হুসাইন রাযি.-এর শাহাদাত: ইসলামে শহিদ এবং শাহাদাতের মর্যাদা

104

মুফতি মুহাম্মাদ নাঈম ।।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (অর্থ) এবং যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় তাদের সম্বন্ধে বলো না যে তারা মৃত। বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পারো না। ( সূরা বাকারা)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, (অর্থ) যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তুমি তাদেরকে মৃত মনে করো না বরং তারা জীবিত। আপন রবের নিকট তাদের রিজিক দেওয়া হয়। (আল ইমরান)

সূরা নিসা তে আল্লাহ তাআলা শহীদের আলোচনা ঐ সকল লোকদের সাথে করেছেন যাদের উপর আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহ রয়েছে এবং যাদেরকে করেছেন তিনি পুরস্কৃত আর তাদেরকেই সিরাতে মুস্তাকিম এর মাপকাঠি বলা হয়েছে।

সুতরাং আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন, (অর্থ) যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ মান্য করে তারা তাদের সঙ্গ লাভ করবে যাদের প্রতি আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করেছেন অর্থাৎ নবী ছিদ্দীক শহীদ ও পূণ্যবানগনের। আর সঙ্গী হিসেবে তারা কতইনা উত্তম!

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হুজুর আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, শহীদগণ জান্নাতের দরজার কাছে একটি সবুজ গম্বুজ এর মধ্যে থাকবেন এবং সকাল-সন্ধ্যা তাদের কাছে রিজিক পৌঁছে দেওয়া হবে।

আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হুজুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন কিয়ামতের দিন হিসাবের জন্য বান্দাকে উঠানো হবে কিছু লোক নিজেদের কাধের উপর তরবারি বহন করে উঠে আসবে। তাদের দেহ থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। জান্নাতের দরজার কাছে তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে। জিজ্ঞেস করা হবে, এরা কারা? উত্তর দেওয়া হবে, এরা শহীদ যারা জীবিত ছিলেন এবং যাদেরকে রিযিক পৌঁছানো হতো
(মাজমাউয যাওয়ায়েদ)

হযরত আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আরো বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে সে চাবেনা পুনরায় দুনিয়াতে ফিরে আসুক এবং দুনিয়ার যাবতীয় জিনিসই তাকে আবার দেয়া হোক তবে শহীদ। তার ব্যাপারটা হল সে আশা করবে সে যেন ফিরে আসে এবং তাকে যেন দশবার কতল করা হয়। অর্থাৎ, আল্লাহর রাস্তায় সে যেন বারবার শহীদ হয় ( সহিহ বুখারি, মুসলিম, বাইহাকী)

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আবি আওফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, জেনে রাখ! জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে। (সহীহ বুখারী)

হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় আহত হয় এবং আল্লাহই জানেন কে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর রাস্তায় আহত আহত হয় কিয়ামতের দিন সে এমতাবস্থায় উঠবে তার ক্ষতস্থান থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকবে এবং রক্ত সুগন্ধিযুক্ত হবে (সহিহ বুখারি, মুসলিম)

হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
শহীদ কে আল্লাহর রাস্তায় কতল করার সময় তার এই পরিমাণ কষ্টও হয়না পিপড়া কামড় দিলে তোমাদের যে পরিমান কষ্ট হয়। (তিরমিজি)

শাহাদাত এর ফজিলত এবং মর্যাদা নিয়ে কুরআন ও হাদিসে অনেক আলোচনা আছে। ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুসলমানের প্রকৃত সফলতা এটাই যে সে আল্লাহর দীনের জন্য নিজের জান কুরবান করে দিবে। এজন্য একজন মুমিনের অন্তরের আশা তো এটাই হয় যে, সে আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত বরণ করবে।

হযরত আবু হুরায়রা বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন, ঐ সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, আমার তো এই আশা এবং আকাঙ্ক্ষা যে আমাকে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ করা হবে অতঃপর পুনরায় জীবিত হব আবার শহীদ করা হবে আবার জীবিত হব আবার শহীদ করা হবে আবার জীবিত হব আবার শহীদ করা হবে (সহিহ বুখারী)

আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাত অনেক মর্যাদার বিষয়। প্রকৃত সৌভাগ্যবানদের নসিব হয় শাহাদাতের মর্যাদা।

আল্লাহর রাস্তায় যাদেরকে কতল করা হয় তাদেরকে শহীদ কেন বলা হয় এ ব্যাপারে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায় আহকামুল কুরআন লিলি জাসসাস, কুরতুবী এবং গ্রহণযোগ্য অন্যান্য তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ আছে

১. যেহেতু শহীদের জন্য জান্নাতের সাক্ষ্য দেয়া টা নিশ্চিত হয়ে যায়

২. যেহেতু তাদের রুহ জান্নাতে হাজির থাকে। কেননা তারা আপন প্রতিপালকের কাছে জীবিত অবস্থায় থাকেন যখন অন্যান্য লোকদের রুহ কেয়ামতের দিন জান্নাতে উপস্থিত হবে।

নজর বিন শুমাইল বলেন, শহীদ অর্থ শাহিদ। আর শাহিদ দ্বারা উদ্দেশ্য জান্নাতে উপস্থিত ব্যক্তি। আল্লামা কুরতুবী বলেন এটাই সঠিক মত।

৩. কেননা শহীদ অর্থ মাকতুল, অর্থাৎ আল্লাহর রাস্তায় যাকে কতল করা হয়েছে।

৪. কেননা ফেরেশতা তার পাশে উপস্থিত থাকেন।

৫. কেননা যখন আল্লাহ তায়ালা জান্নাত এর পরিবর্তে তাদের জানকে খরিদ করে নিয়েছেন তার ওপর অত্যাবশ্যক হয়ে গিয়েছে যে সেই অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। তখন শহীদ নিজের প্রাণ উৎসর্গ করে এই সাক্ষ্য দেয় যে সে অঙ্গীকার করেছে এবং তার সাক্ষ্য আল্লাহর সাথে মিলে যায।
৬. কেননা ফেরেশতারা তার জান কবজ করার জন্য উপস্থিত থাকেন।

মুহাররম। একটি সম্মানিত মাস। এ মাসকে আরবিতে মুহাররামুল হারাম বলা হয। এ মাসে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের ঘটনা ঘটে। ইসলামের কালিমাকে বুলন্দ করার জন্য তিনি কারবালার মাঠে শাহাদাত বরণ করেন। হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুর ছিলেন বিরত্ব-বাহাদুরি, সততা এবং আমানতদারীর সুউচ্চ মিনার।

আল্লাহ তাআলা হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুসহ পৃথিবীর সকল শহীদের মর্যাদা বুলন্দ করুন।

উর্দু সংবাদমাধ্যম জঙ-এ প্রকাশিত

অনুবাদ করেছেন, তারিক মুজিব