হজ্ব ও উমরাহ: পদ্ধতি ও মাসায়েল

237

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া  ।।

 

হজ্ব কার উপর ফরয

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হল হজ্ব। প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন ব্যক্তি, যার মালিকানায় নিত্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং নিজের ও পরিবারের বাসস্থান ও ভরণ-পোষণের খরচের অতিরিক্ত এ পরিমাণ টাকা-পয়সা, স্বর্ণ-রূপা বা জমিজমা রয়েছে, যা দ্বারা হজ্বে যাওয়া-আসার ব্যয় এবং হজ্বকালীন সাংসারিক খরচ হয়ে যায়, পবিত্র কুরআন ও হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী তার উপর হজ্ব আদায় করা ফরয। হজ্ব জীবনে একবারই ফরয হয়। একবার ফরয হজ্ব আদায়ের পর পরবর্তীতে হজ্ব করলে তা নফল হবে।

প্রকাশ থাকে যে, হজ্ব ফরয হওয়ার জন্য নগদ টাকা থাকা জরুরি নয়; বরং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমিজমা কিংবা ব্যবসার মাল হজ্বের খরচ সমপরিমাণ থাকলেও হজ্ব ফরয হবে।

* মহিলার হজ্ব আদায়ের জন্য মাহরাম থাকা জরুরি। মাহরামের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অবশেষে মৃত্যুর আগে বা মাজুর হয়ে পড়লে কাউকে দিয়ে বদলি করাবে। কিন্তু কোনো অবস্থায় মাহরাম পুরুষ ছাড়া হজ্বে যাওয়া জায়েয হবে না। এমনকি এমন মহিলা আত্মীয়, যার সাথে মাহরাম আছে তার সঙ্গী হয়েও যাওয়া যাবে না।-মানাসিক ৫৫-৫৭; গুনইয়াতুন নাসিক ২৬

হাদীস শরীফে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে, কোনো পুরুষ বেগানা মহিলার নিকট নির্জনে অবস্থান করবে না এবং কোনো মহিলা মাহরাম পুরুষ ব্যতীত সফর করবে না। তখন জনৈক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, আল্লাহর রাসূল! আমি তো অমুক যুদ্ধে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছি অথচ আমার স্ত্রী হজ্বের সফরে বের হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, যাও। তুমিও তোমার স্ত্রীর সাথে হজ্ব কর।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ৩০০৬

আরেক হাদীসে আছে, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কোনো মহিলা যেন মাহরাম ছাড়া হজ্বে (সফরে) বের না হয়।-সুনানে দারাকুতনী ২/২২৩

 

হজ্বের ফযীলত

হাদীস শরীফে হজ্বের বহু ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে এ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদীস উল্লেখ  করা হল।

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

مَنْ حَجَّ لِلّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمٍ وَلَدَتْهُ اُمُّهُ

 

অর্থ : যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে এভাবে হজ্ব করবে যে, অশ্লীল কথাবার্তা বলবে না এবং গুনাহের কাজ করবে না সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে হজ্ব থেকে ফিরে আসবে যেদিন মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়েছিল।-সহীহ বুখারী, হাদীস : ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৫০

আতা ইবনে ইয়াসার রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-

مَنْ حَجَّ الْبَيْتَ فَقَضَي مَنَاسِكَهُ وَسَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ غُفِرَ لَهَ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ.

 

অর্থ : যে ব্যক্তি বাইতুল্লাহর হজ্ব করবে, হজ্বের কাজগুলো যথাযথভাবে আদায় করবে এবং মুসলমানরা তার মুখ ও হাত থেকে নিরাপদ থাকবে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।-মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক, হাদীস : ৮৮১৭

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

اَلْعُمْرَةُ اِلَي الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا، وَالْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ اِلاَّ الْجَنَّةُ.

 

অর্থ : এক উমরার পর আরেক উমরা করলে মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহসমূহ মাফ হয়ে যায়। আর হজ্বে মাবরুর (মাকবুল হজ্ব)-এর প্রতিদান একমাত্র জান্নাত।Ñসহীহ বুখারী, হাদীস : ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস : ১৩৪৯

জাবির রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

اَلْحُجَّاجُ وَالْعُمَّارُ وَفْدُ اللهِ، دَعَاهُمْ فَاَجَابُوْهُ وَسَئَلُوْهُ فَاَعْطَاهُمْ.

 

অর্থ : হজ্ব ও উমরাকারীগণ  আল্লাহ তাআলার দল। তিনি তাদেরকে ডেকেছেন, তারা সাড়া দিয়েছে। তারা আল্লাহ তাআলার কাছে চায় তিনি তা কবুল করেন।-মুসনাদে বাযযার, হাদীস : ১১৫৩; মাজমাউয যাওয়াইদ : ৫২৮৮

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত অন্য বর্ণনায় এসেছে-

قَالَ رَسُوْلُ اللّهِ صَلَّي اللّهُ عَلَيْهَ وَسَلَّمَ : اَللّهُمَّ اغْفِرْ لِلْحَاجِّ وَلِمَنْ اِسْتَغْفَرَ لَهُ الْحَاجُّ.

