মানুষের ভালোবাসার পাত্র হওয়াও দায়ীর অনেক বড় অর্জন

159

মাওলানা মাহমুদুল হাসান ।।

আল্লাহর দিকে ডাকার সব পন্থাই দাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত। দাওয়াতের মাধ্যমে আমরা পরস্পর একে অন্য থেকে দ্বীনী ফায়দা লাভ করি। আর মানুষ যাকে ভালোবাসে তার আবদার রক্ষা করে, তার থেকে কোন কল্যাণকর বিষয়ই উপেক্ষা করে না, তার থেকে উপকৃত হতে বিরক্ত বোধ করে না। যাকে ঘৃণা করে তার ভালো কথাও গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকে না। তাই মানুষের ভালোবাসার পাত্র হওয়াও মুমিনের একটি সিফাত। কোন সন্দেহ নেই যে, সর্বাগ্রে একজন মুসলমানের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা। তবে মানুষের নিকট প্রিয় হওয়া দাওয়াত কবুল করার জন্য অন্যতম একটি মাধ্যম। এতে করে মানুষের দিল সব সময় ইসলামের সৌন্দর্য কবুল করার জন্য উদগ্রীব থাকবে।

অপরদিকে আমরা যদি রূঢ় স্বভাবের হই, আমাদের মেযাজে যদি থাকে রুক্ষতা তাহলে মানুষের সাথে আমাদের শুধু দূরত্বই বৃদ্ধি পাবে। আর এজন্য আমরাই দায়ি হবো। আমার আচরণই আমাদের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টির কারণ হবে। কোন সন্দেহ নেই যে, এ কারণে ফায়দার আদান-প্রদান থেকে আমরা উভয় পক্ষই মাহরুম হব।

যদি লক্ষ্য করি, এক্ষেত্রে নববী আদর্শ কী? দেখবো, উন্নত আখলাক ও সুন্দর চরিত্রের মাধ্যমে মানুষকে হকের দিকে আহ্বান করা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দপূর্ণ সকলগুণে গুণান্বিত হওয়া, যে সকল গুণ কোন মুসলমানের মাঝে পূর্ণরূপে পাওয়া গেলে লোকজন তার প্রতি ধাবিত হতে থাকে এবং তার সাথে সম্পর্ক করতে ভালোবাসে এমন গুণের অধিকারী হওয়া। সেটাই ছিলো নববী আদর্শ। আল্লাহর নিকট মাহবুব হওয়ার সাথে এর কোন বৈপরীত্যও নেই। উভয়ের মাঝে জমা করা সম্ভব। বরং এটা শরীয়তেও কাম্য।

রাসূলের শানে ঐশী বাণীও আমাদেরকে এ শিক্ষাই দেয়। আল্লাহ তা‘আলা তার রাসূলের শানে ঘোষণা করেছেন। এরশাদ হয়েছে, وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ  অর্থ: আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।

হযরত আলী রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর গুণ বর্ণনা করে বলেছেন, من رآه بديهةً هابه ومَن خالطه معرفةً أحبه অর্থ: যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রথমবার হঠাৎ দেখতো তাঁর গাম্ভীর্যের কারণে তাঁকে ভয় করতো। অতপর যখন পরিচিত হয়ে তার সাথে উঠাবসা করতো, তাঁর সুন্দর আখলাক দেখতো তাঁকে খুব ভালোবাসতো। তিরমিযী শরীফ হাদীস ৩৬৩৮

ছাহাবাদের মাঝে উভয় গুণ একসাথে ছিলো। লোকজনের ভালোবাসা লাভের আগ্রহ, পাশাপাশি আল্লাহ তা‘আলার ভালোবাসা অর্জনের প্রতি বে-ইনতিহা তামান্না। তাদের মাঝে উভয়টা জমা হয়েছিলো সুচারূপে। যেহেতু উভয়টার উদ্দেশ্য ছিলো এক ও অভিন্ন। উভয়টার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

