হামিদ মীরের কলাম: কাশ্মিরে ধোঁকার অশ্রু, প্রতারণার গল্প

760

হামিদ মীর ।।

তিনি এখন অশ্রু ঝরাচ্ছেন। এই বলে কান্নাকাটি করছেন যে, আমাদের ধোঁকা দেয়া হয়েছে। নিজেদের মজলুম প্রমাণিত করার জন্য  চোখের পানি ফেলছেন। কিন্তু এই অশ্রুর পেছনে লুকিয়ে আছে  ধোঁকার এক দীর্ঘ গল্প।আর সেই ধোঁকাটা স্বজাতির সঙ্গে দিয়েছেন লোক-দেখানো অশ্রু ঝরানো ব্যক্তিটির পরিবার। তিনি হলেন ফারুক আবদুল্লাহ। তিনবার তিনি ছিলেন অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী।যে মুহূর্তে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার নিজেদের আইনেরই বিরুদ্ধাচরণ করে ধারা ৩৭০ ও ৩৫-এ বিলুপ্ত করে দিয়ে অধিকৃত এ রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা খতম করে দিল, তখন থেকে ফারুক আবদুল্লাহ ও তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহ এই প্রতিক্রিয়া তুলে ধরছেন যে, কাশ্মিরীদের প্রতি বড্ড জুলুম করা হয়েছে।

প্রকৃত সত্য হলো, বেশির ভাগ কাশ্মিরী কখনও ৩৭০ ধারাকে স্বীকারই করেনি। কারণ এই ধারার বদৌলতে ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ অধিকৃত কাশ্মীর আর ভারতের মধ্যে একটি ‘অবৈধ’ সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অধিকৃত এই রাজ্যে নিজের ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও শাসন প্রতিষ্ঠিত রাখা। ৩৭০ ধারা মূলত ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু এবং শেখ আবদুল্লাহর মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তি। শেখ আবদুল্লাহ কাশ্মিরীদের সন্তুষ্ট রাখতে ৩৫ ধারাকেও আইনে যুক্ত করান এবং কাশ্মিরের বাইরের লোকদের জন্য কাশ্মিরের ভেতরে জমি কেনার পথ বন্ধ করেন।

৩৭০ ও ৩৫ ধারার বিলুপ্তি মূলত ভারতের পক্ষ থেকে ওইসব কাশ্মিরি নেতাদের প্রতিই ধোঁকা,যারা ভারতের আশ্বাসের ওপর ভরসা করে ভারতীয় আনের অধীনে শপথ করে স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারি করেছিলেন। শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহকে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ স্বজাতির সঙ্গে ধোঁকাবাজি না করতে বলেছিলেন। কিন্তু তিনি কায়েদে আজমের কথা শুনেননি। তিনি বরং নেহেরুর সঙ্গে মিলে কাশ্মীরিদের ভারতের গোলাম বানিয়ে রাখেন। কাশ্মির প্রশ্নে ইতিহাস কায়েদে আজমকে বারবার সত্য এবং শেখ আবদুল্লাহকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। আজ যখন ভারত সরকার নিজেদের মিথ্যা ও ধোঁকাবাজ প্রমাণ করে দিলো তখন শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ এবং তার পরিবারের আসল চরিত্র তুলে ধরা জরুরি। কারণ এই পরিবার শুধু কাশ্মীরিদেরই নয়,পাকিস্তানকেও ধোঁকা দিয়েছে।

