ওয়াসেল! তোমাকে ভুলতে পারছি না

739

শরীফ মুহাম্মদ ।।

মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল।  বন্ধু, বড়ভাই ও সহপাঠী।  একদমই নিজের পরিবারের বাইরে সবচেয়ে কাছের ও আস্থাভাজন মানুষদের একজন। আমাদের ছেড়ে সে চলে গেছে, এক বছর হতে চলল। তার ইন্তেকাল ২০১৮ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। বছর তো পার হয়ে গেছে,   কিন্তু প্রায়ই মনে হয় মানুষটি আমাদের সঙ্গেই আছে। এরপর মুহূর্তেই যখন সচেতন হয়ে উঠি,  বোধের মধ্যে এ কথাটা চলে আসে যে সে এই দুনিয়ায় আর নেই,  তখন কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করে না। পরবর্তী চিন্তাগুলো, ভাবনাগুলো সব থেমে যায়।  জ্বলজ্যান্ত ওয়াসেল এখন মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি।

সেইদিন বশির মেসবাহ ভাইসহ সফরে গিয়ে সন্ধ্যায় যখন বাঁশঝাড়ের নিচে ওয়াসেলের কবরের সামনে দাঁড়ালাম, তখন শরীর-মন কেঁপে উঠলো। মনের মধ্যে বারবার এই কথাটাই উঁকি দিল, কখনও কি ভাবতে পেরেছি, এই বয়সেই এভাবে আমরা ওয়াসেলের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে যাব! দোয়া করব!

দুই.

আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ. ছিল লালবাগ জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়ার উস্তায। হযরত মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. ও লালবাগ জামেয়া কেন্দ্রিক ইসলামী আন্দোলন,  ইসলামী রাজনীতির প্রচার-প্রকাশনা বিষয়ক একজন সক্রিয় নেতা।  মুফতি আমিনী সাহেবের প্রেসসেক্রেটারি বলা হতো তাকে। সারা দেশের মাদ্রাসা অঙ্গন,  ইসলামি লেখালেখি,  ইসলামী রাজনীতি ও সাংবাদিকতা জগতের বহু মানুষের প্রিয় ছিল সে। কম কথা বলা, নিচুকন্ঠ এই মানুষটির প্রতি মুগ্ধতা ও ভালোবাসা পোষণ করতেন বহু মানুষ। এটা আগেও কিছু বোঝা যেত, হঠাৎ সে চলে যাওয়ার পর বোঝা গেছে সবচেয়ে বেশি।

নানা কারণে আমরা ছিলাম খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও আপন মানুষ।  কিন্তু ওয়াসেল চলে যাওয়ার পর তাকে নিয়ে গুছিয়ে কিছু লিখব, এটা শুরুর দিকে তো পারিই নি, এখনো পারব বলে মনে হয় না। আমার চেয়ে বয়সে দুই-তিন বছরের বড় হলেও ছোটবেলা থেকে তাকে নাম ধরে ডেকেছি। আপনত্ব ও বন্ধুত্বের কারণেই। ‘সে’ না বলে তাকে ‘তিনি’ বললে মনে হয়, দূরেই ঠেলে দিচ্ছি। আমি আমার ভাষাতেই তাকে নিয়ে কিছু বলতে চেষ্টা করব।

আহলুল্লাহ ওয়াসেলের জন্ম ১৯৬৮ কিংবা ৬৯- এ হবে।  আমার বড় খালাতো ভাই সে।  আমাদের সবচেয়ে বড় খালাম্মা এখনও হাযাতে আছেন। ওয়াসেলের চেয়ে বড় খালাতো ভাইও আছেন। আল্লাহ তাআলা তাদের হায়াত দারাজ করুন। ওয়াসেলের জন্মের এক- দেড় বছরের মাথায় তার একজন বোনের জন্ম হয়।  এর কয়েক ঘণ্টা পর খালাম্মার ইন্তেকাল হয়ে যায়।  মাওলানা ওয়াসেলের আম্মা আর আমার আম্মা ছিলেন পিঠাপিঠি বোন।  বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়া এবং তৃতীয়া। ছিলেন দুই বান্ধবীর মতো।  ওয়াসেলের আম্মার ইন্তেকালের দুমাস পর আমার আম্মার বিয়ে হয়।  এর এক বছর পর আমার জন্ম।

ওয়াসেলের আম্মা আগেই চলে গেছেন। ওয়াসেলের বোনটিও সম্ভবত নব্বই দশকের গোড়ার দিকে মারা গেছে।  আম্মার ইন্তেকাল হয়ে গেছে ১৯৯২ সালে।  আর মাওলানা ওয়াসেল চলে গেল সেই দিন, ২০১৮- র ৩০ সেপ্টেম্বর। আম্মার ইন্তেকালের বেশ কয়েক বছর আগে আম্মার মুখে শুনেছি, তিনি খালাম্মাকে স্বপ্নে দেখেছেন। খালাম্মা আম্মাকে তার কাছে যেতে বলছেন। আম্মা বলেছেন, আপা, কয়দিন পরে আসি, আমার বাচ্চাগুলো খুব ছোট।’

হঠাৎ ওয়াসেলের ইন্তেকালের খবরের প্রভাব আমার জন্য হঠাৎ ছিল না, ওইদিন থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত,  এবং সম্ভবত সামনের দিনগুলোতেও একটি বড় রকম বেদনা ও আতঙ্কের দাগ এঁকে দিয়ে গেছে।  মন থেকে দুঃখ ও চাপটা সরাতে  পারছি না।

তিন.

