লেখকরা হেরে গেলে হেরে যাবে দেশ

87

সৈয়দ শামছুল হুদা ।।

সাংস্কৃতিক যুদ্ধে পিছিয়ে যাচ্ছেন ইসলামপন্থী প্রিয় লেখকগণ। কবি আসাদ বিন হাফিজ এর আজকের স্টেটাসটি পড়ে আমি মর্মাহত হয়েছি। একটি বিশেষ ইসলামী দলের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল এটা ঠিক। কিন্তু তিনি যে একজন সফল লেখক ছিলেন এ ব্যাপারে মনে হয় ইসলামী ধারার যারা লেখালেখি করেন তারা কেহই সন্দেহ পোষণ করবেন না। তিনি শুধু একজন লেখকই নন, একজন সফল সাংস্কৃতিক যোদ্ধাও। একটি প্রজন্মের মন-মানসে তাঁর অসাধারণ লেখা প্রভাব বিস্তার করেছে এটা সত্য। ক্রুসেড সিরিজ বইগুলো যারা পড়েছেন তারাই এর স্বাদ অনুভব করেন।

এমনিভাবে একজন সফল লেখক বুলবুল সরওয়ার। ঝিলাম নদীর দেশ বইটি পাঠের মাধ্যমে তাঁর সাথে পরিচয়। এরপর তার অনেকগুলো বই পড়েছি। ইস্তাম্বুল পড়ে ইস্তাম্বুল দেখার স্বপ্ন মনে জাগিয়েছি। নীল যমুনার জল পড়ে নীল দেখার এখনো স্বপ্ন দেখছি। তাঁর অসাধারণ লিখনী স্টাইল আমাকে খুবই আকর্ষণ করে। তাঁর সর্বশেষ রচনা সিরিজ মহাভারতের পথে ৩খন্ড প্রকাশিত হয়েছে। আমাকে বইমেলায় একবার বলেছিলেন এটাকে ১০খন্ডে তিনি নিয়ে যেতে চান। কিন্তু সেটা আর হবে কী না জানি না। তিনিও আজ শয্যাশায়ী। তিনিও চরম আর্থিক সংকটে চিকিৎসাধীন।

আমাদের অনেকের প্রিয় মহিউদ্দীন আকবর ভাই। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনিও আমাদের কাছে যেমনি প্রিয়, তেমনি একজন সফল লেখক। তিনিও অসুস্থ মর্মে একটি স্টেটাসে দেখলাম, গতকাল খাইরুল বাশার এর সাথে সাক্ষাতে তিনি চোখের অশ্রু ধরে রাখতে পারেননি।

এমনিভাবে অনেক ইসলামী ধারার লেখকগণ আজ রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতাতো দূরের কথা, বিরাগভাজন হওয়ার কারণে তাদের অনেক স্বপ্ন মাটিতে মিশে যাচ্ছে। একটি সমাজকে জাগিয়ে তুলতে এসব লেখকদের লিখনী শক্তিকে কাজে লাগানোর কোন বিকল্প নেই। কয়েকদিন আগে দেখলাম, জনাব নাসিম আরাফাত সাহেব সম্ভবত উনার ছেলের অসুস্থতা নিয়ে খুবই অসহায় বোধ করছেন।

লেখকগণ জাতির বিবেক। যে কোন আন্দোলন-সংগ্রামে মূল করিগর হলেন লেখকগণ। তাদের অগ্রণী ভূমিকাই পারে একটি সমাজকে জাগিয়ে তুলতে। তাদের নিরবতাই পারে একটি সমাজে কবর রচনা করতে। আজকে বাংলাদেশে কিছুটা হলেও কবরের মতো নিরবতা বিরাজ করছে। কারণ এখানে লেখকরা নিরব হয়ে গিয়েছেন। যারা লিখতে পারেন তাদেরকে নিরব করে দেওয়া হয়েছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, শফিক রেহমান, ফরহাদ মাজহাররা আজ নিরব। শুধু তারাই নয়, এমন অসংখ্য লেখক আছেন যারা নিরব হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। যে কারণে সমাজে হাজারো অসংগতি দেখা দিলেও সমাজের মানুষের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয় না। কারণ লেখকরা এসব বিষয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছেন।

ভিন্নধারার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে কতটা গ্রাস করেছে তা বর্তমান সমাজের উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েদের জীবনযাত্রা দেখলে খুব সহজেই অনুমান করা যায়। সমাজ থেকে ভদ্রতা, নম্রতা যেন উঠেই গেছে। মান্যতাতো নেই-ই। পল্টন একসময় ইসলামী ধারার লেখক-শিল্পীদের পদচারণায় মুখরিত থাকতো। এখন আর সে পরিবেশ নেই। দিন দিন তারা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। অনেক নবীন লেখক বন্ধুরাও পল্টন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন গ্রামের নিরব পরিবেশে। ইসলামী ধারার অনেক পত্র-পত্রিকা বের হতো, সেই পরিবেশও এখন নেই।

বাঁচতে হলে আমাদেরকে আবার জাগতে হবে। ইসলামী ধারার লেখকদেরকে আমাদের স্বার্থেই বাঁচিয়ে রাখতে হবে। তাদেরকে যথাযথ সম্মান দিতে হবে। শুধু ইসলামী ধারা বললে ভুল হবে, বরং যে কোন সত্যিকার লেখক, যিনি বিবেককে বিক্রি না করে লেখালেখি করেন, তাকেই বাঁচতে হবে। ভারতের অরুন্ধতি রায়দের মতো আমাদের সমাজেও অনেক লেখক আছেন যারা সত্যবাদী, সাহসী। সত্যকে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন না। কিন্তু পরিস্থিতি তাদেরকেও দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এ সমাজের সকল মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখকদের আর্থিক দুর্বলতা যেন সবসময়ের সঙ্গী। সত্য বলতে গিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়েছেন। কবি ফররুখ আহমদ সত্যবাদী লেখকদের একজন মূর্তপ্রতীক। তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেই জীবন শেষ করেছেন। আপোষ করেননি। কবি আল মাহমুদ সত্য পথে থেকে আমৃত্যু লড়াই করেছেন।

লেখকের ফেইসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া