আরজাবাদের মুফতি তাজুল ইসলাম: ক্ষণজন্মা একজন নিভৃতচারী আলেম

283

ওলিউর রহমান ।।

মুফতি তাজুল ইসলাম। একজন নিভৃতচারী আলেম। দেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানীর আরজাবাদ মাদরাসার ৩১ বছরের উস্তায। পাকিস্তানের বিশিষ্ট মুহাক্কিক মুফতি রশিদ আহমদ লুধয়ানবীর একান্ত সোহবতপ্রাপ্ত এই আলেম দীর্ঘদিন যাবত আরজাবাদ মাদরাসার প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিখ্যাত কিতাব আহসানুল ফাতাওয়ার প্রথম খণ্ড তাঁর সংকলিত।

স্থানীয় আলেমদের যিয়ারত ও তাদের কাছে দোআ চাওয়ার জন্য যাওয়া ছিল আব্বার একসময়ের নিয়মিত আমল। ছোটবেলায় আমাদেরও সাথে করে নিতেন। কিছুদিন আগে বাড়ি থেকে আসার সময় আব্বা বলে দিলেন, ঢাকার প্রবীণ আলেমদের যিয়ারতে গিয়ে দোআ চেয়ে নিতে। সুযোগ করে গতকাল গেলাম প্রচারবিমুখ ৭৫ বছর বয়সী প্রবীণ এ আলেমের সান্যিধ্যে। নিজেকে প্রকাশ না করার যে চর্চা আমাদের মহান আকাবিরদের ছিল তার বাস্তব নমুনা হলো পাকিস্তানের আবদুর রশিদ নোমানী ও ইউসুফ বানুরীর একান্ত ঘনিষ্ঠ শাগরিদ আরজাবাদ মাদরাসার মুফতি তাজুল ইসলাম।

বৃটিশ-ভারতের হবিগঞ্জ জেলায় পঞ্চাশের দশকে জন্ম এই ক্ষণজন্মা মনীষীর। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনের বীর সেনানী সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ-এর আধ্মত্যিক শিষ্যদের উপস্থিতি বেশি থাকার কারণে দেশভাগের আগে সিলেট অঞ্চল ছিল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের বাংলা-অঞ্চলের প্রধান ঘাটি। সিলেটের হবিগঞ্জে জন্ম নেওয়া এই আলেম তাই বৃটিশ-বিরোধী বহু মিটিং-মিছিলের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। গতকালের সাক্ষাতে সেসময়ের কয়েকটি ক্ষুদ্র ঘটনার স্মৃতিচারণও করেন।

মৌলভিবাজারের বরুনা মাদরাসায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়। শুরু থেকে কাফিয়া জামাত পর্যন্ত এ মাদরাসায়ই পড়েন। পরে কুমিল্লার বরুরা মাদরাসায় শরহেজামি পড়ে হাটহাজারী গিয়ে হেদায়া আওয়ালাইন পর্যন্ত পড়েন।

১৯৬৪ সালে তিনি পাকিস্তান যান। হায়দারাবাদে মেশকাত, দাওরা পড়ে করাচী গিয়ে ইফতা পড়েন। একবছর ছিলেন বানুরী টাউনে। এসময় প্রখ্যাত আলেম আবদুর রশীদ নোমানী ও ইউসুফ বানুরী রহ-এর সাথে তাঁর বিশেষ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বানুরী টাউন থেকে শায়খ রশিদ আহমদ লুধয়ানবীর কাছে গিয়ে ফতোয়ার কাজ করেন দীর্ঘদিন। এসময়ই আহসানুল ফতওয়ার প্রথম খণ্ডের সংকলিত ফতোয়াগুলো লিপিবদ্ধ করেন।

ছাত্রকাল থেকেই হাফিজে হাদীস আবদুল্লাহ দরখাস্তী রহ.-এর সাথে ছিল তাঁর ইসলাহি সম্পর্ক। শায়েখের দেয়া বিভিন্ন আমল ও ওযিফা তিনি নিয়মিত আদায় করতেন।

১৯৬৭ সালে দেশে ফিরে নিজ গ্রাম শিবপাশায় প্রাতিষ্ঠানিক খেদমতে নিয়োজিত হন। একবছর এখানে থেকে ১৯৬৮ সালে চলে যান নেত্রকোণা জেলার মউ মাদরাসায়। দুর্গাপুরের বিখ্যাত মউ মাদরাসায় দীর্ঘ ৯ বছর খেদমতকালে জায়গা কিনে সেখানেই বাড়ি করেন।

১৯৭৭ সালের দিকে তিনি মোমেনশাহীর জামিয়া আশরাফিয়া খাগডহর মাদরাসায় চলে আসেন। খাগডহরে ৯ বছর খেদমত করে চলে আসনে নারায়ানগঞ্জের দেওভোগ মাদরাসায়। দেওভোগ থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মিরপুরের আরজাবাদ মাদরাসায়।

৩১ বছর যাবত তিনি আরজাবাদ মাদরাসায় আছেন। বর্তমানে তিনি মাদরাসার শায়খুল হাদীস ও প্রধান মুফতির দায়িত্ব পালন করছেন।

সত্তোরোর্ধ এ প্রবীণ আলেম এখনও দেশ-বিদেশ থেকে প্রকাশিত নতুন নতুন গবেষণাপত্র সংগ্রহ করে পড়ন। দেওবন্দের এ মাসের ‘মাহনামা’ আমরা থাকাকালেই একজন এসে হুযুরের কাছে দিয়ে যায়।

সরল, অনাড়ম্বর জীবনের অধিকারী নিভৃতচারী এ আলেম নিজের ব্যাপারে বলেন, আমি সরল জীবনে যাপনে আরাম বোধ করি। আমার কাছে কারো কোনো পাওনা নেই। আমি কারো কাছে কিছু পাই না।