শুরুর দিকের স্মৃতির পাতা কিছুটা ধূসর।  মনে পড়ে, আমাদের বাসা থেকে তিন-চার কিলোমিটারের মতো দূরে ছিল খাগডহর জামিয়া আশরাফিয়া। আমার ৬-৭ বছরের শৈশবে সে তখন ওখানে পড়তো, হেফজখানায়। ওই সময়টা থেকেই আমাদের কাছাকাছি হওয়া শুরু। মাঝে মাঝে  সপ্তাহের শেষ দিন, মানে বৃহস্পতিবার সে চলে আসতো আমাদের বাসায়।  শনিবার সকাল পর্যন্ত থাকতো।  ওয়াসেল যখন বাসায় থাকতো, ওই সময়টাতে আমার অন্য কোন রুটিন থাকত না। এমনিতেও তো ছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিন, বয়সে ছোট ছিলাম, বাসার পাশে মক্তবে পড়তাম। ওয়াসেল এলে যতক্ষণ সজাগ থাকতাম, ততক্ষণ আমরা খেলাধুলায় মজে থাকতাম।  অন্যদিকে, আম্মার আচরণেও একটা অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটতো। ওয়াসেল বাসায় এলে যেন নিজের বড় ছেলে বাসায় এসেছে,  রান্নাবান্না, আয়োজন ও আচরণে এমনটাই প্রকাশ পেতে থাকতো।

শনিবার সকাল হলে ঘটত অন্য ঘটনা।  স্বাভাবিকভাবে ওয়াসেল অনেক সময় মাদরাসায় যেতে চাইত না।  আমাকে সঙ্গে নিয়ে কাছের কিংবা দূরের মাঠে কিংবা পুকুরে ঘুরাঘুরি আর সাঁতার-এসবেই ডুবে থাকতে চাইত। এমনটা প্রায়ই হতো। দায়িত্বের কারণে আব্বা কিছুটা ক্ষুব্ধ হতে থাকতেন।  সকালে দোকানে চলে যেতেন, রাতে বাসায় ফিরে ওয়াসেলকে দেখে মুখ ভার করে ফেলতেন। দূর থেকে ওয়াসেল -এর আব্বা আমার আব্বাকে চাপ দিতেন, যেন ওয়াসেল যথাসময়ে মাদ্রাসায় ফিরে যায় সে ব্যবস্থা নিতে।  কিন্তু আম্মা মুখ ফুটে তেমন কিছু বলতেন না। ওয়াসেলকে কড়া ভাষায় আম্মা কিছু বলতেই পারতেন না।

এর একটি কারণ তখনই বুঝতাম কিছুটা।  এসব নিয়ে আব্বা-আম্মা যখন কথা বলতেন তখন সে কথাগুলো বের হয়ে আসতো।  আম্মা অনেক সময় তার চুপচাপ স্বভাবের মধ্যেই আব্বাকে বলতেন,  ছেলেটার তো মা নেই,  আপা তো দুনিয়া থেকে চলে গেছে।  আমিও যদি ধুর ধুর করি,  এই বাচ্চাটা যাবে কোথায় ?‘  আমার ছোট বোনদের কাছে, ছোট ভাইদের কাছে আমার মতো ওয়াসেলও ছিল একজন ‘ভাইজান’। আগেও, পরেও, এখনও।

সহজ কথায়, ওই সময়টাতে ওয়াসেলের জন্য আমাদের বাসা ছিল একটা অবারিত আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের জায়গা।  ওয়াসেল তাদের বাসাতেও যেত কোনো কোনো সপ্তাহের শেষে।  আর তাদের বাসার কাছেই ছিল নানির বাসা -নওমহল । সেখানেও তার যাতায়াত থাকতো। মা-হীন এই শিশুর প্রতি নানি, মামা, খালাম্মাদের স্নেহটাও ছিল অনেক বেশি। ওয়াসেল নানির বাসায় গেলে থাকতো নানির সঙ্গে নানির বিছানায়। নাতিদের মধ্যে এই বিশেষত্বটা তার জন্যই ছিল সংরক্ষিত।

চুপচাপ থাকা, নিচু স্বরে কথা বলা,  যে কোনো দাবি- আবদার থেকে একটু দূরে সরে থাকার ব্যাপারগুলো ওয়াসেলের মধ্যে শিশুকাল থেকেই দেখে এসেছি।  তার যে আম্মা নেই,  আমরা যেভাবে আম্মার কাছে আবদার করি, দাবি খাটাই,  এটা যে তার জন্য ‘সংগত’ না,  এটা মনে হয় সে সেই শিশু-বয়স থেকেই বুঝতো।  আমার অন্তত তাই মনে হয়। ওই অবোধ শৈশবে আমরা যখন চানাচুর, গোলগোল্লা, বিস্কিট, জিলাপি নিয়ে কাড়াকাড়ি করতাম ওয়াসেল চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো।  ক্ষীণ আওয়াজে হঠাৎ বলে উঠতো, ‘আমারে একটু দিবা?’  আমরা ঘাড় গোঁজ করে থাকলে অভিমানভরা গলায় সে শুধু বলতো, ‘আচ্ছা, মনে থাকব।’