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, হে আল্লাহ! আপনি হজ্ব আদায়কারীকে ক্ষমা করে দিন এবং সে যার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তাকেও ক্ষমা করে দিন।-সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস : ২৫১৬; মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস : ১৬৫৪

 

হজ্ব আদায়কারীর প্রতি কুরআন মাজীদের হেদায়াত

হজ্ব সম্পর্কে কুরআন মাজীদে সূরা বাকারার ১৯৬-২০৩ পর্যন্ত মোট ৮টি আয়াতে জরুরি হেদায়াত দেওয়া হয়েছে। হজ্ব আদায়কারীর জন্য সেগুলোর প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। তাই এ আয়াতগুলোর অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়ে নেওয়া উচিত। নিম্নে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ দু’ একটি আয়াত উল্লেখ করা হল।

وَ اَتِمُّوا الْحَجَّ وَ الْعُمْرَةَ لِلّٰهِ ؕ

অর্থ : আর তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ্ব ও উমরা পূর্ণ কর। (সূরা বাকারা : ১৯৬)

এই আয়াতে হজ্ব ও উমরার নিয়ত ও উদ্দেশ্য ব্যক্ত করা হয়েছে। তা হল, একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন। সুতরাং দুনিয়ার যশ-খ্যাতি, লোক-দেখানো, হাজ্বী বা আলহাজ্ব উপাধি পাওয়া প্রভৃতি নিয়ত থেকে বিরত থাকতে হবে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

اَلْحَجُّ اَشْهُرٌ مَّعْلُوْمٰتٌ فَمَنْ فَرَضَ فِیْهِنَّ الْحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَ لَا فُسُوْقَ وَلَا جِدَالَ فِی الْحَجِّ ؕ وَ مَا تَفْعَلُوْا مِنْ خَیْرٍ یَّعْلَمْهُ اللّٰهُ

 

অর্থ : হজ্ব সুবিদিত মাসসমূহে হয়ে থাকে। যে ব্যক্তি সেসব মাসে (ইহরাম বেঁধে) নিজের উপর হজ্ব অবধারিত করে নেয় সে হজ্বের সময় কোনো অশ্লীল কথা বলবে না, কোনো গুনাহ করবে না এবং কোনো ঝগড়াও করবে না। তোমরা যা কিছু সৎকর্ম কর আল্লাহ তা জানেন। (সূরা বাকারা : ১৯৭)

এই আয়াতে ইহরামকারীকে মোট তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

১. অশ্লীল কথা বলবে না। স্ত্রীর সাথেও কামোত্তেজক কথাবার্তা বলা থেকে বিরত থাকবে।

২. সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকবে। অর্থাৎ ইহরামের কারণে বিশেষভাবে যা নিষিদ্ধ এবং সাধারণ অবস্থায় যা গুনাহ উভয় প্রকার নিষিদ্ধ কাজ থেকেই বিরত থাকতে হবে।

প্রকাশ থাকে যে, সাধারণ অবস্থায় যা করা গুনাহ ও নিষিদ্ধ ইহরাম অবস্থায় তা আরো কঠোরভাবে নিষিদ্ধ; যেমন, অন্যকে কষ্ট দেওয়া, কু-দৃষ্টি ও গীবত-শেকায়েত ইত্যাদি।

৩. ঝগড়া-বিবাদ থেকে বিরত থাকবে। এটিও সব সময়ের জন্য নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। এ হিসেবে এটি দ্বিতীয় প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। তথাপি আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে তা উল্লেখ করেছেন, যেন ঝগড়া-বিবাদ থেকে মুক্ত হয়ে হজ্বের মতো মহান ইবাদত নির্বিঘ্নে আদায় করা যায়।

হজ্বের মধ্যে কিছু কিছু ক্ষেত্র এমন আছে, যেখানে অনেকে ধৈর্যধারণ করতে পারেন না। অথচ এই সফরের পুরো সময় আল্লাহ তাআলার এই হুকুম রয়েছে। তাই খুব সজাগ থাকতে হবে। কেউ বড় অন্যায় করে ফেললেও তার সাথে ঝগড়া-বিবাদ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, মানুষকে ক্ষমা করে দিলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা পাওয়া যাবে। বড় সফলতা অর্জিত হবে। হজ্বের সফরে সাধারণত ঝগড়া-বিবাদ হতে দেখা যায় এমন কিছু ক্ষেত্র হল :

* গ্রুপ লিডারের আচরণে কষ্ট পেলে কিংবা তাঁর দেওয়া প্রতিশ্রুতির উল্টো হলে।

* খাওয়া-দাওয়া নিয়ে।

* হোটেল নির্বাচন ও থাকার জায়গা নিয়ে।

* মিনা ও আরাফায় নামায পড়া নিয়ে।

* বিশেষ করে মিনায় থাকার জায়গা নিয়ে তো অনেকের একচোট ঝগড়া হয়েই যায়।

* মসজিদে হারামে জায়গা ধরে রাখা নিয়ে।

* বাসের সিট নিয়ে ইত্যাদি।

অতএব নিজের হজ্ব কবুল হওয়ার স্বার্থেই এসব বিষয়ে ঝগড়া থেকে বিরত থাকুন।

 

হজ্বের রূহানিয়াত : জরুরি হেদায়াত

হজ্ব ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি রুকন। জীবনে তা একবারই ফরয হয়। সুদীর্ঘ সফর এবং বড় ধরনের খরচের মাধ্যমে শ্রমসাধ্য এ ইবাদতটি সম্পন্ন হয়। এজন্য সওয়াবও বেশি। সুতরাং হাজ্বীদের উচিত হজ্বের সকল কষ্টকে সৌভাগ্য মনে করে বরণ করে নেওয়া। হজ্বের সকল কাজের উৎপত্তি ও সূচনাতে কষ্ট ও মুজাহাদার সাক্ষ্য রয়েছে। হযরত ইবরাহীম আ. ও ইসমাঈল আ.-এর মুজাহাদা এবং হাজেরা রা.-এর কষ্ট ও মুজাহাদা দিয়ে এর সূচনা। যার কিছু ছিটেফোঁটার সম্মুখীন হাজীগণ আজও হয়ে থাকেন। তাই এখানের কষ্টকে হজ্বের রূহ জেনে সৌভাগ্যের সাথে মেনে নিবেন। এখান থেকে আল্লাহর জন্য কষ্ট সহ্য করা ও সবরের সবক নিন।