হযরত আবু হুরাইরা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে দোয়া চাইলেন। বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জন্য এবং আমার আম্মার জন্য দোয়া করুন, যেন আল্লাহ আমাকে ও আমার আম্মাকে মুমিনদের নিকট মাহবুব বানিয়ে দেন এবং আমাদের অন্তরে তাঁদের ভালোবাসা ঢেলে দেন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু হুরায়রা রা. এবং তাঁর আম্মার জন্য এ দোয়া করেছিলেন এবং বলেছিলেন,اللهم حبِّب عُبَيدك هذا – يعني أبا هريرة وأمه – إلى عبادك المؤمنين، وحبب إليهم المؤمنين অর্থ: হে আল্লাহ! আপনার এ বান্দার প্রতি এবং তার আম্মার প্রতি আপনার মুমিনবান্দাদের ভালোবাসা ঢেলে দিন। এবং মুমিনদের প্রতিও তাদের অন্তরে ভালোবাসা পয়দা করে দিন! মুসলিম শরীফ হাদীস ১৫৮/২৪৯১

রাসূলের নিকট এসে এ কথা বলাও কোন দোষের বিষয় ছিলো না যে, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমলের কথা বলে দিন, যা করলে আল্লাহ তা‘আলাও আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে। বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদেরকে এই ভালোবাসা লাভের পদ্ধতি বলে দিতেন। বর্ণিত আছে, হযরত সাহল বিন সা‘আদ রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তি এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন আমলের কথা বলে দিন যা করলে আল্লাহ তায়ালাও আমাকে ভালোবাসবেন এবং মানুষও আমাকে ভালোবাসবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, ازهد في الدنيا يحبك الله، وازهد فيما في أيدي الناس يحبك الناس দুনিয়া ত্যাগ করো আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। লোকদের মালের লোভ ছেড়ে দাও, লোকজনও তোমাকে ভালোবাসবে। ইবনে মাজা শরীফ হাদীস ৪১০২

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছু দুর্বল ঈমানের অধিকারী মুমিনকে অনেক দান করে করে মন জয় করতেন, এভাবে তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতেন। বর্ণিত আছে,إني لأعطي الرجل وغيره أحب إليَّ منه خشية أن يكُبَّه الله في النار অর্থ: নিশ্চয় আমি কতককে দান করে থাকি ( যাতে তারা ঈমানের উপর অটল থাকে। এজন্য না যে তারা আমার নিকট অধিক প্রিয়।) অথচ অন্যজন আমার নিকট অধিক প্রিয়, (ওই লোদকদেরকে দান করার উদ্দেশ্য) যেন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ না করেন। বুখারী শরীফ হাদীস ২৭

তবে এ ভালোবাসা হতে হবে আল্লাহর জন্যে। নিজেদের মাঝে ভালোবাসার এই আদান-প্রদান যদি একমাত্র আল্লাহর জন্য না হয়, তবে সেটা হবে নেফাক, চাটুকারিতা ও মুসাহেবি। তাই মানুষকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা একজন মুমিনের জন্য আবশ্যক। এভাবে যদি কেউ পরিপূর্ণ ভালোবাসতে পারে, তবেই তার ঈমান পূর্ণতা লাভ করবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে- من أحب لله وأبغض لله، وأعطى لله ومنع لله، فقد استكمل الإيمان
অথ: যে আল্লাহর জন্য ভালোবাসে এবং রাগ করে, আল্লাহর জন্যই দান করে এবং দান থেকে বিরত থাকে সে যেন তার ঈমানকে পূর্ণ করে নিলো।

ঈমান ও পরস্পর ভালোবাসার মাঝে গভীর সম্পর্ক। হাদীস শরীফেও ঈমানের পূর্ণতার সম্পর্ক একে অপরকে ভালোবাসার সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
لا تدخلون الجنة حتى تؤمنوا، ولا تؤمنوا حتى تحابوا، أو لا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم، أفشوا السلام بينكم
(অর্থ: তোমরা ঈমান আনা পর্যন্ত জান্নাতে যেতে পারবে না। পরস্পর একে অপরকে ভালোবাসা পর্যন্ত পরিপূর্ণ মুমিনও হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলে দিবো না যা করলে তোমরা একে অপরকে ভালোবাসবে! পরস্পরের মাঝে সালামের অধিক প্রচার প্রসার করো।)