ওয়াসেলের এই কথাটা আমার সবসময় মনে হতো। আমাদের দেওয়া-না দেওয়ার কথা, আমাদের অবহেলা-অনাদরের কথা ওয়াসেল আর কীভাবে মনে রাখবে! ওয়াসেলরা আগেও অস্বচ্ছল ছিল না, পরে তার জীবনে আরও স্বচ্ছলতা এসেছিল। পরিবার, ভাইবোন ও আশপাশের কথা সে বরং সুন্দরভাবেই মনে রেখেছিল।

চার.

ওই সময় জামিয়া আশরাফিয়া খাগডহরে আত্মীয় ও চেনাজানা আমাদের বয়সী আরো কয়েকজন শিশু পড়তো।  মুহাম্মদ,  মারুফ,  মামুন- এরা সবাই ছিল কাছের- দূরের  খালাতো ভাই।  এইসব টান ও সূত্র ধরেই ওই মাদরাসায় কয়েক সপ্তাহ কায়দা হাতে নিয়ে ছুটোছুটি করেছি আমি।  আব্বা তো দিয়েছিলেন সেখানে পড়াশোনার জন্য, পড়াশোনার চেয়ে ছোটাছুটির পরিমাণ আমার বেড়ে গিয়েছিলো। এরপর সেখান থেকে আমাকে সরিয়ে নেওয়া হয়। ওয়াসেল সেখানেই পড়তে থাকে। এবং হেফজ শেষ করে।

ময়মনসিংহ জামিয়া ইসলামিয়া ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া বাগে জান্নাত মাদরাসায় নূরানী পড়ে আমি চলে আসি ঢাকায়।  ভর্তি হই কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায়ে নুরিয়া আশ্রাফাবাদে।  ততদিনে ওয়াসেলের হেফজ শেষ।  প্রাথমিক উর্দু দু-একটি কিতাব পড়ছিল ময়মনসিংহে। আমাকে কামরাঙ্গীরচর মাদরাসায় ভর্তি করানোর তিন সপ্তাহ বা মাস খানেকের মধ্যেই ওয়াসেলকে নিয়ে আসেন খালু। একপর্যায়ে আমরা একই ক্লাসে ভর্তি হয়ে যাই।

মাদরাসায়ে নুরিয়ায় আগাগোড়া আমরা ছিলাম সহপাঠী।  প্রথম দুই বা তিন বছর একদম সামনের দিকে না থাকলেও আহলুল্লাহ ওয়াসেল নাহবেমীর- হেদায়াতুন্নাহুর বছর থেকে প্রথমদিককার সিরিয়ালে থাকত।  আমাদের ক্লাসে ১০ থেকে ১৫ জন ছাত্র ছিল এমন, যারা যেকোনো পরীক্ষায় প্রথমদিককার সিরিয়ালের চলে আসতে পারে ‌। এটা নিয়ে কিছু প্রতিযোগিতাও ছিল, উস্তাদদের সুদৃষ্টিও ছিল।

ওয়াসেল ভালো ছাত্রদের একজন ছিল। একারণেও মাদরাসাযয়ে নুরিয়ার উস্তাদরা তাকে চিনতেন।  আরেকটি কারণও ছিল তাকে সবার চেনার।  সেটা হলো,  ওই প্রথম কিশোরকাল থেকেই তার ছিল তীব্র হাঁপানি রোগ। মাঝে মাঝে তিন- চার দিন বা সপ্তাহ জুড়ে তার কষ্টকর শ্বাস-প্রশ্বাস ও বুকের ওঠানামা চলতে থাকত।  এমন বহু হয়েছে যে ক্লাস চলছে, ওয়াসেল  ক্লাসের পাশে বিছানায় আধা শোয়া হয়ে কিতাব ধরে আছে।  এমন বহু হয়েছে,  পরীক্ষার সময় অসুস্থ ওয়াসেল পরীক্ষার হলে যাচ্ছে, তার সঙ্গে কেউ  একজন ভাঁজ করা কাঁথা অথবা কম্বল নিয়ে যাচ্ছে।  পাশের জন  পুরো পরীক্ষা জুড়ে তার পাশে পাশে থাকছে।  শুধু ওয়াসেলের অসুস্থতার কারণে তার সুবিধা-অসুবিধা দেখতে। দাওরায়ে হাদিস পর্যন্তই ওয়াসেলের স্বাস্থ্য ছিল হ্যাংলা পাতলা,  অত্যন্ত শীর্ণ দেহের অধিকারী।  তার চলাফেরার দুর্বলতা ও অসুস্থতার এজাতীয় নাজুকতার কারণে উস্তাযরা মাদরাসা জুড়েই ওয়াসেলকে চিনতেন।

এর আরো একটি দিক ছিল অন্যরকম।  বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক দোয়ার মজলিস বসতো মাগরিবের পর।  আর শুক্রবার ফজরের পর।  মজলিসগুলোর শেষে অসুস্থ ছাত্রদের জন্য দোয়া করা হতো। ওয়াসেলের নাম নিয়ে অনেকবার দোয়া হয়েছে। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. যখন দোয়া করতেন সে সময়েও উস্তাযরা ওয়াসেলের  নাম মনে করিয়ে দিতেন‌।

পাঁচ.

