জাইরা ওয়াসিমের ফিরে আসা, নিকি মিনাজের না এবং আমাদের জয় পরাজয়

922

ড. মুহাম্মদ আমিনুল হক ।।

গত ৩০ জুন ভারতীয় দঙ্গলকন্যা খ্যাত উঠতি নায়িকা জাইরা ওয়াসিম ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি আর হলিউড জগতে থাকছেন না। কেননা হলিউডে অভিনয় করাটা তার ধর্মীয় (ইসলাম) চেতনার সাথে একদম যাচ্ছে না। এই ঘোষণার এক সপ্তাহ পর রিয়েলেটি শো বিগ বসের দেড় কোটি টাকার অফারও নাকি তিনি ফেরত দিয়েছেন বলে সংবাদ বেরিয়েছে।

জাইমা একজন মুসলিম কন্যা। বলিউডের মতো কঠিন কম্পিটিশনের জায়গায় স্থান করে নেয়াটা নিশ্চয়ই যোগ্যতা দিয়েই তাকে করতে হয়েছে। ঐ সমস্ত রঙ্গিন দুনিয়ায় কেউ প্রবেশ করলে সহজে কেউ বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ- অর্থ ও অবাধ জীবন। এই দুটির স্বাদ যারা পায় তারা তা থেকে ফিরে আসাটা বিশাল চ্যালেঞ্জ বটে।

জাইরা নিজে নিজে এমন সিদ্ধান্ত এমন সময় জানান দিলেন যখন কিনা সৌদি আরবে সিনেমা হল ওপেন করে দেয়া হলো, হালাল বার চালু হলো, ছেলে মেয়েদের একসাথে সিনেমা দেখা ও কনসার্টে হাজির হওয়া বৈধ হয়ে গেলো; এমনকি নিকি মিনাজের মতো অশ্লীল গায়িকা যিনি কিনা উলংগ অর্ধ উলংগ হওয়া ছাড়া গান করতে পারেন না; বিশ্বব্যাপী যিনি সমকামীতাকে প্রমোট করেন তিনিও সৌদি আরবের জেদ্দায় ওপেন কনসার্ট করার অফার পেলেন।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই তামাম দুনিয়ার ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতা নিকি মিনাজের সৌদি আগমন ও কনসার্টে পারফর্ম করার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তারা সবাই যার যার শক্তি ও অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করেছেন। যদিও তাদের এই প্রতিবাদ তোয়াক্কা করার সময় এমবিএস কিংবা তার সহযোগিদের নেই।

বিশ্বব্যাপী সাধারন মুসলিম জনতার প্রতিবাদের মধ্যেই খবর এলো, নিকি মিনাজ সৌদি আরব যাচ্ছেন না। কারণ হিসেবে জানা গেল, সৌদিতে নাকি সমকামীতার অনুমোদন নেই, কনসার্টকালীন মদ খাওয়া যাবে না এবং কনসার্টে উপস্থিত মেয়েদের ঢিলেঢালা আবায়া পড়তে হবে। এই কারণে তিনি নাকি সৌদিতে যাওয়ার ব্যাপারে অস্বীকৃতি জানিয়ে সৌদিকে গালমন্দও করেছেন। বলেছেন, সৌদিতে এখনও নারী অধিকার ঠিকমতো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। নিকি মিনাজকে কিছু মানবাধিকার সংস্থা অনুরোধ করেছিল যে সৌদিকে শিক্ষা দিতে কনসার্ট বাতিল করে সমকামীদের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার। নিকি মিনাজ তার কমিটমেন্ট রক্ষা করে সৌদিকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে দিলেন।

যে কারণেই নিকি মিনাজের কনসার্ট বাতিল হোক ধর্মপ্রাণ ইসলামী জনতা এই খবর শুনে খুব খুশি হয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলেছেন। কেউ পোস্ট করেছেন- “আল্লাহ মুসলমানের দুয়া কবুল করেছেন, নিকি মিনাজের কনসার্ট হচ্ছে না”। কেউ লিখেছেন- বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের প্রতিবাদে সৌদি আরব কনসার্ট বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে” ইত্যাদি।

