দুয়ারে কড়া নাড়ছে হজ্বের মৌসুম

109

শাহ মুহাম্মদ খালেদ  ।।

দুয়ারে কড়া নাড়ছে হজের মৌসুম। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম বাইতুল্লাহ অভিমুখে যাত্রার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি সেরে নিচ্ছেন। প্রতিবছর হজের মৌসুমে হেজাজের ভূমিতে যে বিপুল সংখ্যক হাজীর সমাগম হয় তার বড় একটি অংশ হচ্ছে বাংলাদেশের।

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর    লাখের উপরে মানুষ হজব্রত পালনের জন্য সৌদি গমন করছেন। ১৯৯৮ সালে ঢাকা বিমান বন্দরের বিপরীত পাশে আশকোনা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় হজক্যাম্প। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এখান থেকেই বাংলাদেশী হাজীদের হজ্বের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্পন্ন করা হয়।

আশকোনার হজ্বক্যাম্পে গিয়ে সরেজমিনে দেখা যায়, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাইতুল্লাহর মেহমানগণ এসে সমবেত হচ্ছেন। প্রবেশ পথে যথেষ্ট কড়াকড়ি। হাজীগণ এবং তাদের সাথে এক দু’জন আত্মীয়-স্বজনকে কেবল ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে। বাকীদের বলা হচ্ছে বাইরে অপেক্ষা করতে।

আজ প্রথম ফ্লাইট বিধায় আল্লাহর মেহমানদের পদভারে মুখরিত পুরো হজ্বক্যাম্প। চারিদিকে বিরাজ করছে চমৎকার এক নূরানী পরিবেশ। এর মধ্যে দেখা মেলে হজ্ব পরিচালনা কর্তৃপক্ষের নানামুখী তৎপরতা। আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া মিলেছে এখানেও। বিভিন্ন জায়গায় জায়ান্ট স্ক্রিন ও ডিজিটাল সাইন বোর্ডে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা এবং সঠিকভাবে হজ্ব আদায়ের পদ্ধতি দেখানো হচ্ছে।

ক্যাম্পের একটি ওয়েটিং চেয়ারে বসে একমনে পান চিবুচ্ছিলেন রংপুর সাতমাথা থেকে আসা ওমর ফারুক (৪০)। কথা প্রসঙ্গে জানা গেল তিনি সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ্ব যাচ্ছেন। বাংলাদেশ থেকে যারা হজ্ব পালন করতে যান তাদের সিংহভাগই বেসরকারি বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে গিয়ে থাকেন। যেমন চলতি বছর হজে যাচ্ছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ১৯৮ জন। তাদের মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন সাত হাজারের কিছু বেশি।

ওমর ফারুক জানালেন এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে হজ্বে গিয়ে মানুষ অনেক বাজে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে বিগত কয়েক বছরে। বিপরীতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সে ধরনের হয়রানির ঝুঁকি কম। তিনি এ গ্রেডে ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিয়েছেন। এছাড়া রয়েছে বি গ্রেড, যেখানে খরচ হয় তিন লাখ ৪৫০০০ টাকা।

বগুড়া ক্যান্টনমেন্ট থেকে এসেছেন আমিনুর রহমান (৫৫)। স্থানীয় আল খায়ের ট্রাভেলস এর মাধ্যমে যাচ্ছেন তিনি। “একেকজন হাজীর কাছ থেকে একেক পরিমাণ টাকা নেয়া হয়েছে। মাঝখানে মধ্যস্বত্বভোগীও রয়েছে। আমি নিজেদিয়েছি  তিন লক্ষ টাকা। আমাদের ৮০ জনের দলটি থাকবে স্থানীয় একজন মুয়াল্লিমের অধীনে। আগামীকাল দুপুর বারোটায় আমাদের ফ্লাইট।” —বলছিলেন বগুড়া থেকে আসা পঞ্চাশোর্ধ আমিনুর রহমান। এবার সরকারি ঘোষণামতে ফ্লাইটের কমপক্ষে ১০ ঘণ্টা আগে ঢাকা হজ্বক্যাম্পে রিপোর্ট করতে হবে।