মাদরাসায়ে নুরিয়ায় আমাদের পড়াশোনা, বিকেলে ক্রিকেট খেলা  আর অবসর সময়ে নিজেদের মধ্যে লেনদেন করে বইপত্র পড়ার জায়গাগুলোতে আমরা আলাদাভাবে একসঙ্গে হতাম।  আমাদের ক্লাস এবং উপরে- নিচে আরও  ২/৩  ক্লাস পর্যন্ত ছিল এই যোগাযোগের আলাদা একটা বলয় । দেয়ালিকায় টুকটাক লেখালেখির সময় আমরা একজন আরেকজনকে লেখা দেখাতাম আগে। এখানেও ওয়াসেলের অংশগ্রহণ ছিল।  তবে ওয়াসেলের স্বাভাবিক স্বভাব ছিল চুপচাপ থাকা।  কথা কম বলা।  সব পরিস্থিতিতে অনুত্তেজিত থাকা।  আমাদের এই গ্রুপটিতে ওয়াসেল ছিল, আমি ছিলাম,  পাশের জামাতের ইয়াহইয়া ইউসুফ ছিল,  মুহাম্মদ ইউসুফ ছিল। ছিল আইয়ুব আলী, আব্দুল জব্বার, আতাউর রহমান ভাইসহ আরো কয়েকজন । ওয়াসেল লেখালেখির জন্য লিখত কম, পড়তো বেশি ‌। হেদায়াতুন নাহু থেকে দাওরায়ে হাদীস পর্যন্ত এভাবে প্রচুর বইপত্র, ঈদসংখ্যা, বিশেষ সংখ্যা আমরা পড়ার সুযোগ পেয়েছি।

ওয়াসেল,  আমি  এবং তখন হেফজখানায় পড়তো আমাদের আরেক খালাতো ভাই মুহাম্মদ, আমাদের এই কয়েকজনের বিশেষ মুরব্বি ও অভিভাবক ছিলেন হযরত মাওলানা আব্দুল হক সাহেব- ময়মনসিংহের হুজুর।  আমাদের সব টাকা-পয়সা, ছুটিছাটার অনুমোদন আলাদাভাবে নিতে হতো ময়মনসিংহ হুজুরের কাছ থেকেই। প্রতিদিন দুইবেলা হুজুরের কাছে খাতা নিয়ে যেতাম । নাস্তা কিংবা অন্য প্রয়োজনের কথা লিখে টাকার অংক বসিয়ে টাকা নিয়ে আসতাম।  আমাদের শরহেজামী পর্যন্ত হুজুর ছিলেন মাদরাসায়ে নুরিয়ায়।  সে পর্যন্ত আমরা এই নিয়মই মেনে চলেছি।  এসব ক্ষেত্রেও আমাদের আসা-যাওয়া, খানা -নাস্তা ও প্রয়োজন পূরণের ব্যাপারগুলো একসঙ্গেই ঘটতো ‌।  কাফিয়া ও শরহে বেকায়ার বছর আমি অন্য মাদ্রাসায় চলে গিয়েছিলাম।  এছাড়া মেশকাতের শুরু পর্যন্ত মাদরাসায়ে নুরিয়ায় আমরা একসঙ্গেই ছিলাম।

মাদরাসায়ে নুরিয়ায় আমাদের প্রতি বিভিন্ন সময় বিশেষ সুদৃষ্টি রাখা মুরুব্বীদের মধ্যে ছিলেন হযরত মাওলানা আব্দুল হক  ময়মনসিংহ হুজুর,  হযরত মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ- আদিব হুজুর,  হযরত মাওলানা ইসমাইল- বরিশালি হুজুর,  হযরত মাওলানা আজিমউদ্দিন -বাঁশবাড়িয়া হুজুর।

মেশকাত  ও দাওরায়ে হাদিস আমাদের পড়া হয় লালবাগে। দাওরার পর আমি চলে যাই মতিঝিল মাদরাসায় শিক্ষকতায়। আর ওয়াসেল থেকে যায় লালবাগে।

লালবাগ মাদরাসা

লালবাগে দাওরায়ে হাদিসের পর তার প্রথম বছর কাটে এক বছরের তাফসীর বিভাগে।  তাফসীরে মাযহারী সে সেখানে বিশেষভাবে দরসে পড়ে হযরত মাওলানা আব্দুল মজিদ ঢাকুবী হুজুর রহ. মুফতি আমিনী রহ. ও হযরত মাওলানা আব্দুল হাই সাহেবের কাছে।  এরপর এক বছর ইফতা বিভাগের তামরীন করে। ওই সময়ই হযরত মুফতি আমিনী রহ.-সহ অন্যান্য প্রবীণ উস্তাযের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ গড়ে ওঠে তার। উস্তাযদের বিশেষ স্নেহ লাভ করার সুযোগ পায়। এর পরের বছর থেকেই লালবাগ মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ লাভ করে ওয়াসেল।

ছয়.

