বিখ্যাত মুসলিম পর্যটক ইবনে বাতুতার কবরের পাশে দাড়িয়ে… 

492

মির্জা ইশতিয়াক বেগ ।।

মরক্কোর একটি শহর ‘তানজির’। ইসলামী ইতিহাসের দুজন মহান ব্যক্তিত্ব তারেক বিন যিয়াদ এবং ইবনে বাতুতার কারণে শহরটি দুনিয়াজোড়া প্রসিদ্ধি লাভ করেছে । মুসলিম সিপাহসালার তারেক বিন যিয়াদ এর সম্পর্ক এ শহরের সাথেই। ৭১১ হিজরীতে তার নেতৃত্বে ইউরোপে ইসলামের আলো পৌঁছে। অপরদিকে ১৪শ শতাব্দীর মুসলিম পর্যটক ইবনে বাতুতাও এই তানজিরের বাসিন্দা। মরক্কোর উত্তর পশ্চিম দিকে অবস্থিত তানজির শহরটি ইউরোপ থেকে ১৪ কিলোমিটার ব্যবধানে অবস্থিত। আর এই দূরত্ব ফেরিতে আধা ঘণ্টায় অতিক্রম করা যায়।

গরমকালে শহর থেকে জিবরীল্টারের আলো (جبل الطارق)  দেখা যায়। স্পেনে জিবরীল্টার ঐ স্থান যেখানে তারেক বিন যিয়াদ তার সাথীদের নিয়ে ছাউনি ফেলেছিলেন এবং নিজেদের নৌকা সব পুড়িয়ে দিয়ে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তারেক বিন যিয়াদ এর সাহসিকতা ফলে মুসলিমগণ আন্দালুস যা বর্তমানের স্পেন এবং পর্তুগাল নিয়ে গঠিত, তাতে প্রায় আটশত বছর পর্যন্ত শাসন করেছিলেন।

আফ্রিকার দ্রুতগামী ট্রেন ‘আল বোরাক’ রেল স্টেশনে এসে থামে। যখন আমি বাইরে বের হই, তখন তীব্র গরমের মধ্যেও এক পশলা ঠান্ডা বাতাস আমাকে স্বাগত জানায়। স্টেশনের বিল্ডিংগুলো দেখে এমন মনে হল, যেন আমি কোন বড় শপিং মলে প্রবেশ করেছি, যেখানে দুনিয়ার বড় বড় ব্র্যান্ড এর শোরুম, রেস্টুরেন্ট এবং ক্যাফে বিদ্যমান।

কিছুক্ষণের মধ্যে তানজির বসবাসকারী আমার বন্ধু আমাকে নিতে স্টেশনে এসে পৌঁছয়। যিনি বর্তমানে লন্ডন থেকে এখানে শিফট হয়েছেন এবং তানজির উপত্যকায় তার পাকিস্তানি খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। এবার তানজির শহরে সফর করার একটি উদ্দেশ্য ছিল ইবনে বতুতার কবরের সামনে উপস্থিত হওয়া, যা তানজিরের ‘ওল্ড মদিনায়’ অবস্থিত। শত শত বছরের পুরানো উঁচু স্থানে অবস্থিত ‘ওল্ড মদিনা’ দেখার মত একটা জায়গা। আমরা যখন ‘ওল্ড মদিনার’ সংকীর্ণ গলিগুলো দিয়ে অতিক্রম করছিলাম, তখন সেখানের পুরানো ঘরগুলোর পুরানো দেয়াল, যেগুলোতে নীল রংয়ের প্রিন্ট দেয়া হয়েছিল, দেখে খুব প্রভাবিত হলাম।

বড় বড় শ্বাস নিয়ে যখন ওল্ড মদিনার সংকীর্ণ গলিগুলো অতিক্রম করছিলাম তখন মনে মনে ভাবছিলাম, ইবনে বাতুতার কবর হয়তো বড় কোন মাকবারা বা কবরস্তান থাকবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে অবাক হয়ে গেলাম- একটা ছোট কামরার মধ্যে ইবনে বাতুতার কবর। কামরার বাইরে একটি ফলকে ইবনে বতুতার নাম, জন্ম ও মৃত্যু সন লেখা। কামরার দরজায় তালা লাগানো দেখে নিরাশ হয়ে গিয়েছিলাম। আমাদের নিকটে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবক আমার পেরেশানি সহজ করে দিলেন। তিনি ইবনে বাতুতার কবর দেখাশোনা করেন মুখতার নামে এক ব্যক্তির ফোন নাম্বার দিলেন।

মুখতারকে ফোনে পাকিস্তান থেকে এখানে আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করলাম। তিনি আমাদেরকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বললেন। অপেক্ষার মুহূর্তগুলো খুব কষ্টে পার হল। কিছুক্ষণ পর এক দুর্বল অন্ধ ব্যক্তি হাতে চাবির ছড়া নিয়ে আসলেন। তিনি এসেই আমাদের হাতে কামরার চাবি দিয়ে দিলেন। মুখতার বললেন, তিনি ইবনে বতুতার খান্দানের লোক। এবং তার জীবন ইবনে বতুতার কবর দেখাশুনা করে কেটেছে।

