কাশ্মীরের কান্না ও মুসলিম শাসকদের ভিন্নজাতি তোষণ

473

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ।।

কাশ্মীরে জুলুমের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ১৯৪৭ -এর পর থেকেই জম্মু কাশ্মীরে ভারতীয় আধিপত্য ছিল। তার সঙ্গে ছিল নানা রকম জুলুম নির্যাতন। সম্প্রতি এ জুলুম একটি চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকার আলোচিত ৩৭০ ধারা বাতিল করেছে। যে ধারার বলে কাশ্মীরের জনগণ বিশেষ কিছু স্বতন্ত্র সুবিধা পেতেন। তাদের এই স্বতন্ত্র মর্যাদা বিলুপ্ত করার জন্যই ৩৭০ ধারা বাতিল করা হয়। এর বিরুদ্ধে কাশ্মীরের জনগণ ক্ষোভ প্রকাশ করেন,  প্রতিবাদ করেন। কিন্তু তার আগে থেকেই তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় ‌। বর্তমানে কাশ্মীরী মুসলমানরা নির্যাতন ও অবরুদ্ধতার এক কঠিন জীবন যাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

৩৭০ ধারা বাতিল করে শুধুমাত্র কাশ্মীরের স্বতন্ত্র মর্যাদাই ধ্বংস করেনি ভারতীয় সরকার, বরং জম্মু-কাশ্মীর একভাগ এবং লাদাখকে আরেক ভাগ করে কাশ্মীরকে বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। এরপর গোটা কাশ্মীরকে এই কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে।

কাশ্মীরি মুসলমানদের এই কঠিন সময়ে তাদের প্রতিবেশী পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছাড়া অন্য কোনো মুসলিম রাষ্ট্রকেই তাদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর আচরণে মনে হয়েছে, কাশ্মীরীদের এ সংকট নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যাথাই নেই। জাতিসংঘ বরাবরের মতো অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করছে। যদিও অনেক বছর পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কাশ্মীর ইস্যুতে একটি বৈঠক করেছে, সেখানেও কোনো নিন্দা প্রস্তাব পর্যন্ত পাশ করা হয়নি। সে হিসেবে নিরাপত্তা পরিষদের এ বৈঠক কাশ্মীরিদের সংকট উত্তরণে কোনো বিশেষ পদক্ষেপ রাখতে পারছে, এমন কথা বলা যাবে না।

কাশ্মীরি মুসলমানদের এই সংকট ও নির্যাতিত অবস্থার মধ্যেই দু’একটি আরব দেশের শাসকদের কাণ্ডকারখানা দেখে পৃথিবীর দেশে দেশে মুসলমানরা আরো কষ্ট পেয়েছেন। কাশ্মীরের এই পরিস্থিতির মধ্যেই প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত, পরে বাহারাইন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদক ও সম্মাননা দিয়েছে। খবরে এসেছে, দিল্লিতে নিযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত কাশ্মীরে ভারতের পদক্ষেপ ও নির্যাতনের পক্ষে বিবৃতিও দিয়েছে। কাশ্মীরি মুসলমানদের নিয়ে দুনিয়ার মুসলমানরা এমনিতেই কষ্টে আছেন। এরমধ্যে আরব রাষ্ট্রগুলোর শাসকদের এই আচরণ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের কাটা ঘায়ে লবন ছিটিয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল করার পর কয়েক সপ্তাহ যাবৎ কাশ্মীরীরা অবরুদ্ধ আছেন। সেখানে কারফিউ জারি করে রাখা হয়েছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট নেটওয়ার্কসহ যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে বা সীমিত করে দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাদের উপর চালানো নানা রকম নিগ্রহ-নির্যাতনের খবর প্রকাশ হচ্ছে। এতকিছুর পরও সৌদি আরবসহ বড় বড় মুসলিম রাষ্ট্রের কারো পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তো দূরের কথা, কোনরকম নিন্দাবাদ ব্যক্ত করার কথাও শোনা যায়নি। অবশ্য কোনো কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র কাশ্মীরের সংকট নিয়ে দু’একটি কথা বলেছে। পাকিস্তানের অনুরোধে চীন ও জাতিসংঘ কিছু বক্তব্য রেখেছে। কিন্তু যেখানে মুসলিম রাষ্ট্রগুলোই নীরবতা অবলম্বন করছে সেখানে অমুসলিম দেশ এবং অমুসলিমদের দ্বারা প্রভাবিত জাতিসংঘের কাছে কী আর পদক্ষেপ আশা করা যেতে পারে!

