থানাভবনে আলী নদবি: হাকীমুল উম্মতের স্মৃতিচারণ

322

আশরাফ আলী থানবি রহঃ। হাকিমুল উম্মত তাঁর উপাধি। গত শতকের ভারত উপমহাদেশের আধ্যাত্মিক রাহবর। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রহ.-এর নির্দেশে তিনি থানাভবনে  খানকায়ে এমদাদিয়ায় অবস্থান গ্রহণ করেন। থানাভবনকে কেন্দ্র করে ভারতে তখন ইসলাহ ও তারবিয়তের নতুন ধারা শুরু হয়। সুলুক ও তরিকতের নামে সমাজে অনৈসলামিক যেসকল কার্যকলাপ প্রচলিত ছিল তার সংস্কার করেন। সেজন্য তাকে মুজাদ্দিদুল মিল্লাত বলা হয়।

তবে এ মহান মনীষীর কর্মজীবন শুধু ইসলাহ ও তারবিয়াত এবং তাসাউফেরর ‘তাজদীদেই’ সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন তিনশতেরও অধিক গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর ইলমি মাকাম অনুধাবনের জন্য তাফসিরে বয়ানুল কুরআন অধ্যয়নই যথেষ্ট। ১৯৪৩ সালে ২০ জুলাই মতান্তরে ১৯ জুলাই হাকিমুল উম্মত রহঃ ইনতিকাল করেন।

বিশ শতকের অন্যতম ইতিহাসবিদ আবুল হাসান আলী নদবি তার পুরানে চেরাগ গ্রন্থে থানাভবনে গমন এবং হাকীমুল উম্মতের সাথে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেছেন। ইসলাম টাইমসের পাঠকদের জন্য তা অনুবাদ করে দেওয়া হলো।

 

আবুল হাসান আলী নদবি ।।

পরিশেষে থানাভবনে হাযিরা দেওয়ার সৌভাগ্যের দিন সমাগত হল। যে স্থানের উপখ্যান গমন-প্রত্যাগমনকারীদের যবানে দীর্ঘদিন যাবত শুনে আসছিলাম নিজ চোখে তা প্রত্যক্ষ করে অন্তর বলে উঠল – ফুল, বাগানের গাছেই দেখতে সুন্দর। ( অর্থাৎ থানবি রহ.- এর সাথে লেখকের আগেও সাক্ষাত হয়েছিল। তবে থানাভবনের সাক্ষাত ভিন্নরকম ছিল)

সম্ভবত, ১৯৪২ সালের মে মাস তখন। প্রচণ্ড গরম ছিল। জায়গায় জায়গায় লু হাওয়াও বইছিল। আমি মাওলানা ইলিয়াস কান্দলভির সাথে তাবলীগ জামাতের এক সফরে সাহরানপুর যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে কান্দালা, থানাভবন, নানুতা, রামপুরসহ এমন সব স্থান অতিক্রম করছিলাম যেসকল স্থান ছিল দেওবন্দের বুযুৃর্গদের বরকতে বরকতময়।

প্রোগ্রাম ছিল, কান্দলা থেকে মাওলানা ইলিয়াস সাহেবের সাথে রামপুরে যাওয়ার। ইতিমধ্যে মনে বাসনা জাগল থানাভবনের দরবারে একবার হাজিরি দিই। থানাভবন কান্দালা এবং রামপুরের মাঝামাঝিতে অবস্থিত।

আমি ইলিয়াস কান্দলভির কাছে চব্বিশঘন্টা থানাভবন থেকে সফর করে তিনি যে গাড়িতে রামপুর যাবেন সে গাড়িতেই থানাভবন থেকে রামপুর যাওয়ার অনুমতি চাইলাম। ইলিয়াস কান্দলভি সাহেব মাওলানা থানবিকে শাইখের মর্যাদা দিতেন। আমার থানাভবন যাওয়ার সংবাদ শুনে খুব খুশি হলেন এবং আনন্দের সাথে অনুমতি প্রদান করলেন।

থানাভবন যাবেন এমন এক হযরতের কাছে আমার আগমনের সংবাদ জানিয়ে মাওলানা থানবিকে একটি চিঠি পাঠালাম।

একদিন পর দুপুরের গাড়িতে থানাভবন পৌঁছুলাম। স্টেশন থেকে খানকাহে এমদাদিয়া খুব দূরে নয়। হেঁটেই চলে গেলাম। থানাভবনের আদাব ও কানুনের কথা এত অধিক শোনা হয়েছে যে, খানকায় পা দিতেই মনে হলো কোনো তালিবে ইলম মাদরাসায় ‘দাখিল’ হচ্ছে।

গরমের দিনে দুপুরের সময় খানকায় অবস্থানকারীরা নিজেদের কামরায় বিশ্রাম করছিলেন। আমি একপাশে ‘সামানা’ গুটিয়ে বসে পড়লাম। দুপুরের আযান হলে মাওলানা থানবি অযু করতে বের হলেন। এ মুহূর্তে সাক্ষাত উপযোগি মনে হলো না।

