কাশ্মীরি মেয়ের ডায়েরি : “মারও খাবে, আবার ‘আহ’ও করতে পারবে না”

301

তাসনীম শবনম ।।

কারফিউ চলছে। এরই মধ্যে  কয়েকদিন  ধরে বই খুলে পড়ার চেষ্টা করছি কিন্তু একটা প্যারাগ্রাফের বেশী পড়তে পারিনি।পড়তে বসলেই মনটা কোথায় যেন উড়ে যায়।

কয়েকটা টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি আছে। কিন্তু মোবাইল ফোন নেই। টেলিফোন নেই। এবং নেই ইন্টারনেটও। প্রত্যেক সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা শোনা যায়- মানুষকে আসা যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আমি কোথায় যাব? আমার যাওয়ার জায়গা কোথায়?

کشمیر

ফোনের গুরুত্ব আজ যেমন করে বুঝেছি তেমন কখনোই বুঝিনি। আমার ভাবিকে কারফিউর আগে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তার একটা ছেলে হয়েছে- সেটা আমরা পাঁচ দিন পরে জেনেছি। ততদিন পর্যন্ত আমাদের ঘরে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা চলছিল- কেউ কেউ বলছিলেন, ভাবি হয়তো ইন্তেকাল করেছেন। কেউ আশঙ্কা করে বললেন, আমাদের ভাতিজার কিছু হয়নি তো?

একদিন অলিগলিতে লুকিয়ে লুকিয়ে বের হলাম আমার ভাইয়ের সাথে মোটরসাইকেল দিয়ে। রাস্তায় জ্বলন্ত টায়ার, ইটের টুকরা, পাথর এবং রাস্তার পাশ থেকে উপড়ানো ফুলদানি নজরে পড়ছিল। একটা-দুটো মোটরসাইকেল, গাড়ি রাস্তায় পড়ে আছে। এখানে ওখানে বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিরাপত্তাবাহিনী।

ছোট ছোট বাচ্চারা নিরাপত্তাবাহিনী লোকদের দিকে দূর থেকে দেখে তাকিয়ে থাকে। আমার হঠাৎ মনে হল, আজ যারা পাথর মারছে, তারাও তো ১০ বছর আগে এভাবে নিরাপত্তাবাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকত।

کشمیر

কাশ্মীরে পাথর নিক্ষেপ করা একটি দেশ বিরোধী ‘অপরাধ’। তাই যারা পাথর নিক্ষেপ করে তাদের উপরে ছররা গুলি নিক্ষেপ করা হয় এবং তাদের চোখ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আন্দোলন তীব্র হলে কখনো গুলিও চালানো হয়। এতে মানুষ মারা যায়। এগুলো ভাবতে ভাবতে আমরা হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম।

 ‘মারও খাবে, আবার ‘আহ’ও করতে পারবে না

দুই সপ্তাহ পার হয়ে গেছে, কারফিউ চলছে। এই অকল্পনীয় বন্দীদশার মধ্যেই খবর এলো যে, আমার ভাতিজা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আমি এবার ঘর থেকে ভাইয়ের সাথে পায়ে হেঁটে বের হলাম। রাস্তা যেন টায়ার, পাথর আর ইটের টুকরার ক্ষেত।

প্রত্যেকে ১০০ মিটার পর পর নিরাপত্তা বাহিনী কাঁটাতার দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রেখেছে। একটু পর পর চেকপোস্ট বসিয়ে পথচারীদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।  একসময় আমরা হাসপাতালে পৌঁছে গেলাম। দেখলাম, যে আমার ভাই তার ছেলেকে নিয়ে যতটা না ব্যস্ত তার চেয়ে বেশি ব্যস্ত হাসপাতালে আহতের সংখ্যা নিয়ে। আমারও মনে হল, একটু খবর নেই। কিন্তু আহতদের খুঁজে বের করা খুব কঠিন।کشمیر

অনেক কষ্টে একজন  আহত লোককে দেখলাম রিলিজ নিতে। আমার ভাই তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কিভাবে আহত হয়েছে। কোন জবাব পাওয়া গেল না। সত্যি কথা কী, আহত হওয়ার বিষয়টা একটু জটিল। আহত লোকটির বন্ধু বললেন, ‘বোন, এখানে মারও খেতে হয়, আবার আহও করা যায় না।’

কয়েক বছর আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম, পুরানো শ্রীনগরে টিয়ার গ্যাসের কারণে অধিকাংশ বাসিন্দাদের শ্বাসনালী শক্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সেখানকার অধিকাংশ লোক শ্বাসকষ্টের রোগী। বাসায় ফিরে আসার পরও রাস্তার দৃশ্যগুলো আমার মনের আয়নায় ভাসতে লাগল।।

সূত্র : বিবিসি উর্দূ

অনুবাদ: হাসান জুনায়েদ