ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব ও নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্ব পরিস্থিতি

220

ওলিউর রহমান ।।

নাইন-ইলেভেন নিয়ে গুগলে কিছু তথ্য তালাশ করছিলাম। গভীর বিশ্লেষণমূলক মনপুত কোনো লেখা তো দৃষ্টিগোচর হল না তবে লোকমুখে চর্চিত ষড়যন্ত্র-তত্ত্বের দীর্ঘ ফিরিস্তি দেখতে পেলাম। ইংরেজি ও বাংলা বিবিসি, বিদেশি পত্রিকা ডেইলি ডান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের প্রথম আলো, কালেরকণ্ঠসহ ওপরের সারির অনেক পত্রিকায়ও দেখলাম, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বেশ গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়েছে। নাইন-ইলেভেন নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের ভাষণ-বিবৃতি উদৃত করা হয়েছে সেসব প্রতিবেদনে। ৯/১১ কে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত ষড়যন্ত্রের অংশ মনে করা এসব মন্তব্য-প্রতিমন্তব্য কতটুকু যথার্থ সে আলাপ ভিন্ন, তবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে লোকমুখে প্রচলিত ‘ফালতু’ মনে হওয়া এসব মন্তব্যের উপস্থিতি দেখে আমাদের শৈশবের শুনা গল্পগুলোর আইনুনাগ বৈধতা পাওয়া গেল যেন।

নাইন-ইলেভেনের ঘটনা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বড় রকমের পরিবর্তন আনে। ২০০১ সালের ১১ আগস্ট ওয়াশিংটনের ওয়াল্ড ট্রেড সেন্টার, পেন্টাগন ও পেনসিলভ্যানিয়ায় হামলার পরে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করে। অবশ্য আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি কখনোই নিরীহ গোছের ছিল না। তবে আশ্চর্যের বিষয় হল, ৯/১১-এর পরে আরব বিশ্বের বিলাসী শাসকরা আগের তুলনায় ভয়াবহ রকমের তোষণ নীতি গ্রহণ করে।

তদানীং মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসবাদের’ বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আল-কায়েদা নেতা উসামা বিন লাদেনকে ৯/১১ হামলার মূল হোতা চিহ্নিত করে আফগানিস্তানে তার অবস্থান সন্দেহে দেশটিতে বিরাট পরিমাণ সেনা মোতায়েন করা হয়। সোভিয়েত যুদ্ধের পর শান্তি এমনিতেও আফগানিস্তানে ছিল কম; তবে ‘সন্ত্রাস’ দমন করতে আসা সন্ত্রাসবাদী আমেরিকার সেনা অভিযানে দেশটিতে তালেবানদের ক্ষমতা গ্রহণের পর যে স্থিতিশীলতা বিরাজ করছিল তা আর রইল না। আফগানিস্তানে দেখা দিল কিয়ামতের বিভিষিকা।

উসামা বিন লাদেন পৃথিবীর জন্য ত্রাস নাকি বিশ্ব-মুক্তির প্রতীক ছিলেন কিংবা আঠার বছরের মার্কিন-তালেবান যুদ্ধে কার জয় হল বা কে পরাজিত হল সে প্রসঙ্গ বাদ রেখে যার তালাশে আমেরিকা আফগানিস্তানে হামলা চালাল, দীর্ঘ দশ বছর যুদ্ধের পর যখন দেশটিতে তার অস্তিত্বের প্রমাণ মিলল না তখন ৯/১১ নিয়ে সন্দেহের যে ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব বীজ শৈশবে আমাদের অন্তরে গ্রোথিত হয়েছিল তাই ডালপালা ছড়াল কেবল।

দজলা-ফোরাতের দান ঐতিহাসিক দেশ ইরাক ছিল সুজলা-শ্যামল। বিধ্বংসী মরণাস্ত্র আছে সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাল ইরাকেও। কয়েক বছরের যুদ্ধে ইরাকে হাজার হাজার বেসামরিক জনগণ প্রাণ হারালেন। উদ্বাস্তু হলেন কয়েক লাখ মানুষ। মধ্যপ্রাচ্যের উদীয়মান শক্তিশালী রাষ্ট্রটির ধ্বংস যখন চূড়ান্ত হল, কোনো ধরনের মরণাস্ত্রের সন্ধান না পেয়ে আমেরিকা তখন জানাল ইরাকে তাদের হামলা চালানো ঠিক হয়নি।