যেসব হজ যাত্রী তারও আগে আসছেন তাদের আবাসনের চমৎকার ব্যবস্থা রয়েছে হজ ক্যাম্পের তৃতীয় চতুর্থ ও পঞ্চম তলায়। পুরুষ এবং মহিলাদের জন্য রয়েছে ভিন্ন ওয়ার্ড। তবে খাবার নিজ দায়িত্বে এবং নিজ খরচে তাদেরকে খেয়ে নিতে হয়। আসরের পর দেখা গেল হজ্বক্যাম্প জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হজ্বের কার্যাবলী সম্পর্কে মানুষকে ব্রিফিং করছেন।

ইমাম মাওলানা এস এম জাহাঙ্গীরের দেওয়া তথ্যমতে অন্যান্য সময়ে মসজিদের অর্ধেকের মতো জায়গা নামাজের সময় পূর্ণ হয়। বিশেষত মাগরিবের নামাজে ৬০০ থেকে ৭০০ মুসল্লী শরীক হয়। আর শুক্রবার এখানে জুমার নামাজ অন্যান্য মসজিদের তুলনায় আধাঘন্টা আগে হয়। ফলে আগেভাগে নামাজ শেষ করার জন্য অন্যান্য মসজিদ এলাকার মুসল্লিরাও এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে আসেন।

ইমাম জাহাঙ্গীর বললেন, হজ্বযাত্রীরা প্রশিক্ষণ তো নিয়েই আসেন, তবু তিনি সাধ্যমত তাদেরকে বিষয়গুলো আরো ভালো করে বুঝানোর চেষ্টা করেন। এ বছর থেকে নতুন নিয়ম অনুযায়ী বেশকিছু হাজীর সৌদি আরব অংশের ইমিগ্রেশন বাংলাদেশই সম্পন্ন হবে। বাংলাদেশ অংশের ইমিগ্রেশন আগ থেকেই দু’ভাগে হয়ে থাকে। যেসব যাত্রী বাংলাদেশ বিমানে করে যাবেন তাদের ইমিগ্রেশন হয় হজ্বক্যাম্পে। আর যারা সৌদি এয়ারলাইন্সে যাবেন তাদের ইমিগ্রেশন এয়ারপোর্টে। এভাবে দুই ভাগে বাংলাদেশ অংশের ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার পর বিমান বন্দরে বসানো বিশেষ বুথে সৌদি অংশের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হবে। সে উদ্দেশ্য সৌদি ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের প্রেরিত প্রতিনিধি দল এখন এয়ারপোর্টে অবস্থান করছেন। ফলে এসব হজযাত্রীকে জেদ্দা বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন এর জন্য সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে না।

উপরের তলায় হজযাত্রীদের জন্য যে আবাসন ব্যবস্থা সেখানে যাওয়ার পথটুকু নিয়ন্ত্রণ করছিলেন কয়েকজন স্কাউট সদস্য। কথা হলো ফরিদপুর থেকে আসা রোভার স্কাউট সদস্য মোহাম্মদ আলী শেখের সাথে। ফরিদপুরের একটি কলেজে তিনি পড়ালেখা করেন তিনি। এখানে ছয় দিনের জন্য এসেছেন। এভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোবার স্কাউটের সদস্যরা পালাক্রমে হজ ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করবেন। “আমরা মূলত হজ্বযাত্রীগণকে প্রথমে রিসিভ করা, এরপর তাদের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা বা ফর্মালিটিগুলো সম্পন্ন করা এবং ইমিগ্রেশনের আগ পর্যন্ত তাদের আবাসন ব্যবস্থা, সবশেষে সুষ্ঠুভাবে ইমিগ্রেশন পার হওয়া— এসব ক্ষেত্রে আমরা সহায়তা দিয়ে থাকি। পাশাপাশি যে কোন বিষয়ে যে কোন তথ্যের জন্য আমাদের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে— বলছিলেন রোভার স্কাউট সদস্য মোহাম্মদ আলী শেখ।

প্রসঙ্গত আজ থেকে শুরু হচ্ছে হজের ফ্লাইট। সকাল সোয়া সাতটায় ৪১৯ জন হজযাত্রী নিয়ে জেদ্দার উদ্দেশ্যে উড়াল দিয়েছে বিমান বাংলাদেশের বিজি ৩০০১ ফ্লাইট। বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটায় চলতি বছরের হজ মৌসুমের উদ্বোধন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী এমপি এবং ধর্ম মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আব্দুল্লাহ।