তবে সৌদিতে নিকি মিনাজের আমন্ত্রণ এবং পরে তা বাতিল হওয়া নিয়ে আমার মূল্যায়নটা অন্য রকম। তা হচ্ছে-
ক. মাজা খাসিরাল আলামু বিইনহিতাতিল মুসলিমীন শিরোনামে একটি বই লিখেছিলেন আল্লামা আবুল হাসান আলী আন নাদভী। তিনি সেখানে মুসলিমদের অধঃপতনে বিশ্ব কী হারালো তা খুব সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছিলেন। সৌদি আরবের নেতৃবৃন্দের সাম্প্রতিক কর্মকান্ডগুলো আমাদেরকে আবুল হাসান নাদভীর লেখনীর দিকেই বার বার নিয়ে যাচ্ছে।

খ. যেই ইসলাম আমাদেরকে গৌরাবান্বিত করেছিলো সেই ইসলামকে আমরা আমাদের গৌরবের পেছনে বড় বাধা মনে করছি। এখন আমরা সম্মান খুজছি পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের মধ্যে।

গ. আমরা আমাদেরকে প্রগতিশীল প্রমাণ করতে এতোটাই খেই হারিয়ে ফেলছি যে, হজ্জের মৌসুমেও একটু দ্বিধা করলাম না একজন বেশ্যাকে আমন্ত্রন জানাতে।

ঘ. ওই অশ্লীল গায়িকা আমাদের গালে কষে এক থাপ্পড় দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, তোরা আরো নিচে নাম। তোরা যখন ওপেনলি বেশ্যামি করবি তখনই আমি তোদের ভুমিতে নিমন্ত্রণ গ্রহণ করবো। নচেৎ নয়।

ঙ. নিকি মিনাজের আগমণের প্রতিবাদ যারা করেছেন তারা অবশ্য আল্লাহর কাছে প্রতিদান পাবেন এটা আমি বিশ্বাস করি। তাদের প্রতিবাদের কোনো মূল্য থাকুক আর নাই থাকুক। তাদের প্রতিবাদে কনসার্ট বন্ধ হোক আর না হোক তাতে তাদের কোনো লস নেই। ঈমানী পরীক্ষায় পাশ করেছেন তারা এটুকু বলা যায়। মুনকারাত পরিবর্তন করতে তারা না পারলেও প্রতিবাদটুকু করে তারা ঈমান থাকার পরিচয় দিয়েছেন।

চ. যারা এইসব অপকর্মর খবর চেপে গেছেন, প্রতিবাদ করার সাহস দেখাতে পারেননি বিভিন্ন কারণে, অথবা বলে বেড়িয়েছেন যে, এইসব খবর শিয়াদের ছড়ানো এবং খাওয়ারিজদের উস্কানি বৈ কিছু না, এইসব খবর ভূয়া, সৌদি তথা ইসলাম বিদ্বেষীরাই প্রচার করছেন, তাদের অবস্থানটুকু আল্লাহর কাছে পরিস্কার হয়ে গেছে।

জ. জাইরা ওয়াসিম বাদশাহ সালমান, তার পাহলোয়ান ছেলে মি. এমবিএসসহ তাবৎ দুনিয়ার কাছে একটা ম্যাসেজ দিয়ে দিলেন- তোমরা টাকা, ক্ষমতার জন্য ঈমান বিক্রি করতে পারো, মুসলমানের পবিত্র অনুভূতিকে আঘাত হানতে পারো কিন্তু আমি অতি নগন্য জাইরা তা করতে পারি না। আমি জাইরা আমার ঈমনের সাথে যায় না এমন কাজ করতে পারি না। আমি অতীতে যা করেছি তা ভুল করেছি। এজন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে আবার সত্যের পথে এসেছি। আর তোমরা কিনা নিকি মিনাজের মতো বেশ্যার কাছে মাথা ঠুকছ…

ঝ. আমরা দুইটা থাপ্পড় খেলাম পৃথিবীর দুই অঞ্চলের দুই কন্যা থেকে। দেখা যাক কোন থাপ্পড়ে আমাদের ঘুম ভাঙ্গে। আমরা কি নিকি মিনাজের থাপ্পড় খেয়ে আরো্ নিচে নামবো নাকি জাইরার থাপ্পড় খেয়ে সম্বিত ফিরে পাবো, চেষ্টা করবো সোনালী যুগ ফিরে পেতে!

লেখকের ফেইস বুক পেজ থেকে নেওয়া