এই সময়টা থেকেই ওয়াসেলের ব্যস্ততার ধরনে একটু বাঁক বদল ঘটতে থাকে। দরসের পড়াশোনার বাইরে আন্দোলন ও রাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন রকম প্রচারমূলক লেখায় তার বেশিরভাগ সময় কাটে।  বিভিন্ন মিডিয়ায় নিউজ পাঠানো এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা -এগুলো ছিল  ওয়াছেলের দায়িত্ব। আমাদের চেনা একজন অন্তর্মুখি মানুষ হয়েও মুফতি আমিনী সাহেব রহ.- এর পক্ষে এ কাজটি সফল ও সুন্দরভাবে আঞ্জাম দিয়ে যায় ওয়াসেল ।

লালবাগে এক সময় মুফতি মুহাম্মদ তৈয়ব ভাই এ কাজগুলো বেশি করতেন। ওয়াসেল এ অঙ্গনে ব্যস্ত হওয়ার পর তৈয়্যব ভাই অন্য কাজে মনোযোগ দেন বেশি। ৯০- এর দশক ও নতুন শতাব্দীর শূন্য দশকে আন্দোলন-সংগ্রামে লালবাগের আরও অনেকেই মুফতি আমিনী সাহেব হুজুরের সঙ্গে কাজ করতেন। মুফতি ফয়জুল্লাহ ভাই, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব, মাওলানা আবুল কাসেমসহ অনেকেই ছিলেন। কিন্তু দাওরার পর থেকেই আমি ছিলাম লালবাগের বাইরে। তবু ঠিক পুরোপুরি বাইরে থাকতে পারিনি। কখনো নিজে উৎসাহে এসে যুক্ত হয়েছি কোনো কোনো কাজে । মুফতি আমিনী সাহেব হুজুর নিজ থেকে ডেকে নিয়েছেন বহু কাজে।  শুরুর দিকে তৈয়ব ভাই ডেকে নিযুক্ত করেছেন কিছু কিছু কাজে।  আর পরের দিকে প্রায় দেড় যুগের মতো লালবাগের সঙ্গে আমার প্রধান যোগসূত্র ছিল মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল।

সাত.

ওয়াসেলের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বন্ধুত্বের ছিল,  সহপাঠীর ছিল, ছিল ছোট ভাই- বড় ভাইয়েরও।  এজন্য অনেক সময়ই আমার জন্য উপযোগী অনেক কাজ  ও ক্ষেত্রে সে নিজ থেকে আমাকে যুক্ত করতো।  অনেক সময় অনেক বিষয় থেকে সতর্কও করতো। অনুষ্ঠান-প্রোগ্রামে সব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে আমাদের মধ্যে ছিল একটা অনানুষ্ঠানিক জোরালো সম্পর্ক। রাজনীতি নিয়ে এমন তর্কের স্মৃতি আমার আর বশির ভাই ও খালিদ মামার অগণিত যে, আমরা ওয়াসেলকে কোনো একটা বিষয়ে চেপে ধরেছি, এটা কেন করছ, ওটা কেন করছ না? এটা কেন বলছ, ওটা কেন বলছ না? আল্লাহর বান্দার মুখ বন্ধ। টুকটাক কিছু একটা বলে পাশ কাটিয়ে শেষে বলতো, আচ্ছা-আজকে যাই।

লালবাগে মাঝেমধ্যে আমাদের বৈঠক বসতো।  আবার পল্টনে বশির মেসবাহ ভাইয়ের অফিসে আমরা মিলিত হতাম বেশিরভাগ সময়।  এমন অনেক হয়েছে, আমরা একেক জন দূরে দূরে আছি,  ওয়াসেল পল্টন কিংবা তার কাছাকাছি  আসছে, আমাদের খবর দিতে থাকতো।  মাগরিবের মধ্যেই আমরা পল্টনে একসঙ্গে হয়ে যেতাম। বহু সময় কোনো উপলক্ষ ও কারণ ছাড়াই লালবাগে যাওয়ার জন্য দাওয়াত দিতে থাকত। আমরাও চলে যেতাম।

ওয়াসেল লালবাগে থাকার কারণে,  আর লালবাগ ইসলামী নানামুখী কর্মতৎপরতার একটি কেন্দ্র হওয়ার কারণে দেশের অনেক আলেম বন্ধুর সর্বশেষ খবর পেতাম তার কাছে।  অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হতো ওয়াসেলের মাধ্যমে।  মাদরাসায়ে নুরিয়া কেন্দ্রিক,  লালবাগ মাদরাসা কেন্দ্রিক আমাদের পুরনো সাথীদের অনেকের সন্ধান ও কাজকর্মের অবস্থা ওয়াসেলের কাছ থেকেই জানতে পারতাম।  মুফতি আমিনী রহ.- এর স্নেহধন্য ঘনিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে ওয়াসেল নিজেও আমাদের অনেকের জন্য একটি কেন্দ্রে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। ওয়াসেল মুফতি আমিনী রহ -এর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিল শেষ দশ বারো বছর। শুধুমাত্র সংবাদ প্রচারের বিষয় না, বরং ব্যক্তিগত ও সংগঠনগত অনেক বিষয়ে ওয়াসেলের প্রতি মুফতি আমিনী সাহেব হুজুর রহ. আস্থা রাখতেন।  এটা আমরা দূর থেকে দেখতাম।

মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল ছিল স্বভাবগতভাবে নামাজ ও তেলাওয়াতের পাবন্দ। হেফজ শেষ করার পর থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত সব রমজানেই তারাবিহ পড়িয়েছে। প্রথমদিকে আমাদের বাসার কাছের মসজিদে প্রায় ৮-১০ বছর, এরপর ময়মনসিংহ ঈদগাহ মাঠ মসজিদে বছর দুয়েক।  তারপর থেকে ঢাকায়।  গত ২০ বছরের বেশি সময় ধরে দিনে  ৩ পারা করে পড়িয়ে দশ দিনের তারাবিহে কোরআন শরীফ খতম করতো সে।  ১০ দিনে খতম করার প্রথম উদ্যোগ শুরু হয় লালবাগ মাদ্রাসার দফতরে।  হযরত মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ. ছিলেন এই  তারাবির প্রধান মুসল্লী। এছাড়াও সেই জামাতে শরিক হতো আরো প্রায়  ৪০-৫০ জন। মুফতি আমিনী রহ.- এর ইন্তেকালের পরও এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।  গোটা রমজানে তারাবি পড়াতো সে একাই। আমাদের প্রজন্মে সামগ্রিকভাবে সে ছিল এক আল্লাহওয়ালা আলেমেদ্বীন। মানুষের জীবন ও চিত্তে নানামাত্রিক ওঠানামা তো থাকেই। কিন্তু একরকম নিঃশব্দতা, নির্লিপ্ততা আর দ্বীনকেন্দ্রিক জীবনের আবর্তন সবার ভাগ্যে জোটে না। ওয়াসেলের সেটা ছিল।

মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল রহ.-এর চোখে পড়ার মতো ভালো গুণটি ছিল, কাউকে কোন রুঢ় কথা না বলা। কারো কোনো আচরণ অথবা কথা পছন্দ না হলে সে এড়িয়ে যেত।  খুব প্রয়োজন না পড়লে তর্কে জড়াতো না‌।  নিজ থেকে  সে কাউকে কষ্ট দিয়েছে,  এমন উদাহরণ পাওয়াটা কঠিন।

ওয়াসেল নিজে ছিল নিচুকন্ঠ মানুষ‌।  কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিয়েছে এমন দৃশ্য আমি কম দেখেছি।  কোথাও এরকম কোনো পরিস্থিতি দাঁড়ালে সে গুছিয়ে অল্প কয়েকটি কথা বলে বিদায় নিত‌।  বক্তব্য বক্তব্যের মতো করে দেওয়ার চেষ্টা করত না।  তারপরও বিভিন্ন মিছিল ও অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা তার ছবি ধারণ করত ও প্রচার করত।  দূর থেকে আমরা ওয়াসেলকে ‘কর্মতৎপর একজন রাজনীতিকের’ মতো দেখতে পেতাম। এবং আমাদের ‘চেনা’ ওয়াসেলকে মিছিলের অগ্রভাগে দেখে অবাক হতাম। অপরদিকে তার লেখার হাত ছিল বড় সুন্দর। যা-ই লিখতো ঝরঝরে ভাষায় ফুটিয়ে তুলতো। মুজিযায়ে রাসুল (সা.)-এর ওপর তার লেখা কিশোরপাঠ্য একটি বই মাকতাবাতুল আযহার থেকে প্রকাশ হয়েছে। এমদাদিয়া লাইব্রেরীসহ বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অনেক অনূদিত পাণ্ডুলিপি সে সম্পাদনা করে দিয়েছে। মুফতি আমিনী সাহেব রহ.-এর কিছু বইপত্রের অনুলিখন ও সম্পাদনার কাজও সে সফলভাবে করেছে।

বিয়ের আগে পরে থেকেই ওয়াসেলের স্বাস্থ্য আমূল বদলে যায়।  একটু স্বাস্থ্যবান ও স্ফীত হয়ে ওঠে।  নূরিয়া মাদরাসার সহপাঠীরা অনেকদিন পর তাকে দেখে অনেকেই অবাক হয়ে যেত।  পরবর্তী সময়ে ওয়াসেলের হাঁপানির টানটা কমে যায়।  সে একটু স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে।  শেষ কয়েক বছর তার ডায়াবেটিসের বিষয়টা আমাদের জানা ছিল। ডায়াবেটিস খুব বেশি ছিল এমন শুনিনি।  মাঝে মাঝে অসুস্থ বোধ করলে দেখা হলে ছোট্ট করে বলতো।

পরিবারের প্রতি তার দৃষ্টি ও যত্ন ছিল অনেক বেশি।  অনেক অমীমাংসিত বৈঠক রেখে ওয়াসেলকে চলে যেতে দেখেছি, পরিবারের কাউকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার প্রয়োজনে।  কখনো ভাবির জন্য, কখনো তার কোনো ছেলে বা মেয়ের জন্য।  আমরা যতই তাকে বসে আলোচনা শেষ করে যেতে বলতাম সে তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকত। যাওয়ার সময় চুপচাপ উঠে চলেই যেতো। চাপাচাপি ও কথার কোনো উত্তর দিত না।

আট.