তিনি আরও জানালেন, ইবনে বাতুতার আসল নাম মোহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ। তিনি সফরের সূচনা করেছিলেন একুশ বছর বয়সে, ১৩২৫ হিজরীতে। এই জায়গা থেকে তিনি সফর শুরু করেছিলেন। ২৯ বছরে সারা বিশ্ব তিনি সফর করেন। ইবনে বাতুতা এই ছোট কামরাতেই থাকতেন। তার মৃত্যুর পর তার ইচ্ছা অনুযায়ী এখানেই তাকে দাফন করা হয়েছে। এসফরেই তিনি তার কিতাব ‘রিহলাহ’ লিখেছিলেন।

আমি মোখতারের কথার সাথে যুক্ত করে বললাম, আমি পাকিস্তান থেকে এসেছি। আর ইবনে বাতুতা যখন সিন্ধ, মুলতান সফর করেন তখন পাকিস্তান উপমহাদেশের ছোট একটি অংশ ছিল। আমি মুখতারকে জিজ্ঞাসা করলাম, পাকিস্তান থেকে কি কখনো কোনো বড় ব্যক্তি এসেছিলেন? তিনি না জানার ভাব প্রকাশ করলেন এবং বললেন, কখনো কখনো দুনিয়ার বড় বড় ব্যক্তি ইবনে বাতুতার কবরের কথা জিজ্ঞাসা করে করে এখানে এসে যান।

তানজিরে অবস্থান করার সময় ‘তানজির মেড’ বন্দরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। যাকে আফ্রিকার এবং দুনিয়ার সবচেয়ে বড় বন্দর মনে করা হয়। এই পোর্ট-এ ৮ মিলিয়ন কন্টেইনার, ৭ মিলিয়ন যাত্রী, সাত লাখ ট্রাক এবং দুই মিলিয়ন গাড়ি হ্যান্ডেল করার যোগ্যতা রাখে। এখন শহরটি মডার্ন এবং অনেক সুন্দর হয়ে গিয়েছে। আপনি তানজির আসলেন আর ওই উপত্যকায় গেলেন না যেখানে আটলান্টিক এবং ভূমধ্যসাগর এসে মিলিত হয়েছে, তাহলে আপনি অনেক বড় একটা জিনিস থেকে বঞ্চিত হলেন।

ইসপাইরাল নামক এই স্থানে পানির দুটি ভিন্ন ভিন্ন রং দেখে আমার কোরআনের আয়াত স্মরণ হয়ে গেল। এরশাদ হয়েছে, ‘তিনি আল্লাহ যিনি দু’সমুদ্রকে পাশাপাশি প্রবাহিত করেছেন এবং এদের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা, যাকে তারা অতিক্রম করতে পারে না।’ তানজিরে আমি আরও এসেছি কিন্তু এবার এই শহরের সৌন্দর্য এবং চিত্তাকর্ষক দৃশ্য আমাকে অভিভূত করেছে। আমি যেন প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্যের ভেতরে নিজকে হারিয়ে হারিয়ে ফেলেছি।

তানজির থেকে ফিরে আসার সময় ভাবছিলাম, সফর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম। সফর উদ্ভাবন যোগ্যতাকে বৃদ্ধি করে। ফলে যেহেনে জ্ঞানের নতুন দিগন্ত উম্মোচিত হয়। সফর করার জন্য অগণিত সম্পদের প্রয়োজন নেই। বরং প্রয়োজন জযবা ও আগ্রহের।পৃথিবীতে যত পর্যটক অতিবাহিত হয়েছেন, তারা কেউ বড় কোন ধনী ছিলেন না। কিন্তু আগ্রহ-উদ্দীপনাই তাদেরকে সারা বিশ্ব জয় করতে বের করেছিল। ইবনে বাতুতার কবরে এসে আমার এ বিশ্বাস আরো মজবুত হলো। তার আগ্রহ-উদ্দীপনাই তাকে বিশ্ব-ভ্রমণে বের করেছিল। ইবনে বতুতা গরিব খান্দানের লোক ছিলেন। এই ছোট কামরাই তার সমস্ত সম্পত্তি ছিল। কিন্তু উপায়-অবলম্বনের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আগ্রহের কারণে তিনি সারা দুনিয়া সফর করেছেন। এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে রয়েছেন।

মুসলিম দেশ থেকে প্রত্যেক বছর লক্ষ লক্ষ পর্যটক সফরের উদ্দেশ্যে আমেরিকা-ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে যায়, যেখানে তাদের সাথে অনেক অনেক অপমানকর আচরণ করা হয়। তাদেরকে ছোট মনে করা হয়। আল্লাহ তাআলা ইসলামী রাষ্ট্রগুলোকে বিশেষ করে মরক্কোকে অনেক অনেক সৌন্দর্য দান করেছেন। আমাদের উচিত, আমরা ভ্রমণের জন্য ইসলামী রাষ্ট্রগুলোকে প্রাধান্য দিব, তাহলে সফরের আনন্দও হবে আবার  ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কেও আমরা জানতে পারব।

৩জুলাই, দৈনিক জং থেকে অনুবাদ: মাহমুদুল হাসান জুবাইর