৯/১১ পরবর্তী পৃথিবীব্যাপী মার্কিন গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ল প্রচণ্ডরকমভাবে। মার্কিনীরা নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে- এমন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের যেকোনো ব্যক্তিকেই গ্রেফতার বা গুম করে ফেলতো কোনো কারণ ছাড়াই। তারপর তাদের নিয়ে যাওয়া হত কুখ্যাত গোয়ান্তামো কারাগারে। মানুষের পক্ষে কতটা নৃশংসতা দেখানো সম্ভব এবং মানুষ কতটা বর্বর হতে পারে তার বাস্তব উদাহরণ গোয়ান্তামো কারাগারের নির্যাতন। নিপীড়নের ভয়াবহতা আঁচ করা যায় বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগে দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ‘সাধু’ বারাক ওবামার ক্ষমতা গ্রহণের পরেরদিনের ভাষণ থেকে। ‘গোয়ান্তামো কারাগার আমেরিকার জন্য কলঙ্ক’। কথার খৈ ফোটানো সাধু ওবামা অবশ্য সাথে সাথেই বলে রেখেছেন ‘তবে এখানের বন্দীদের ব্যাপারে আমেরিকা সিদ্ধান্ত নিবে’। অথচ আটক বা গুম করে সেখানে বন্দী করে রাখা হয়েছিল কেবল-আমেরিকা বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার সন্দেহে। উইকিপিডিয়াতে উল্লেখ তরা তথ্যমতে ১৯৮ বন্দীর মধ্যে ১৩০ জনই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন। এ পর্যন্ত মাত্র ৬ জন বন্দীকে বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব হয়েছে।

ওবামা যে ছদ্মবেশী ‘সাধু’ ছিলেন, তা ‘শান্তির পয়গাম’ নিয়ে যাওয়া কায়রো সফরে মুসলমানদের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিপক্ষ না ভাবার আহ্বান থেকেই বিশ্ব মুসলিম অনুধাবন করতে পেরেছিল।

দুই দুইটি বড় রকমের সেনা-অভিযান চালিয়ে মার্কিন অর্থনীতি যখন ক্রমহ্রাসমান, আমেরিকা তখন যুদ্ধনীতিতে পরিবর্তন আনল। মধ্যপ্রাচ্যের পেট্রোডলার হাতিয়ে নিজেদের অর্থনীতি সংহত করতে তারা তখন গ্রহণ করল যুদ্ধাস্ত্র-বিক্রী নীতি। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রের আঞ্চলিক বিরোধকে উস্কে দিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে আমেরিকা সেখানে হাজির হয় সমঝোতাকারীর ভূমিকায়। অথচ পক্ষ বিপক্ষ সবার কাছে অস্ত্র বিক্রী করে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থে তারাই যুদ্ধকে জিইয়ে রাখে। ইয়েমেন, সিরিয়ায় যে মানবিক সঙ্কট এবং ভয়াবহ যুদ্ধ তা টিকে আছে মার্কিন অস্ত্র সহায়তায়। অবশ্য আমেরিকা কোথাও শক্তি প্রয়োগ করতে গেলে তার ঐতিহাসিক চির প্রতিপক্ষ রাশিয়া সেখানে হার মেনে নিবে তা হয় কীভাবে! তাই এখন যুদ্ধের আগুন যেখানে জ্বলছে সেখানের সর্বশেষ মানুষটিকে পুড়ানোর আগে সে আগুন হয়ত নিভবে না।

আবারও ষড়যন্ত্র-তত্ত্বে আসা যাক। গত ৮ সেপ্টেম্বর দৈনিক প্রথম আলো বিদেশি সংবাদমাধ্যমের বরাতে একটি প্রতিবেদনে লেখেছে, ৯/১১ হামলার দুইদিন আগে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন নাকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইকে আমেরিকাতে ভয়াবহ হামলার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্য থেকেও ওয়াশিংটনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।

২০০৩ বা ২০০৪-এর দিকে মালয়েশীয় প্রেসিডেন্ট মাহাথির মুহাম্মদ এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘পর্যাপ্ত পরিমাণ তথ্যের আলোকে বলছি, নাইন-ইলেভেনের হামলায় আমেরিকার নিজেদের হাত ছিল। নতুন শতকে শতাব্দী কাল ধরে বিশ্যব্যাপী মুসলমানদেরকে কোণঠাসা করে রাখতেই এই পরিকল্পনা’।

কোনো কোনো পত্রিকায় লেখেছে, তালেবান কর্তৃক আফগানিস্তানে যেন ইসলামি শাসনের ভিত রচনা না হয় এবং মধ্যপ্রাচ্যে উদীয়মান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাওয়া ইরাককে সমূলে গুড়িয়ে দিতেই আমেরিকা ৯/১১ ঘটিয়েছিল।