এখানে ভাববার এবং চিন্তা করার মতো একটি বিষয় হলো, মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের নির্যাতিত স্বজাতির ভাইদের প্রতি কেন কোনো দরদ ব্যক্ত হয় না? মজলুম মুসলমানদের জন্য তারা কেন কিছু করতে পারেন না? বরং অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতি যারা নির্যাতন চালায়, সেই নির্যাতনকারীদেরই উল্টো পুরস্কৃত করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্র। তাদের সাথেই সম্পর্ক উন্নত করার চেষ্টা করে ‌ এবং তাদের দেশে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা বিনিয়োগ করে। মুসলিম শাসকরা এমনটা আসলে কেন করেন? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রধানত দুটি বিষয় সামনে আসে।

ক্ষমতার লোভে ভিন্ন জাতিগোষ্ঠির তোয়াজ

প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, ক্ষমতার লোভ। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার লোভেই বিভিন্ন বিজাতীয় শক্তির সঙ্গে তারা সম্পর্ক রাখছে। যুগ যুগ থেকেই শাসকরা ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার জন্য বহু পন্থা অবলম্বন করে থাকে। আরব ভূখন্ডের শাসকরাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না। এমন অনেক পদক্ষেপ তারা গোড়া থেকেই রেখে এসেছেন যেগুলো ছিল সাধারণ মুসলিম নাগরিক স্বার্থের পরিপন্থী। কিন্তু গত প্রায় দুই দশক থেকে, বিশেষত ৯/১১-এর পর থেকে আরব শাসকদের যে বিষয়গুলো চূড়ান্ত অধ:পতন হিসেবে সামনে আসছে সেটি হলো, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তারা স্বজাতির বিরুদ্ধেও বিভিন্নসময় প্রকাশ্য অবস্থান নিচ্ছে। এজন্য অনেক আরব মুসলিম রাষ্ট্রকেই দেখা যাচ্ছে দখলদার ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিতে। ইসরাইলের সঙ্গে নানা রকম সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এখন কোনো কোনো আরব রাষ্ট্রের প্রধানরা সামান্যতম রাখঢাকেরও আশ্রয় নিচ্ছেন না। তাদের পক্ষের বিভিন্ন বিশ্লেষকরা অবশ্য সাফাই গেয়ে বলছেন, এটি হচ্ছে ‘সন্ত্রাসের বিরোধিতাকারীদের’ সাথে একমত হয়ে ‘সন্ত্রাস প্রতিরোধ করে’ ক্ষমতায় টিকে থাকার নীতি। আরব শাসকরা এ নীতিই এখন গ্রহণ করছেন।

অর্থাৎ তারা ভাবছে, যদি কোনো কারনে গণআন্দোলন কিংবা গণধিক্কারে তাদের ক্ষমতা চলে যাওয়ার উপক্রম হয় তাহলে ভিন্ন জাতি তথা ইহুদি- খ্রিস্টানরা তাদেরকে রক্ষা করবে। এ মনোভাবের কারণেই দেশে দেশে বিভিন্ন সময় তাদেরকে মুসলিমদের প্রতি আক্রমণকারী শক্তির সঙ্গে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। কখনো কখনো মুসলিম নির্যাতকদের সঙ্গে নীরব সম্পর্ক বজায় রাখতেও দেখা যায় । কাশ্মীর নিয়েও তারা একই অবস্থান গ্রহণ করেছে। কোনো কোনো মুসলিম রাষ্ট্র মুখে বলছে আর কেউ কেউ আচরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে কাশ্মীর ইস্যু ভারতের নিজস্ব ইস্যু। কেউ কেউ আবার বাহবামূলক আচরণ করছে, পদক ও সম্মাননা দিচ্ছে। বিশ্ব মুসলিমের অনুভুতির দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে নির্যাতক শক্তিকে পুরস্কৃত করছে, সম্মানিত করছে। তাদের আচরণে মনে হচ্ছে, অপর দেশের মুসলিম ভাইদের যারা রক্ত ঝরাচ্ছে তাদের প্রতি তারা খুব খুশি এবং ভিন্নজাতির লোকদের এ জাতীয় মুসলিমবিদ্বেষী আচরণে তাদের কিছুই যায় আসে না।