* হজ্ব ও উমরাহ আদায়কারী আল্লাহ তাআলার মেহমান। মেহমানের বিশেষ পোশাক হল সেলাইবিহীন ইহরামের কাপড়। আল্লাহর মেহমান হওয়ার সৌভাগ্য লাভ হয়েছে এই অনুভূতি সর্বদা জাগ্রত রাখবেন এবং এর স্বাদ অনুভব করার চেষ্টা করবেন। খেয়াল রাখবেন, মেজবান অসন্তুষ্ট হন এমন কোনো কাজ যেন না হয় এবং তাঁর ঘরের অসম্মান হয়-এমন কোনো আচরণ যেন প্রকাশ না পায়।

* ভদ্র মেহমান মেজবানের বাড়ির কোনো কিছু নিয়ে সমালোচনা করে না। এমনকি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত কোনো এুটি বা মেজবানের বাড়ির চাকর-নওকরের দোষ-ত্রুটি রও সমালোচনা করে না। আল্লাহর ঘরের মেহমানকেও ভদ্রতা রক্ষা করতে হবে।

* মক্কা মুকাররামা ও মদীনা মুনাওয়ারার মাঝে তুলনা করবেন না; বরং যখন যেখানে থাকবেন সৌভাগ্য মনে করে সেখানের সংশ্লিষ্ট কাজ ও ইবাদত-বন্দেগীতে মগ্ন থাকবেন।

* হজ্বের সকল আমলের অন্যতম উদ্দেশ্য হল আল্লাহ তাআলার স্মরণ তাজা করা। তাই প্রতিটি কাজে এর খেয়াল রাখবেন। স্মরণ ছুটে গেলেই ইস্তিগফার দ্বারা ক্ষতিপূরণ করে নিবেন। ২৪ ঘণ্টা আল্লাহর হয়ে থাকা, বসা- শোয়া, হাঁটা সর্বদা তাঁর খেয়াল তাজা রাখার সবক নিন। সকল ক্ষেত্রে শরীয়তের প্রতি এবং সুন্নত ও আদাবের প্রতি খুব খেয়াল রাখুন।

* প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহ তাআলার সাহায্য প্রার্থনা করুন। ‘হে আল্লাহ! হেফাযত করুন, সহজ করুন এবং কবুল করুন। আপনার সন্তুষ্টির সাথে সমাপ্ত করার তাওফীক দিন।’ হজ্বের সকল কাজ এই মিনতি ও প্রার্থনা দ্বারা শুরু ও শেষ করুন।

* তাওয়াফ অবস্থায় যদিও কথা বলা জায়েয, কিন্তু যথাসম্ভব আল্লাহ তাআলার ধ্যানে মগ্ন থাকবেন। তাঁর সন্তুষ্টি, রহমত, বরকত ও মাগফিরাত এবং মুহাব্বত লাভের উদ্দেশ্যে তাঁর ঘরের চারপাশে ভিক্ষুকের মতো ঘুরছেন-এ ধরনের ধ্যানে বিভোর থাকবেন।

* তাওয়াফ, সাঈ এবং হজ্বের সকল ক্ষেত্রে ভিডিও করা, ছবি তোলা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকুন। হারামের এলাকায় সব ধরনের গুনাহ বিশেষ করে চোখের গুনাহ থেকে বিরত থাকুন। কেননা বাইতুল্লাহ হল গুনাহ মোচনের স্থান। সেখান থেকে মানুষ পবিত্র হয়ে আসে। কেউ যদি সেখান থেকে গুনাহর বোঝা বাড়িয়ে নিয়ে আসে তাহলে এই হতভাগা তার গুনাহ থেকে পাক হবে কোথায় গিয়ে?!!

* অনুরূপভাবে সাফা-মারওয়ার সাঈর সময় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি, তাঁর মুহাব্বত ও মাগফিরাত লাভের উদ্দেশ্যে ছোটাছুটি করা হচ্ছে এবং এগুলোর সন্ধান করছেন এমন নিয়ত করবেন। ভাববেন, মারওয়াতে গেলে বুঝি ওসবের সন্ধান মিলবে। আবার সেখানে গিয়ে ভাববেন, সাফাতে গেলে মাওলা হয়ত দিয়েই দিবেন।

* হজ্ব-উমরাতে কোনো নির্দিষ্ট দুআ পড়া জরুরি নয়। এমন কোনো দুআ নেই, যা না পড়লে হজ্ব-উমরাহ হবে না। শুধু তালবিয়াটা মুখস্থ করে নিবেন। তারপরও এ পুস্তিকায় গুরুত্বপূর্ণ ছোটখাটো কিছু দুআ উল্লেখ করা হয়েছে। যারা আরবী পড়তে পারেন তাদের উদ্দেশ্যে শুধু আরবী পাঠ দেওয়া হয়েছে। বাংলা উচ্চারণ দেখে দুআ পড়া ঠিক নয়। তাই তা দেওয়া হয়নি। প্রয়োজনে দুআর ভাবার্থ ও তরজমা পড়তে পারেন।

