চামড়ার পড়তি দর: করণীয় প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞদের কতিপয় প্রস্তাব

412

তারিক মুজিব ।।

কওমি মাদরাসা। বিনা বেতনে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর শিক্ষা কার্যক্রম সম্পাদনের দায়িত্ব পালন করছে শতাব্দী ধরে। জনগণের স্বতস্ফূর্ত অনুদান এজাতীয় মাদরাসাগুলোর সুষ্ঠু পরিচালনায় যথেষ্ট প্রভাব রাখে। দেশের দ্বীনদার মানুষ সময়ে সময়ে নিজেদের উপার্জনের একটা অংশ দান করেন কওমি মাদরাসায়।

কওমি মাদরাসায় মানুষের দানের বড় অংশ জমা হয় রমযানে যাকাত এবং কুরবানির চামড়া বাবদ। কুরবানির চামড়া নিজে ব্যবহারের অনুমতি থাকলেও বাংলাদেশের জনগণ সাধারনত চামড়া বিক্রি করে সে অর্থ গরিব অসহায়দের বা এতিমখানায় কিংবা মাদরাসার গোরাবা তহবিলে দান করে দেন। অনেকে চামড়াই মাদরাসায় দিয়ে দেন বা মাদরাসার কাছে ছাড়মূল্যে বিক্রি করেন।

বিশ্ববাজারে সারাবছর চামড়ার দর চড়া থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে কুরবানির সময় বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোতে কাঁচা চামড়ার দর পড়ে যায়। গতবছরে অর্ধলক্ষাধিক টাকার গরুর চামড়া মাত্র ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। ছাগল বা খাসির চামড়ার দাম শতকের ঘরেও পৌঁছায়নি। দ্বীনদার মানুষ কুরবানির টাকার উল্লেখযোগ্য অংশ যেহেতু কওমি মাদরাসার গোরাবা ফান্ড বা এতিমখানায় দান করেন সুতরাং কুরবানির চামড়ার দর কমে যাওয়ার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাব কওমি মাদরাসার আয়খাতে পড়ে।

বিশেষজ্ঞ অনেকেই এটাকে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছেন।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার মাদরাসা কর্তৃপক্ষ কুরবানির যে চামড়া ক্রয় করেন তা বিক্রি করতে গেলে তাদের পড়তে হয় বিপাকে। ক্রয়কৃত মূল্য এবং তা পরিবহনসহ আনুসাঙ্গিক ব্যায় মিলে যে খরচ চামড়া বিক্রি করে তা থেকে খুব বেশি উঠে আসে না। তাই মাদরাসা কর্তৃপক্ষের ভিন্ন কিছু ভাবা দরকার।

ইসলাম টাইমসের পক্ষ থেকে দেশের দায়িত্বশীল বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে চামড়া কালেকশন তা সংরক্ষণ এবং বিক্রয় পদ্ধতি সম্পর্কে কতিপয় প্রস্তাব পেশ করা হলো।

* কালেকশন পদ্ধতির মাঝে পরিবর্তন আনা। কালেকশনের পরিধি কমিয়ে এনে ক্যাম্পিং পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়। নির্দিষ্ট কিছু স্থানে মাদরাসার পক্ষ থেকে প্রতিনিধি পাঠিয়ে সে স্থানের চামড়া কালেকশনের চেষ্টা করা। এছাড়া কেউ স্বেচ্ছায় নিজ চামড়া কোনো নির্দিষ্ট মাদরাসায় দিতে চাইলে তা গ্রহণের ব্যবস্থা করা। চামড়ার এই পড়তি বাজারে ব্যাপক কালেকশন করে যে চামড়া তোলা হয় তা বিক্রি করে যে অর্থ আসে তা যেন ছাত্রদের এক সপ্তাহের থাকা খাওয়া বাবদ যে খরচ হয় তার থেকে কম না হয় সে ব্যাপারে মাদরাসা কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, যেসব এলাকায় মাদরাসায় চামড়া বিক্রি বা দানের প্রচলন কম সেখানে কালেকশনের চিন্তা না করাই ভালো।

* ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের বিকল্প হিসেবে কুরবানির দিনগুলোতেই যেন দর কম হলেও চামড়া বিক্রি করে দিতে না হয় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া। এ জন্য জেলা, থানা বা স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। অল্পদিনেই চামড়া যেন নষ্ট না হয়ে যায় নূন্যতম এতটুকু প্রসেসিং সম্পর্কে জেনে নিয়ে থানা বা জেলা ভিত্তিক এ উদ্যোগ ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেটের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তবে এ পদ্ধতি অবলম্বনের জন্য দেশের বৃহত্তর অঞ্চলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কেননা পৃথক পৃথকভাবে পুঁজিপতি চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করতে গেলে এ পদ্ধতি অবলম্বন করেও খুব ফল পাওয়া যাবে না। কেননা তখন উপযুক্ত মূল্য পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।

আরও পড়ুন:  প্রতিবছরই কমছে কুরবানির চামড়ার দর: প্রতিকার নিয়ে কী ভাবছেন আলেমরা

* ট্যানারি সিন্ডিকেটের ভায়া ছাড়াই নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বিদেশে চামড়া রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া। তবে এজন্য দেশের দায়িত্বশীল পর্যায়ের আলেমদের ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন বা কোনো বোর্ডের এ কাজে এগিয়ে আসা দরকার। চামড়া ব্যবসায়ীরা যখন দেখছে, কুরবানির চামড়া শেষ পর্যন্ত তাদের কাছেই বিক্রি করা হয় বা তাদের মধ্যস্থতায়ই বিদেশে রপ্তানি হয় তখন তারা সিন্ডিকেটের সুযোগ পেয়ে যায়। তাই নিজেদের ব্যবস্থাপনায় রপ্তানির উদ্যোগ নিতে পারলে ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট মোকাবেলার সুযোগ তৈরি হবে।

* মসজিদের ইমাম,এলাকার দায়িত্বশীল থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে গরিবের হক চামড়ার পড়তি দর নিয়ে আওয়াজ তোলা প্রয়োজন যেন প্রশাসন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে চামড়ার ন্যায্য দাম নিশ্চিত করে।

ঈদের মতো দিনে ছাত্র বা মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা সারাদিন কষ্ট করে যে চামড়া কালেকশন করেন তা যেন পুঁজিপতি চামড়া ব্যবসায়ীদদের কাছে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিতে না হয় সেজন্য উল্লেখিত প্রস্তাবগুলো ছাড়াও আরও যা করণীয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষের তাই করা উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ববাজারে চামড়ার দর যেহেতু চড়া তাই কুরবানির চল্লিশ লক্ষাধিক চামড়া থেকে মাদরাসা কেন নামমাত্র অর্থ আদায় করবে। বরং অসাধু চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে মোকাবলা করা এখন সময়ের দাবি।