বন্দীশিবিরে মানবিক বিপর্যয়, লিবিয়ায় কি আরেক গাদ্দাফির উত্থান হতে চলেছে?

148

ইসলাম টাইমস ডেস্ক: সম্প্রতি ত্রিপোলির বাইরে একটি অভিবাসী বন্দী শিবিরে বিমান হামলায় অন্তত ৪০ জন অভিবাসী নিহত হয়েছেন। ত্রিপোলিতে প্রায় প্রতিদিনই সরকারী বাহিনী ও দেশটির এক সশস্ত্র গোষ্ঠীর নেতা খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মির মধ্যে লড়াই চলছে। জাতিসংঘ সমর্থিত দেশটির সরকারের প্রধানমন্ত্রী ফায়েজ আল-সেরাজ অভিযোগ করেন, স্বনিয়ন্ত্রিত লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি (এলএনএ) ওই শিবিরে হামলা চালিয়েছে। তবে খলিফা হাফতার নেতৃত্বাধীন ওই বাহিনী এলএনএ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, যে এলাকায় হামলাটি হয়েছে সেখানেই সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ছেন তারা। পাল্টাপাল্টি এ অভিযোগের মধ্যে অভিবাসীদের প্রাণ যাচ্ছে।

২০১১ সালে দেশটির দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে অপসারণ ও হত্যার পর থেকেই সংঘাতের কারণে বিভক্তি দেখা দেয়। কোন কর্তৃপক্ষই লিবিয়ার পুরো নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। চরমভাবে অস্থিতিশীল দেশটির নিয়ন্ত্রণ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক এবং সামরিক গোষ্ঠীর হাতে। যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে একটি প্রধানমন্ত্রীর সারাজের নেতৃত্বাধীন এবং অপরটি জেনারেল হাফতারের নিয়ন্ত্রণাধীন।

গত এপ্রিলে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে জেনারেল হাফতার। গত চার দশক ধরে লিবিয়ার রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন জেনারেল হাফতার। ১৯৮০র দশকে মত বিরোধের জেরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসনের আগ পর্যন্ত গাদ্দাফির কাছের মিত্র ছিলেন তিনি। ২০১১ সালের আন্দোলনের পর দেশে ফিরে পূর্বাঞ্চলে নিজের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলেন তিনি। সমর্থন পান ফ্রান্স, মিশর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের। গাদ্দাফি সংশ্লিষ্টতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ থাকার কারণে তার প্রতি মানুষের মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। তবে বেনগাজি এবং এর আশেপাশের এলাকাগুলো থেকে কথিত ইসলামপন্থী জঙ্গিদের বিতাড়িত করায় অনেকে তাকে কৃতিত্ব দেন।

লিবিয়ার অভিবাসী বন্দিশিবিরে ‘অকল্পনীয় বিভীষিকা’

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সহিংসতা থেকে লিবিয়ায় পলায়মান ১০ হাজারের বেশি অভিবাসীর মধ্যে বেশির ভাগের ভাগ্য নির্ধারিত হয় মানব পাচারকারীদের হাতে বা অন্ধকার বন্দিশিবিরে। এদের মধ্যে বেশির ভাগই আফ্রিকান নাগরিক। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এ খবর দিয়েছে আইপিএস।

খবরে বলা হয়,  ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের সবচেয়ে বড় প্রস্থান পয়েন্ট হচ্ছে লিবিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূল। একইসঙ্গে আধুনিক দাসত্বের সবচেয়ে বড় চর্চাও হয়ে থাকে সেখানে। কেউ আটক হন স্থলে, কেউ সমুদ্রে, কেউ আহত হন মিলিশিয়াদের হামলায় আর কেউ ফেঁসে যান মানব পাচারের জালে। সেখান থেকে অনেকের স্থান হয় বন্দিশিবিরে, যেখানে সম্ভাব্য সকল প্রকারের নির্যাতনের শিকার হয় তারা।

লিবিয়ায় জাতিসংঘের সহায়ক মিশনের (ইউএনএসএমআইএল) এক প্রতিবেদনে জানায়, অভিবাসীরা লিবিয়ার মাটিতে পা রাখা মাত্রই তারা বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, অসদাচরণ, বাছবিচারহীন আটক, চলাফেরার স্বাধীনতার ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ ও ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তবে, এসব বিষয়ে কোনো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে লিবিয়া কর্তৃপক্ষ বন্দিশিবিরের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

‘আমি জানি না এই দুনিয়ায় আমার স্থান কোথায়!’

লিবিয়ার বন্দিশিবিরগুলো নিয়ন্ত্রণ করে থাকে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সেগুলো পাহারার দায়িত্বে থাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড বা জিএনএ সরকার সমর্থনকারী মিলিশিয়ারা। প্রায় প্রতি বন্দিশিবিরেই অল্প জায়গায় আটকে রাখা হয় কয়েক শ’ অভিবাসীকে। তাদের দেয়া হয় না যথাযথ ভেন্টিলেশন বা বিশুদ্ধ পানি। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, কিছু শিবিরে টয়লেট ভরে মল উপচে পড়ছে। শিবিরের ভেতরেই কয়েকদিন ধরে পড়ে থাকছে আবর্জনা ও মল। সৃষ্টি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির। এতে একাধিক রোগ মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে।

জিনতানে একটি শিবির পরিদর্শন শেষে আন্তর্জাতিক দাতব্য সংগঠন ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) কর্মীরা জানিয়েছেন, এ যেন কোনো বিপর্যয়। শত শত অভিবাসী মাত্র চারটি টয়লেট ব্যবহার করেন। টয়লেটগুলোর অবস্থা যাচ্ছেতাই। এগুলোতে নেই শাওয়ারের কোনো ব্যবস্থা। পানি সরবরাহের পরিমাণও স্বল্প।

এদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) লিবিয়া সমন্বয়ক ড. হুসেইন হাসান বলেন, প্রায় ৩৪টি কেন্দ্রের বিভিন্ন অভিবাসী যক্ষ্মাসহ অন্যান্য শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত সমস্যা, এইচআইভি ও চর্ম রোগে ভুগছে। জানুয়ারিতে কেন্দ্রগুলোতে টিবি ক্যামেপইন চালানো হয়। তাতে যাদের যক্ষ্মা আক্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাদের আলাদা কক্ষে না রেখে বাকি সবার সঙ্গেই রাখা হয়।

দ্য আইরিশ টাইমসে জাতিসংঘের ফাঁস হওয়া এক প্রতিবেদনে বলা হয়, জিনতান বন্দিশিবিরের অন্তত ৮০ শতাংশ অভিবাসী যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত। এমএফএফ জানায়, যক্ষ্মা ছাড়া আরো অনেক রোগে আক্রান্ত শিবিরের বন্দিরা। অনেকে অপুষ্টি, চর্মরোগ, আমাশয়, শ্বাসনালীতে সংক্রমণসহ নানা রোগে ভুগছেন। এর সঙ্গে অপর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্দশা আরো বৃদ্ধি করছে। এরকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের একইসঙ্গে রাখা হচ্ছে।

আইপিএস জানায়, অভিবাসীদের এসব দুর্দশা থেকে রক্ষা করার কেউ নেই। স্থানীয় জনগণ ছাড়া বাইরের কারো সেখানে প্রবেশ আইনত নিষিদ্ধ। এমনকি প্রায়ই আটকে রাখা হয় মানবাধিকার কর্মীদেরও। একজন এরিত্রিয়ান শরণার্থী এমএফএফকে বলেছে, আমাদেরকে এখানে ফেলে রাখা হয়েছে। আমি ফিরে যেতে পারছি না, আর অন্য কেউ আমাদের নিতেও চাইছে না। আমি জানি না, এই দুনিয়ায় আমার স্থান কোথায়।

আমরা মারা যাচ্ছি
মানব পাচারকারীদের দ্বারা শোষিত ও পণ্যদ্রব্যের মতো বিক্রি হয়ে নিজেদের বেঁচে থাকা নিয়ে সংশয়ে থাকেন এই অভিবাসীরা। ইউএনএসএমআইএল’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্দি শিবিরগুলোতে অভিবাসীদের প্রায়ই না খেয়ে থাকতে হয়। তাদেরকে নিয়মিত মারধর করা হয়, গরম লোহা দিয়ে গায়ে ছেঁকা দেয়া হয়। এমনকি বৈদ্যুতিক শকও বাদ দেয়া হয় না। নানা ধরনের অত্যাচারের মাধ্যমে তার পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করে থাকে পাচারকারীরা। 

২০১১ সালে লিবিয়ার সামরিক স্বৈরশাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতন হয়। এরপর দেশটির বিরোধী দল ও ইসলামপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লিবিয়ার শাসন নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। দেশটির তেলক্ষেত্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়া নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ লেগেই থাকে। এই সময় দেশজুড়ে অস্থিরতা বিরাজমান থাকে। ফলে, লিবিয়ার সীমান্ত অঞ্চল ও সমুদ্র তীরবর্তী এলাকাগুলোতে চোরচালান ও মানব পাচার ভয়াবহ মাত্রায় বৃদ্ধি পায়। বেশির ভাগ অভিবাসীই দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। এই অঞ্চলটি লিবিয়ার সব থেকে বেশি অস্থিতিশীল। সেখান থেকে তাদেরকে ত্রিপলিতে নিয়ে আসা হয় এবং মাত্র কয়েক শ’ ডলারের বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়া হয়। দেশজুড়ে চলমান সহিংসতা ও যুদ্ধের মধ্যে অভিবাসীরা অসহায়ের মতো বাস করছে। প্রতিদিন সেখান থেকে পালাচ্ছেন অসংখ্য অভিবাসী।

রিপোর্ট অনুযায়ী, মানব পাচারকারীদের হাতে বন্দি থাকা অবস্থায় অসংখ্য অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই গুলি খেয়ে কিংবা নির্যাতনের কারণে মারা গেছে। এ ছাড়া আছে, অনাহার ও বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু। ইউনিসেফকে এসব বন্দি  জানিয়েছে, আমরা মারা যাচ্ছি। আমরা পশুর মতো বাস করছি, তারা প্রতিদিন আমাদের ওপর অত্যাচার চালায়।

এত কিছুর পরও অনেক অভিবাসী পালাতে সক্ষম হয়। তারা লিবিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় উপকূল দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তখন ইউরোপীয় পেট্রোল জাহাজগুলো তাদেরকে তাড়া করে এবং ভূমধ্যসাগরের মাঝ থেকে তাদেরকে আবার সেই লিবিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়। জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের এ ধরনের পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে অক্সফাম ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।

২০১৭ সালে ইতালির পার্লামেন্ট নতুন এক আইন পাস করে। এ আইন অনুযায়ী অভিবাসীদের ইউরোপে প্রবেশ ঠেকাতে ইতালির নৌবাহিনী ভূমধ্যসাগরের অপরপাশে লিবিয়ার কোস্টগার্ডদের সাহায্য করার অনুমতি পায়। ২০১৪ সালের পর থেকে এই রুটে ১০ হাজারেরও বেশি অভিবাসন প্রত্যাসীর মৃত্যু হয়েছে।