নামাযের পর বড় বড় ব্যক্তিত্ব এবং হযরতের নিকটজনদের নিয়ে বৈঠক শুরু হলো। যাদের মধ্যে খাজা আযিযুল হাসান মাজযুব সাহেব আমার পূর্ব পরিচিত ছিলেন। আমিও এক কিনারে বসে পড়লাম। মজলিসে বসতেই আমার নজরে পড়ল হযরতের ডেস্কের উপর আমার লেখা সিরাতে সাইয়্যিদ আহমদ শহিদ রাখা। যদিও আমার জানা নেই হযরত কি আমার মনতুষ্টির জন্য সেদিন কিতাবটি তার ডেস্কে রেখেছিলেন নাকি এটা সবসময় সেখানে থাকে। তবে এ দৃশ্য আমার অন্তরকে প্রফুল্ল করে দিল।

মজলিস শেষে হযরত চিঠির উত্তর দিতে ডেস্কে বসলেন। খাজা সাহেব পাশেই ছিলেন। হযরত খাজা সাহেবকে জিজ্ঞেস করলেন, লক্ষৌ থেকে ডাক্তার আবদুল আলী সাহেবের ভাই আসার কথা ছিল না! আমি তৎক্ষণাত সামনে এগিয়ে সাক্ষাত করলাম। জিজ্ঞেস করলেন, আগে দেখা করেননি কেনো! আসুন মুসাফাহা করি। আমি আরয করলাম, হযরতের অসুবিধে হতে পারে ভেবে আগে দেখা করতে আসিনি। হযরত বললেন, ‘এটা তো আমার জন্য লজ্জা, আফসোস এবং হতাশার কথা যে, আপনার আগমনের সংবাদ আমি পাইনি। এটাও কি কম কষ্টের আপনি এতক্ষণ এখানে অথচ আমি আপনার কোনো খোঁজই করতে পারিনি।  আপনি আসবেন জেনে চিঠি লেখার অনেক কাজ আজ নামাযের আগেই করে রেখেছি। যেন আপনার সাথে একান্তে কথা বলতে পারি’। আমার মতো কমবয়সী একজনের জন্য হযরতের এই আকুলতা ছিল অকল্পনীয়।

হযরত আবার জিজ্ঞেস করলেন, সাথে কেউ আছে কি না এবং খাবারে কোনো বাছবিচার করি কি না! ধারণা করা যাচ্ছিলো হযরত নিজেই আমার মেহমানদারি করবেন। তবে এটা ছিল সাধারণ প্রচলনের বিপরিত।

অতপর হযরত কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ছাড়াই বললেন, ‘তবে আমাকে ক্ষমা করতে হবে যে, ‘তবিয়তে’ সামান্য অসুবিধে থাকার কারণে দস্তরখানে শরিক হতে পারব না’।

জিজ্ঞেস করলেন, কতদিন থাকবার ‘এরাদা’। আমি বললাম একদিন। হযরত বললেন, এত সংক্ষিপ্ত সফর! তবে যা হোক ‘ইসরার’ পীড়াপীড়ি করে কষ্টে ফেলাও উচিত নয়।

অতপর সাধারণ কথা শুরু হলো। অধমের খানদান, শাহ ওলিউল্লাহ, শাহ আবদুল আযীয, শাহ ইসমাঈল শহীদকে নিয়ে কথা হলো বেশি।

রাতের খাবার হযরতের ঘরে হলো। দস্তরখানে মেহমানের মনতুষ্টি ও যত্নের ছাপ ছিল স্পষ্ট।

ফজরের পরে সাধারণ বৈঠক ছিল। খাজা সাহেবের মাধ্যমে হযরত আমার ইযাযত তলব করলেন, বৈঠকে আরো কেউ উপস্থিত হতে পারবে কি না! আমি লজ্জিত হয়ে বললাম, অবশ্যই।

বৈঠকে হযরত কথা বলছেন। কী প্রাণবন্ত আলোচনা! সুফিবাদের নামে যেসব সুক্ষতা ও রুক্ষতা প্রচলিত তার ছিটেফোঁটাও নেই।

একদিন খানকাহে এমদাদিয়েতে অবস্থান করে আমার কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেলো, থানাভবনের খানকাহর ব্যাপারে কঠোরতার যে বক্তব্য লোকমুখে প্রচলিত তার মূল কারণ হচ্ছে ভুল বুঝাবুঝি এবং লোকদের বাড়িয়ে বলার প্রবণতা।

কানুনে কঠোরতা ছিল, তবে তা কেবল ‘সালেকিন’দের জন্য। যারা ইসলাহ ও তরবিয়তের জন্যই থানাভবনে হাযির হয়েছে কেবল তাদের জন্য। মেহমান এবং দর্শনার্থীদের উপর তার কোনো প্রয়োগ ছিল না। বরং মেহমানদের মেজাজ-মর্জির ব্যাপারে পূর্ণ লক্ষ্য রাখা হতো। তবে লোকেরা ভুল বুঝে ‘কানুনের’ অপপ্রয়োগ করতো।

অনুবাদ: ওলিউর রহমান