কুরবানীর গরু : ছবি আপলোডে আপত্তি কোথায়

515

 আবুল কাসেম আদিল ।।

ফেইসবুকের রুচিশীল মানুষদের রুচিবোধ এত স্পর্শকাতর কেন? তাদের রুচিবোধ এত নড়বড়ে যে, কিছু থেকে কিছু হলেই তাদের অতি সংবেদনশীল রুচিবোধে আঘাত লাগে। এতে তাদের ভঙ্গুর হৃদয় ভেঙে গুড়া গুড়া হয়ে যায়— কারণ কী? গরুর ছবি সোস্যাল মিডিয়ায় আপলোড করলে এই রুচিশীল মানুষগুলোর কী ক্ষতি হয়? কুকুরের ছবিতে সমস্যা নেই, বিড়ালের ছবিতে সমস্যা নেই, খরগোশের ছবিতে সমস্যা নেই, চিড়িয়াখানায় বন্য পশু দেখতে গিয়ে ছবি তুলে আপলোড করলে সমস্যা নেই; গরুর ছবিতে সমস্যা কেন?

এটা তো নিতান্ত ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার, নিজে ব্যক্তিগতভাবে পালনীয়, অন্যকে বাধ্য করার মতো নয়। কিন্তু তারা এমনভাবে বিষয়টাকে সমালোচনায় বিদ্ধ করে-বিশ্বাস করা স্বাভাবিক- পারলে বাধ্য করত।

স্বীকার করতেই হবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনের অনেকখানি দখল করে আছে। আমরা অনেকেই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রায় সবকিছু এখানে শেয়ার করি। ব্যক্তিগত অভ্যাসের ভিত্তিতে কেউ ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় বেশি শেয়ার করি, কেউ একটু কম, কেউ মোটেই না। কুরবানির গরুর ছবি আপলোডের ব্যাপারটা তো সেরকমই। ব্যক্তি হিসেবে রুচির বিভিন্নতার কারণে কেউ গরুর ছবি আপলোড করছে, কেউ করছে না। ছবি আপলোড করা না-করা একান্ত ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার, জাতীয় দুর্যোগ নয়। তবু এব্যাপারে অতি রুচিবাদীরা এর বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করল কেন?

ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবিত গরুর ছবি আপলোড করাকে কখনো রুচিবিরুদ্ধ মনে করিনি, এখনো এখনো করি না। সব ধরনের পশুর ছবি আপলোডে সমস্যা না মনে না করলে, আলাদা করে গরুতে সমস্যা কী? তবে একসময় ফেইসবুকে জবাইকৃত গরুর ছবি দেখলে বিরক্ত হতাম। আপত্তিটা বৈধা- অবৈধের ছিল না, আপত্তি ছিল রুচির। অর্থাৎ আমি মনে করতাম, জবাইকৃত গরুর ছবি দেওয়া অপরাধ না হলেও সুরুচির পরিচয়বাহী নয়। কারণ প্রয়োজনে গরু জবাই করতে হবে, কাটাকুটি করতে হবে, খেতে হবে। কিন্তু কর্তিত গরুর ছবি দিতে হবে কেন? অনেকেই এতে অভ্যস্ত নয়। তাদের জন্য এটা অস্বস্তিকর। আমার বড় ভাইয়ার মেয়ে গরুর মাংস খেতে অভ্যস্ত ছিল। এক ঈদে আমাদের কুরবানির গরু সে জবাই করতে দেখেছে। এর পর থেকে গরুর গোস্ত খেতে তার অনীহা। তার বক্তব্য হলো, গরু খায় কেমনে?

দ্রষ্টব্য যে, গরুর মাংস তার পছন্দের খাবারই। সেটা মাংস আকারে হাজির হলে সে আগ্রহের সঙ্গেই খেত। কিন্তু গরু জবাই করতে দেখার পর তার শিশুমন এটা পছন্দ করেনি।

কিন্তু আমার মানসিক অবস্থান পরিবর্তন হয়েছে। এখন কর্তিত গরুর ছবি দেখলে আমার তেমন কিছু মনে হয় না। কারণ একদল মানুষ বিষয়টাকে রুচির বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে ঔচিত্যের বিষয়ে নিয়ে গেছে  এবং গরুর জন্য আশ্চর্য এক ভাবাবেগ তৈরি করার চেষ্টা করছে। গরুকে পশুমাত্র হিসেবে না দেখে ‘গরু’, তথা বিশেষ এক মর্যাদাবান প্রাণী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে। আমিষভোজী হয়েও তারা গরু খেতে অনেচ্ছুক। ছাগলে আপত্তি নেই, মুরগিতে আপত্তি নেই; কিন্তু গরুতে তাদের আপত্তি। কিন্তু কেন, এই প্রশ্ন তুলতে হবে।

মনে করা অস্বাভাবিক নয় যে, এটি আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের ক্ষমতাসীন উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির অংশ। এই রাজনীতির কবলে পড়েই অভিজাত হোটেল মালিকরা হোটেলে সব ধরনের মাংস রাখলেও গরুর মাংস রাখে না। তারা সেটা গর্বভরে লিখেও রাখে— নো বীফ।

গরুর এই ক্ষমতায়ন রুখে দেওয়া দরকার মনে করি। গরু একটা ভোজ্য পশু। যে পশু খেতে আপত্তি নেই, সেই পশুর কর্তিত ছবি দেখতে আপত্তির কিছু নেই। তাছাড়া যারা গরুর মর্যাদায় বিশ্বাসী, জবাইকৃত গরুর ছবি দিয়ে তাদের সহ্যক্ষমতা বাড়াতে সহযোগিতা করার দরকার বোধ করি।

মোট কথা, জীবিত গরু ও জবাইকৃত গরুর ছবি আপলোড করাটা রুচির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকলে ঠিক ছিল। তবে এই সীমা অতিক্রম করে বৈধতা-অবৈধতার প্রশ্নে নিয়ে গিয়ে মুসলমানের ধর্মীয় ভাবাবেগকে লজ্জা দিতে চাইলে, পশুপ্রেমের নামে কুরবানিকে নিরুৎসাহিত করলে — যা এখন চলছে — বেশি বেশি গরুর ছবি আপলোড করা দরকার মনে করি।