনি তাঁর সাধ্যমতো দ্বীন ও ইলমের কাজগুলো করে যাবেন। আমাদের মধ্যে থেকে যাবেন।

আল্লাহ তাআলার ফায়সালা, দুনিয়া থেকে অনন্ত পরকালের দিকে সফর করাই তাঁর জন্য মঞ্জুর হলো। তাঁর জীবন ও কাজ নিয়ে আমাদের অনুমান ও প্রত্যাশার সব বাতি নিভে গেল। ২০১৭ সালের ২০ মে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তাঁর জন্ম ১৯৫৪  সালে। সে হিসেবে ৬৩ বছর বয়সের একটি দ্বীনী স্বপ্নময় ও কর্মতৎপর জীবন তিনি দুনিয়ায় কাটিয়ে গিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা কাজপাগল এই মেধাদীপ্ত মনীষী আলেমেদ্বীনকে জান্নাতের উঁচু মাকাম দান করুন। #

 

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯/ ইসলাম টাইমস, পল্লবী