মুহাররম বনাম সমাজে মুহাররমের আনুষ্ঠানিকতা

152

মাওলানা মুহাম্মাদ যাকারিয়া আবদুল্লাহ ।।

ইসলামের শিক্ষা ও জীবনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ছিল, সহজতা ও স্বাভাবিকতা। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর বর্তমান জীবন-যাত্রায় এর বিপরীত দৃশ্যই বেশী পরিলক্ষিত হচ্ছে। সামাজিকতার পর্ব-উৎসব, জীবনাচার সবকিছুতেই অধিকাংশ মুসলমানের জীবন আনুষ্ঠানিকতাবহুল হয়ে পড়েছে। সহজ সরল জীবন-যাত্রা, যা ছিল ইসলামের শিক্ষা এবং উম্মাহর পূর্বসূরী কর্মবীরগণের বৈশিষ্ট্য, তা এখন অনেকটাই বিদায় নিয়েছে। এখন জীবন জুড়ে অনুষ্ঠানের ঘনঘটা। এসকল স্ব-আয়োজিত অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততায় মানুষের জীবন এতই ব্যস্ত ও আবদ্ধ হয়ে পড়েছে যে, প্রয়োজনীয় কাজের ফুরসত তার কমে গেছে। আর এই আরোপিত আনুষ্ঠানিকতা শুধু সাধারণ জীবনযাত্রাকেই নয়, আমল-ইবাদতকেও ভারাক্রান্ত করে তুলেছে। এমন অনেক বিষয়কে মানুষ ছাওয়াবের কাজ বানিয়ে নিয়েছে যেগুলোর সাথে শরীয়তের নির্দেশনার কোনো সম্পর্ক নেই। শরীয়তের পরিভাষায় যা ‘বিদআত’ হিসাবে চিহ্নিত।

হিজরী বর্ষের প্রথম মাস মুহাররম। এ মাসে এবং এ মাসের একটি বিশেষ ফযীলতপূর্ণ দিবস ‘আশুরা’র কিছু ফযীলতপূর্ণ আমলের কথা হাদীস শরীফে আছে। যেমন সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে,

أفضل الصيام بعد رمضان شهر الله المحرم

‘রমযানের পর আল্লাহর মাস মুহাররমের রোযা সর্বশ্রেষ্ঠ।’ -সহীহ মুসলিম ১/৩৬৮; জামে তিরমিযী১/১৪৭

আর আশুরার রোযা সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

صيام يوم عاشوراء احتسب على الله أن يكفر السنة التى قبله

‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার  রোযা দ্বারা আল্লাহ অতীতের এক বছরের (সগীরা) গুনাহ মাফ করবেন।’ -সহীহ মুসলিম ১/৩৬৭; জামে তিরমিযী ১/ ১৫৮

অন্য হাদীসে আছে, তোমরা আশুরার রোযা রাখ এবং ইহুদীদের সাদৃশ্য ত্যাগ করে আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোযা রাখ।- মুসনাদে আহমাদ ১/ ২৪১

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের  এই হাদীসসমূহের উপর আমল করে কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে নফল রোযার বিষয়ে যত্নবান হন তাহলে তা অনেক সৌভাগ্যের বিষয়। এরপর ‘আশহুরে হুরুম’ বা সম্মানিত চার মাসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কারণে কেউ যদি এ মাসে গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করে এবং নেক আমলে বেশী যত্নবান হয় তাহলে সেটাও কল্যাণকর বিষয়। কিন্তু এসব সহজ সরল নেক আমলের পরিবর্তে একশ্রেণির মানুষের আগ্রহ আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব বিভিন্ন কাজে। যার অনেক কিছু অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতাই শুধু নয়, নানা নিষিদ্ধ ও গর্হিত কাজও বটে। যেমন, তাজিয়া, শোকগাঁথা পাঠ, শোকপালন, মিছিল ও র‌্যালি বের করা, শোক প্রকাশার্থে শরীর রক্তাক্ত করা ইত্যাদি। তেমনি এ মাসে বিয়ে-শাদি থেকে বিরত থাকা এবং এ মাসটিকে অশুভ মনে করার প্রবণতাও অনেকের মাঝে দেখা যায়। এটা ঠিক যে, এ মাসে নবী আ.-এর দৌহিত্র ও সাহাবী হযরত হুসাইন রা. মর্মান্তিকভাবে শাহাদাত বরণ করেছেন। একজন মুসলিমের জন্য এ শোক সহজ নয়, কিন্তু একে কেন্দ্র করে শোক পালন করা, মাতম করা স্বয়ং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামেরই শিক্ষা -‘নিশ্চয়ই চোখ অশ্রুসজল হয়, হৃদয় ব্যথিত হয়, তবে আমরা মুখে এমন কিছু উচ্চারণ করি না, যা আমাদের রবের কাছে অপসন্দনীয়।’-এর খেলাফ।

নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন, ‘ তাদের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই, যারা মুখ চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে আর জাহেলী যুগের কথা বলে।’- সহীহ বুখারী, হাদীস ১২৯৮

আরেকটি বর্জনীয় বিষয় এই যে, অনেক বক্তা এ মাসের বিশেষত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে এমন সব অমূলক কথা বর্ণনা করেন ইতিহাসে যেগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। কেউ কেউ হাদীস হিসাবেও এসব ভিত্তিহীন কথা বর্ণনা করেন। বলাবাহুল্য, শরীয়তের দৃষ্টিতে এটাও মারাত্মক গুনাহ ও বর্জনীয় কাজ। না জেনে কোনো কথা বলা, আসর জমানোর জন্য ভিত্তিহীন কাহিনী বর্ণনা করা, ভিত্তিহীন চিন্তা ও বিশ্বাস পোষণ করা এবং অপ্রয়োজনীয় ও গর্হিত আনুষ্ঠানিকতায় ব্যস্ত হওয়া- শরীয়তের পরিভাষায় এগুলোর নাম ‘তাকাল্লুফ’, যা বর্জনীয়।

বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন, ‘হে লোকসকল! যার কোনো বিষয় ভালভাবে জানা আছে সে  যেন তা বলে আর যে জানে না সে বলবে, ‘আল্লাহই ভাল জানেন।’ কারণ যা জানা নেই সে সম্পর্কে এ কথা বলা যে, আল্লাহ ভাল জানেন, ইলমেরই অংশ। (তাফসীরে ইবনে কাছীর ৪/৪৪) সুতরাং কোনো বিষয়ের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে ভালভাবে না জেনেও তা বর্ণনা করা জ্ঞানী মুমিনের শান নয়; বরং এক হাদীসে স্বয়ং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ করেন কারো মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্যে এটাই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে (সত্য মিথ্যার যাচাই ছাড়া) তা-ই বর্ণনা করে। -সহীহ মুসলিম ১/৮; হাদীস ৫/; সুনানে আবু দাউদ ২/৬৮১, হাদীস ৪৯৮২

একইভাবে জীবন-যাত্রায় অপ্রয়োজনীয় লৌকিকতা ও আনুষ্ঠানিকতাও নিন্দিত ‘তাকালস্নুফ’, যা ত্যাগ করা অতি প্রয়োজন। কারণ এ সকল আনুষ্ঠানিকতার পেছনে সাধারণত সুনাম, সুখ্যাতি ও লোকদেখানোর প্রবণতা কার্যকর থাকে, যা নিন্দনীয় ও বর্জনীয়। তেমনি অপ্রয়োজনীয় কাজকর্মকে প্রয়োজনীয় বানিয়ে নেওয়া বুদ্ধিমান মুমিনের শান নয়। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইরশাদ-

من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه

‘সুন্দর মুসলমানিত্বের একটি দিক, অপ্রোয়জনীয় কাজ ত্যাগ করা’।

উপরন্তু এসবের সাথে যখন নানা ধরনের অন্যায় ও গর্হিত কাজ যুক্ত হয় যেমন, নাচ, গান বেপর্দা চলাফেরা এবং নানা শিরকী ও বিদআতী কাজকর্ম,  তখন তা আরো বেশী বর্জনীয় হয়ে পড়ে। এ কারণে প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকাল্লুফ ও আরোপিত নিয়ম কানুনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে ইসলামের সহজ-সরল শিক্ষার অনুসারী হওয়া। হিজরী বর্ষের প্রথম মাসে এই হোক আমাদের সংকল্প। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন। আমীন।