যে প্রেস যত বেশি তোষামোদ করতে পারে, তারা তত বেশি স্বাধীন: মাহফুজ আনাম

69

ইসলাম টাইমস: আধুনিক সভ্যতার মৌলিক ভিত্তি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা। তবে বর্তমানে সংবাদ মাধ্যমে নতুন এক স্বাধীনতার আবির্ভাব ঘটেছে বলে মন্তব্য করেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। তিনি বলেন, বর্তমানে সংবাদ মাধ্যমে ‘তোষামোদী স্বাধীনতা’র  আবির্ভাব ঘটেছে। যে প্রেস যত বেশি তোষামোদি করতে পারে, তারা তত বেশি স্বাধীন বলে প্রত্যায়িত হয়।

ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক লেখায় তিনি এসব মন্তব্য করেন।

 

ডেইলি স্টারের সম্পাদক বলেন,  যেমনভাবে রক্ত আমাদের শরীরে খাঁটি অক্সিজেন সরবরাহ করে সেই অক্সিজেন ছাড়া আমাদের দেহকোষ যেমন মরে যায়, একইভাবে ‘সর্বশেষ তথ্য ও তরতাজা ধারণা’ ছাড়া একটি সমাজ মারা যায়। এসব ধারণা সামনে আসে একটি মুক্ত মিডিয়া ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। যেমন একাডেমিয়া, থিংকট্যাংক, নাগরিক সমাজের সংগঠন প্রভৃতি।
একটি মুক্ত সংবাদ মাধ্যমের টিকে থাকার পূর্বশর্ত হলো কথা বলার স্বাধীনতা এবং চিন্তা করার স্বাধীনতা।

তবে আজকের বিশ্বে অধিক থেকে অধিক পরিমাণে সরকার ও রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যাশা করেন মিডিয়া হবে ওই রূপকথার আয়নার মতো, যা শুধুই প্রশংসা গাইবে। এমন আয়না হবে না, যা সমাজের বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়।

মাহফুজ আনাম আরও বলেন,  গত বেশ কয়েক বছর ধরে, একটি রাজনৈতিক সিস্টেম হিসেবে গণতন্ত্রের ইচ্ছাকৃত অবমূল্যায়ন প্রত্যক্ষ করছি।
এসব হলো ‘ঝঞ্ঝাটপূর্ণ’, ‘বিশৃংখল’, ‘দৃষ্টিভঙ্গি ওইসব মানুষের যারা অনেক জানেন না অথবা যাদের দৃষ্টিভঙ্গি দূরদর্শী নয়’, ‘সময় সাপেক্ষ’ এবং উন্নয়নে প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব, যা এসব বিষয় সম্পন্ন করে।
সর্বোপরি, নেতা যখন সব জানেন, তখন জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়গুলোকে বিভ্রান্ত করে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ফেলে।  এই মানসিকতার মধ্যে জনমত, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয় এবং অনেক বেশি প্রশ্ন তোলার জন্য মিডিয়াও তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়।
এমন মানসিকতা অনিবার্যভাবে মেগা দুর্নীতিতে দায়মুক্তির একটি সংস্কৃতিতে নেতৃত্ব দেয় এবং হয়ে ওঠে একটি স্বাভাবিক সহচর।
‘তদারকি’ সংস্থা হিসেবে পার্লামেন্টকে প্রত্যাখ্যান করা সাম্প্রতিক সময়ের এক করুণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

অতীতে সরকারগুলো প্রশ্নবাণে জর্জরিত হওয়া ও তাতে মারাত্মক সমালোচনার ভয়ে পার্লামেন্টে মুখোমুখি হতে ভয়ে থাকতো মন্তব্য করে দেশের এই প্রবীণ সাংবাদিক বলেন,  ভালভাবে জানা ও ব্যাপক গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে  আগে প্রশ্ন করা হতো। প্রশ্ন করতেন নির্বাচনী দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উচ্চ মাত্রায় প্রতিশ্রুতিশীল ও মোটিভেটেড নির্বাচিত নেতাদের পক্ষ থেকে।
পার্লামেন্টে বিরোধীদের ভূমিকাকে খর্ব করায় জবাবদিহিতায় খাতটিতে আরো বড় মাত্রা যোগ করেছে, যা আমরা সব সময়ই দেখছি।

“অনেক দেশে ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহার রোধের প্রেক্ষাপটে সুদূরপ্রসারি আইন আছে। এসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছে প্রধানত খবর, দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণাকে বিস্তৃত করতে দেয়ার পরিবর্তে তাতে বাধা দেয়ার জন্য। সরকার যেসব ডিজিটাল ও মূলধারার মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে ক্রমশ জটিলতার মুখে তাদের দিকে দৃষ্টি রেখে এসব আইন কার্যকর করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সম্ভবত এটাকে ‘তোষামোদির স্বাধীনতা’র নতুন যুগের চিত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
একেবারে শুরু থেকেই তিনি কেবল ওইসব মিডিয়াকে গ্রহণ করেছেন, যারা তার প্রশংসা করে এবং অন্যদেরকে ‘জনগণের শত্রু’ বলে আখ্যায়িত করেছে, ওইসব মানুষের জন্য ঘৃণাসমৃদ্ধ শব্দ ছাড়া আর কিছু বলেনি এসব মিডিয়া। যদিও তিনি সংবাদ মাধ্যমকে ঘৃণা করা প্রথম কোনো নেতা বা সরকার প্রধান নন, তবু তিনি এই প্রবণতায় সবচেয়ে শক্তিশালী গতি দিয়েছেন অবশ্যই।
বিশ্বের বিভিন্ন অংশের অনেক নেতা এখন ট্রাম্পের একান্ত অনুসরণকারী। তারা সবাই চান মিডিয়া তার প্রচলিত ‘ওয়াচডগের’ ভূমিকা পালন না করুক এবং তাদের কোলে লালিত হোক”।

“মিডিয়া এখন যার জন্য লড়াই করছে- এবং আরো শক্তিশালীভাবে ও ঐক্যবদ্ধভাবে করছে তা হলো, মানব সভ্যতার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় অর্জন। তা হলো চিন্তার স্বাধীনতা এবং কথা বলার স্বাধীনতার অধিকার।
এ লড়াই এর চেয়ে কম কিছুর জন্য নয়”।