* হজ্বে দুআ-মুনাজাত বাংলাতেও করা যায়। ‘মুনাজাতে মাকবুল’ বাংলা তরজমাসহ সাথে নিয়ে নিবেন। আরবী না পারলে তরজমা দেখে দেখে দুআ-মুনাজাত করবেন। আর তালবিয়া, যিকর, দরূদ শরীফ, তাসবীহ, কালিমা তাইয়্যিবা, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি এ সফরে আপনার সর্বোত্তম আমল।

 

কিছু জরুরি মাসায়েল

* হজ্ব-উমরার আমলের ক্ষেত্রে ভিন্নতা দেখলে বিচলিত হবেন না। এ নিয়ে কারো সাথে বিতর্কেও জড়াবেন না। দেশের যে আলেমের ইলম ও তাকওয়ার প্রতি আপনার আস্থা রয়েছে তার সমাধান বা দিকনির্দেশনা অনুযায়ী আমল করবেন। নিম্নে ভিন্নতার একটি দৃষ্টান্ত পেশ করা হল।

মিনা, মুযদালিফা কি মক্কার অংশ?

মিনা, মুযদালিফা ও আরাফাতে চার রাকাত বিশিষ্ট ফরয নামায দুই রাকাত পড়া হবে নাকি চার রাকাত? এ নিয়ে ভিন্নতা দেখা যায়। এক্ষেত্রে মাসআলা হল :

যদি কেউ মিনা যাওয়ার আগে একনাগাড়ে ১৫ দিন থাকার নিয়তে মক্কায় অবস্থান করেন তাহলে তিনি নিশ্চিত মুকীম। তিনি মিনা, মুযদালিফা ও আরাফায় পূর্ণ নামায পড়বেন। কসর করবেন না।Ñবাদায়েউস সানায়ে ১/২৭০; আলবাহরুল আমীক ৩/১৪১৮; মানাসিক ১৯৬

আর যে হাজ্বীর মক্কা ও মিনাসহ ১৫ দিন অবস্থান হয়ে যায়, তার ব্যাপারে পূর্ণ নামায পড়া বা না পড়া নিয়ে দুই ধরনের বক্তব্যই আছে। অধিকাংশের মত হল, মিনা মক্কা শহরের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আরাফার আগে মিনা-মক্কাসহ ১৫ দিন অবস্থান হলে মুকীমই গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে মিনার তাঁবু মুযদালিফার অংশে পড়লেও মিনার তাঁবুর সাথে সংযুক্ত হওয়ার কারণে এক এলাকা এবং একই বসতি গণ্য করে মুকীম ধরা হবে। দারুল উলূম করাচী থেকেও মিনা ও মুযদালিফাকে মক্কার অন্তর্ভুক্ত বলে ফতওয়া প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া মাদরাসা সওলতিয়ার তত্ত্বাবধানে ভারত ও পাকিস্তানের মুফতীদের একটি দল সরাসরি মিনা-মুযদালিফা প্রত্যক্ষ করে বলেছেন যে, ১৪২৪ হিজরীতে আজিজিয়া হতে একটি বসতি বৃদ্ধি হয়ে মুযদালিফার অংশে এসে গেছে। তাই মিনার মতো মুযদালিফাও মক্কার অংশ। সুতরাং কোনো ব্যক্তির মক্কা, মিনা ও মুযদালিফাসহ ১৫ দিন অবস্থান হয়ে গেলেও তিনি মুকীম গণ্য হবেন। (দেুখন : ইযাহুল মানাসিক, মুফতী শাব্বীর আহমদ, জামেয়া কাসেমিয়া, শাহী মুরাদাবাদ, ইন্ডিয়া) অবশ্য এ ব্যাপারে কারো কারো ভিন্নমতও আছে। আপনি যে বক্তব্যের উপরই আমল করবেন নামায হয়ে যাবে।

মোটকথা, মিনা, মুযদালিফা মক্কার অন্তর্ভুক্ত হওয়া এবং সে হিসেবে ১৫ দিন হয়ে গেলে পূর্ণ নামায পড়া বা কসর পড়া উভয় মতের পক্ষে দলিল আছে। সুতরাং যে মতের উপরই আমল করা হোক নামায হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। তাই এক্ষেত্রে জরুরি হল, এ নিয়ে বিচলিত না হওয়া এবং কারো সাথে বিতর্কে না জড়ানো। কোনো পক্ষের আমলকে ভুল সাব্যস্ত না করা; বরং আপনি যাদের সাথে আছেন তাদের সাথে মিলে জামাতে নামায পড়ে নিবেন। মনে রাখবেন, হজ্ব বড় ধরনের ঐক্যের প্রতীক। এতে বিভেদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়।

 

ইহরাম করার পর হজ্বে যেতে না পারলে

ইহরাম করার পর শরীয়তসম্মত ওজরের কারণে মক্কায় যাওয়া সম্ভব না হলে যেমন, সরকারীভাবে বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা ফ্লাইটের সমস্যার কারণে যাওয়া না হলে বা মারাত্মক অসুস্থতার কারণে যাওয়া সম্ভব না হলে, তদ্রƒপ মহিলার মাহরাম মারা যাওয়া বা মাহরামের সফর মুলতবী হওয়ার কারণে মহিলা যাত্রা বিরতি করলে বা মহিলার স্বামী মারা গেলে (যেহেতু ইদ্দতের কারণে সফর মুলতবী করা জরুরি) এসব ক্ষেত্রে হজ্ব বা উমরার ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কারো মাধ্যমে হারামের এলাকায় একটি কুরবানী করতে হবে। কিরানকারীর জন্য দুটি কুরবানী করতে হবে। কুরবানী করার আগ পর্যন্ত ইহরামের নিষিদ্ধ কাজ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। কুরবানী করার দ্বারা ঐ ব্যক্তি হালাল হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে হালাল হওয়ার জন্য মাথা মুণ্ডানো জরুরি নয়। তবে কুরবানীর পর মাথা মুণ্ডিয়ে নেওয়া বা চুল কেটে নেওয়া মুস্তাহাব।