অবশ্য কাশ্মীরের প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে কাশ্মীর বিষয়ে সরব দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের অনুরোধে চীনও কিছু কিছু কথা বলছে। কিন্তু এই চীনকে দেখা যাচ্ছে আবার উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে ভিন্ন ভূমিকায়।  সেখানে তারা মুসলমানদের প্রতি নির্যাতন করছে। এ নির্যাতনের বিষয় নিয়ে আবার পাকিস্তানও চীনকে কিছু বলছে না। এখানেও কাজ করছে ক্ষমতা রক্ষা ও বাণিজ্যিক স্বার্থ। অপরদিকে কাশ্মীর বিষয়ে চীন যতটুকু যা করছে, সেটাও মৌখিক ভূমিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাস্তবে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চীনের পক্ষ থেকে নেওয়া হবে কি না সেরকম কোনো আলামত মোটেই দেখা যাচ্ছে না।

ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে স্বজাতির বিরুদ্ধে গিয়ে ভিন্নজাতি বা আক্রমনকারীদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার এই দৃষ্টান্ত বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটাচ্ছে। কিন্তু মুসলিম দেশের শাসকরা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করছে না। প্রশ্ন হলো, ভিনদেশি ও ভিন্নজাতির সঙ্গে মুসলিম দেশের জাতি-বিচ্ছিন্ন শাসকদের বন্ধুত্ব বা সম্পর্ক কি স্থায়ী হবে? সময়ের বিচারে কি এ বন্ধুত্ব টিকবে?

ইতিহাস ও বাস্তবতা তো এমন কথা বলে না। ভিন্ন জাতির শাসকেরা ক্ষমতাচ্যুত হতে যাওয়া মুসলমান কোনো শাসককে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে না। ভিন্ন জাতির লোকেরা তাদের নিজস্ব স্বার্থ ছাড়া এক কদমও নড়ে না-এমন ইতিহাস ও প্রমাণের তো কোনো অভাব নেই। ভিন্ন জাতির শাসকদের পক্ষ থেকে মুসলিম শাসকদের প্রতি সামরিক-বেসামরিক যেকোনো সহযোগিতা তাদের নিজেদের আধিপত্য ও আগ্রাসী উদ্যোগ সফল করার স্বার্থেই হয়ে থাকে, কাউকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে ন্যূনতম মায়া-দয়াও তারা প্রকাশ করে না। মধ্যপ্রাচ্যে বিগত তিন -চার দশকের ঘটনাবলী এ বাস্তবতারই জ্বলন্ত প্রমাণ বহন করে।

