মিরপুরের জ্যাম, মেট্রোরেল, বয়স ও সুখ-দুখের গল্প

134

ওলিউর রহমান ।।

বছরখানেক আগে ফেসবুকে কার পোস্টে যেন দেখেছিলাম, মিরপুর থেকে গুলিস্তান যেতে চাইলে চিড়া-মুড়ি-গুড় বা অন্য কোনো শুকনো খাবার নিয়ে ওঠা উচিত। তখন ঢাকার বাইরে ছিলাম কিছুদিন। তবে পুরান ঢাকায় থাকার কারণে আমার যেহেতু চকবাজারের রিকশা-জট, ও মৎস্য ভবন থেকে সাড়ে চার ঘন্টায় শাহবাগ যাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল তাই মিরপুর কাহিনী খু্ব ভয়াবহ মনে হচ্ছিল না তখন। মিরপুর থেকে গুলিস্তান তো ‘সফর’ সমান দূরত্বেই অবস্থিত।

তবে কোনো ব্যাপার যখন প্রবাদতুল্য হয়ে যায় সেটাকে সমীহ না করে উপায় কী! তাই পোস্ট দেখে ঢাকার বাইরে থেকেই মনে মনে আখাঙ্ক্ষা করছিলাম, আবার কখনো ঢাকায় গেলে আমাকে যেন মিরপুরে বাসা নিতে না হয়।

কিন্তু ভাগ্যের লিখন। কিতাবে আছে, ভাগ্য লেখার কলমের কালি কবেই শুকিয়ে গেছে! তাই আমাকে মিরপুরেই বাসা নিতে হয়েছে এবং রাজধানীর ‘সুন্দরতম’ সড়কে প্রতিদিন দুইবার যাতায়াত করতে হচ্ছে।

বারো নং সেক্টরের সাগুফতা আবাসিকে বাসা রাহাত সাহেবের। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। কাজিপাড়ায় তার অফিস। নয়টায় অফিস টাইম হলেও সাতটার আগেই তাকে গাড়িতে উঠতে হয়। সাড়ে এগারো, পুরবি, এগারোর জ্যামেরর পর দশ নাম্বারের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যাম পেরিয়ে কাজিপাড়ার অফিসে পৌঁছুতে নয়টা বাজার খুব বাকী থাকে না তার। অথচ দূরত্ব তিন কিলোমিটারও নয়। হাঁটলে আধঘন্টার পথ।

আজ অফিসে যাওয়ার সময় বাসে আমার পাশের সিটে বসেছিলেন তিনি। পুরবির সামনে দশমিনিট আটকে থেকে বলছিলেন, ‘তোমাদের সমান বয়স হলে এ পথটুকু হেঁটেই যেতাম-আসতাম। প্রতিদিন তিন থেকে চার ঘন্টা বাসে বসেই কাটাতে হয়। আজ চার বছর যাবত একই অবস্থা। ছুটির দিন ছাড়া বাড়তি একটা কাজ করারও সুযোগ নেই। অফিস আর রাস্তায় কেটে যায় দিন।

আমি বললাম, আঙ্কেল, কিছুদিন পরে তো মেট্রোরেলই হচ্ছে আর উপরে থাকবে ফ্লাইওভার- তখন তো দু’মিনিটেই অফিসে চলে যেতে পারবেন! ভদ্রলোক বললেন, এই ক’বছরে যে ‘সুখ’ পেয়েছি; সুখের আর বাকী রইলো কী? মেট্রোরেল চালু হবে তো ভাল কথা তখন দেখা দিবে আরো নিত্যনতুন কত ফ্যাসাদ।

অবশ্য ১৩ নং সেক্টরের একটি স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়া আবির মেট্রোরেল নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস দেখায়। তার বাসা পল্লবী ঝিলপাড় মসজিদের কাছে। আমার সাথে প্রায়দিন সকালেই ১২ নাম্বার বাসট্যান্ডে দেখা হয়। খু্ব বেশি তাড়া না থাকলে দেড়-দুইঘন্টা জ্যামে বসে থাকা তার কাছে বিরক্তিকর নয়। আরেকটু বড় হলো পুরো ঢাকা মাত্র কয়েকঘন্টার ব্যবধানে ঘুরে ফেলতে পারবে এই স্বপ্নে তার বর্তমান কষ্টকে কষ্ট মনে হয় না।

আজকেও তেরো নাম্বার থেকে দশ নাম্বার হয়ে বারো নাম্বারে আসতে একঘন্টার বেশি লাগল। বাসে বসে বসে রাহাত সাহেব ও আবিরের কথা ভাবছিলাম। বয়স্ক রাহাত সাহেব উন্নয়ন নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর তরুন আবির কত উচ্ছ্বসিত।

পাশে তাকিয়ে দেখি, লেগুনা যেতে পারে সমান জায়গায় পেছনের একটি বাস মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছে। এখন না পারছে সামনে যেতে না পারছে পিছে সরতে। এভাবেই অহেতুক জ্যাম দীর্ঘ হয়।

রাহাত সাহেবের আরেকটি কথা মনে পড়লো। রাজধানী- যেখানে কোনো ভূমিকা ছাড়া হঠাৎ করেই এখানে সেখানে জ্যাম লেগে যায়, সেখানে চারবছর ধরে মিরপুর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ব্যস্ততম সড়ক পুরোটাই একসাথে কেটে রাখার কী যৌক্তিকতা। একটু একটু করে আগালেই তো আর পুরো ঢাকাবাসীর অতিরিক্ত কষ্টটা একসাথে করতে হতো না!

দেশজুড়ে কাজ কী হচ্ছে সেটাতো সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীলদের নিয়মিত বক্তব্য থেকে আমরা প্রতিনিয়তই জানতে পারছিই; তবে জন-কল্যাণের কাজ নিখুঁত পরিকল্পনার অভাবে একটা দীর্ঘসময় পর্যন্ত জন-দুর্ভোগের কারণ হচ্ছে কি না এ ব্যাপারেও নিয়মিত খোঁজ নেয়া দায়িত্বশীলদের কর্তব্য ছিল।