ওয়াসেলদের বাড়ির সামনে সে গত কয়েক বছরে আগে নতুন ছোট্ট একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছে।  কয়েকবার তার সঙ্গে তাদের বাড়িতেও যেতে হয়েছে।  ওয়াসেলের ডাকে দুবার গিয়েছি মাহফিলের সময়।  নরসিংদী মনোহরদীর শেখেরগাঁও।  ওই মাদরাসটি স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে একদম নিজ উদ্যোগে সে গড়ে তুলেছে।  মক্তব হেফজখানা ও নিচের দিকে দু- একটি জামাত।

ওয়াসেলদের বাড়ির সামনে একটি বড় আলিয়া মাদরাসা রয়েছে আগে থেকে।  এক সময় ওই মাদরাসাটির অনেক নামডাক ছিল। ওয়াসেলের দাদা মাওলানা হারিস উদ্দিন সাহেব রহ. স্থানীয়ভাবে অনেক প্রভাবশালী ও গণ্যমান্য একজন ব্যক্তি ছিলেন।  তার দাদার ছোট ভাই ছিলেন আমার নানা,  মাওলানা জালাল উদ্দিন রহ. ‌। শিক্ষকতা উপলক্ষে নানা চলে গিয়েছিলেন ময়মনসিংহে।  ওয়াসেলের দাদা নিজের বাড়িতে রয়ে গিয়েছিলেন।  তাদের হাতে গড়া ছিল ওই আলিয়া মাদরাসাটি। শিক্ষাদীক্ষা ও সামগ্রিক আমল-আখলাকের মানের মারাত্মক অবনতির কারণে ওই মাদরাসার ব্যাপারে ওয়াসেল ও তাদের পরিবার নিরাসক্ত হয়ে গিয়েছিল।  এখান থেকেই ওয়াসেলের এই নতুন মাদরাসার উদ্যোগ। মাদরাসাটি এখনও চালু আছে।

এছাড়াও ইন্তেকালের কযেকবছর আগে থেকে কেরানিগঞ্জের রাজাবাজার এলাকার একটি মাদরাসার দায়িত্ব পড়েছিল তার ওপর। সেখানে সে বুখারি শরীফের একটি দরস দিত। সপ্তাহে দুদিন গিয়ে অন্যান্য বিষয়েও খোঁজখবর নিয়ে আসতো। দুবার দুটি প্রোগ্রাম উপলক্ষে আমারও সেখানে যেতে হয়েছে।

ওয়াসেল আমার খালাতো ভাই।  আবার তার আব্বা হলেন আমার আম্মার বড় চাচাতো ভাই।  অর্থাৎ তার আব্বা-আম্মা ছিলেন চাচাতো ভাই-বোন। মুরব্বিদের সিদ্ধান্তে এই বিয়ে হয়। ওয়াসেলের আম্মা মারা যাওয়ার পর খালুর আবার বিয়ে হয় ময়মনসিংহের মাইজবাড়িতে, মাওলানা মনসুরুল হক খান রহ.-এর বোনের সঙ্গে। ওই ঘরের সব ভাইবোনই তার ভাইবোন। ওই খালাম্মাই ওয়াসেলের আম্মা। ওয়াসেলদের দাদার বাড়ি আর আমাদের মায়ের দাদার বাড়ি একটাই। ফলে মনোহরদীর ওই শেখেরগাঁও আমাদের শৈশবের স্মৃতিতে বহুল পরিচিত একটি নাম।  আম্মা  তার শৈশবের রঙিন গল্পগুলো শেখেরগাঁওকে নিয়ে করতেন।

ওয়াসেলের আব্বা মাওলানা ফখরুদ্দিন রহ. কর্মজীবনের শুরুর দিকে ছিলেন ময়মনসিংহে। নাসিরাবাদ স্কুলের ইসলামিয়াতের শিক্ষক।  শহরের নওমহল এলাকায় নানার বাসার সামনে তাদের একটি দোকানও ছিল। ওয়াসেলের ছাত্র জমানার মাঝামাঝি সময়ে খালু ময়মনসিংহের চাকরি ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি শেখেরগাঁও চলে যান।  প্রথমে ওই আলিয়া মাদরাসায় যোগ দেন স্থানীয় লোকজনের অনুরোধে।  পরে অবসর গ্রহণের পর তিনি মনোহরদী উপজেলা সদরের মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।