শেখ মুহাম্মদ আবদুল্লাহ তার আত্মজীবনী ‘আতশচিনার’-এ আল্লামা ইকবালের সঙ্গে নিজের সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করেছেন,কিন্তু কায়েদে আজমের সঙ্গে সাক্ষাতের ঘটনাগুলোর কথা এড়িয়ে গেছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, কাশ্মীরিদের বর্তমান যে স্বাধীনতা আন্দোলন এর নিয়মতান্ত্রিক সূচনা করেছিলেন আল্লামা ইকবাল ১৯৩১ সালে। ওই বছরের ১৩ জুলাই শ্রীনগরে মুসলমানদের শহীদ হওয়ার প্রতিবাদে লাহোরে ১৪ আগস্ট প্রথম যে  প্রতিবাদসভা ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয় সেটা ছিল আল্লামা ইকবালের নেতৃত্ব। সেই সভায় তিনি কাশ্মিরিদের সাহসে উদ্দীপ্ত হতে অনুপ্রাণিত করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৩২ সালে অল জম্মু-কাশ্মীর মুসলিম কনফারেন্স প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা মূল উদ্দেশ্য ছিল শাসক গোষ্ঠীর মুখোশ উন্মোচন করে দিয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, ১৯৩৩ সালে শেখ আবদুল্লাহ আকবর জাহান নামে এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করেন। আকবার জাহান ছিলেন এক ব্রিটিশ গোয়েন্দা লরেন্স অফ আরাবিয়ার সাবেক স্ত্রী। তার বাবা হ্যারি নিডোজ লাহোর ও শ্রীনগরের ‘নিডোজ হোটেলের’ মালিক ছিলেন। লাহোরে ‘নিডোজ’ হোটেলের জায়গায় এখন ‘আওয়ারি হোটেল’ হয়েছে। সেই হোটেলে টিআই লরেন্স এসে থাকতেন এবং করম শাহ নাম নিয়ে আফগানিস্তানের তৎকালীন শাসক আমানুল্লাহ খানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতেন। সেখানেই আকবর জাহানের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং বিয়ে হয়। কলকাতার একটি পত্রিকা ‘লিবার্টি’তে যখনলরেন্স অফ আরাবিয়ার গোমর ফাঁস করে দেওয়া হলো,তখন ওই ব্রিটিশ গোয়েন্দা পাকিস্তান ছেড়ে চলে যান। তিনি পাকিস্তান ছাড়ার পরপরই আকবার জাহান তাকে তালাক দিয়ে শেখ আবদুল্লাহকে বিয়ে করেন।

ব্রিটিশ ওই নারীকে বিয়ে করার পর শেখ আবদুল্লাহর চিন্তাধারা পাল্টে যায়। ১৯৩৯ সালে তিনি মুসলিম কনফারেন্স ছেড়ে প্রতিষ্ঠা করেন ন্যাশনাল কনফারেন্স। ১৯৪৪ সালে কায়েদে আজম শ্রীনগরে গেলে মুসলিম কনফারেন্স তার সম্মানে সংবর্ধনার আয়োজন করে। শেখ আবদুল্লাহ তখন কায়েদে আজমকে ন্যাশনাল কনফারেন্সের পক্ষ থেকেও সংবর্ধনা গ্রহণের দাওয়াত দেন। কায়েদে আজম উভয় দলের দাওয়াতই গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তখন কায়েদে আজম শেখ আবদুল্লাহকে আহ্বান জানান, তিনি যেন কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের অংশ হয়ে যান। কে এইচ খোরশেদের একটি সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, কায়েদে আজম শেখ আবদুল্লাহকে বলেন, ‘ফিরে এসো এবং মুসলিম কনফারেন্সের নেতৃত্ব দাও। ওদের সাথে থাকলে আবদুল্লাহ,তুমি ধোঁকার শিকার হবে।’ এই পরামর্শ শুনে শেখ আবদুল্লাহ চিৎকার করে উঠলেন এবং বললেন, ‘বাইরের লোকদের কাশ্মীরের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে নাক গলানোর কোনো অধিকার নেই। মিস্টার জিন্নাহর উচিত কাশ্মীর থেকে চলে যাওয়া।’

