মহব্বত হতে হবে আল্লাহর জন্য

57

তাওহীদুল ইসলাম তায়্যিব।।

মানুষকে আরবীতে বলে ইনসান। এর মূল শব্দে আছে আলিফ নূন সীন। যা থেকে উৎসারিত অর্থের মাঝে রয়েছে- মহব্বত, ভালোবাসা, অন্তরঙ্গতা ও হৃদ্যতা। এই শব্দ দিয়ে মানুষকে নামকরণের বড় একটি কারণ বলা হয়- মানুষের মধ্যে মহব্বত ভালোবাসা খুব বেশি। খুব সহজেই তারা একে অপরকে আপন করে নেয়। অল্পতেই তাদের মাঝে গড়ে উঠে হৃদ্যতা ও অন্তরঙ্গতা।

এই মহব্বত সৃষ্টি হওয়ার বাহ্যিক কিছু কারণ ও উপলক্ষ যেমন থাকে তেমনি থাকে অদৃশ্য কিছু বিষয়ও। তাতে ইচ্ছার দখল যেমন থাকে তেমনি থাকে অনিচ্ছারও শক্তমন্ত অবস্থান। তা থেকে লাভবান হবার দিক যেমন থাকে তেমনি থাকে ক্ষতিগ্রস্ত হবারও অনেক দিক। তবে যথাস্থানে যথাযথ পন্থায় মহব্বত ভালোবাসা সকলের যেমন কাম্য তেমনি তার উপকারিতাও সর্বব্যাপী। এমনকি হাদীস শরীফে এই মহব্বতের জন্য দুআও শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।

সুনানে তিরমিযীর একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআয় বলতেন, اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يَنْفَعُنِي حُبُّهُ عِنْدَكَ (হে আল্লাহ! আমাকে আপনার মহব্বত দান করুন এবং যার মহব্বত আপনার কাছে আমার জন্য উপকারী হয়, তার মহব্বতও দান করুন।)-হাদীস নং : ৩৪৯১

আরেক বর্ণনায় আছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বিশেষ এক মুহূর্তে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন- আপনি (আমার কাছে কিছু) প্রার্থনা করুন। তখন তিনি প্রার্থনা করলেন এভাবে- اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ فِعْلَ الخَيْرَاتِ، وَتَرْكَ المُنْكَرَاتِ، وَحُبَّ المَسَاكِينِ، وَأَنْ تَغْفِرَ لِي وَتَرْحَمَنِي، وَإِذَا أَرَدْتَ فِتْنَةً فِي قَوْمٍ فَتَوَفَّنِي غَيْرَ مَفْتُونٍ، وَأَسْأَلُكَ حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَحُبَّ عَمَلٍ يُقَرِّبُ إِلَى حُبِّك (হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে ভালো কাজসমূহ করার এবং মন্দ কাজসমূহ ছাড়ার তাওফীক চাই। তাওফীক চাই অভাবীদের ভালোবাসার। আর আমাকে ক্ষমা করুন ও আমার উপর রহম করুন। আর যখন কোনো জাতিকে বিপদগ্রস্ত করার ইচ্ছা করবেন তখন আমাকে তুলে নিবেন বিপদগ্রস্ত হওয়ার আগেই। আমি আপনার কাছে চাই আপনার ভালোবাসা এবং ঐ ব্যক্তির ভালোবাসা, যে আপনাকে ভালোবাসে। আর ঐ কাজের প্রতিও ভালোবাসা চাই, যা আপনার ভালোবাসার নিকটবর্তী করে।)-সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং : ৩২৩৫

এক্ষেত্রে লক্ষ্যণীয় এবং সবচে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সামনে রাখা। মহব্বত যতটুকুই হোক, যার সাথেই হোক তা যেন হয় আল্লাহর জন্য। এমনিতেও মুমিনের সকল কাজ আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য হওয়া কাম্য। কোরআন মাজীদে আল্লাহ তায়ালা বলেন, قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ (বলে দিন, নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন-মরণ সবই আল্লাহর জন্য, যিনি জগতসমূহের প্রতিপাকত।)-সূরা আনআম

এছাড়াও মহব্বতের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা। যেমন হাদীস শরীফে এসেছে- সাত শ্রেণির লোক কিয়ামতের দিন আরশের ছায়ায় থাকবে, তন্মধ্যে একশ্রেণি হলো- رَجُلاَنِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ ঐ দুই ব্যক্তি যারা একে অপরকে মহব্বত করে আল্লাহর জন্য। তাঁর জন্যই একত্রিত হয় আবার তাঁর জন্যই বিচ্ছিন্ন হয়।-সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৬৬০ ও ১৪২৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ১০৩১