মনোহরদীর প্রধান যে ঈদের মাঠ সেখানে একসময় ইমামতি করতেন ওয়াছেলের দাদা, একসময় ইমামতি করতেন ওয়াসেল এবং আমার নানা। এরপর ওয়াসেলের আব্বা। স্থানীয় মানুষেরা ইলম, আমল, আখলাক ও শরাফতের কারণে  এই খান্দানের  পরম্পরার প্রতি সম্মান জানাতে পছন্দ করতেন।  এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের খালু-  ওয়াসেলের আব্বার ইন্তেকালের পর উপজেলা মসজিদে খতিবের দায়িত্ব পড়ে ওয়াসেলের ওপর।  প্রায় প্রতি সপ্তাহে এজন্য ওয়াসেলকে মনোহরদী যেতে হতো।  শুধুমাত্র ওয়াসেলের সঙ্গে যাওয়া এবং তাদের বাড়িতে বেড়িয়ে আসার জন্য কোনো কোনো শুক্রবার আমি ওয়াসেলের সঙ্গে মনোহরদী গিয়েছি। আবার দু-একবার গিয়েছি মাহফিলের সফরে পথের বিরতি হিসেবে। শুক্রবার থাকায় একটু আগে বের হয়েছি। জুমার পর ওয়াসেলের সঙ্গে দেখা করে-খানা খেয়ে পরের পথ ধরেছি।

নয়.

তখন সকাল দশটা- এগারোটা হবে।  মিরপুর ১২ নাম্বার মোল্লা মার্কেটে ইসলাম টাইমস অফিস শুরুর প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যস্ত।  আগামীকাল থেকে অফিস নিয়মিত শুরু। আমার সঙ্গে তখন সালাহউদ্দিন জাহাঙ্গীর।  দিনব্যাপী নানা রকম জিনিসপত্র সংগ্রহের পেছনে আমাদের সময় যাবে।  কিছুটা ক্ষিপ্র গতিতেই চলছিল কেনাকাটা।  এ সময়ে হঠাৎ ফোন এল।  প্রথমে একটা, তারপর আসতেই থাকলো। মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াসেল ইন্তেকাল করেছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ রবিবারের কথা বলছি।

শান্তভাবেই আমি ঘামতে লাগলাম। প্রথমে মাথা মোটেই কাজ করছিল না। মনে হচ্ছিল, আমি বসে বসে বাচ্চাদের মতো চড়ুইভাতি খেলছি। মনে হচ্ছিল, আমরা সবাই টাইমবোমার ওপর বসে আছি। কে কখন চলে যাই ঠিক নাই। এরপর  ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে করণীয় ঠিক করে সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীরকে সব বুঝিয়ে দিলাম।  এখন বাসায় যাব, বাসা থেকেই লালবাগ।  কিন্তু বাসায় আসতেই শরীর নেতিয়ে পড়তে থাকলো।  কিছুতেই চলতে পারছি না।  কী হয়ে গেল, কীভাবে হয়ে গেল!

ঘন্টা দেড়েক পর লালবাগের উদ্দেশে রওনা দিলাম। বহু ফোন আসছে, কোনোটাই রিসিভ করা হচ্ছে না। শুধু আমার ছেলেকে ফোন দিয়ে খবর দিলাম, তোমার ওয়াসেল চাচার ইন্তেকাল হয়ে গেছে। দোয়া করতে থাক।

পরে শুনেছি, দুই- তিন দিন ধরেই শরীরটা খারাপ লাগছিল তার।  কিন্তু দূর থেকে আমি কিছুই  জানতাম না।  কয়েকদিন আগে সন্ধ্যার পর লালবাগে দেখা হয়েছে, তখনো তাকে ক্লান্ত মনে হয়েছে।  কিছুই বুঝতে পারিনি।  ইন্তেকালের দুদিন আগে হবে, কেরানীগঞ্জে রাজাবাজার হয়ে আসছিলাম বাবুবাজার।  পথে তাকে ফোন দিয়েছিলাম। সেই পুরনো কথা। ‘মাদরাসাটা হয়ে যাও। আমি বলে দিচ্ছি, তুমি গেলে ওস্তাদরা খুশি হবেন।’

মাওলানা ওয়াসেল তখন ওই মাদরাসায় অবস্থান করছিল না, ছিল লালবাগে।  আমি আর সেদিন যেতে পারি নি। নিজের আঙিনায় এভাবে দরদের সঙ্গে দাওয়াত দেওয়াটা তার একটা বৈশিষ্ট্যই ছিল। আর কোনোদিন এরকম দাওয়াত সে আর দেবে না।

হঠাৎ চলে যাওয়া এই দীর্ঘ আপন মানুষটির জন্য আমরা কী করতে পারি,  আমরা সেটা জানি।  যারা তাকে চেনেন,  তাদেরকে বলবো না, তার জন্য দোয়া করুন। আমার বিশ্বাস,  তারা দোয়া করছেন, দোয়া করবেন।  আর যারা তাকে চেনেন না, চিনতেন না, তাদের কাছে বলবো,  একজন ভালো মানুষের জন্য,  পরলোকে চলে যাওয়া একজন নেককার  ও কর্মতৎপর আলেমে দ্বীনের জন্য সুযোগ পেলে একটু দোয়া করবেন।