এসব তথ্য বা তত্ত্ব কতটুকু যথার্থ তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও একথা ঠিক যে ইরাকে, আফগানে মার্কিন সৈন্যদের হাতে লাখ লাখ নিরাপরাধ মুসলমানকেে প্রাণ দিতে হয়েছে। বহু আলেম, সাধারণ মুসলমানকে ‘মার্কিন বিরোধী কাজে তৎপর’ সন্দেহে আটক বা গুম করে গোয়ান্তামো কারাগারে বর্বরোচিত নির্যাতন করা হয়েছে। মুসলিম মাত্রই তাকে ট্যারোরিস্ট আখ্যা দিয়ে বিশ্বের দেশে দেশে মুসলমানদেরকে হেনেস্তা করা হয়েছে। বিশ্বের কোথাও কোনো সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ঘটলে মুসলমানদের দিকে তার দায় চাপানো বা আমাদের বাংলাদেশে যে টুপি-পাঞ্জাবি পরিহিত কিংবা মাদরাসায় পড়ুয়াদের ‘জঙ্গী’ বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা কিছুদিন আগ পর্যন্তও ব্যপক ছিল সেটা ৯/১১ পরবর্তী আমেরিকা পলিসিরই ফলাফল।

সন্ত্রাসবাদ কি মিঠে গেছে: কাতারের দোহায় দীর্ঘদিন যাবত চলা মার্কিন-তালেবান শান্তি আলোচনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে গেল। আমেরিকাই নিজের স্বার্থ বিবেচনায় শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাই তালেবান নেতারা বলছেন, শান্তি আলোচনা সফল না হওয়ার ক্ষতি আমেরিকারই বেশি হবে।

এখানে প্রশ্ন জাগে, আমেরিকা শান্তি আলোচনায় বসতে গেলো কেন? পৃথিবী থেকে সন্ত্রাসবাদ কি মিঠে গেছে? নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচাচে খ্রীস্ট সন্ত্রাসবাদ, ভারতে জয় শ্রীরাম শ্লোগান তোলা হিন্দু সন্ত্রাসবাদ, ফিলিস্তিনে ইয়াহুদি সন্ত্রাসবাদ, জিনজিয়ানে চীনা কম্যুনিস্ট সন্ত্রাসবাদ এবং রাখাইনে বৌদ্ধ সন্ত্রাসবাদের কথা না হয় বাদই দিলাম খোদ আমেরিকার বিভিন্ন চার্চ, বার, নাইটক্লাবে হামলা কি থেমে গেছে? সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ না বিশ্বের তাবত সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে অনন্ত যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন! তাহলে কোথায়! আমেরিকাতে তবে কেন এখনও বোমা হামলা হয়? নাইটক্লাবে, বারে, চার্চে কেন আত্মঘাতী হামলা করে খ্রিস্টানদের বিভিন্ন উপগোষ্ঠী? নাকি তাদের এসব কর্মকাণ্ড সন্ত্রাসবাদ নয়? তারা সন্ত্রাসী না? নাকি প্রত্যেককেই ব্রেন্ডন টরেন্টোর মতো ‘উন্মাদনাগ্রস্ত’ বলে হামলার আইনুনাগ বৈধতা দেওয়া হয়? আসলে এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

৯/১১-এর ঘটনা ষড়যন্ত্র হোক বা না হোক মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্র তো থেমে নেই। ‘আধুনিক’ ইউরোপের বুকে কলঙ্কের তিলক বসনিয়া হার্জেগোভিনার ঘটনা বা তো নাইন-ইলেভেনের পরে নয়। অপরাপর শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কি সার্ব সৈন্যদের বিরুদ্ধে কিছু বলেছিল? সার্বিয়ার উপর কি কোনো অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল?

আসলে চৌদ্দশত বছর আগে বলে যাওয়া রাসূলের কথাই ঠিক ‘কুফর শক্তিগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে একজোট’। এই কুফর চাই ভারত হোক, চাই মিয়ানমার হোক, চাই রাশিয়া হোক, চাই চীন হোক বা হোক যুক্তরাষ্ট্র!

সম্প্রতি চীনের এক বক্তব্যে এ বিষয়টি পানির মতো স্পষ্ট হয়ে যায় ‘ভারত যেহেতু থাইওয়ান ও জিনজিয়ানকে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করে তাই চীনও কাশ্মীরকে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় মনে করে’।