মহব্বতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য রাখা হয় যে বিষয়টি তা হলো, প্রিয়জনের সন্তুষ্টি। খেয়াল রাখা হয় তার খুশি অখুশি, তার পছন্দ অপছন্দ, সর্বোপরি তার আনন্দ ও ভালোলাগাই থাকে পরম আরাধ্য। আর এইজন্য মানুষ কত কী-ই না করে। কত ত্যাগ কুরবানী স্বীকার করে। কত কিছু বিসর্জন দেয়। কত কষ্ট যাতনা সয়ে যায়। কত দুঃসাধ্য সাধন করে। এমনকি প্রিয়জনের সন্তুষ্টির জন্য অন্য কতজনকে অসন্তুষ্ট করে। কতজনকে কষ্ট দেয়। কতজনের উপর যুলুম করে। কত নিয়ম নীতি রীতি প্রথা লঙ্ঘন করে। এক্ষেত্রে সে অন্য কারো ইচ্ছা অনিচ্ছা ও আগ্রহ দাবীরও পরোয়া করে না। তার এই সব কিছু হয় প্রিয়জনকে খুশি করার জন্য।

মহব্বত যখন এমনই ঝুঁকিপূর্ণ তখন অবশ্যই তার কিছু নিয়ম নীতি থাকবে। শরীয়তে সে বিষয়ে নির্দেশনা থাকবে। তো এ বিষয়ে প্রথম কথা হলো, মহব্বত হতে হবে আল্লাহর জন্য। আল্লাহর পছন্দ ও সন্তুষ্টিই থাকবে মহব্বতের কেন্দ্রীয় বিষয়।

এতএব যাকে মহব্বত করলে আল্লাহ তায়ালা নাখোশ হন তাকে যেমন মহব্বত করা যাবে না তেমনি মহব্বতের আতিশয্যে যেসব কাজ আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে আবশ্যক করে তা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে। এ বিষয়ে শরীয়তের পরিষ্কার একটি নীতি হলো, لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ اللهِ আল্লাহর নাফরমানীতে কোনো মাখলুকের আনুগত্য নেই।-মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং : ২০৬৫৩; ইবনে আবী শাইবা, হাদীস নং : ৩৩৭১৭

কারণ মহব্বতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বিষয়টিই হলো ইতাআত বা আনুগত্য। মানুষ যাকে মহব্বত করে নিজের অজান্তেই তার আনুগত্য করে। অবচেতন মনেই তার সন্তুষ্টিকে গুরুত্ব দেয়। কবিতায় আছে لو كان حبك صادقًا لأطعته … إن المحب لمن يحب مطيع যদি তার প্রতি তোমার মহব্বত সত্য হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই তুমি তার আনুগত্য করবে। নিশ্চয়ই প্রেমিক প্রেমাষ্পদের অনুসারী হয়।

সেজন্য মহব্বতের ক্ষেত্রে খুব যত্নের সাথে খেয়াল রাখতে হবে- আমি যাকে মহব্বত করি তাকে মহব্বত করতে শরীয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে কি না। তার আনুগত্যে শরীয়তের কোনো বিধান লঙ্ঘনের আশঙ্কা আছে কি না। হিসাব নিতে হবে মহব্বতের ক্ষেত্রে আমি কতটা নিয়ন্ত্রিত! আবেগের বশবর্তী হয়ে মুমিন শরীয়ত থেকে বের হতে পারে না। মহব্বতের আতিশয্যে মুমিন তার দীনকে ডিঙ্গিয়ে যেতে পারে না। মুমিনের ভেতরে তার ঈমান থাকবে সদা জাগরূক, জীবন্ত, সতেজ, সজীব। মুমিনের ঈমান তার অতন্দ্র প্রহরী। দুনিয়া আখিরাতের সকল বিষয়ে তাকে তার ঈমান সতর্ক করবে। নির্দেশনা দিবে। তাকে মনে রাখতে হবে- আমার ঈমান সবার আগে, সবকিছুর আগে। ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে কোনো কাজ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

আর মনে রাখতে হবে এই হাদীস- مَنْ أَحَبَّ لِلَّهِ، وَأَبْغَضَ لِلَّهِ، وَأَعْطَى لِلَّهِ، وَمَنَعَ لِلَّهِ فَقَدِ اسْتَكْمَلَ الْإِيمَانَ যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসে, আল্লাহর জন্য কারো প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়, আল্লাহর জন্য কাউকে কিছু দেয়, আল্লাহর জন্যই দেওয়া থেকে বিরত থাকে- সে ঈমানকে পূর্ণ করল।-সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং : ৪৬৭১

আর মহব্বত যখন আল্লাহর জন্য হবে তখন তাতে যেমন নিয়ন্ত্রণ থাকবে তেমনি থাকবে নিজের ও অপরের সর্বদিকের কল্যাণকামিতা। তাতে যন্ত্রণায় আত্মহত্যা থাকবে না। প্রিয়জনের অযাচিত আচরণে বিদ্বিষ্ট হয়ে তার ক্ষতির চিন্তা থাকবে না। সকল চিন্তা ও সিদ্ধান্তেই থাকবে মজবুত এক নিয়ন্ত্রণ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য মহব্বত করার তাওফীক দান করুন। জীবনের সকল কাজে তাঁর হুকুম ও বিধানকে সামনে রাখার তাওফীক দিন। আমীন।