দীর্ঘদিন থেকে বিদেশি ও ভিন্ন জাতির আজ্ঞাবহ হয়েও বহু মুসলিম ক্ষমতাসীন শাসক চূড়ান্ত সংকটের সময় তাদের সহযোগিতা পায়নি, বরং উল্টোটাই ঘটেছে। জাতি বিচ্ছিন্ন মুসলিম শাসকদের পতনের মুখে ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন জাতির লোকেরা সরে গেছে। ইরাক,আফগানিস্তান, মিশরসহ বিভিন্ন দেশের পতিত শাসকদের পতনের সমযের ইতিহাস এ সত্যের প্রমাণ দেয়। ভিন্ন জাতির শক্তি কেন্দ্রগুলো তাদের সাহায্য করে নি। ভিন্ন জাতির দালালি করেও স্বেচ্ছাচারী মুসলিম শাসকেরা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। সাধারনত  ‘আজ্ঞাবহদের’ পতনের সময় মুসলামাদের দুশমনরা কোনো সাহায্য করে না। অথচ মুসলিম বিশ্বের শাসকেরা এ সত্যটি থেকে ইবরত হাসিল করা থেকে দুরে সরে থাকে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন (অর্থ): মুসলমানরা যেন মুসলমানদের ছেড়ে কাফেরদের বন্ধু না বানায়। যে কেউ এ কাজ করবে, আল্লাহর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এই অবস্থায় (তা করতে পারো ) যে তোমরা ওদের থেকে আত্মরক্ষা করতে চাও। আল্লাহ তার নিজের সম্বন্ধে তোমাদের সতর্ক করছেন এবং আল্লাহরই কাছে তোমাদের ফিরে যেতে হবে। (সূরা আল ইমরান, আয়াত- ২৮)

দেশে দেশে মুসলিম শাসকদের তাই মুসলিম স্বজাতিদের বিরুদ্ধে গিয়ে অমুসলিম নির্যাতনকারীকে বন্ধু বানানো উচিত নয়। এতে সংকটের সময় তারা তো কোনো সহযোগিতা পাবেই না, উল্টো পতন ঘটলেও, মৃত্যু হলেও স্বজাতির মধ্যে ‘ইন্নালিল্লাহ’ বলা বা আফসোস করার মতো লোকও থাকবে না। বিপদে-আপদে, সঙ্কটে মুসলিম শাসকরা যদি স্বজাতির পক্ষে থাকেন তাহলে অন্তত তিনি স্বজাতির সহানুভূতিটুকু পাবেন, দোয়াও পাবেন।

শাসকরা মনে রাখতে চান না যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী হয় না। যে শাসকদের সম্পর্কে বলা হতো তাদের সূর্য অস্ত যায় না, সেই শাসকদেরও ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে, ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। কারণ তারা গণবিরোধী ছিল। তাদের ‘নানারকম উন্নয়ন’ -এর কথায় দকলকৃত দেশের লোকেরা ফাঁদে পড়েনি। বরং তাদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। ঠিক একইভাবে মুসলিম শাসকেরা ভিন্ন জাতির লোকদের মদদ নিয়েও ক্ষমতায় টিকতে পারবে না। এজন্য তাদের উচিত, নির্যাতিত হলেও মুসলিম স্বজাতির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করা। মুসলিমবিরোধী নির্যাতনকারীদের তোয়াজকারীতে পরিণত না হওয়া।

অর্থকড়ির মোহ-মায়া

মুসলিম শাসকেরা স্বজাতির বিরুদ্ধে গিয়ে ভিন্ন জাতির শাসকদের প্রতি সম্মান ও আনুগত্য প্রকাশের দ্বিতীয় কারণ হিসেবে যে জিনিসটি সামনে আসে, সেটি হচ্ছে বাণিজ্যিক স্বার্থ বা আর্থিক স্বার্থ। পুরো পৃথিবীর সবকিছুই মনে হচ্ছে, অর্থের দ্বারা এবং অর্থের জন্য প্রবাহিত হচ্ছে, ব্যবহৃত হচ্ছে। সম্মান-মর্যাদা, জাতিসত্তা, দ্বীন-ধর্ম-সবকিছুই যেন অর্থের অধীনে চলে যাচ্ছে। অর্থের কাছে মানবিকতা অনেক আগেই পদদলিত হয়েছে। পৃথিবীর রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে সম্পর্ক, এক শক্তির প্রতি অপর শক্তির সম্বন্ধ ও সম্মান- এমন সবকিছুই করা হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থ দেখে। কয়েক বছর ধরে দেখছি, ভারত তো বটেই, চীন-জাপানের মতো রাষ্ট্রও জালিম মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। কারণ সে দেশে তাদের বিশাল বিনিয়োগ ও বাণিজ্য রয়েছে।