* আর পরবর্তীতে তা কাযা করা ওয়াজিব। যদি ইফরাদ হজ্বের ইহরাম করার পর বাধাগ্রস্ত হয়ে হালাল হয়ে থাকেন তাহলে পরবর্তীতে একটি হজ্ব এবং একটি উমরা কাযা করতে হবে। অবশ্য যে বছর বাধাগ্রস্ত হয়েছেন সে বছরই যদি হজ্বে যাওয়ার সুযোগ হয়ে যায় তবে কাযার নিয়ত করতে হবে না এবং আলাদা উমরাও করতে হবে না; বরং শুধু ইফরাদ হজ্ব করলেই হবে। আর যদি কিরানের ইহরাম করার পর তা  ত্যাগ করে থাকেন তবে এক হজ্ব এবং দুই উমরা করতে হবে। এক্ষেত্রে কিরান করার পর আলাদা উমরা আদায় করতে পারেন অথবা ইফরাদ হজ্ব করে পৃথক দুটি উমরাও করতে পারেন। অবশ্য এক্ষেত্রেও এই বছরেই হজ্ব করার সুযোগ পেলে শুধু কিরান হজ্ব করলেই চলবে। কিংবা ইফরাদ হজ্ব ও এক উমরা করতে হবে।

আর যদি উমরার ইহরাম থেকে হালাল হয়ে থাকেন চাই তা তামাত্তু হজ্বের উমরা হোক বা পৃথক উমরা উভয় ক্ষেত্রে পরবর্তীতে একটি উমরা করতে হবে।Ñমুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১২৯৪৭, ১২৯৪৯, ১৩২৩৫, ১৩২৩৮, ১৩২৪১; কিতাবুল হুজ্জাহ আলা আহলিল মাদীনা ১/৪৫০; আলমাবসূত, সারাখসী ৪/১০৬-১১০; মুআলি−­মুল হুজ্জাজ ২৭৫-২৭৬; যুবদাতুল মানাসিক ৪২৯-৪৩২

 

তামাত্তু হজ্বকারী উমরা করার পর মদীনা থেকে কিসের ইহরাম করবে?

* তামাত্তুকারী যদি প্রথমে উমরা করতঃ হালাল হওয়ার পর মদীনা মুনাওয়ারা যান তাহলে তার জন্য মদীনা থেকে মক্কা ফিরে আসার সময় শুধু উমরার ইহরাম করা কিংবা শুধু হজ্বের ইহরাম করা উভয়টিই জায়েয। তবে এক্ষেত্রে উমরার ইহরাম করলে মীকাত থেকে একটি অতিরিক্ত উমরাহ করার সওয়াব পাবে। কিন্তু এ অবস্থায় কিরান হজ্বের নিয়তে হজ্ব ও উমরার একত্রে ইহরাম করা জায়েয নয়। কিরানের নিয়তে ইহরাম করলে উমরার ইহরামটি বাতিল করে দেওয়া জরুরি। অর্থাৎ সে হজ্বের আগে উমরাহ আদায় করবে না; বরং ঐ ইহরামেই শুধু হজ্ব পালন করবে। এতেই তার উমরার ইহরামটি বাতিল হয়ে যাবে। আর উমরার ইহরামটি বাতিল করার কারণে জরিমানা হিসেবে একটি দম দিতে হবে এবং ঐ উমরাটি ১৩ যিলহজ্বের পর নতুন ইহরাম করে কাযা করে নিতে হবে। অবশ্য এক্ষেত্রে তার হজ্বটি তামাত্তু হজ্বই হবে। তাই তাকে দমে শোকর তথা হজ্বের কুরবানিও দিতে হবে। আর যদি উমরার ইহরাম বাতিল না করে অর্থাৎ কিরানের ইহরাম করার পর উমরা করে নেয় তাহলে তা অন্যায় হবে এবং সে গুনাহগার হবে। এক্ষেত্রে কিরানের ইহরাম করে তা সম্পন্ন করার কারণে একটি জরিমানা দম আদায় করতে হবে এবং পূর্বের ন্যায় তাকে দমে শোকরও দিতে হবে।Ñগুনইয়াতুন নাসিক ২১৫; ২৩০

 

মসজিদে আয়েশা থেকে একাধিক উমরাহ

* তামাত্তুকারীর জন্য মক্কায় অবস্থানকালে নফল উমরাহ করা জায়েয আছে।

ওয়ালিদ বিন হিশাম বলেন, আমি হজ্বের পরে উমরা করার ব্যাপারে উম্মুদ দারদা রা.কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন।Ñমুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১৩০১৬

মক্কাবাসী এবং যারা হজ্বের জন্য মক্কায় এসেছেন সকলের জন্য উমরার ইহরামের স্থান হল হিল। ‘‘তানয়ীম’’ হিলের অন্তর্ভুক্ত। যেখান থেকে আম্মাজান আয়েশা রা. হজ্বের পর উমরার ইহরাম করেছিলেন। এজন্য ঐ মসজিদকে মসজিদে আয়েশা বলা হয়।Ñসহীহ বুখারী, হাদীস : ৩১৬, ১৫৫৬

হযরত আবদুল্লাহ বিন যুবাইর রা.ও তানয়ীম থেকে উমরার ইহরাম করেছেন।-মুআত্তা মালেক, হাদীস : ৮১৩

ইবনে সিরীন রাহ. বলেন-

بَلَغَنَا اَنَّ رَسُوْلَ اللّهِ صَلَّيْ اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَقَّتَ لِاَهْلِ مَكَّةَ التَّنْعِيْمَ.

