ঘুরপথে ট্রেনের টিকিট সংগ্রহের গল্প: জিরো ওয়ান সেভেন…

170

আবদুল্লাহ মারুফ ।।

[ট্রেনের টিকিট কাউন্টারে না পাওয়া গেলেও পাওয়া যায় স্টেশনের আশেপাশে। টিকিট কালোবাজারিদের দৌরাত্মে সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। এই পোস্ট লেখক আগের দিন কাউন্টারে টিকিট খোঁজাখুঁজি করে নিশ্চিতভাবে হতাশ হন। পরের দিন ঘুরপথে দ্বিগুণ দামে টিকিট সংগ্রহের অস্ত্র প্রয়োগ করেন! সে গল্পটিই এখানে দেওয়া হলো।]

ㅡঘটনাটা শোনাই আপনাদেরকে।
আমি যে সেদিন টিকেট কাটতে এসেও ব্যর্থ হয়েছিলাম সেটা আপনাদেরকে বলেছি। আমার নিয়ত ছিলো ঢাকা চলে যাবো, কমলাপুর থেকে টিকেট নিয়ে তারপর চট্টগ্রামে ফিরবো। কিন্তু কেন জানি জিদ চাপলো ময়মনসিংহ থেকেই চট্টগ্রামে যাবো। এবং ট্রেনেই যাবো।
আব্বা বারবার বলছিলেন, গাড়িতে করে যাও, ট্রেনের সিট পাওনি এতো দূরে যাবে কীভাবে! যাও গাড়ির টিকেট করে নিয়ে আসো।’
কিন্তু আমি অজুহাত দিয়ে বিভিন্ন, বিরত থেকেছি।

মনে-মনে ভয় ছিলোㅡ যদি ব্যর্থ হই শেষ প্রচেষ্টায়! কী হবে তখন!
আবার সাহস করলাম, যা হবার হবে। মাগরিবের পর মুক্তাগাছা থেকে ময়মনসিংহ শহরে আসলাম। কতক্ষণ ইতিউতি করলাম কাউন্টারে। নাহ, অসম্ভব এখান থেকে কাউকে পটানো! তো কি করা যায়? মাথায় চিন্তা ভাজতে ভাজতে হাঁটছি আর চোখকান খোলা রাখছি বিড়ালের মতো! উঁহু, কোনো ছায়াশয়তানের (টিকিট কালোবাজারি) নাগাল পাচ্ছি না। তারপর ঢিল ছুঁড়লাম বে-নিশানায়!
ㅡ কাকা, আসতে বলেছিলেন; টিকেটটা দেন! কাউন্টারের ঠিক বিপরীত দিকে ওপাশের একটি দোকানে গিয়ে দোকানিকে কথাটা বললাম।
তিনি বললেনㅡ ‘আমরা টিকেট বেচি না, সামনের দোকানে যান।’ আমি এগোলাম। পরের দোকানে গিয়ে আবার আরেকটা ঢিল ছুঁড়লাম। এবার ঢিলটা নিশানায় গিয়ে বিঁধলো। এ-দোকানদার আঙুলি নির্দেশ করলেন, ওই যে চশমাঅলা, রিক্সায়; তার কাছে যান।’

আমি হাঁটলাম। আর মাথায় একটা থিম দ্রুত দাঁড় করিয়ে নিলাম। তারপর গিয়ে দাঁড়ালাম লোকটির ঠিক নাক বরাবর। ফোনে কথা বলছিলেন তিনি, টিকেটসংক্রান্তই। দেখতে কিছুটা ভয়ংকেই লাগছে। ছিমছাম গড়ন। মধ্যবয়সী। লুঙ্গি পরে রিক্সায় বসে আছেন পা তোলে! একটা হাটু উদোম হয়ে আরও কিছুদূর গিয়ে রানের চিপায় বেঁধে আছে! বাতাস যদি ক্ষাণিকটা জোরে বয়ㅡ ক-খ-গ সব দেখা যাবে, নিশ্চিত! হা হা হা।
তিনি ফোন রাখলেন। চশমার উপর দিয়ে তাকালেন আমার দিকে। আমি তখন গলায় জোর এনে বললামㅡ আংকেল, ফোন দিয়েছিলো আপনাকে, আমার টিকেটটা দেন। ব্যতিব্যস্ত হ’য়ে তিনি জিগ্যেশ করলেন- কেডা দিছিন ফোন? কহন?

আমি বললাম, আমার ভাইয়া ফোন দিয়েছে। (আল মুসলিমু আখুল মুসলিম) দুপুরের দিকে হয়তো, আমাকে বলছে আপনার থেকে টিকেট নিয়ে নিতে। দ্যান আমার টিকেটটা! তাড়া দিলাম ক্ষাণিকটা। দেখি কাত হ’য়ে গেছেন! কিন্তু দুইটা ধমক দিলেনㅡ ‘সইন্ধার সুময় আমারে ফোন দিছে না ক্যা? আরে, অহন আমি কই পামু টিকেট! ফোন দিছে না ক্যা-ন আগে?’রাগি চোখে তাকালেন। আমি তখন বললাম, হেইডা তো আমি জানি না আংকেল। আপনার লগে কতা কইছে, হেইডা আমারে কয়া দিছে।’

একথা শুনে তিনি জিহ্বা দিয়ে চুক-চুক করতে করতে রিক্সাচালকে অর্ডার করলেন, ‘আগা!’ আর আমারে বললেন, ‘আইন্নে এনু খাড়ায়া থাহুইন হুজুর, আমি আইতাছি।’

আমি ঠিক আছে বলে পাশে দাঁড়ালাম।

ক্ষাণিকবাদে তিনি আসলেন। আরও একটি লোক তার পেছন-পেছন। প্যান্টশার্ট পরা। আংকেল তাকে বলছেন, ‘হুজুর মুক্তাগাছা থেইক্কা আইছে, দুফরো ফোন দিছে, হেরে টিকেট দিওয়ন লাগবোই একটা। আজকা আমি পারবো না বাবা!’
ওই লোকটি তখন চ্যাঁচামেচি করলো কতক্ষণ। ‘আমি আইন্নের নম্বর ডিলিট কইরা ফেলবো। আপ্নার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই।’ আরও কি কি সবকথা।

আমি তখন বুঝলাম ইনি পুরানা খদ্দের। হাসলাম কতক্ষণ নিজে নিজে।

ওদিক থেকে দোমড়ানো-মুচড়ানো একটা টিকেট দোকান থেকে বের করে লোকটি আমার হাতে দিয়ে বললেনㅡ লইন, হুজুর। ছয়শ দ্যান!’
আমি পাঁচশত টাকার একটা নোট হাতে দিয়ে বললামㅡ চলে না? উনি তখন বলেনㅡ না হুজুর, দ্যাখলাইন ই তো, হেরে পাডায়া দিলাম আইন্নের লেইগ্যা।’

আমি তখন আরও একশত দিয়ে বললামㅡ আচ্ছা লন, সাড়ে তিনশর টিকেট ছয়শ, দারুণ আংকেল। তিনি হাসলেন। তারপর বললেনㅡ হুনুইন, আমার নম্বর নেন, আর সামনের বার থেইক্যা আইন্নে নিজে ফোন দিবাইন। আরও আগে আগে।’
আমি মুচকি হেসে বললামㅡ দ্যান, নম্বরটা তুলে রাখি। তিনি তখন আগ্রহের সঙ্গে বলতে থাকেনㅡ জিরো ওয়ান সেভেন…

লেখকের ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া