এই টাকার ভূত মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর শাসকদের উপরও চেপে বসেছে। যেসব মুসলিম রাষ্ট্রের শাসকদের পূর্বপুরুষদের কিছু ভালো আচরণের কারণে তাদেরকে ‘ইসলাম বান্ধব’ মনে করা হতো, তাদের কাঁধেও চেপে বসেছে টাকা,বাণিজ্য ও বিনিয়োগের হিসাব-নিকাশের সম্পর্ক। তারা লাভ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য এমন সব দেশে বিনিয়োগ করছে, যে দেশগুলো মুসলিম নিধনে অগ্রগামী ভূমিকা রাখছে। ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানিতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত তেল শোধনাগার কোম্পানি -আরামকো শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। অর্থকড়ির মোহমায়ার ভিত্তিতে স্বজাতির উপর জুলুমবাজদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের এটি একটি বড় উদাহরণ। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ভারতে মুসলিম বিদ্বেষী সরকার কর্তৃক কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত করা ও কাশ্মীরকে অবরুদ্ধ করার পর আরব শাসকদের পক্ষ থেকে এসব সম্পর্কস্থাপন ও সম্মাননার ঘটনাগুলো সামনে আসছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, মুসলমান শাসকরা নির্যাতনকারী ভিন্ন জাতির শক্তিকে বিশ্বাস করে আল্লাহর দেওয়া সম্পদ যেভাবে তাদের কাছে বিনিয়োগ করছে, তারা কি ভেবে দেখেছে, এমন পরিস্থিতিও সামনে আসতে পারে যে, তারা এক টাকাও ফেরত পাবে না!  পৃথিবীতে এমন ঘটনা কি কম যে, শাসকরা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে যাওয়ার পর যে দেশের একাউন্টে টাকা রাখা হয়েছে অথবা যেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে সেখানে টাকা আটকে রাখা হয়েছে!  ভিন্ন জাতির এসব শক্তির উপর আস্থা রাখা তো আত্মঘাতী পদক্ষেপ। একটা সময় পর্যন্ত মুসলিম শাসকরা এসব পদক্ষেপের বিষফল সম্পর্কে টের না পেলেও পরে করুণ পরিণতির মধ্যে তাদের পড়তে হয়। ক্ষমতা থেকে পতনও হয়, বিনিয়োগ করা অথবা গচ্ছিত রাখা টাকাও হারাযতে হয়। সুতরাং সতর্কতা গ্রহণের বিষয়টি আসলে মুসলিম শাসকদেরই দায়িত্ব। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে ইবরত গ্রহণ করে তাদের পথচলা উচিত। স্বজাতির প্রতি সহানুভূতি ও মদদের মানসিকতা পোষণ করা উচিত। এ বিষয়ে ভিন্ন দেশ ও ভিন্ন জাতির শাসকদের কিছু বলে আসলে লাভ নেই।

এদিকে  বেদনাদায়ক একটি ব্যাপার হলো, মুসলিম শাসকদের এই তোয়াজ-তোষণের প্রভাব মুসলিম দেশের জনগণের উপরও কিছু কিছু পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের সংকট শুরু হলে এখন বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মধ্যে কষ্ট, দোয়া, অন্তঃকান্না ঠিকই চলতে থাকে। কিন্তু আগের মতো দেশে দেশে মুসলিম জনতার সরব ভূমিকা চোখে পড়ে না। আগে বিক্ষুব্ধ মানুষের খবর মিডিয়ায় আসত। পশ্চিমামুখী হলেও মুসলিম দেশের প্রভাবশালী মিডিয়াগুলো মুসলমানদের বিক্ষুব্ধতার খবর প্রকাশ করতে বাধ্য হতো। এর একটি প্রভাব বিশ্বজনমতের উপর পড়ত। এখন বিক্ষুব্ধতা প্রকাশের অভাব যেমন, তেমনই মুসলিম দেশগুলোর মিডিয়াও নীরব, যেন তাদের কোনো মাথাব্যাথাই নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে মুসলমানদের প্রতি  নির্যাতক শক্তির পক্ষে মুসলিম দেশের মিডিয়াগুলো ভূমিকা রেখে চলছে। মিডিয়াগুলো এমন করবে না কেন? কথায় আছে, ‘ আন্নাসু ‘আলা দীনি মুলূকিহিম’ রাজার চালে রাজ্য চলে। মুসলিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান থেকে নিয়ে জনতা পর্যন্ত যদি নির্যাতিত মুসলমানদের ব্যাপারে নীরব থাকে, তাহলে পশ্চিমা-অনুরক্ত মিডিয়াগুলো তার সুযোগ তো গ্রহণ করবেই। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, মুসলিম দেশে দেশে মুসলমানদের প্রকাশ্য বিক্ষুব্ধতা না থাকর পেছনে রড় ভূমিকা রাখছে বর্তমানে প্রচলিত তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন মিডিয়ার বিনোদনমূলক আয়োজন। এমন কি তথাকথিত সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমও বহু দেশের বহু ‘ক্ষুব্ধ’ মুসলমানকে নিঃশব্দ করে রেখেছে। মুসলিম জনতার বিরাট একটি অংশ এসব বিনোদোন- আয়োজন ও ব্যবস্থাপনায় বুঁদ হয়ে আছে।

