আসামের বিদেশী বন্দীশিবির : বৈষম্য ও বঞ্চনার গল্প

144

এনাম হাসান জুনাইদ।।

বিজ্ঞাপন

তখন মধ্যরাত। নভেম্বর ২০১৬। মার্জিনা বিবি ঘুম থেকে উঠেছেন দরজায় কারো কড়া নাড়ার শব্দ শুনে।

“যখন আমি দরজা খুললাম, দেখি দুজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা আমার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা আমার ঘরে ঢুকলেন। এবং আমাকে তাদের সাথে যেতে বললেন,” বলছিলেন ২৭ বছর বয়সী নারী মার্জিনা বিবি।

তাকে আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি রাখা হল একজন সন্দেহভাজন নাগরিক হিসেবে।

১৭ জুলাই ২০১৭ তিনি মুক্ত হন। কিছু মানবাধিকার সংস্থার প্রচেষ্টায় এ বিষয়টি প্রতীয়মান হয় যে, তাকে ভুলক্রমে আটক করা হয়েছে।

মর্জিনা বিবি আসামের গোয়ালপাড়া ডিস্ট্রিক্টের লোক। ডিটেনশন সেন্টারে তিনি প্রায় ৯ মাস কাটিয়েছেন।

“আমি খেতে পারতাম না। বারবার আমার মনে একটি কথাই ঘুরেফিরে আসতো,  আমার কি অন্যায় ছিল? তারা কেন আমাকে এখানে বন্দি করে রেখেছে?” বলছিলেন বিবি।

“আমি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করতাম, আমার কি অন্যায়? আমার সাথে আপনারা এমন আচরণ করছেন কেন? আমি তো কোন অন্যায় করিনি” যোগ করেন মর্জিনা।

তারা আমাকে বলতো, চুপ থাকুন।

মার্জিনা বিবির কে কোকরাঝাড় ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো।

“ডিটেনশন ক্যাম্প -এর ভিতরকার জীবন মান অনেক নিম্ন। খাবার বিস্বাদ। অপর্যাপ্ত জায়গা। একটি কামরায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন মানুষ আমরা থাকতাম। যখন আমরা ঘুমাতাম একজন আরেকজনের সাথে লেগে থাকতাম।”

বলেছেন মর্জিনা বিবি।

রুহুল আমিন আসামের রাজধানী গোহাটি কাছে একটি গ্রামে বাস করেন। ১৮ বছর বয়সী যুবক আমীন তার মা-বাবার কথা বলছিলেন গণমাধ্যমকে।

কিছুদিন আগে তার মা-বাবাকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৯৯৭ সনে তার বাবা-মা আইয়ুব আলী এবং রহিমা খাতুনকে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য একটি নোটিশ পাঠানো হয়।

২০১৫ সালে গোহাটি হাইকোর্টের তারা মামলায় হেরে যান। তখন তাদেরকে বন্দিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়।

“আমরা আমাদের দোকান বিক্রি করে দিয়েছি মামলায় লড়ার জন্য। আমার বাবা আমাদের জায়গা-জমি বিক্রি করে দিয়েছেন মামলার খরচ চালানোর জন্য” অশ্রুসিক্ত চোখে বলছিলেন রুহুল আমিন।

ভাইদের খরচ চালানোর জন্য শেষমেষ রুহুল আমিনকে স্কুল ছাড়তে হয়। এক পর্যায়ে তার ১৪ বছর বয়সী ভাইকেও স্কুল ছাড়তে হয়। নিকটাত্মীয় এবং প্রতিবেশীদের খরচে তার বড় বোনের বিবাহের ব্যবস্থা হয়।

“আমার বয়সের ছেলেরা পড়ালেখা করে। আমারও পড়ালেখার স্বপ্ন ছিল। এবং জীবনে ভালো কিছু করার আশা ছিল। কিন্তু হয়তো আমার জীবনের স্বপ্ন আর পূরণ হবে না,” যোগ করেন রুহুল আমিন।

আসামের আরো অনেক নাগরিকের মতো রুহুল আমীন এখন পুলিশের ভয়ে ভীত।  “এখন যদি তারা আমাকে বিদেশী ঘোষণা দেয়, এবং গ্রেফতার করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠিয়ে দেয় তাহলে আমার ছোট ভাইয়ের কি হবে?” বলছিলেন রুহুল আমীন।

আসামের ১৯ লাখেরও বেশী মানুষের নাম চূড়ান্ত জাতীয় নাগরিক পঞ্জী বা এনআরসি থেকে বাদ পড়েছে। এই ১৯ লাখ বাংলাভাষী মানুষের এখন কী হবে?

আসামের লেখিকা সঙ্গিতা বড়ুয়া পিশারডি গণমাধ্যমকে বলেন, “যাদের নাম চূড়ান্ত তালিকাতে নেই তারা অত্যন্ত শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন যে তাদের এখন কী হবে। তার প্রধান কারণ ফরেনার্স ট্রাইবুনালের ভাবমূর্তি ভালো না, মানুষের আস্থা নেই।”

“ফলে সেখানে গিয়ে আদৌ কাজ হবে কিনা তা নিয়ে বহু মানুষ সন্দিহান।”

বাদ পড়া এই মানুষদের আপিলের জন্য ১২০ দিন সময় দেওয়া হয়েছে।

বিশেষভাবে তৈরি ট্রাইবুনাল ছাড়াও তারা হাইকোর্ট বা সুপ্রিম কোর্টেও আপিল করতে পারবেন।

তবে ভারতের সমস্ত আদালতগুলো এমনিতেই সারা বছরই মামলার চাপে পর্যুদস্ত। ফলে আদালতে গিয়ে দীর্ঘ, জটিল এবং ব্যয়বহুল আপিল প্রক্রিয়ার সুবিধা কতজন নিতে পারবেন তা নিয়ে পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিস্তার সন্দেহ রয়েছ।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র, অল্প শিক্ষিত বা নিরক্ষর মানুষগুলোর জন্য এই আপিল প্রক্রিয়ায় ঢোকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ফলে যারা আপিলে অসফল হবেন বা এই প্রক্রিয়াতে ঢুকবেনই না, তারা রাষ্ট্রবিহীন হয়ে পড়বেন – সে সম্ভাবনাই প্রবল।

নাগরিকত্ব নির্ধারণে আসামে, এখন ধরনের ২০০টি বিশেষ আদালত বা ট্রাইবুনাল রয়েছে যেগুলোর অধিকাংশই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর।

অক্টোবরের মধ্যে এ ধরণের ট্রাইবুনালের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০০০।

এ সব আদালতের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের বিস্তর অভিযোগ রয়েছ। তাদের কাজের মধ্যে কোনো ধারাবাহিকতাও নেই।

সবচেয়ে বড় কথা প্রমাণের সমস্ত দায় বর্তায় বিদেশী হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তির ওপর।

লাখ লাখ দরিদ্র, নিরক্ষর মানুষের কাছে সবকিছুর লিখিত রেকর্ডও নেই।

সাংবাদিক রোহিনী মোহন আসামের একটি জেলায় এসব ট্রাইবুনালের ৫০০টিরও বেশি রায় বিশ্লেষণ করে দেখতে পান ৮২ শতাংশ অভিযুক্তকেই বিদেশী হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে । ৭৮ শতাংশ রায় হয়েছে অভিযুক্তের বক্তব্য না শুনেই।

বলা বাহুল্য বিদেশী হিসাবে ঘোষিত এসব মানুষদের সিংহভাগই মুসলমান।

সূত্র: আল জাযিরা ও বিবিসি অনলাইন