যখন পাকিস্তান হয়ে গেল তখন কায়েদে আজম শেখ আবদুল্লাহর কাছে ডা. মুহাম্মদ দীন তাসির এবং সরদার শওকত হায়াতসহ কয়েকজনের একটি প্রতিনিধি দল পাঠালেন। কিন্তু শেখ আবদুল্লাহ তাদের সঙ্গে বেয়াদবিমূলক আচরণ করে তাদের বিদায় করেন। এমনকি সরদার শওকত হায়াতকে গ্রেফতারের হুমকিও দেন। যখন মহারাজা হরি সিং ভারতের সঙ্গে কাশ্মিরকে সংযুক্ত করতে তথাকথিত চুক্তি করে বসেন তখন শেখ আবদুল্লাহর অবস্থান অনেকটা দুর্বল হয়ে যায়। এ সময় তিনি নেহেরুর সঙ্গে আঁতাত করে কৌশলে কাশ্মিরের শাসনক্ষমতা কব্জায় নেন। তিনি নিজের শাসন টিকিয়ে রাখতে নেহেরুকে এই বলে প্রভাবিত করতেন যে, আমার সঙ্গে পাকিস্তান সরকার যোগাযোগ রাখছে। ১৯৫২ সালে তিনি নেহেরুর সঙ্গে দিল্লি চুক্তিতে সই করেন। সেখানে ভারতীয় সংবিধানে ৩৭০ ধারা যুক্ত করে জম্মু-কাশ্মিরকে আলাদা রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে নেহেরুর কাছে শেখ আবদুল্লাহ আরও বেশি অধিকার দাবি করেন। তখন নেহেরু তাকে কারাগারে পাঠান। কারাগার থেকে শেখ আবদুল্লাহ পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি পত্র লিখেন। তাতে তিনি লিখেন, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মির ইস্যুটি উত্থাপন করলে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে মত দেবেন। এই ‘ব্ল্যাকমেইলিংয়ের’ কারণে ১৯৫৮ সালের জানুয়ারি মাসে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু এপ্রিল মাসে আবার শেখ আবদুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দেয়া হয়। সেই মামলায় চার পাকিস্তানিকেও আসামি করা হয়।

শেখ আবদুল্লাহ ভারতকে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে ব্ল্যাকমেইল করেন এবং কাশ্মিরিদের কাছে হিরো হয়ে যান। ১৯৭৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে একটি চুক্তির পর পুনরায় তিনি কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে তার ইন্তেকালের পর ছেলে ফারুক আবদুল্লাহ হন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী। ফারুক আবদুল্লাহও এক ব্রিটিশ নারীকে বিয়ে করেন। ফারুক আবদুল্লাহর পর তার ছেলে ওমর আবদুল্লাহ হন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী।

এই পরিবারটি আজ অশ্রু ঝরাচ্ছে এই কষ্টে যে, ভারত সরকার তাদের ধোঁকা দিয়েছে। প্রকৃত সত্য হলো, এই পরিবার সাধারণ কাশ্মিরিদের সঙ্গে ধোঁকাবাজি করেছে। ১৯৪৭ সালে শেখ আবদুল্লাহ নেহেরুকে সমর্থন না দিলে আজ কাশ্মির স্বাধীন থাকত। সময় ও অবস্থার বিচারে আজ এ কথা প্রমাণিত, সাইয়েদ আলি গিলানি, ইয়াসিন মুলক, মির ওয়ায়েজ ওমর ফারুক, আছিয়া আন্দারাবি, শিব্বির শাহসহ অন্যান্য স্বাধীনচেতা নেতারা সঠিক ছিলেন। আর ফারুক আবদুল্লাহর মতো লোকেরা ছিলেন ভুল। যারা আজও ভারতীয় আইনের প্রতি গদগদ।

ফারুক আবদুল্লাহর অপদস্থতা মূলত ‘ভারতপ্রেমী’ কাশ্মীরিদের অপদস্থতা। ৩৭০ ধারার বিলুপ্তি মূলত কাশ্মীরের চলমান স্বাধীনতা আন্দোলনকে আরও বেগবান করবে এবং ভারতের শাসনকে করবে দুর্বল। আর মোদি ভারতের ‘ভেজা বেড়াল’ প্রমাণিত হবেন।

[হামিদ মীর: পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক]

৮ আগস্ট দৈনিক জংয়ে প্রকাশিত কলামটি উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন: সাইমুম রিদা