 

আমরা অবগত হয়েছি যে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আহলে মক্কার জন্য তানয়ীমকে মীকাত নির্ধারণ করেছেন।-ফাতহুল বারী ৩/৬০৬

আর তানয়ীম তথা মসজিদে আয়েশা বা হিলের অন্য যে কোনো স্থান যেমন, মসজিদে জির্য়িরানাহ বা মসজিদে হুদাইবিয়া থেকেও উমরার ইহরাম করা যাবে।

তবে নফল উমরার জন্য যে সময় ব্যয় করা হয় এ পরিমাণ সময় ধরে নফল তাওয়াফ করা উত্তম। তদ্রƒপ এক উমরার চেয়ে একাধিক তাওয়াফ করাও উত্তম। তাই এক মাসে একাধিক উমরা না করে তাওয়াফে বেশি বেশি সময় কাটানো উচিত।-সহীহ বুখারী ১/২১১; ফাতহুল বারী ৩/৭১০; মাবসুত, সারাখসী ৪/১৭০; মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১৬০৮৭; গুনইয়াতুন নাসিক ১৩৮; রদ্দুল মুহতার ২/৫০২; আলবাহরুল আমীক ৩/১৩১৯

 

 

হজ্বের ইহরাম অবস্থায় স্ত্রীর সাথে মিলন হলে

* হজ্বের ইহরামের পর আরাফায় অবস্থানের আগেই কারো যদি স্ত্রীর সাথে মিলন হয়ে যায় তাহলে তার হজ্ব নষ্ট হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে তার করণীয় হল, সে যথানিয়মে হজ্বের কার্যাদি সম্পন্ন করে হালাল হবে। এবং হজ্বটি নষ্ট করার জন্য তাকে জরিমানা স্বরূপ একটি দম দিতে হবে। এবং পরবর্তীতে ঐ হজ্বটি কাযা করতে হবে।

আর আরাফায় অবস্থানের পর তাওয়াফে যিয়ারত ও মাথা মুণ্ডানোর আগে যদি স্ত্রীর সাথে মিলন হয় তাহলে তাকে জরিমানা স্বরূপ একটি ‘বাদানা’ দিতে হবে। তবে তার হজ্বটি নষ্ট হবে না। তাই পরবর্তীতে তা আর কাযা করতে হবে না।-আলবাহরুর রায়েক ৩/১৬; মানাসিক ৩৩৯

 

মাতাফে ও মসজিদে হারামে নামাযীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা

* মাতাফে নামাযীর সামনে দিয়ে তাওয়াফকারী এবং অন্যান্যদের চলাচল করা জায়েয। আর মসজিদুল হারামেও নামাযীর সামনে দিয়ে তাওয়াফকারীদের চলাচল করা জায়েয। তবে মসজিদে হারামে তাওয়াফকারী ব্যতীত অন্যদের চলাচলের ব্যাপারে দ্বিমত আছে। অনেকেই ব্যাপকভাবে জায়েয বলেছেন। যেমন, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, ইমাম তহাবী প্রমুখ ইমামগণ। আর তাদের এ মতকে গ্রহণ করেছেন ইবনে আবেদীন শামী, ইউসুফ বিন্নুরী, যফর আহমদ উসমানী রাহ.। কেননা এ সম্পর্কে সাহাবা-তাবেয়ীন থেকে আমল প্রমাণিত আছে। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে যুবায়ের রা., আতা, মুজাহিদ, ইবনে আবী মুলাইকা রাহ. প্রমুখ সাহাবা-তাবেয়ীনের আমল। অবশ্য ভিড় না হলে মসজিদে হারামে যথাসম্ভব নামাযীর সিজদার জায়গা এড়িয়ে আরো সামনে দিয়ে চলাচল করা অধিক সতর্কতা হবে।Ñআলমুগনী ৩/৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান ৬/১২৮; মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক ২/৩৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ২৭২৪১; তাহযীবুল আসার, হাদীস : ৫২৬; আলআওসাত ৫/৯৩; শরহু মুশকিলিল আছার ৭/২৮; ইলাউস সুনান ৫/৮৪; মাআরিফুস সুনান ৩/৩৫৩; রদ্দুল মুহতার ২/৫০১

 

ইহরাম করার পর মীকাতের বাইরে গেলে

হজ্ব বা উমরার ইহরাম করার পর তা থেকে হালাল হওয়ার আগে কেউ যদি মীকাতের বাইরে যায়, যেমন ইফরাদ বা কিরান হজ্বের ইহরাম করার পর হজ্ব বা উমরার আগে তায়েফ বা মদীনা মুনাওয়ারা যায় তাহলে তার ইহরাম নষ্ট হবে না এবং এ কারণে তার উপর কোনো জরিমানাও আসবে না। আর এক্ষেত্রে যেহেতু ইহরাম অবস্থায়ই আছে তাই ফেরার সময় মীকাত অতিক্রমকালে পুনরায় ইহরাম করবে না।Ñমানাসিক ৯২; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ১০/৩৮৪

 

বদলী হজ্বের মাসায়েল

কাদের জন্য বদলি হজ্ব করানো জায়েয?