আমরা আহবান করব, মুসলিম দেশগুলোর শাসকেরা যে যে দেশে আছেন, তারা যেন ভেদাভেদ ভুলে নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, পারস্পরিক লেনদেনে অন্য জাতি-গোষ্ঠীর পরিবর্তে নিজেদের প্রতি আস্থা বেশি স্থাপন করেন। এবং একই সঙ্গে যেসব দেশে মুসলিম উম্মাহ সংখ্যালঘু হিসেবে আছেন সেখানে তারা নির্যাতিত হলে মুসলিম শাসকরা যেন জোরালো ভূমিকা রাখেন।  মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর একটি সংগঠন হচ্ছে- ওআইসি। সংগঠনটি এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। এটিকে মজবুত করা যেত। এ সংগঠনটিকে কাজে লাগিয়েও অনেক কাজ করা যেত। দেশে দেশে নির্যাতিত মুসলমানদের পাশে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করা যেত।

এখনো যদি মুসলিম শাসকেরা স্বজাতির পক্ষে কথা বলেন, উম্মাহমুখি ও গণমুখি হয়ে উঠেন, তাহলে তাদেরও বিপদের দিন শেষ হবে, উম্মাহর নির্যাতিত মানুষের সংকটও কাটবে। এতে যে মুসলিম শাসকেরা শুধু আখেরাতে চিরস্থায়ী শান্তি পাবেন এতোটুকুই নয়, বরং শাসকদের বিপদের সময় তাদের পক্ষ হয়ে নেমে যাওয়ার মতো বহু সংখ্যক মানুষও তখন তারা পাবেন স্বজাতির মধ্যে। মুসলিম শাসকেরা যত তাড়াতাড়ি স্বজাতিমুখি হবেন, তত শিগগির তাদের মঙ্গল হবে এবং পাশাপাশি শত কোটি মুসলমানেরও কল্যাণ হবে।

আর তারা যদি স্বজাতিমুখি এ-জাতীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হন, এতে তারা নিজেদের চূড়ান্ত পরাজয় থেকে তো রক্ষা পাবেনই না, পতন ঘটলে কারো কাছ থেকে করুণাও পাবেন না। চূড়ান্ত বিজয় আল্লাহ তা্লআ মুসলমানদেরকেই দান করবেন ইনশাআল্লাহ। কোনো জালেম স্বার্থবাজেরই শেষ রক্ষা হবে না। পৃথিবীব্যাপী আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হবেই একদিন। মুসলমান হিসেবে এ বিশ্বাস আমাদের আছে। কোরআনে মাজিদ আমাদেরকে এ শিক্ষাই দিয়েছে।

আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন (অর্থ): তোমরা হীনবল হইও না, চিন্তিতও হইও না। তোমরাই বিজয়ী থাকবে, যদি তোমরা ঈমানদার হও। (সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৩৯)