ক) যিনি হজ্ব করার মতো শারীরিক শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেলেছেন।

খ)        কারো সহায়তা নিয়েও চলাফেরা কিংবা যানবাহনে উঠা-নামা করতে যিনি একেবারেই অক্ষম হয়ে পড়েছেন।

গ)        হজ্বের সফরে সঙ্গী হওয়ার জন্য কোনো মাহরাম পাননি এমন মহিলা শারীরিক শক্তি একেবারেই হারিয়ে ফেললে।

ঘ)        ফরয হজ্ব না করে মৃত্যুবরণ করলে তার বদলী করানো জায়েয।-মুআত্তা মুহাম্মাদ, হাদীস : ৪৮০-৪৮২, মানাসিক ৪৩৫-৪৩৬

* বদলী হজ্বের জন্য প্রেরণকারী অনুমতি দিলে তামাত্তু বা কিরান হজ্বও করা জায়েয। তদ্রƒপ বিশেষভাবে ইফরাদ হজ্ব করার নির্দেশ না দিলে সেক্ষেত্রেও কিরান ও তামাত্তু যেকোনোটি করা জায়েয। (আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৫২৩; হজ্ব ওয়া উমরা কে জাদীদ মাসাইল আওর উনকা হল্, ইসলামিক ফিকহ একাডেমী ভারত, পৃষ্ঠা : ৬০০)

‘‘অনুমতি থাকলেও ইফরাদ করা জরুরি; তামাত্তু বা কিরান করা জায়েয নয়’’-এ কথা ঠিক নয়। মুআল্লিমুল হুজ্জাজ ও ফাতাওয়া খলীলিয়াহসহ কিছু কিতাবে বদলী হজ্বে সর্বাবস্থায় ইফরাদ করা জরুরি বলা হলেও উপমহাদেশের বিজ্ঞ ও খ্যাতনামা অনেক মুফতী প্রেরকের অনুমতি সাপেক্ষে তামাত্তু বা কিরান করাকে জায়েয বলে ফাতওয়া প্রদান করেছেন। যেমন, মুফতী কেফায়াতুল্লাহ দেহলভী রাহ., মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ., আল্লামা  যফর আহমদ উছমানী রাহ., মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী রাহ. ও মুফতী তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহু প্রমুখ ফকীহগণ। এছাড়া ভারতের ইসলামিক ফিকহ একাডেমীর সিদ্ধান্তও এমনই। আর এটি হানাফী মাযহাবের অধিকাংশ ফকীহর মত। যেমন, ইমাম কাযীখান, আল্লামা রহমাতুল্লাহ সিন্ধি,  আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী, আল্লামা হুসাইন ইবনে মুহাম্মাদ সাঈদ আবদুল গনী প্রমুখ ফকীহগণ। (ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩০৭; রদ্দুল মুহতার ২/৬১১; ইরশাদুস সারী পৃ. ৪৫৯; কেফায়াতুল মুফতী ৪/৩৪৫; ইমদাদুল আহকাম ২/১৮৩; আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৫২৩; ফাতাওয়া উসমানী ২/২২২; জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৫০৮-৫১৬)

* বদলী হজ্ব এমন ব্যক্তিকে দিয়ে করানো উচিত যিনি পূর্বে হজ্ব করেছেন এবং হজ্বের মাসায়েল সম্পর্কে ভালো জ্ঞান রাখেন। অনেকে মনে করেন, পিতা-মাতার বদলী হজ্ব সন্তানেরই করা উচিত। তাই মাসায়িলের জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও ছেলে নিজেই বদলী করে থাকেন। এক্ষেত্রে মুত্তাকী, বিজ্ঞ আলেম দ্বারা বদলী করানোই শ্রেয়।-মানাসিক ৪৫২, ৪৫৪; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩৭

* যে ব্যক্তি সরকারী খরচে কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির খরচে হজ্বে যাচ্ছেন (যেমন হজ্বের মুআলি−মগণ) তাকে দিয়ে বদলী হজ্ব করানো যাবে না। কেননা, যার বদলী করা হচ্ছে তার ব্যয়েই হজ্ব করা জরুরি। অন্যথায় বদলী হজ্ব আদায় হবে না।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৫৯৯; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী ৪৩৮; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২৩

* বদলী হজ্বকারী তামাত্তু হজ্ব করুক বা অন্য কোনো প্রকার হজ্ব, যার পক্ষ থেকে বদলী করছে তার পক্ষ থেকে ইহরামের নিয়ত করবেন। এভাবে যে, আমি অমুকের পক্ষ থেকে উমরার ইহরাম করছি। এরপর হজ্বের ইহরাম বাঁধার সময় এভাবে নিয়ত করবেন, আমি অমুকের পক্ষ থেকে হজ্বের ইহরাম করছি।

* কিরানকারী নিয়ত করবেন, আমি অমুকের পক্ষ থেকে একত্রে উমরাহ ও হজ্বের ইহরাম করছি। এরপর তালবিয়া পড়বেন।

* উপরোক্ত নিয়মে প্রেরকের পক্ষ থেকে ইহরাম করাই যথেষ্ট। তাওয়াফ, সাঈ, কুরবানী ইত্যাদি কোনো আমলের সময় প্রেরকের পক্ষ থেকে করার নিয়ত করতে হবে না। সেখানে স্বাভাবিকভাবে আমলগুলোর নিয়ত করাই যথেষ্ট।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা, হাদীস : ১৩৭২৫

 

 

হজ্বের সফরে ব্যবহৃত কিছু পরিভাষা

১. ইহরাম : হজ্ব¡ বা উমরার নিয়ত করে তালবিয়া পড়া।

২. তালবিয়া : এই দুআ পড়া : লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইক। ইন্নাল হামদা ওয়াননি’মাতা লাকা ওয়ালমুলক লা-শারীকা লাক।

৩. ইছতিলাম : হাজরে আসওয়াদে চুমু দেওয়া অথবা হাত দিয়ে স্পর্শ করে বা হাত দিয়ে ইশারা করে তালুতে চুমু খাওয়া। রুকনে ইয়ামানীকে হাত দিয়ে স্পর্শ করাকেও ইছতিলাম বলা হয়।

৪. ইযতিবা : পুরুষের জন্য ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে বের করে বাম কাঁধের উপর রাখাকে ইযতিবা বলে। যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে সে তাওয়াফ অবস্থায় এটা করণীয়।

৫. রমল : যে তাওয়াফের পর সাঈ আছে সে তাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর কাঁধ হেলিয়ে দুলিয়ে ছোট ছোট পদে একটু দ্রুত ও বীরদর্পে হাঁটা।

৬. সাঈ : তাওয়াফ সম্পন্ন করার পর সাফা ও মারওয়ার মাঝে বিশেষ নিয়মে সাতবার চক্কর দেওয়া।

৭. মসজিদে হারাম : বাইতুল্লাহ শরীফকে চতুর্দিক থেকে যে বিশাল মসজিদ ঘিরে রেখেছে এটাই মসজিদে হারাম বা হারাম শরীফ।

৮. মুলতাযাম : হাজরে আসওয়াদ এবং বাইতুল্লাহ শরীফের দরজার মধ্যবর্তী দেওয়াল।

৯. রুকনে ইয়ামানী : বাইতুল্লাহর দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ।

১০. হেরেম : মসজিদে হারামের চতুর্দিকে কিছু দূর পর্যন্ত নির্দিষ্ট এলাকাকে হেরেম বলা হয়। চারদিকে এর সীমানা চিহ্নিত রয়েছে। এখানে যুদ্ধ করা, পশুপাখি শিকার করা, গাছ কাটা নিষেধ। এখানে কাফেরদের প্রবেশও নিষেধ। হেরেমের বাইরের অংশকে ‘হিল’ বলে।

১১. মীকাত : মক্কাগামী বা হাজ্বীদের জন্য যে স্থান ইহরাম ব্যতীত অতিক্রম করা জায়েয নয় সেই স্থানকে ‘মীকাত’ বলা হয়। যেমন বাংলাদেশ থেকে বিমানের যাত্রীদের জন্য মীকাত ‘কারনুল মানাযিল’ ও ‘যাতু র্ইক’-এর মধ্যবর্তী স্থান।

১২. হিল : হেরেমের সীমানার বাইরে মীকাতের আগ পর্যন্ত স্থানকে হিল বলে।

১৩. দম : উমরাহ ও হজ্বের আমলে বিশেষ ত্র“টি হলে কিংবা ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ করে ফেললে হেরেমের এলাকায় ক্ষতিপূরণ হিসেবে একটি ছাগল-দুম্বা বা উট-গরুর সাত ভাগের এক ভাগ কুরবানী করাকে দম বলে। আর কোনো কোনো ভুলের কারণে গোটা গরু বা উট জবাই করতে হয়, একে ‘বাদানা’ বলে।

১৪. তাওয়াফ : হাজরে আসওয়াদের কোণ থেকে শুরু করে পুরো কাবা ঘর বিশেষ নিয়মে সাতবার চক্কর দেওয়া।

১৫. তাওয়াফে যিয়ারত : এটি হজ্বের ফরয তাওয়াফ। ১০ যিলহজ্ব সুবহে সাদিক থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্তের ভিতর এ তাওয়াফ করা হয়।

১৬. উকূফ : উকূফ অর্থ অবস্থান করা। নির্দিষ্ট সময়ে আরাফা ও মুযদালিফায় অবস্থান করাকে ‘উকূফ’ বলা হয়।

১৭. জামরাহ : হাজ্বীগণ মিনার যে তিনটি স্থানে কংকর নিক্ষেপ করেন তার প্রত্যেকটিকে ‘জামরাহ’ বলে, এর বহুবচন ‘জামারাত’।

১৮. তাওয়াফে বিদা : তাওয়াফে যিয়ারতের পর মক্কা থেকে বিদায়ের আগে যে তাওয়াফ করা হয় তাকে তাওয়াফে বিদা বলে। একে তাওয়াফে সদরও বলা হয়।

১৯. হাতীম : বাইতুল্লাহ শরীফ সংলগ্ন উত্তর দিকে মানুষ সমান প্রাচীর দিয়ে ঘেরা অংশ। এটি মূলত কাবা ঘরেরই অংশ।

২০. মাকামে ইবরাহীম

কাবার পূর্ব দিকে অর্থাৎ হাজরে আসওয়াদ ও রুকনে ইরাকীর মাঝ বরাবর মাতাফে কাঁচে ঘেরা একটি পাথর। যার উপর হযরত ইবরাহীম আ.-এর পদচিহ্ন রয়েছে।

 

লেখক:  উস্তায, ফিকহ বিভাগ, মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া ঢাকা